kalerkantho


অন্তরঙ্গ আলোকে হাসান আজিজুল হক

গোলাম মুরশিদ

৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অন্তরঙ্গ আলোকে হাসান আজিজুল হক

আলোকচিত্রী : মানব

তরুণ বয়সে মানুষ অনেক হঠকারী কাজ করতে পারে, আগামাথা না ভেবে—বইয়ের ভাষায় বললে—অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে। ১৯৭০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর সনৎ সাহা আর আমি তেমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, যার ফলে কয়েক মাস পর স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আমাদের খেসারতও দিতে হয়েছিল।

সেই দিনটা ছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ১৫০তম জন্মদিন। আমরা দুজন সেদিন ঠিক করেছিলাম, বিদ্যাসাগরের সার্ধশতবর্ষ অর্থাৎ ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একটা স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করব। গোড়াতে আমরা চেয়েছিলাম তখনকার রাজশাহীর ত্রৈমাসিক সাহিত্য পত্রিকা পূর্বমেঘের একটা বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করতে। কিন্তু পত্রিকার সম্পাদক অধ্যাপক জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী তাতে রাজি হননি। সে জন্য আমরা বিদ্যাসাগরকে নিয়ে একটা বই প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। যেমন কথা তেমন কাজ। সন্তান হতে সময় লাগে ৯ মাস। কিন্তু আমাদের পরিকল্পনা বাস্তবে জন্ম নিতে সময় লেগেছিল মাত্র তিন মাস। ছাপা-বাঁধাই হয়ে যাওয়ার পর সেই বইকে আনুষ্ঠানিকভাবে সূর্যের আলো দেখানোর জন্য খুলনা থেকে হাসান আজিজুল হক এসেছিলেন প্রধান অতিথি হয়ে। তাঁর সঙ্গে সেই প্রথম পরিচয়। তারপর ৪০ বছরেরও বেশি চলে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে ব্যক্তি ও সাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক—উভয়কেই বেশ কাছাকাছি থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে।

তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল আরো আগে, পূর্বমেঘের পাতায়। প্রথম বইটার নাম ছিল খুব আকর্ষণীয়—‘সমুদ্রের স্বপ্ন, শীতের অরণ্য’। যদিও ছোটগল্পের বই না হয়ে কবিতার বই হলেই বোধ হয় এ নামটা আরো বেশি মানানসই হতো (তা ছাড়া, সত্যি বলতে কি, নামটা খুব সুন্দর শোনালেও আমি তার অর্থ বুঝতে পারিনি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বইও ছোটগল্পের এবং তাদের নামও কাব্যিক—‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’ এবং ‘জীবন ঘষে আগুন’)।

১৯৭১ সালের জানুয়ারিতে দেখা হলেও তাঁর সঙ্গে সত্যিকার পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা হয় যখন তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন, তখন, যত দূর মনে পড়ে, ১৯৭৩ সালের গোড়ায়। তখনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দুর্নীতি ও দলবাজির আখড়ায় পরিণত হয়নি। সেখানে তখনো রাজনীতি হতো, কিন্তু সেই সঙ্গে লেখাপড়াও হতো। এখনকার মতো ক্ষমতার ধামাধারীরা উপাচার্য হতেন না; তখন উপাচার্য হতেন সাধারণত নামকরা পণ্ডিত ও গুণী ব্যক্তিরা। তাঁরা গুণীর কদরও করতে জানতেন। হাসান আজিজুল হককে মফস্বলের কলেজের গণ্ডি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর পরিবেশে নিয়ে আসেন এমন একজন গুণী উপাচার্য—অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ। তার ফলে হাসান আজিজুল হকের কাজ করার সুযোগ ও পরিসর বৃদ্ধি পেয়েছিল—সেটা তাঁর ব্যক্তিগত লাভ। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় ও তার পরিবেশ লাভবান হয়েছিল তার চেয়ে ঢের বেশি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে তখনো মননশীলতা ও সমাজবিবেকের একটা ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল। দেশকে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাওয়ার চিন্তার উন্মেষ তখন হতো বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেই চিন্তাকে পরে বাস্তবতায় অনুবাদ করতেন রাজনীতিকরা। ভাষা-আন্দোলন হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার থেকে ১৯ বছর পর বাংলাদেশের জন্ম। এমনকি জাতির জনক শেখ মুজিবের যে ছয় দফা দাবি পাকিস্তানের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়েছিল, তারও সূত্রপাত বিশ্ববিদ্যালয়ে। হাসান আজিজুল হক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মননশীলতার পরিবেশ সমৃদ্ধ করেছিলেন। বুদ্ধিজীবীদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সামগ্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করেছিলেন। তাঁকে নিয়ে এসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মহা উপকার করেছিলেন অধ্যাপক খান সারওয়ার মুরশিদ।

বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর প্রথম দিকে তাঁর গল্প লেখায় জোয়ার আসেনি; কিন্তু তাতে পরিণতি এসেছিল। তিনি এ সময়ে একে একে ‘জীবন ঘষে আগুন’, ‘নামহীন গোত্রহীন’ ও ‘পাতালে হাসপাতালে’র গল্পগুলো প্রকাশ করেন। বই তিনটির কোনোটিই আকারে বড় নয়। প্রথম বইটিতে আছে মাত্র তিনটি গল্প। দ্বিতীয়টিতে পাঁচটি। আর তৃতীয়টিতে সাতটি। কিন্তু তিনটির মধ্যেই ভাষা ও ভঙ্গি নিয়ে তাঁর অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার স্বাক্ষর রয়েছে। এই পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে তিনি প্রথম দিকের অবস্থান থেকে যথেষ্ট সরে আসেন।

ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা বলেন যে হাসান আজিজুল হকের প্রথম নামটা ‘হাসান’ আরবি শব্দ নয়, ওটা আসলে বাংলা। এর সরল অর্থ যিনি অন্যদের হাসান। এটা যদি সত্যি সত্যি বাংলা হয়ে থাকে, তা হলে বলব যে, তাঁর নাম ষোলো আনা সার্থক। তিনি নিজে যেমন অবস্থায়ই থাকুন না কেন, তাঁর কথা শুনে অন্যদের হাসতে হবেই। হাসতে হাসতেই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে তাঁর কথার তাত্পর্য। যত দিন রাজশাহীতে ছিলাম, কারণে-অকারণে মন খারাপ হলে তাঁর কাছে চলে যেতাম হাসির বড়ি খেয়ে মন ভালো করার জন্য। কিন্তু যে হাসান অন্যদের এত হাসান, তাঁর মধ্যে যে কান্নার বিশাল খনি রয়েছে, সেটা টের পেয়েছিলাম আরো পরে।

১৯৭৮ সালের জুলাই মাসে আমি মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কাজ করতে। সেখানে ভারতচর্চা বিভাগের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক শিবনারায়ণ রায়। তিনি ও তাঁর স্ত্রী গীতা রায় তাঁদের অতুলনীয় আন্তরিকতা দিয়ে আমাদের প্রবাসজীবনের নিঃসঙ্গতা অনেকটাই মুছে দিয়েছিলেন। অধ্যাপক অতীন মজুমদার ও তাঁর পরিবারও আমাদের গ্রহণ করেছিলেন আন্তরিকতার সঙ্গে। কিন্তু রাজশাহীর জীবন থেকে তা ছিল যথেষ্ট আলাদা। রাজশাহীতে ছিলাম বহু বন্ধুপরিবেষ্টিত। সে জন্য মেলবোর্নেও সেই বন্ধুদের জন্য, দেশের জন্য মন কেমন করত। এই পরিবেশে আমি অধ্যাপক শিবনারায়ণ রায়কে একদিন জিজ্ঞেস করি যে হাসান আজিজুল হককে একটা বৃত্তি দিয়ে নিয়ে আসা যায় কি না। অধ্যাপক রায় বলেন যে পিএইচডি করার জন্য আবেদন করলে একটা বৃত্তি দিয়ে আনা যায়। আমি আবেদনের ফরম পাঠিয়ে দিই। অধ্যাপক রায় আশ্বাস দিয়ে বলেন, হাসান আবেদন করলে তিনি সুপারিশ করবেন। হাসানের রেফারি ছিলেন অধ্যাপক ডেভিড কফ আর আমি। আমরা দুজনেই তাঁর সম্পর্কে অনেক উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলাম। তা ছাড়া তত দিন হাসানের সাহিত্যকীর্তি নিয়ে একটি বইও প্রকাশিত হয়েছিল। এসব মিলে হাসান বৃত্তি পেয়ে মেলবোর্নে আসেন ১৯৭৯ সালের, যদ্দুর মনে পড়ছে, আগস্ট মাসে।

তাঁর অন্তত বছর তিনেক থাকার কথা। তাই তিনি থাকতেন আমাদের বাড়িতে, গেস্ট হিসেবে। তখন সেখানকার শীতকাল। সেই শীতে খানিকটা কাবু হলেও প্রথম কয় দিন সময় কাটল হাসি-হুল্লোড়ে, মেলবোর্ন দেখে, অন্যদের সঙ্গে পরিচয় করে ইত্যাদি। তারপর হাসান লেখাপড়া শুরু করলেন। কিভাবে বঙ্গদেশে পশ্চিমা দর্শন ধীরে ধীরে অনুপ্রবেশ করে—এই ছিল তাঁর অধ্যয়নের বিষয়। আমরা দুজন রোজ ব্রেকফাস্ট করে মুনিপন্ডস্ থেকে ট্রামে করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে গিয়ে নামি। সারা দিন কাজ করি, ৫টার পর ফিরে আসি। সপ্তাহে এক দিন বিকেলে থাকত বিভাগের সেমিনার। সেখানে বিভাগের ছাত্র-ছাত্রী ছাড়া বাইরে থেকেও কয়েকজন একাডেমিক নিয়মিত আসতেন, এমনকি, দূরের লা ট্রোব বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও।

এই সেমিনারে একজন একটা পেপার পড়তেন। অন্যরা তার প্রান্তবন্ত আলোচনা করতেন লাল-সাদা শরাব আর অরেঞ্জ জুস সহযোগে। হাসান ও আমি আলোচনায় অত অংশ নিতাম না। আমি নিতাম না আমার ইংরেজির দুরাবস্থা (আকারটা ইচ্ছা করে দিয়েছি) সম্পর্কে অতিসচেতন হওয়ার জন্য। কিন্তু আলোচনায় অবদান যত কমই থাক, সেখানেই প্রথম শিখলাম কিভাবে আলোচনার মধ্য দিয়ে যথার্থ শিক্ষা লাভ হয় এবং ভাবতে শেখা ও ভাবতে শেখানো যায়। তা ছাড়া আদর্শ ছাত্র-শিক্ষকের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, তা-ও দেখলাম সেই সেমিনারে। পরে দেশে ফিরে আমি আমার টিউটরিয়াল গ্রুপগুলো নিয়ে এমনই সাপ্তাহিক সেমিনারের আয়োজন করেছিলাম। সেসব সেমিনারে যেসব কম-বেশি মৌলিক প্রবন্ধ পড়া হয়েছিল, তার অধিকাংশই বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। স্বরোচিষ, সাইফুদ্দীন, আবুল হাসান, শফিক, সুজিৎসহ অনেককেই আমি উৎসাহ দিয়ে তাঁদের শক্তিটাকে উসেক দিতে পেরেছিলাম। তাঁরা পরে সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ের   অধ্যাপক হন।

হাসান ও আমি বসতাম ভিন্ন ঘরে। আমাদের কাজও ছিল ভিন্ন রকমের। তাই তিনি কী পড়ছিলেন ও তাঁর লেখাপড়ায় কতটা উন্নতি করছিলেন, তা আমার বিশেষ জানা ছিল না। ধীরে ধীরে শীতের কুয়াশা সরিয়ে দিয়ে নানা রঙের পসরা সাজিয়ে মেলবোর্নে বসন্ত নামল। কিন্তু হাসানের মুখে দেখা দিতে শুরু করল হেমন্তের পড়ন্ত বেলার অন্ধকার। তারপর রৌদ্রোজ্জ্বল মেলবোর্নেই দেখলাম তাঁর মুখে বিষাদের কালো মেঘ। নিজে তো হাসেনই না, অন্যদের হাসানোর কাজেও ইস্তফা দিলেন। আস্তে আস্তে বোঝা গেল তাঁর মধ্যে একটা মানসিক অসুখ দানা বাঁধছে—যাকে ইংরেজি পরিভাষায় বলে ডিপ্রেশন। শারীরিক অসুখ হলে সেটা সহজেই চোখে পড়ে, মানুষ অমনি ডাক্তার ডাকে, ওষুধ খায়। মনের অসুখ করলে সেটা কেউই সহজে গ্রাহ্য করে না। আমরাও করিনি। আমরা সবাই ধরে নিলাম যে পরিবার ছেড়ে এসে হাসানের মন খারাপ করেছে। আবার ভালো হয়ে যাবেন। কিন্তু তিনি এই মানসিক অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারলেন না। অন্তত বছর তিনেক তাঁর প্রবাসের নিঃসঙ্গতার মধ্যে কাটাতে হবে—এই চিন্তা বোধ হয় তাঁকে বিশেষ বিচলিত করেছিল। এ অবস্থায় মাঝেমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করলেন তিনি। মুখে বিষাদের ছায়া আরো পুরু হলো। তারপর একদিন অধ্যাপক রায়কে বললেন যে তিনি দেশে চলে যেতে চান। যেদিন তাঁর যাওয়ার টিকিট এলো, সেদিন হাসান খুশিতে আবার হাসলেন, আর দুঃখিত হলাম আমরা বাকি সবাই। বোধ হয় নভেম্বর মাসের শেষে তিনি মালয়েশিয়া হয়ে দেশে ফিরে এলেন।

আমি নিজেকে কখনো কখনো অপরাধী ভাবতাম। ভাবতাম, কী জানি আমাদের আতিথেয়তায় কোনো ত্রুটি ছিল নাকি। কিন্তু অনেক বছর পর তিনি যখন মার্কিন মুলুকে যান, তখনো মন খারাপ করে দেশে ফিরে আসেন। তাই ভেবে নিজেদের সান্ত্বনা দিই। মালয়েশিয়া থেকে ঢাকায় নামার সঙ্গে সঙ্গে নাকি তাঁর মনের ভারও নেমে গিয়েছিল। এর প্রায় ১০ বছর পরে আবার যখন লন্ডনে বেড়াতে যান, তখন তিনি বেশ হাসিখুশিই ছিলেন, আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। তবে মেলবোর্ন থেকে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মনের অবস্থা ভালো হয়নি। আসলে মনের বিষণ্নতা বা ডিপ্রেশন একটা রোগ। তার চিকিৎসা প্রয়োজন।

 

চিকিৎসা করানোও হয়েছিল। তার পর থেকে মাঝেমধ্যে তিনি ভালো থেকেছেন, মাঝেমধ্যে আবার নিজের খোলসের মধ্যে চলে গেছেন। পরিহাসের বিষয়, তাঁর নাম ‘হাসান’ হলেও, হাস্যের সঙ্গে তাঁর নিজের চরিত্রের একটা শক্ত বিরোধ রয়েছে। এখনো মাঝেমধ্যে তাঁর মনে নিম্নচাপ দেখা দেয়। কিন্তু আগের চেয়ে এখন অনেক কার্যকর ট্যাবলেট পাওয়া যায় বলে ডিপ্রেশনের সঙ্গে লড়াই করার শক্তি জোগাতে পারেন। সেসব বড়ি তাঁকে এখন উপশম দেয়।

বাংলা ভাষায় ছোটগল্প লেখার সূচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ—১৮৯০-এর দশকের গোড়ায়। তিনি ১১৯টি গল্প লিখেছিলেন। ভাষা, রস, কাহিনি ও চরিত্রগুলোর অভিনবত্বের জন্য সেসব গল্প এমন অসাধারণ যে অনেকে বলেন রবীন্দ্রনাথের হাতেই বাংলা গল্পের চরম উত্কর্ষ ঘটেছে। এক অর্থে সে কথা মিথ্যা নয়। আমার নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বলতে পারি, গল্পগুচ্ছের গল্পগুলো যতবার পড়েছি, ততবারই উপভোগ করেছি; ততবারই নতুন দৃষ্টি দিয়ে নতুন কিছু খুঁজে পেয়েছি। রবীন্দ্রনাথ সেসব অসাধারণ গল্প উপহার দেওয়ার পর আরো অনেকে মিলে বাংলা ছোটগল্পকে আরো এগিয়ে দিয়েছেন। শুধু ছোট ছোট দুঃখকথা নয়, বড় বড় অনেক সমস্যা—দারিদ্র্য, যৌনতা, মানবিক সম্পর্কের টানাপড়েন, প্রবৃত্তির সঙ্গে বিবেকের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি ছোটগল্পের সহজ-সরল ভুবনকে অনেক জটিল করে তুলেছে। কিন্তু কবিতার মতো ছোটগল্পও বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ সম্পদ। এ দুই শাখাই বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে মূল্যবান শাখা।

কিন্তু যতই সমৃদ্ধ হোক বাংলা ছোটগল্পের জগৎ, সাহিত্যর অন্যান্য শাখার মতো ছোটগল্পেও আঞ্চলিকভাবে পূর্ববঙ্গ ও সম্প্রদায় হিসেবে মুসলমানরা পিছিয়ে ছিলেন। পূর্ববাংলায় সত্যিকার উঁচু মানের ছোটগল্প দীর্ঘকাল লেখা হয়নি। শওকত ওসমান, ওয়ালীউল্লাহ, আবুল কালাম শামসুদ্দীন, আলাউদ্দীন আল আজাদ প্রমুখ যে ধারার পত্তন করেছিলেন, সে গল্পের প্রধান সম্পদ ছিল কাহিনি। ওয়ালীউল্লাহ তার ভেতরে মানসিক জটিলতাও আমদানি করেছিলেন। অপরপক্ষে, হাসান আজিজুল হকের গল্পের তলায় তলায় লক্ষ করি ফল্গুধারার মতো এক গভীর চেতনাপ্রবাহ এবং তা অঙ্কন করার একান্ত নিজস্ব ভাষার জাদু। তাঁর কাহিনির সঙ্গে এই যে মনের অসাধারণ খেলা, তা তাঁকে দুই বাংলারই একজন বিশিষ্ট ছোটগল্পকারের খ্যাতি দিয়েছে। কারো রচনার উত্কর্ষ বোঝার একটা পরিমাপক হলো তাঁর প্রভাব অন্যদের ওপর পড়েছে কি না। ভালো গল্প লিখলেও ওয়ালীউল্লাহর কোনো অনুকারক নেই। কিন্তু আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মতো বড় লেখকও হাসান আজিজুল হকের সার্থক অনুকরণ করেছেন। হাসান আজিজুল হকের স্টাইল অন্যদের কতটা আকর্ষণ করে, এ থেকে তারই প্রমাণ মেলে।

হাসান আজিজুল হকের জন্ম বর্ধমানের প্রত্যন্ত গ্রামে। ফলে ছেলেবেলা থেকেই গ্রামের মানুষ ও সমাজকে তিনি খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছেন। সুযোগ পেলেও অবশ্য সবার দেখার চোখ থাকে না—তাঁর সেই চোখ ছিল এবং তিনি তা দুই চোখ ভরে দেখেছেন। নিজের চারদিকের মানুষের বিচিত্র কর্মকাণ্ড ও আচার-ব্যবহার যেমন দেখেছেন, তেমনি লক্ষ করেছেন প্রকৃতির খেলা। বাইরের আবরণের জন্য খালি চোখে আমরা যেসব জিনিস দেখতে পাই না, এক্স-রে কিন্তু সেই বহিরাবরণ ভেদ করে সেসব দেখতে পায়। হাসান আজিজুল হকের দৃষ্টিভঙ্গি এক্স-রের মতো, সব বাহ্য আবরণভেদী। আমরা—সাধারণ মানুষরা—যেসব অসংগতি দেখতে পাই না, দেখি না, সেসব সহজেই তাঁর চোখে পড়ে। সব খুঁটিনাটি। শুধু মানুষ নয়, জীবজন্তুদের আচরণও তিনি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে লক্ষ করেন।

তাঁর মধ্যে কৌতুকের যে অসামান্য বোধ রয়েছে, সেই দৃষ্টি দিয়ে চরম ট্র্যাজেডিকে দেখতে গিয়েও তিনি কৌতুক বোধ করেন। মানুষের চিন্তা যে একমাত্রিক নয়, মানুষের চরিত্র যে সাদা অথবা কালো নয়, নির্ভেজাল ভালো অথবা মন্দ নয়—বরং নানা দোষে-গুণে, ভালোয়-মন্দয় মেশানো—তাঁর প্রতিটি চরিত্র দেখলেই সেটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেসব চরিত্রের মধ্যে কখনো কখনো বিবেক ও প্রবৃত্তির এমন টানাপড়েন চলতে থাকে যে আমাদের স্বভাবতই তা বিস্মিত করে। কিন্তু প্রায় অসম্ভবকেও তিনি বিশ্বাসযোগ্য করে চিত্রিত করেন। এ প্রসঙ্গে একটা গল্পের কথা মনে পড়ছে—‘ঘরগেরস্থি’ : বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সন্তানদের নিয়ে একটি পরিবার খুলনায় ফিরে এসেছে পশ্চিমবঙ্গ থেকে। সম্বল, বলতে গেলে, তাদের সঙ্গে কিছুই নেই। তা-ও হাঁড়িকুঁড়ি, হুঁকো-কল্কে, কুল্লে সের সাতেক চাল, বিছানাপত্র ইত্যাদি নিয়ে হাঁটতে গিয়ে আধমরা হয়ে তারা ফিরে আসে। কিন্তু সেদিনই তাদের ছোট মেয়েটি মারা যায়। মারা যাওয়ার আগে সে অবশ্য বাঁচার চেষ্টা কম করেনি। দু-তিনটি বাক্যে হাসান আজিজুল হক সেই শিশুর জীবনসংগ্রামের অবিশ্বাস্য শেষ দৃশ্যটি অঙ্কন করেছেন। এক ফোঁটা দুধ খেয়ে মেয়ের প্রাণপণ বাঁচার চেষ্টা দেখে তার মা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। বলে, ‘তুই কি আমারে চিব্যায়ে খাবি—হাঁ লা?’ জবাবে মেয়ে খিমচি দিয়ে ভানুমতীর শুকনো স্তনের বোঁটা ধরে এমন করে চুষতে শুরু করে যে যন্ত্রণায় তার চোখে জল এসে যায়। সে তখন ধাঁই ধাঁই করে মেয়ের পিঠে চড় কষিয়ে দেয়। ’ সেটাই কার্যত তার জীবনসংগ্রামের শেষ অঙ্কের শেষ দৃশ্য।

যখন রামশরণ তাদের পাড়ায় ফিরে আসে, তখন চিনতে পারে না, তার বাড়িটা ঠিক কোথায় ছিল। খোঁজাখুঁজি করে শেষ পর্যন্ত কিছু ছাই দেখে ভিটেটা শনাক্ত করতে পারে। পেটে খাবার না থাকলেও সেই ভিটে খুঁজে পাওয়াটাকেই মস্ত পাওয়া বলে বিবেচনা করে। রাতের বেলা খোলা আকাশের নিচেই তারা ঘুমিয়ে পড়ে। মনে কন্যা হারানোর শোক, চোখের সামনে মৃত কন্যার পড়ে থাকা শুকনো দেহটা, পেটে খিদের জ্বালা। কিছু করার নেই। তারই মধ্যে স্বামীটি হঠাৎ বউয়ের দিকে এগিয়ে যায়। বউ তাকে লাথি দিয়ে ফেলে দেয়। পরাবাস্তবের মতো এই ঘটনা। কিন্তু হাসান আজিজুল হক যেভাবে এই গল্পটি পরিবেশন করেন, তাতে তাকে অবিশ্বাস্য মনে হয় না। এই হতদরিদ্রদের জন্য ঘৃণাও বোধ হয় না। বরং তাদের রিক্ততা ও তলাহীন দুঃখ মনকে অভিভূত করে। সহানুভূতি জেগে ওঠে।

তিনি যে গ্রামে দরিদ্রদের মধ্যে মানুষ হয়েছেন এবং তাঁদের সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা সবচেয়ে অন্তরঙ্গ, সে জন্যই সম্ভবত তাঁর বেশির ভাগ গল্পই সাধারণ মানুষদের নিয়ে। হাসান নাগরিক নন। তাই গ্রামের সাধারণ মানুষদের দারিদ্র্য, তাদের ছোট-বড় দুঃখকথা তাঁর গল্প ও উপন্যাসের উপজীব্য। তাদের সরলতা, কুটিলতা; তাদের লোভ, তাদের সন্তোষ এবং অতৃপ্তি। সেই সঙ্গে উজ্জ্বলভাবে চোখে পড়ে তাদের মনুষ্যত্ব—সব দুর্বলতাসহ।

দরিদ্রদের প্রতি এই স্বাভাবিক দরদ ছাড়াও তাঁর রচনা পড়ে মনে হতেই পারে যে তিনি বাম-ভাবনা দিয়ে অনুপ্রাণিত। কোথাও কোথাও বাম-তত্ত্বও তাঁর কাহিনির বর্ণনা ও মন্তব্যে বেশ লক্ষ করা যায়। তবে তা দিয়ে তাঁর গল্প আরো আকর্ষণীয় হয়েছে কি না, আরো পাঠযোগ্য হয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থাকতেই পারে। এমনকি, সাহিত্য রচনা করতে গিয়ে মানবতা ছাড়া কোনো তত্ত্বের প্রতি কোনো আনুগত্য দেখানোর প্রয়োজন আছে কি না, সে প্রশ্নও সংগতভাবেই উঠতে পারে। তাঁর গল্প চুম্বকের মতো মনটাকে শক্ত করে ধরে রাখে। কিন্তু যে অর্থে ভালো লাগা বলে, সে অর্থে তাঁর গল্প পড়তে ভালো লাগে না। কারণ, তাঁর গল্পে মিষ্টত্ব নামক রসটা অনুপস্থিত। এবং গল্পের চরিত্রগুলো এতই অসাধারণ যে সেগুলো নির্বিশেষ হয়ে ওঠে না। সেসব চরিত্রের সঙ্গে পাঠক একাত্ম বোধ করতে পারে না। তবু যে পাঠক তাঁর গল্প পড়ে, সে তাঁর অতি অসাধারণ ও বিস্ময় সৃষ্টিকারী কাহিনি, চরিত্রের জটিলতা এবং লেখার নাটকীয় ভঙ্গির জন্য, দরিদ্রদের প্রতি তাঁর দরদের কারণে নয়। হাসান অত্যন্ত সমাজসচেতন এবং মনে করেন সমাজের প্রতি তাঁর একটা দায়িত্ব আছে। সে দায়িত্বের কথা প্রবন্ধে তিনি সরাসরি বলেনও। কিন্তু গল্পে বলেন পরোক্ষভাবে। হয়তো এ কারণে কারো কারো কাছে তাঁর গল্প খানিকটা বক্তব্যপ্রধান মনে হতে পারে। তবে পাঠক কী ভাবল তাঁর বক্তব্য সম্পর্কে, সে বিষয়ে লেখক তোয়াক্কা করেন না, তাঁর যা বলার তা তিনি খাপখোলা তীক্ষধার তরবারির মতো চোখের সামনে তিনি খেলিয়ে নেন। সমাজের প্রতি তাঁর যে দায়িত্ববোধ আছে, তা তিনি লুকোতে চান না। আর সে কথা বলার মতো সাহস ও ক্ষমতা উভয়ই তাঁর আছে অফুরন্ত।

হাসানের রঙ্গব্যঙ্গের বোধ তাঁর জীবনে এবং রচনায়—উভয় ক্ষেত্রেই অসাধারণ। তাঁর রচনার তলে তলে এই হাস্যকৌতুকের ধারা তাঁর রচনাকে সুখপাঠ্য ও উপভোগ্য করে তোলে। এটাই তাঁর রচনাকে গতিশীলতা দান করে। আরেকটা জিনিস, যা তাঁর রচনাকে উজ্জ্বলতা ও মাধুর্য দান করে, সে হলো তাঁর বর্ণনার ভাষা। এই ভাষায় তিনি এত আঞ্চলিক শব্দ ও অনুবাক্য ব্যবহার করেন যে তা একদিকে কৌতুকরসের জোগান দেয়, অন্যদিকে চরিত্রগুলোকে রক্তমাংসের অবয়ব দান করে। তাঁর বর্ণনার ভাষার আরেকটি বৈশিষ্ট্য তাঁর উপমা ও চিত্রকল্প। পড়তে পড়তে পাঠক নানা রঙের সেই চিত্রের গ্যালারির মধ্য দিয়ে এগোতে থাকেন।

উদ্বাস্তুদের মধ্যে অনেক সময় ফেলে-আসা দেশ ও সমাজ সম্পর্কে তিক্ততা থাকে। সে তিক্ততার কারণ ব্যাখ্যাও করা যায়। মানুষ সাধারণত দেশ ত্যাগ করে নানা দুঃখ-কষ্টের শিকার হয়ে—সমাজ ও রাষ্ট্রের নিষ্করুণ অবিচার ও আচরণের কারণে। তারপর সেই প্রতিকূল সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি বিরোধী মনোভাবের কারণে সাম্প্রদায়িক হয়ে পড়ে। কিন্তু হাসান আজিজুল হক পশ্চিমবঙ্গ ত্যাগ করে পূর্ব পাকিস্তানে এলেও তাঁর মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার লেশমাত্র নেই। বরং যাঁরা পূর্ববাংলার ধর্মনিরপেক্ষ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং এখনো দিচ্ছেন, তিনি তাঁদের অগ্রগণ্য। এ ব্যাপারে তাঁর সাহস দৃষ্টান্তযোগ্য। তাঁর সাহসের প্রসঙ্গে একটা ঘটনা মনে পড়ছে ১৯৭৫ সালের। একদলীয় শাসনব্যবস্থা—বাকশালে যোগ দেওয়ার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় তাবৎ শিক্ষকই সই করেছেন—বাকি আছে মাত্র একটি রাত আর সনৎ সাহা, আলী আনোয়ারসহ আমরা মাত্র ১০-১৫ জন শিক্ষক। একজন অধ্যাপক চোখ গরম করে শাসিয়ে গেলেন আমাদের। হাসানও সেই ১০-১৫ জনের একজন। যেকোনো সংকটে নিজের অবস্থান নিতে হাসান কখনো পিছপা হননি।

তাঁর ‘নামহীন গোত্রহীন’ বইটির গল্পগুলো দেশ স্বাধীন হওয়ার—যদ্দুর মনে পড়ে—দু-তিন বছর পরে প্রকাশিত হয়। কোনোটির বিষয়বস্তু যুদ্ধের সময়কার, কোনোটির যুদ্ধের অব্যবহিত পরবর্তী সময়ের। তত দিনে এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে দেশের স্বাধীনতা রাজনৈতিক পরিবর্তন আনলেও সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছে। এই বইয়ের ‘ফেরা’ গল্পে আমরা মুক্তিযুদ্ধে পঙ্গু হয়ে যাওয়া মজিদের চরিত্রের মাধ্যমে এই গভীর হতাশা প্রতিফলিত হতে দেখি। তাঁর একটা মস্ত বেদনার কারণ হলো দেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতা তার অভীষ্ট পথে যায়নি। তাই তাঁর গল্পে বারবার তিনি দেশ স্বাধীন হলো অথচ দেশের লোকের ভাগ্য বদলাল না, মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীনতার পুরস্কার পেলেন না ইত্যাদি দুঃখের কথা প্রকাশ করেছেন।

তিনি তাঁর গল্পে এই যে অন্তহীন হতাশা ও একেকটা তুলনাহীন অদ্ভুত চরিত্র নির্মাণ করেছেন, তাঁর চরিত্রগুলোকে বৈশিষ্ট্যের দিক দিয়ে একক করে তোলার এবং তাদের মধ্যে অন্তহীন প্রাণপ্রাচুর্য সৃষ্টি করার প্রধান হাতিয়ার হলো সুকৌশলী উপভাষার ব্যবহার। যেমন—তিনি খুলনার আঞ্চলিক ভাষা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করেন সংলাপে। মনে হয় না, বাংলাদেশের অন্য কোনো সাহিত্যিক খুলনার আঞ্চলিক ভাষা অথবা অন্য কোনো জেলার উপভাষা এমন কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পেরেছেন। রাজশাহীতে আসার পর তিনি রাজশাহীর, বিশেষ করে নবাবগঞ্জের ভাষাও অত্যন্ত দক্ষ শিল্পীর মতো ব্যবহার করেছেন। একসময় তিনি রাজশাহীতে থেকে লেখাপড়া শিখেছিলেন, তাঁর সেই অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে তাঁকে রাজশাহীর উপভাষা শিখতে সাহায্য করেছে। আঞ্চলিক ভাষার জাদুস্পর্শে তাঁর চরিত্রগুলো যেন বইয়ের পাতা থেকে জ্যান্ত মানুষের মতো বেরিয়ে পাঠকের সামনের বিস্তৃত মঞ্চে এসে দাঁড়ায়। সেই মঞ্চে তারা অভিনয় করে না, বরং তারা নিজেদের সত্যিকার স্বরূপকেই উন্মোচন করে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের গল্প-উপন্যাস-নাটকে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু কেউই নাটকে সৈয়দ শামসুল হকের মতো এবং গল্পে হাসান আজিজুল হকের মতো আঞ্চলিক ভাষা এত কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না। তাঁর উপন্যাস ‘আগুন পাখি’তে তিনি ব্যবহার করেছেন তাঁর ছেলেবেলায় শেখা বর্ধমানের উপভাষা, ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’-এও। ‘আগুন পাখি’তে এই ভাষা আমার মতো পাঠককে বিপন্ন করে। আমি দুবার চেষ্টা করেও এই উপন্যাস পড়তে পারিনি—যদিও একাধিক পত্রিকা-গোষ্ঠীর দেওয়া পুরস্কারে ভূষিত হওয়া থেকে বুঝতে পারি এটি একটি সার্থক উপন্যাস হয়েছে। ‘সাবিত্রী উপাখ্যান’-এ উপভাষার ব্যবহার আদৌ ভার হয়ে দেখা দেয় না। অবশ্য এই উপাখ্যান উপন্যাস হিসেবে কতটা সার্থক হয়েছে, সে প্রশ্নও উঠতে পারে। আপাত দৃষ্টিতে এ কাহিনিকে পৌনঃপুনিক নীরব নির্বাধ ধর্ষণের কাহিনির বেশি কিছু মনে না-ও হতে পারে।

উপভাষা, উপভাষা কেন, ভাষার ব্যবহারের দিক দিয়েই তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘জীবন ঘষে আগুন’ একটি ব্যতিক্রম। এ উপন্যাসে আঞ্চলিক ভাষার ব্যবহার কম। বরং এই বইয়ে সাধু ভাষার বহু শব্দ তিনি ইচ্ছে করেই ব্যবহার করেছেন। ধ্বনিময় তৎসম শব্দ ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চেষ্টা করেছেন।

আমার ধারণা, এই পরীক্ষায় লেখক অত সফল হননি। অন্তত একে হাসান আজিজুল হকের স্বাদু ভাষা বলে মনে হয় না। ভাষা এখানে গল্পের প্রবহমানতাকে সহায়তা না করে তাকে বরং ব্যাহত করে। কিন্তু লেখক বোধ হয় তাঁর সাফল্য সম্পর্কে নিজেকেই প্রশ্ন করেছেন এবং তাঁর পরবর্তী গ্রন্থাবলির ভাষা বিশ্লেষণ করে মনে হয় তাঁর প্রশ্নের যথার্থ উত্তরও পেয়ে গেছেন।

‘পাতালে হাসপাতালে’ গল্পে বাস্তবতার অতিকরুণ চিত্র ফুটে উঠেছে। তখনকার বাংলাদেশের দুরবস্থা, দারিদ্র্য এবং আকাশজোড়া হতাশা ‘পাতালে হাসপাতালে’ গল্পের মধ্যে ভয়ানক জীবন্তভাবে ফুটে উঠেছে। তখনকার বাংলাদেশ কেমন ছিল, তা উপলব্ধি করার জন্য এই গল্পটিই যথেষ্ট। কিন্তু এই বাস্তবতা এত অবাঞ্ছিত, এত রূঢ় যে খবরের কাগজের অতিরঞ্জিত রিপোর্টকেও তা হার মানায়। সেই বাংলাদেশের এক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে জমিরুদ্দি তার পচতে-থাকা পা নিয়ে। রোগী গ্যাংরিনে আক্রান্ত হয়ে মুমূর্ষু। তাকে তার পরিবার মরার জন্য বাড়িতে নিয়ে যেতে চায়।

ডাক্তারের ভয়ানক ভবিষ্যদ্বাণীর মধ্যে আলোর রেখাটি অথবা নরম সুরের রেশ মাত্র অনুপস্থিত—গল্পটা পড়ে ফেলার পর যা পাঠকের মনে গুনগুন করতে থাকবে। ধরা যাক ‘গল্পগুচ্ছ’র গল্পগুলো, বারবার পড়লেও তা পুরনো হয় না। সেখানে যে দুঃখ-দারিদ্র্যের চিত্র দেখি, তা-ও মনকে স্পর্শ করে; তা সত্ত্বেও তার মধ্যে এমন এক ধরনের মাধুর্য থাকে, যা মনকে টানে। হাসানের গল্পে সেই মাধুর্যের বড় অভাব। চোখে আঙুল দিয়ে দুঃখটাকেই দেখানো যেন লেখকের লক্ষ্য। দুঃখটাই যেন নায়ক হয়ে ওঠে। নানা বর্ণে রাঙিয়ে তিনি সেই নায়কেরই অতিবাস্তব তৈলচিত্র অঙ্কন করেছেন। দুই বাংলা মিলেই যে স্বল্পসংখ্যক ছোটগল্পকার সার্থকতার সঙ্গে এই চিত্র অঙ্কন করেছেন, তাঁদের প্রথম সারিতেই আছেন তিনি।

গল্পের বইগুলো এবং গল্পগুলোর কাব্যিক নাম পাঠকের সঙ্গে প্রতারণা করে মাত্র। গল্পগুলো চলচ্চিত্রের মতো একে একে তুলে ধরে দেশবিভাগ, বাংলাদেশের জন্য সংগ্রাম, বাংলাদেশের প্রসববেদনা, বাংলাদেশ নামক শিশুর শৈশব সংকট এবং বাংলাদেশের সাবালক হয়ে ওঠা—এই অর্ধশতাব্দীর জ্যান্ত ইতিহাস।

তবে এই ইতিহাসের সবটাই তাঁর সৃজনশীল রচনা থেকে চোখে পড়ে না। এই ইতিহাসে ঘটনার ঘনঘটা অথবা তারিখের ফিরিস্তিও নেই। এটা ইতিহাসের মর্মকথা। এটা এই ইতিহাসের নির্যাস, যেমনটা তিনি তাঁর সর্বান্তঃকরণ দিয়ে উপলব্ধি করেছেন। এই ইতিহাসের বাকি অর্ধেক—তার ঘটনাপুঞ্জ আর সময়রেখা দেখা যায় তাঁর প্রবন্ধ, ভাষণ ও তাঁর বাস্তব জীবনের কর্মকাণ্ড থেকে। সেখানে হাসান আর পাঁচজনের মতোই, আবার মোটেই আর পাঁচজনের মতো নন। সেখানে তিনি সজ্ঞানে এবং সুবিধাজনক স্ব-অবস্থান থেকে ইতিহাসের ব্যাখ্যাদাতা। সবটাই তাঁর গভীর উপলব্ধি অথবা অনুভূতি নয়, কিছুটা বুঝি বা সামাজিক জীব হিসেবে তাঁর বক্তব্য। তবে যা মোটেই আর পাঁচজনের মতো সাধারণ নয়, তা তাঁর সৎসাহস বা সেই সাহসের পরিধি। রাজনীতির আঁধি প্রবল বাত্যার মতো শিকড় ছিঁড়ে তাঁকে উপড়ে ফেলতে চায়, কিন্তু পারে না। কট্টরবাদীরা যমদূতের মতো তাঁর চোখের সামনে যখন ধারালো তরবারি নাচাতে থাকে, তিনি অকম্পিতভাবে শিরদাঁড়া খাড়া রেখে তার মোকাবিলা করেন। অন্য যাঁরা অনুরূপ হুমকির সম্মুখীন, তিনি তাঁদেরও সাহসের দৃষ্টান্ত দেখান। তিনি কখনোই আপস করেন না, তা হয়তো নয়, কিন্তু তিনি একজন অত্যন্ত ব্যতিক্রমধর্মী দুঃসাহসী এবং  প্রগতিশীল মানুষ।


মন্তব্য