kalerkantho


নয়মাস

চোখের জলে লেখা সত্যি গল্প

মাসউদ আহমাদ

১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



চোখের জলে লেখা সত্যি গল্প

নয়মাস : ইমদাদুল হক মিলন। প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ। প্রকাশক : অনন্যা, ফেব্রুয়ারি ২০১৭। দাম : ১৭৫ টাকা।

বড় ক্যানভাসে কোনো গল্প লিখতে গেলে সুন্দর একটি আবহ তৈরি করে নিতে হয়, যাতে গল্পটি পড়ে ওঠার জন্য পাঠকের অনুরাগ ও আগ্রহ জিইয়ে থাকে। খ্যাতিমান কথাশিল্পী ইমদাদুল হক মিলনের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা সাম্প্রতিক উপন্যাস ‘নয়মাস’ পড়তে পড়তে সেই মনোরম কৌশলের কথা আরেকবার উপলব্ধি হলো। তাঁর দীর্ঘ উপন্যাস ‘নূরজাহান’-এর শুরুতে আমরা তা দেখেছি। নতুনতর এই উপন্যাসেও তিনি দক্ষতার সঙ্গে সেই কৌশলটি ব্যবহার করেছেন।

এই বইতে দুটি আখ্যান। দুটিই মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা। কিন্তু প্রথম পর্বটির নাম ‘নয়মাস’।

এটির নামানুসারে বইটির নাম রাখা হয়েছে।

মায়মুনা হায়দার খান ১৩ বছরের একটি পাকিস্তানি মেয়ে। বাবার চাকরির সূত্রে সে মা-বাবার সঙ্গে ঢাকায় থাকে। অসম্ভব সুন্দরী ও মেধাবী মুনা। বেশ লম্বা, বুদ্ধিমতীও। ভালো ক্রিকেট খেলে। বনানীর দ্য সিটি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে সিক্সথ গ্রেডে পড়ে। তার নিজের জগৎ ও দিনযাপনের ভেতর দিয়ে গল্প পাখা মেলে ধরে। টেলিভিশনে মার্চ মাসের বাংলাদেশ-পাকিস্তানের ক্রিকেট খেলার সূত্র ধরে মুনার মাথায় ঢুকে পড়ে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ ও পাকিস্তান আর্মির গল্প। সেই গল্প এমন রহস্যময় যে পরিবারের কেউ তা নিয়ে মুখ খোলে না। মুনাদের বাড়ির পাশেই একজন লেখক-সম্পাদক থাকেন। বন্ধুদের সঙ্গে মুনা একদিন সেই লেখকের বাসায় যায়। ক্যান্ডি ও কোক খেতে খেতে গল্প করে। গল্পের বিষয় অনিবার্যভাবে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশ ও পাকিস্তানি আর্মির নৃশংসতার কাহিনি। কিশোরী একটা মেয়েকে উপন্যাসের কথক মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর ঘটনা ও চিত্র বলে চলেন। সেসব শুধু গল্পই নয়, প্রতিটি গল্প ও চিত্রই বলেন ইতিহাসসমর্থিত প্রক্রিয়ায়। লেখক অবশ্য বইয়ের শেষে সহায়ক গ্রন্থের তালিকাও জুড়ে দিয়েছেন। ফলে ‘নয়মাস’ আখ্যানটি একজন পাকিস্তানি কিশোরী ও লেখকের আলাপচারিতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, হয়ে উঠেছে একাত্তরের পূর্বাপর ঘটনার প্রামাণ্য গল্প। যে গল্প জানাটা জরুরি বাংলাদেশের প্রত্যেকটি মানুষেরও।

উপন্যাসটি পড়তে পড়তে গুলির শব্দ, রক্ত, মানুষের গগনবিদারী হাহাকার, আগুনের রং, কামানের বুক কাঁপানো বিকট আওয়াজে মন দুলে ওঠে। মাথা ফাঁকা হয়ে আসে। চোখে জল এসেও থেমে থাকে। চোখ ঝাপসা লাগে। পুরান ঢাকার হিন্দু সম্প্রদায় ও ছাত্রদের ওপর কী নির্মম ও পৈশাচিক অত্যাচার চালিয়েছিল পাকিস্তানি আর্মি, সেই বর্ণনা উঠে আসে। বিভিন্ন জেলা শহরের আকাশ ও মাটি কিভাবে রং ও লাবণ্য পাল্টে ফেলছে পাকিস্তানি সৈন্যদের লোমহর্ষক কর্মকাণ্ডে, তার অনুপম চিত্র গল্পের ঢঙে এখানে লিপিবদ্ধ করেছেন মিলন। বইটি পড়ার সময় সেসব দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে জীবন্ত হয়ে। আখ্যানটুকু সামান্যই, কিন্তু পড়ে শেষই হতে চায় না—মনটা ভার হয়ে আসে। চোখের জলে গাল, বুক ভেসে যায়। মুনাকে মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতে বলতে কথক নিজেও আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। আড়ালে চলে গিয়ে চোখের জল লুকোন।

রাজারবাগ পুলিশ লাইনের সদস্যরা মানুষকে পাহারা দেন, নিরাপত্তা তৈরি করেন। কিন্তু একাত্তরে তাঁরাও কিভাবে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন, লেখক তা গল্পচ্ছলে মুনাকে বলে চলেন।

মুক্তিযুদ্ধের টুকরো আখ্যানের ভেতর দিয়েই পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গড়ে ওঠা, এর নেপথ্য নায়ক বঙ্গবন্ধু ও তাঁর সহযোগীদের কর্মতৎপরতা এবং দুর্ভোগ—এসবও এতে মূর্ত হয়ে উঠেছে। এতে পাঠক দুটি গল্প পাবেন—প্রথমটি গল্পচ্ছলে কিশোরী পাকিস্তানি মেয়েটিকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সত্যি গল্প বলা—পর্ব; আর অন্যটি মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর ভয়াবহ বিবরণ জেনে ওঠার পর কিশোরীর মানসরাজ্যের বিস্ময়কর পরিবর্তন। যে পরিবর্তনের ঢেউ তার পরিবারে এসে আছড়ে পড়ে। মুনা পাকিস্তানকে ঘৃণা করতে শুরু করে। একসময় সে মা-বাবাসহ পাকিস্তানে ফেরত যাওয়ার পরিস্থিতিও তৈরি করে। উপন্যাসটি পাঠের পর চোখের জল কিছুতেই সংবরণ করা যায় না। অনেক দিন পর ইমদাদুল হক মিলন তাঁর কুশলী শিল্পসত্তার পরিচয় দিলেন চোখভেজা চমতকার একটি আখ্যান উপহার দিয়ে।


মন্তব্য