kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রিয় কবি শামসুর রাহমান

হাবীবুল্লাহ সিরাজী   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



প্রিয় কবি শামসুর রাহমান

ছবি : এস এম সাইফুল ইসলাম

‘কেমন সবুজ হয়ে ডুবে আছে ক্রিয়াপদগুলি/গভীর জলের নিচে কাছিমের মতো শৈবালের সাজঘরে। ’—এ এক হরতাল-চিত্র, এ এক শহর বর্ণনা।

কবির শব্দমেলায় নিবিড় এক স্তব্ধতা, আবার আঙুলের ডগায় হঠাৎ একটি সোনালি মাছ লাফিয়ে ওঠা।

কবি শামসুর রাহমান। সাতাত্তর বছরের জীবনে কবিতা ছিল তাঁর ছায়া, মায়া ছিল অনন্ত নক্ষত্রবীথি। আকাশ-জলের মধ্যবর্তী অঞ্চলে প্রণয় ও দ্বিধা, দ্বিতীয় ও দশম, পথ ও প্রতিমা যেন তাঁর প্রার্থনা, যেন একান্ত অভিনিবেশ! ১৯৬০ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম কাব্য—‘প্রথম গান, দ্বিতীয় মৃত্যুর আগে’। তারপর ১৯৬৩ সালে ‘রৌদ্র করোটিতে’, ১৯৬৭ সালে বিধ্বস্ত নীলিমা, ১৯৬৮ সালে ‘নিরালোকে দিব্যরথ’ এবং ১৯৭০ সালে ‘নিজ বাসভূমে’। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্ব পর্যন্ত প্রকাশিত এই পাঁচখানা গ্রন্থে কবি তাঁর সত্তাটি উন্মোচিত করেছেন আপন অন্তর্ভাবনায় ও নিজস্ব অভিঘাতে। দরোজা খোলা পেয়ে অন্দরমহলের ঘ্রাণ নেমে এসেছে উদার জনপথে। আবার আকাশের আলো-নীল উত্তাল করেছে সমুদ্রের জলখেলা এবং নুন-হাওয়া। প্রণয়ের প্লাবনের সঙ্গে ঘটেছে ভালোবাসার দূর-বিস্তার।

‘আমার খামার নেই, নেই কোনো শস্যকণা

     আছে শুধু একটি আকাশ

তারই কিছু আলো-নীল আজো হে সুদূরতমা

     ভালোবেসে তোমাকে দিলাম’

অন্যদিকে—

‘তোমার মুখের দিকে আজ আর যায় না তাকানো বর্ণমালা, আমার দুঃখিনী বর্ণমালা। ’

শুরু করেছিলেন হার্দ্য উন্মোচনের মধ্য দিয়ে; একে-একে বড় হতে লাগল ছায়াপথ—জীবনের মানেই গেল পাল্টে। গত শতাব্দীর ষাটের দশকের বাংলাদেশ মানে তো এক প্রতিবাদ-প্রতিরোধের ভূখণ্ড। শস্যের শিকড়ে ঘামের বিন্দু জমা করা থেকে প্রান্তরে রক্ত ঢেলে দেয়ার সে কালে শামসুর রাহমান নিজেকে স্থাপন করলেন অন্যমাপে, ভিন্ন মাত্রায়। তাঁর কণ্ঠস্বর বিস্তৃত হলো এক থেকে বহুতে।

‘গুচ্ছ গুচ্ছ রক্তকরবীর মতো কিংবা সূর্যাস্তের

জলন্ত মেঘের মতো আসাদের শার্ট

উড়ছে হাওয়ায়, নীলিমায়।

...  ...  ...

আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা। ’

 

যে পাঁচখানা কাব্য নিয়ে আমাদের শামসুর রাহমানকে অবলোকন—তা কি পূর্ণ কোনো প্রতিচ্ছবি তৈরি করছে? একজন কবির আরোহণের গতি কিংবা দিক পরিবর্তনের চিহ্ন কি আমরা সহজেই অনুভব করতে পারছি? মরা গলি বা পচা ডাস্টবিনের বাইরের কাকটিও কিন্তু উড়াল দিয়ে নদীর তীরে কিংবা গাছের ডালে বসতে পারে,—তা সহজেই দৃষ্টিগোচর হতে শুরু করল। আর তাই তো শামসুর রাহমান তাঁর চোখের পাতা যেমন ভিজিয়ে নিলেন জ্যোত্স্নার প্রেমে তেমনি উন্মুক্ত করলেন হৃদয়ের নীরব ক্ষত।

‘বাংলা কবিতার প্রতি’ কবিতায় কবির খেদ আমরা এ ভাবেই পাই—

‘গন্ধ-প্রসবিনী শরীরে তোমার ভনভনে মাছি

একঝাঁক। বলো, বিদ্যাধরী, বলো ন্যক্কার নেই কি

কিছুতেই? ঘেন্না, বড় ঘেন্না, বড় বেশি ঘেন্না লাগে—

কালের মন্দিরা বাজে ডানে বাঁয়ে দুই হাতে, শোনো,

এসো ভিন্ন সাজে বিদ্যাধরী ওগো ঘেন্না-জাগানিয়া!’

 

কবি কি এর জবাবেই তাঁর কবিতার শব্দরূপ, বিষয়রূপ এবং সর্বোপরি মগ্নরূপটি নিয়ে অন্য ভাবনায় আবর্তিত হন। ‘নিরালোকে দিব্যরথ’ গ্রন্থটি এই ক্রান্তিকালের চিত্রলেখা। এবং এ পর্যায়ের শেষ গ্রন্থ ‘নিজ বাসভূমে’ এসে কবি যেন নিজেকে অন্যরূপে আবিষ্কার করলেন। বদলে গেল মাটি-জল-হাওয়ার ভাষা, পরিবর্তিত হলো বর্ণমালার রং এবং অঙ্গীকারের অঞ্চলগুলো ভরে উঠতে শুরু করল সোনালি শস্যদানায়।

আনন্দ ও বেদনার মধ্যে একটি ডট প্রোথিত করে আমাদের কবিতার বিকাশ এবং মান পরিমাপ করা যেতে পারে। সেখানে মানুষ হিসেবে বাঙালিকে পলি ও নুনের সঙ্গে মিশিয়ে যা দাঁড়ায় তা অতি অস্থির। জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াটির বয়সও ছিল স্বল্প। তার পরও ভাষাবিন্যাস ও বিকাশে এবং জনগোষ্ঠী বিবেচনায় আমাদের অবস্থান ছিল সংকটাপন্ন। যেহেতু তৎকালীন রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও তৎসঙ্গে অর্থনৈতিক চাপ কবিকে জীবনের তাপ ওষ্ঠে ধারণ করতে বাধ্য করেছিল, তাই তাঁর আঙুলের ডগায় ফুটে উঠেছিল কাঁটার গভীর ক্ষতের সঙ্গে পুষ্পশোভা। একজন কবি শামসুর রাহমান, যৌবনের প্রেম ও ধৈর্য সংযুক্ত করেছিলেন মানুষের কল্যাণে এবং স্থিতিতে।

কবি তো কালের প্রতিনিধি, ভবিষ্যতের দ্রষ্টা। ভারত বিভাগ-পরবর্তী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সম্পূর্ণভাবে অনাস্থা প্রকাশ করেছিল পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর প্রতি। ফলস্বরূপ, এক নবচেতনায় আমাদের সংস্কৃতি তথা অর্থনৈতিক মুক্তির পথ প্রসারিত হতে শুরু করেছিল। ঠাণ্ডা জলে উঠেছিল ঢেউ এবং আগুনের তাপে বিস্তৃত হচ্ছিল প্রান্তরের দাগ। ১৯৬০ সাল থেকে ১৯৭০ সাল অবধি সময়ে তাই একজন কবিকে আমরা যেমন পাই সৌন্দর্যবোধের শুদ্ধ প্রতীক হিসেবে—আবার তেমনি প্রতিবাদের তুমুল শব্দ-তরবারির ধারক হিসেবেও। স্নিগ্ধ শিশিরকণাও যে সূর্যালোকে বাষ্প হতে পারে—শামসুর রাহমান তা যেন আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।

‘সত্যাগ্রহের আগেই

ওদের সবাইকে আমি বাক-স্বাধীনতা দিতে চাই। ’

অপেক্ষা ছিল; প্রতীক্ষা ছিল নিত্যসঙ্গী। আমাদের বাঁচার লড়াই রূপ নিয়েছিল জীবনসংগ্রামে। যুদ্ধ শুধু গ্রাস করে না, যুদ্ধ যে দিতেও জানে—আমাদের মুক্তিযুদ্ধ তার প্রমাণ। মুক্তিযুদ্ধের সেই সফল রক্তদানের ফসল বাংলাদেশ। আর বাংলাভাষার নিত্য স্মরণীয় কবির নাম শামসুর রাহমান।


মন্তব্য