kalerkantho


প্রদর্শনী

শিল্পী মোখলেসের ক্যানভাসে রূপসী বাংলা

আইয়ুব ভূঁইয়া

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



শিল্পী মোখলেসের ক্যানভাসে রূপসী বাংলা

স্প্রিংস বার্থ-২

বাংলার আবহমান প্রকৃতি ও নিসর্গ যুগে যুগে দেশ-বিদেশের শিল্পী ও সাহিত্যিকদের অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁদের সৃষ্টিতে বিভিন্নভাবে উঠে এসেছে এ জনপদের মাটি ও মানুষের কথা। সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ থেকে শুরু করে বিভূতি ভূষণের ‘পদ্মা নদীর মাঝি’তে এ ভূখণ্ডের প্রকৃতি ও নিসর্গ সংলগ্ন গণমানুষের জীবনযাত্রা ফুটে উঠেছে। রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় নদী ও নারীকে অসাধারণ নান্দনিকতায় উপস্থাপন করেছেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, কামরুল হাসান ও সফিউদ্দিন আহমেদ থেকে শুরু করে সমসাময়িক অনেক শিল্পীর ক্যানভাসে এ দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। বাংলার জল ও আলো-বাতাস শিল্পিত রূপ পেয়েছে তাঁদের চিত্রকর্মে। শিল্পী মোখলেসুর রহমান এ ধারারই একজন খ্যাতিমান শিল্পী। তিন দশকেরও বেশি সময় তিনি প্রকৃতি ও নিসর্গ নিয়ে কাজ করে আসছেন নিরলসভাবে।

শিল্পী মোখলেস তাঁর ছবি পটে নীল আকাশের দিগন্ত রেখাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করেন। ছুটে গেছেন দিগন্ত রেখার দিকে দুরন্ত কিশোরের মতো। কিন্তু দিগন্ত স্পর্শ করা তো সম্ভব নয়। তাই ফিরে আসেন বারবার। তাঁর কাজে দিগন্ত বিস্তৃত সবুজ মাঠের বুক চিরে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে নদী। নদীর বুকে চলছে পালতোলা নৌকা। মাঝি যেন ভাটিয়ালি সুরে গান ধরেছে। জীবনানন্দের রূপসী বাংলাকে তিনি ক্যানভাসে অসাধারণ নান্দনিকতায় তুলে ধরেছেন। জীবনানন্দকে যদি বলা যায় রূপসী বাংলার কবি, তাহলে নিঃসন্দেহে শিল্পী মোখলেসকে বলা যায় রূপসী বাংলার চিত্রকর। এই রূপসী বাংলাকে মোখলেস কখনো বিমূর্ত, আবার কখনো আধা বিমূর্তভাবে তুলে ধরেছেন। ছবির পটে ধানক্ষেত, গাছ, ঘরবাড়ি, মানুষ, জলাশয়ে শাপলাপাতা ও শাপলা ফুলকে উপস্থাপন করেছেন শিল্পী। প্রতিটি ছবিতেই প্রকৃতির প্রতি তাঁর গভীর অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। চারদিকের বিস্তীর্ণ প্রান্তরকে তিনি পাখির চোখে অবলোকনের চেষ্টা করেছেন।

অসংখ্য নদী ও খাল-বিলে ভরা শরিয়তপুরে জন্ম নেওয়া শিল্পী মোখলেসুর রহমানের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে গ্রামে। সেখানকার খরস্রোতা নদী, নদী তীরের কাশফুল, ধু ধু বালুচর আর দিগন্ত বিস্মৃত ফসলের মাঠ তাঁর হৃদয়ের গভীরে এখনো গেঁথে রয়েছে। ছবি আঁকতে গিয়ে আজ এসব স্মৃতি তাঁর কাছে মহামূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছে।

মোখলেস সত্যিকার অর্থেই একজন প্রকৃতিপ্রেমী শিল্পী। প্রকৃতির প্রতি রয়েছে তাঁর অসীম ভালোবাসা। তাই তাঁর ছবিগুলোতে নৈসর্গিক দৃশ্য জীবন্ত হয়ে ওঠে বারবার। নিসর্গের প্রতি তাঁর এই তীব্র আকর্ষণে ঢাকার অদূরে সবুজের সমারোহে আবাস গড়ে তুলেছেন মোখলেস। নগরের ধুলাবালি ও কোলাহল থেকে দূরে অবস্থান করে এখানে শিল্পচর্চা করে যাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন এই প্রকৃতিজাত শিল্পী। এখানে বসে চন্দ্রালোকিত রাতের দৃশ্য অনুভব করেন। হেমন্তের পড়ন্ত বিকেল দেখেন এবং বসন্তে কোকিলের ডাক শোনেন। আর এসব অনুভূতির আলোকে ক্যানভাস ভরে তোলেন।

রূপসী বাংলার চিত্রকর শিল্পী মোখলেসুর রহমান শৈশব থেকেই প্রকৃতির অসীম সৌন্দর্যের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ার মধ্য দিয়ে বাংলার রূপকে তুলে ধরেছেন। কখনো কাগজে, কখনো ঐতিহ্যবাহী গামছা, শাড়ি, কখনো ব্যবহৃত কাঁথা, বিভিন্ন পটে উডকাট প্রিন্ট করে দেশ-বিদেশের শিল্প ও শিল্প সমজদারদের কাছে সমাদৃত হয়েছেন। একটার পর একটা স্বচ্ছতলে প্রিন্টের পর প্রিন্ট দিয়ে প্রকৃতির গহিন থেকে গহিনে বিচরণ করে এক অপরূপ সৃষ্টিশৈলী উদ্ভাবন করেছেন। সহসাই দর্শক তাঁর কাজের গহিনে সাঁতার কেটে অবগাহন করতে পারেন। ওপর থেকে নিচে, আবার নিচ থেকে ওপরে ভেসে বেড়াতে পারেন। ভেতর থেকে বাইরে, আবার বাইরে থেকে ভেতরে যাওয়া-আসা এক অনাবিল আনন্দে মুখরিত করে তাঁর কাজ। মোখলেসকে উডকাটের জাদুকর বলা যায়। কাঠের টেক্সচারকে এমনভাবে উপস্থাপন করেছেন, যেন প্রকৃতির মতোই তা সহসা সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু এগুলো তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণা ও কঠোর পরিশ্রমের ফসল। তাঁর কাজে নৃত্য, কাব্য ও এক ধরনের সংগীতময়তা অনুভব করা যায়। কাব্য ও সংগীতপিপাসু শিল্পী মোখলেস কবিতা ও সংগীতকে অবলম্বন করেও বেশ কিছু কাজ করেছেন।

এই প্রদর্শনীতে ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে আঁকা তাঁর বেশকিছু পেইন্টিংও রয়েছে। পেইন্টিংগুলোর সৃষ্টিশৈলীতেও এক আশ্চর্য স্বতঃস্ফূর্ততা রয়েছে, যা তাঁকে রূপসী বাংলার চিত্রকর হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। ৩৮ বছর ধরে মোখলেস ছাপচিত্রের মাধ্যমে নিরলসভাবে কাজ করে আসছেন। প্রখ্যাত শিল্পী সফিউদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ কিবরিয়া ও আবুল বার্ক আলভী এবং প্রি-ডিগ্রির শিক্ষক শিল্পী মাহমুদুল হক, মাহবুবুল আমিন, শহীদ কবির, মতলুব আলী ও আবদুস শাকুর শাহর সুযোগ্য ছাত্র মোখলেস বাংলাদেশের শিল্পকলাকে বিশ্ব অঙ্গনে সম্মানের সঙ্গে পরিচিত করেছেন। ২০১৩ সালে তিনি পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পকলার উৎসব ভেনিস বিয়েনালে ছাপচিত্র মাধ্যমে রূপসী বাংলাকে নান্দনিকভাবে উপস্থাপন করেন। ৫৫তম এই ভেনিস বিয়েনালে তাঁর কাজগুলো ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়। ফলে তিনি প্যারিসে তাঁর কাজের প্রদর্শনীর জন্য আমন্ত্রিত হয়েছিলেন।

শিল্পী মোখলেসুর রহমান পড়াশোনা করেছেন ছাপচিত্রে। প্রথমদিকে লিথো ও এচিংয়ে প্রচুর কাজ করেছেন। পরবর্তী সময় দীর্ঘদিন কাঠ খোদাই কাজে ব্যস্ত ছিলেন। এখন অবশ্য তিনি পেইন্টিং করছেন বেশি। বেশির ভাগ কাজেই অ্যাক্রিলিক মাধ্যমে।

মোখলেস ছাপচিত্র নিয়ে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। কাগজের পাশাপাশি তিনি এ জনপদের মানুষের নিত্য ব্যবহৃত ঐতিহ্যবাহী গামছার ওপরও প্রিন্ট করেছেন। তবে তাঁর এ কাজগুলো বর্তমান প্রদর্শনীতে নেই। এগুলো নিয়ে তিনি আরেকটি পৃথক প্রদর্শনী করার কথা ভাবছেন। কিছু কিছু কাজে তিনি নেটও ব্যবহার করেছেন। এর ফলে এসব কাজে ভিন্ন ধরনের তৃপ্তি পাবেন দর্শক। এ ছাড়া বেশ কিছু কাজের প্রিন্ট নিয়েছেন খবরের কাগজের ওপর। এগুলোও ভিন্ন মেজাজের কাজ হিসেবে দর্শকদের কাছে বিবেচিত হবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন শিল্পী।

শিল্পী মোখলেসুর রহমানের এটি অষ্টম একক প্রদর্শনী। সপ্তম একক প্রদর্শনীর মতো এবারের প্রদর্শনীর প্রতিপাদ্যও ‘রূপসী বাংলা’। এতে বিভিন্ন মাধ্যমের প্রায় ৩৫টি শিল্পকর্ম রয়েছে। মোখলেস জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালিসহ দেশে-বিদেশে অসংখ্য দলীয় প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বেশ কিছু পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন তিনি। এর মধ্যে  উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ২০০১ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দশম দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে গ্রান্ড প্রাইজ এবং একই বছর সাজু আর্ট গ্যালারি আয়োজিত দলীয় প্রদর্শনীতে সম্মান পুরস্কার লাভ।

তিনি ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত মার্কিন শিল্পী ক্যারেন কুঙের অধীনে ছাপচিত্র কর্মশালায় অংশ নেন। ক্যারেন কুঙের কর্মকৌশল মোখলেসকে খুবই উদ্দীপ্ত করেছে। শিল্পী মোখলেস দেশের বাইরে ইতালির রাজধানী রোম এবং ভারতের হায়দরাবাদ ও কলকাতায় একক প্রদর্শনী করেছেন।


মন্তব্য