kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মহান শিল্পীরা তুলনাহীন

রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেম কিংবদন্তি বব ডিলান ২০১৫ সালে দ্য মিউজিকেয়ার পারসন সম্মানে ভূষিত হন। এ উপলক্ষে অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে তিনি যে বক্তব্য প্রদান করেন, তাতে প্রকাশ পায় নিজের কৃতজ্ঞতাবোধ এবং কিছু বিতর্কিত বিষয়। তাঁর সেই বক্তব্যের নির্বাচিত অংশ পাঠকদের জন্য অনুবাদ করেছেন ফাহমিদা দ্যুতি

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মহান শিল্পীরা তুলনাহীন

আজকের এই জমকালো সান্ধ্য অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য কয়েকজন মানুষকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ দিতে চাই। নিল পর্টনাউ, ডানা টামারকিন, রব লাইট, ব্রয়ান গ্রিনবম, ডন ওয়াস প্রমুখকে ধন্যবাদ।

এখানে উপস্থিত থেকে আমাদের সম্মানিত করার জন্য প্রেসিডেন্ট কার্টারকে ধন্যবাদ। আজকের সন্ধ্যা নিশ্চয় দীর্ঘ হবে। তবু আমি বেশি কিছু বলে আমার কথা দীর্ঘ করব না। কিছু বিষয়ে কয়েকটি কথা বলতে চাই আমি।  

আমার গান এভাবে সম্মানিত হয়েছে বলে ভালো লাগছে। তবে আপনারা জানেন, গানগুলো এমনি এমনিই এতদূর আসতে পারেনি। এতদূর পৌঁছতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। অনেক চেষ্টা করতে হয়েছে। আমার গান রহস্য নাটকের মতো মনে হয়। বেড়ে ওঠার কালে শেকসপিয়ারেরও নিজের কর্ম সম্পর্কে এ রকম অনুভূতি হয়েছিল। আশা করি আপনারা বুঝতে পারছেন, আমি কতদূর অতীতের কথা বলছি।

এত দীর্ঘ পথে আমাকে যাঁরা সঙ্গ দিয়েছেন, তাঁদের কয়েকজনের কথা উল্লেখ করতে চাই।

আমি জানি, প্রতিভাধর জন হ্যামন্ডের কথা উল্লেখ করতেই হবে। অনেক দিন আগে তিনি আমাকে কলাম্বিয়া রেকর্ডসে নিয়ে গিয়েছিলেন। তখন আমার কোনো পরিচয়ই ছিল না। সেই সময় তিনি আমাকে ওখানে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। যথেষ্ট বিশ্বাস ছিল বলেই তিনি এ রকম ভূমিকা পালন করতে পেরেছিলেন। অন্য লোকদের ঠাট্টার শিকারও হতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু তিনি ওসবে কান দেওয়ার মতো মানুষ ছিলেন না। তিনি তাঁর মতোই। তাঁর সাহস উল্লেখ করার মতোই। সে জন্য আমি তাঁর কাছে যথার্থ কৃতজ্ঞ। আমাকে আবিষ্কার করার আগে তিনি সর্বশেষ আবিষ্কার করেছিলেন আরেথা ফ্রাঙ্কলিনকে। তাঁরও আগে কাউন্ট বেসি, বেসি হলিডে এবং আরো অনেক শিল্পীকে। সবাই অবাণিজ্যিক শিল্পী। চলতি হওয়ায় জনের আগ্রহ ছিল না মোটেই। আমিও অবাণিজ্যিক ছিলাম এবং তিনি আমার কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেননি। আমার প্রতিভায় তাঁর আস্থা ছিল এবং তাঁর আস্থাই অনেক বড় কথা। তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে শেষ করা যাবে না।

লুও লেভি লিডস মিউজিক চালাতেন। আমার প্রথম দিকের গান ওখান থেকে করা। তবে ওখানে বেশি দিন কাজ করিনি। লেভি নিজেও আমাকে অনেক সাহায্য করেছেন। লিডস মিউজিকের সঙ্গে আমাকে যুক্ত করেছিলেন। তিনি আমার গান রেকর্ড করেছিলেন। আমি টেপরেকর্ডারে গান রেকর্ড করেছিলাম। তিনি আমাকে সরাসরি বলেছিলেন, আমার গানের মতো আর কারো গান নাকি আগে তিনি শোনেননি। তাঁর মানে, হয়তো আমার সময়ের চেয়ে অনেক এগিয়ে ছিলাম কিংবা অনেক দূর পেছনে ছিলাম আমি। তিনি নিশ্চিত না হলেও বলেছিলেন, আমার সময়ের চেয়ে যদি আমি এগিয়েই থাকি, তাহলে তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে আমার গান লুফে নেবে মানুষ। সে জন্য তিনি আমাকে প্রস্তুত থাকতে বলেছিলেন। পরে তাঁর কথা সত্যি হয়েছিল।

উইটমার্ক মিউজিকের সঙ্গে আমাকে যুক্ত করে নিয়েছিলেন আরটি মোগুল। তিনি আমাকে গান লেখা চালিয়ে যাওয়ার উপদেশ দিয়েছিলেন। আমার লেখা যেমনই হোক না কেন, চালিয়ে যেতে বলেছিলেন। তিনিও আমাকে পেছন থেকে উৎসাহ দিয়েছেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করার আগে আমি নিজেকে গীতিকার হিসেবে কল্পনাই করতে পারিনি। তাঁর দ্রষ্টাসুলভ মানসিকতার জন্য তাঁর কাছে আমি চিরকৃতজ্ঞ।

আমার প্রথম দিকের গান যাঁরা রেকর্ড করেছেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। আমার তরফ থেকে কিছু না বলা হলেও আমার গান তাঁদের ভালো লেগেছিল বলেই রেকর্ড করেছিলেন। পিটার, পল ও মেরি, তাঁদের প্রতি আমার ধন্যবাদ। তাঁরা পরে একটি দলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। তবে তাঁদের সবাইকে আমি আগে থেকেই আলাদাভাবে চিনতাম।

দ্য বায়ার্ডস ব্যান্ড, দ্য টার্টলস ব্যান্ড, সনি ও চের— তাঁরাও আমার কিছু গান করেছিলেন। টপ টেন হিটস। কিন্তু আমি তো পপগান লেখক ছিলাম না। তেমন ইচ্ছাও আমার ছিল না। তবে হয়ে যাওয়ায় ভালোই হয়েছিল। তাঁদের করা আমার গানের ধরন কমার্শিয়ালের মতো মনে হয়েছিল। তাতে অবশ্য আমি কিছু মনে করিনি। ৫০ বছর পরে আমার গান থেকেই বিজ্ঞাপন করা হয়েছে। সেটাও ভালো হয়েছিল। তার জন্য আমি খুশি হয়েছি। তাঁদের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা।

পারভিস স্ট্যাপলস ও স্ট্যাপল গায়করা স্ট্যাক্সে কাজ করার আগে এপিকে ছিলেন। আমার সর্বকালের প্রিয় দলগুলোর অন্যতম ছিলেন তাঁরা। বাষট্টি-তেষট্টির দিকে তাঁদের সঙ্গে আমার দেখা হয়।

পারভিস আমার কণ্ঠে আমার গান শোনেন এবং তিন-চারটি গান রেকর্ড করতে চান। তিনি স্ট্যাপল গায়কদের দিয়ে আমার গান করেন।  

নিনা সিমোন—নিউ ইয়র্ক সিটিতে ভিলেজ গেইট নাইট ক্লাবে তাঁর সঙ্গে কতবার দেখা হয়েছে। তিনি প্রশংসা করার মতোই একজন শিল্পী। ড্রেসিংরুমে বসে তিনি আমার কাছ থেকে সরাসরি কিছু গান শুনেছিলেন। সেগুলো তিনি রেকর্ড করেছেন। বিমূঢ় করে দেওয়ার মতো অসাধারণ পিয়ানো বাজাতেন তিনি। অসাধারণ একজন শিল্পীও। তাঁর মনের জোর প্রবল; খুব স্পষ্টবাদী মানুষ। তাঁর গান পারফর্ম করা দেখলে বোঝা যেত তিনি ঝড়ের মতো পারফর্ম করছেন। তিনি আমার গান রেকর্ড করছেন মানে বোঝা যেত আমার সব কিছু শক্ত প্রমাণের চেহারা পেল। আমি যেমন শিল্পীকে ভালোবাসি ও প্রশংসা করি, তিনি ঠিক তেমন শিল্পীই ছিলেন। হ্যাঁ, জিমি হেনিড্রক্সের কথা তো ভুলে গেলে চলবে না। তাঁকে যখন প্রথম পারফর্ম করতে দেখি, তখন তিনি জিমি জেমস অ্যান্ড দ্য ব্লু ফ্লেইম ব্যান্ডের সঙ্গে কাজ করতেন। তিনি অবশ্য গাইতেন না। গিটার বাজাতেন। কেউ তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি, এমন কিছু গান ছিল আমার। তিনি বিখ্যাত হয়ে যাওয়ার পর আমার সেই গানগুলো নিয়েছিলেন। তিনি সেই গানগুলো আন্তর-আকাশের বাইরে পাঠিয়ে দেন। গানগুলো পুরোপুরি ধ্রুপদী মর্যাদা পেয়ে যায়।

আমার প্রথম দিকের কিছু গান রেকর্ড করেছিলেন জনি ক্যাশ। তেষট্টির দিকে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। তখন তাঁর চেহারা একদম তালপাতার সেপাইয়ের মতো। দীর্ঘ ভ্রমণে অভ্যস্ত ছিলেন তিনি। কষ্টকর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। তবে আমার কাছে তিনি ছিলেন নায়ক। বেড়ে ওঠার কালে আমি তাঁর বেশ কিছু গান শুনেছি। আমার কাছে নিজের গানের চেয়েও বেশি পরিচিত তাঁর গান।

জনির চরিত্রের মধ্যে প্রচণ্ডতা ছিল লক্ষ করার মতো। একসময় তিনি খেয়াল করে দেখলেন, ইলেকট্রিক মিউজিকের মাধ্যমে কিছু লোক আমার গান নিচের দিকে নামিয়ে আনছে। তিনি ম্যাগাজিনগুলোতে চিঠিপত্র লিখে তাদের সাবধান করে দিলেন তারা যেন থামে। আমাকে যেন আমার মতো গাইতে দেওয়া হয়।

ওহ, আবারও ভুল হয়ে যাবে, যদি জোয়ান বায়েজের কথা না বলি। তখনকার দিনে এবং এখনো তিনি লোকগানের সম্রাজ্ঞী। একসময় আমার গান তাঁর ভালো লেগে যায় এবং তাঁর সঙ্গে আমাকেও কনসার্টে গাইতে নিয়ে যান তিনি। তাঁর সৌন্দর্য আর কণ্ঠের জাদুতে কনসার্টের হাজার হাজার দর্শক-শ্রোতা বিমুগ্ধ হয়ে যেত। লোকজন জিজ্ঞেস করত, আপনি এই খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা গৃহহীন বালককে দিয়ে কী করছেন? তিনি নিশ্চিত কণ্ঠে বলতেন, এবার আপনারা চুপ থাকুন। গান শুনুন। কিছু গান আমরা একসঙ্গেও করেছি। খুব শক্ত মনের এক নারী তিনি। মুক্ত মনের বিশ্বস্ত ও প্রচণ্ড রকমের স্বাধীনচেতা। তিনি নিজে না চাইলে অন্য কারো ক্ষমতা নেই তাঁকে দিয়ে কোনো কাজ করানোর। তাঁর কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। ভয়াবহ সততার একজন নারী তিনি। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও নিষ্ঠা ফিরিয়ে দেওয়ার সাধ্য আমার নেই।

লেইবার ও স্টলার আমার গান পছন্দ করতেন না। তবে ডক পোমাস আমার গান পছন্দ করতেন। আমার গান তাঁদের পছন্দ না করার কারণ হলো, আমিও তাঁদের গান পছন্দ করতাম না। আহমেত এরতেগান আমার গান নিয়ে তেমন মাথা ঘামাননি। তবে স্যাম ফিলিপস আমার গানের প্রতি গুরুত্ব দিতেন। আহমেত আটলান্টিক রেকর্ডস প্রতিষ্ঠা করেন। বেশ কিছু দারুণ রেকর্ড বের করেছেন।

মার্লে হ্যাগার্ড আমার গানের দিকে তেমন নজর দিতেন না। তবে বাক ওয়েনসের পছন্দ ছিল আমার গান। বাক আমার প্রথম দিকের বেশ কিছু গান রেকর্ড করেছেন। অবশ্য আমার তরফ থেকে মার্লের জন্য প্রশংসা আছে।

সমালোচকদের কথা বলতে গেলে, তাঁরা শুরু থেকেই আমার পেছনে আছেন। তাঁদের ভাব দেখে মনে হয়, তাঁরা আমার জন্য বিশেষ কিছু করেছেন। কোনো কোনো সমালোচক মনে করেন, আমি গান গাইতেই পারি না। আমার গান মানে ব্যাঙের ডাক। ওই একই সমালোচকরা কিন্তু টম ওয়েস্টের জন্য এ রকম মন্তব্য করেন না। কেন করেন না জানি না। তাঁরা বলেন, আমার গান গাওয়ার মতো কণ্ঠই নেই। লিওনার্দ কোহেনের বেলায় কিন্তু তাঁরা এ রকম মন্তব্য করেন না। তাহলে আমাকে কেন বিশেষ চোখে দেখা হয়? তাঁরা বলেন, আমি গানের মধ্যে কথা বলে সময় নষ্ট করি। সত্যিই কি তা-ই? লুও রিডের বেলায় কেউ এমন বলছেন বলে শুনিনি।

সমালোচকরা বলেন, আমি নাকি সুর কেটে-ছিঁড়ে নষ্ট করে ফেলি। গান নাকি আর চেনাই যায় না। সত্যিই নাকি? তাহলে একটা ঘটনার কথা বলি, শুনুন। কয়েক বছর আগে একবার বক্সিং দেখতে গিয়েছিলাম। বক্সিং চলছিল ফ্লয়েড মেওয়েদার আর পুয়ের্তো রিকার এক বক্সারের মধ্যে। প্রথমে শুনলাম পুয়ের্তো রিকার জাতীয় সংগীত। কে যেন গাইলেন, বেশ চমৎকার। হৃদয়ে দোলা দেওয়ার মতো। তারপর আমাদের জাতীয় সংগীতের পালা। খুব জনপ্রিয় একজন সোল-সিঙ্গার সিস্টারকে দিয়ে গাওয়ানো হলো। তিনি প্রত্যেক নোটই গাইলেন, তবে আরো কিছু নোট যোগ করে গাইলেন। সুর কাটাছেঁড়ার কথা বলবেন? মনে হলো, তিনি কণ্ঠের জিমন্যাস্টিক করছেন। যেন ট্রাপিজ দেখাচ্ছেন। কিন্তু আমার কাছে মোটেও হেলাফেলার মনে হয়নি তাঁর গাওয়া।

ব্ল্যাকউড ব্রাদারসরা আমার সঙ্গে গান করার কথা বলছেন। মনে হচ্ছে, তাঁদের সঙ্গে এই প্রচেষ্টা কোনো হেলাফেলার হবে না। আমার জন্য বড় কিছু হবে। তাঁদের সঙ্গে গাওয়ার জন্য মনে মনে একটা গান ঠিক করে ফেলেছি এরই মধ্যে : ‘স্ট্যান্ডবাই মি’। মানে পপ গান ‘স্ট্যান্ডবাই মি’ নয়, সত্যিকার অর্থেই পাশে থাকা।

যখন জীবনে ঝড় উঠে আসছে/আমার পাশে থেকো/যখন জীবনে ঝড় উঠে আসছে/পাশে থেকো/সমুদ্রের বুকে জাহাজের মতো/জগৎ যখন আমাকে প্রচণ্ড দোলাচ্ছে/যে তুমি বায়ু আর পানিকে শাসন করো/পাশে থেকো আমার

যা হোক, মিউজিকেয়ারের এই অনন্য সম্মান পেয়ে গর্ববোধ করছি। এত বিশালসংখ্যক শিল্পী আমার গান গেয়েছেন বলে সম্মানিত বোধ করছি। মহান শিল্পীদের মতো আর কিছু নেই। আপনারা সবাই জানেন, কী করে সত্যকে গাওয়া যায়। আপনারা সবাই মহান শিল্পীদের কণ্ঠে সত্যের গায়কী শুনতে পান। মিউজিকেয়ারের জন্য আজ এই সন্ধ্যায় এখানে উপস্থিত হতে পেরে গর্বিত বোধ করছি। মিউজিকেয়ারকে আমি সম্মানের চোখে দেখি, গুরুত্বের সঙ্গে দেখি। আমাদের সংস্কৃতিতে যেসব সংগীতজ্ঞ বিশেষ অবদান রেখেছেন, এখান থেকে তাঁদের অনেককে সহায়তা করা হয়েছে।


মন্তব্য