kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বব ডিলানের সাক্ষাৎকার

গানকে নিজের ভেতর অনুভব করা চাই

আমেরিকার জনপ্রিয় গান নিয়ে তাঁর নতুন অ্যালবাম ‘শ্যাডোজ ইন দ্য নাইট’ প্রকাশ উপলক্ষে ২০১৫ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কিংবদন্তি গায়ক বব ডিলানের সঙ্গে কথা বলেন রবার্ট লাভ। কালের কণ্ঠ’র পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটির নির্বাচিত অংশ অনুবাদ করেছেন মনসুর আহমেদ

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



গানকে নিজের ভেতর অনুভব করা চাই

প্রশ্ন : আপনার বেশ কিছু মৌলিক রেকর্ড সমালোচকদের অনেক প্রশংসা পেয়েছে। তার পরও এবারের এই রেকর্ড করতে গেলেন কেন?

বব ডিলান : এখনই উপযুক্ত সময়।

সত্তরের দশকের শেষের দিকে উইলি নেলসনের ‘স্টারডাস্ট’ শোনার পর থেকেই ভেবেছি। বরাবরই আমার মনে হয়েছে, আমিও এ কাজটা করতে পারব। সে জন্যই আমি কলাম্বিয়া রেকর্ডসের প্রেসিডেন্ট ইয়েটনিকফের সঙ্গে দেখা করতে যাই। তাঁকে বললাম, আমি উইলির মতো স্ট্যান্ডার্ডের রেকর্ড করতে চাই। তিনি বললেন, আপনি চাইলে করতে পারেন। তবে আমরা খরচ দিতে চাচ্ছি না। আপনি নিজেই রিলিজ করুন। ইচ্ছা করলে আপনি অবশ্যই এগিয়ে যেতে পারেন। শেষে আমি বরং ‘স্ট্রিট লিগ্যাল’-এর জন্য কাজ করলাম। এখন পেছন ফিরে দেখতে পাই, ইয়েটনিকফের ধারণাই ঠিক ছিল। কাজটা তখন আমার জন্য একটু বেশিই আগাম হয়ে যেত।

প্রশ্ন : আপনার গান শুনে যাঁরা অভ্যস্ত তাঁদের রুচির কাছে এবারের রেকর্ড একটা বিস্ময়ের মতো মনে হবে, তাই না?

ডিলান : ভক্তদের কাছে বিস্ময়কর মনে হবে না অবশ্য। এত দীর্ঘ সময় ধরে আমি তো নানা রকম গান করে এসেছি। সুতরাং তাঁরা তো আমার স্ট্যান্ডার্ড শুনে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন।

প্রশ্ন : এসব গানের অনেকগুলোই তো ছেলেবেলা থেকেই পরিচিত? বেশ কয়েকটা তো অনেক দিনের পুরনো।

ডিলান : একবার যদি মনে হয়, আমি গানটা শুনেছি, তাহলে দেখতে হবে অন্যরা এটা কিভাবে করেছেন। একজনের করা গানের অবস্থা থেকে আরেকজনের রকমফের তৈরি হয়। আমরা হ্যারি জেমসের করা গানের ধরন দেখেছি, তাঁর কাছ থেকে কিছু মিশিয়েছি। এমনকি পেরেজ প্রাডোর করা গান থেকেও কিছু কিছু কৌশল নিয়েছি। বিল মনরো ব্যান্ডে ড্রামস মোটেই ব্যবহার করা হয়নি। হ্যাংক উইলিয়ামসও ড্রামস ব্যবহার করেনি। সুতরাং আমার মনে হয়েছে, আমিও আমার মতো করেই করব। হেডফোনস, ওভারডাবস, ভোকাল বুথ কিংবা আলাদা কোনো ট্র্যাকিং—কিছুই ব্যবহার করিনি। বলা যেতে পারে, পুরনো দিনের কায়দায় করা হয়েছে। কারণ আমার মনে হয়েছে, এ গানের জন্য এ রকম ব্যবস্থাই সবচেয়ে মানানসই হবে।

প্রশ্ন : এ গানগুলো বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন। আপনি সবার করা গান পরীক্ষা করে বাতিল করে দিয়ে নিজের রুচিমাফিক তৈরি করেছেন?

ডিলান : হ্যাঁ, জানেন নিশ্চয়ই, এ গানগুলোর অনেকগুলো বহু বছর ধরে সাড়া জাগিয়েছে, শ্রোতাদের আন্দোলিত করেছে। যে গানগুলো সবাই শুনেছেন, কিংবা তাঁরা মনে করেন, তাঁরা শুনেছেন—তেমন গানই আমি রেকর্ডে নিতে চেয়েছি। গানগুলোর ভিন্ন দিক তাঁদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছি। তাঁদের সামনে গানগুলোর নতুন জগৎ অনন্য চেহারায় উপস্থাপন করতে চেয়েছি। গানের কথাগুলো যা বলছে, সে বিষয়টা আপনার বিশ্বাস করতে হবে। গানের সুরের মতোই গুরুত্বপূর্ণ গানের কথাগুলোও। গানের কথাগুলো যদি বিশ্বাস করার মতো না হয়, যদি নিজের মতো করে না নেওয়া যায়, তাহলে গান গেয়ে লাভ কী? ‘সাম এনচ্যান্টেড ইভনিং’ কিংবা ‘অটাম লিভস’—এ রকম গান আছে। এসব গান শুনে ভালোবাসা আর বিরহ সম্পর্কে জানা থাকা চাই, নিজের ভেতর অনুভব করা চাই। না হলে গান করে কোনো লাভ নেই। এ গানের গভীরতা অনেক বেশি। কোনো স্কুলবালককে দিয়ে এমন গান বিশ্বাসযোগ্যভাবে তুলে ধরা কঠিন।

লোকে ফ্রাংক সিনাত্রার কথা বলে; বলাটাই স্বাভাবিক। তিনি গানের গভীরে ঢুকে যেতেন কথা বলার ভঙ্গিতে। তাঁর গান সামনের মানুষদের দিকে বাতাসে ছুড়ে দেওয়ার মতো ছিল না। তিনি সরাসরি শ্রোতাকে উদ্দেশ করেই গাইতেন। আজকের দিনের অনেক পপ গায়ক পরোক্ষ ভঙ্গিতে গান করেন। এমনকি স্ট্যান্ডার্ড গায়কদের কেউ কেউ এ রকম পরোক্ষ ভঙ্গিতে গান করেন। কারো দিকে পরোক্ষে গান ছুড়ে দেওয়ার মতো গায়ক হতে চাইনি আমি। আমি চেয়েছি, গান শ্রোতাকে স্পর্শ করে যাবে, তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করে নেবে। শ্রোতার চেতনার একদম ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য পর্যন্ত পৌঁছে যাবে—এ শিক্ষা অনেক বছর আগেই সিনাত্রার কাছ থেকে পেয়েছি।

প্রশ্ন : আপনি কি এ অ্যালবামকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ বলে মনে করেন? এ গানগুলোর অনেক ভক্তশ্রোতা আছেন; তাঁরা হয়তো বলতে পারেন, আপনি সিনাত্রার স্তর ছুঁতে পারেননি।

ডিলান : সত্যি নাকি? ল্যান্ডমাইন পুঁতে রাখা আছে—এমন মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতো? কিংবা কোনো বিষাক্ত গ্যাসের ফ্যাক্টরিতে কাজ করার মতো? রেকর্ড বের করার মধ্যে তেমন ঝুঁকির কিছু নেই। সিনাত্রার সঙ্গে আমাকে তুলনা করছেন? আপনি কি ঠাট্টা করছেন? তাঁর নামের সঙ্গে আমার নামটা উচ্চারণ করলেই তো আমার জন্য অনেক সম্মানের হয়ে যায়। তাঁর স্তর ছুঁয়ে যাওয়া আর কারো পক্ষে সম্ভব নয়। আমার পক্ষে তো নয়ই।

প্রশ্ন : বড় হতে হতে আর কোন ধরনের গান শুনেছেন?

ডিলান : রক এন রোল শোনার আগে ব্যান্ড মিউজিক শুনেছি। রেডিওতে যা কিছু শোনা যেত, সবই। হোটেলের রেডিওতে এ রকম গান শোনা যেত। ওই সব গানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের বাবাদের প্রজন্মের মানুষরা নাচতেন। আমাদের বাড়িতে একটা রেকর্ড প্লেয়ার ছিল। সেখানে বিল মনরো কিংবা স্ট্যানলি ব্রাদার্সের গান শুনেছি। আমরা সব সময় রেডিওর অনুষ্ঠান শুনতাম। মনে হয়, রেডিওর প্রজন্মের শেষের দিকের একজন মানুষ আমি। তারপর তো টিভি চলে এসেছে। রেডিওর অনুষ্ঠানগুলোই আমাদের কাছে টিভির মতো ছিল। যা যা শুনতাম, কল্পনায় সেসবের ছবি তৈরি করে নিতাম। যে গায়কদের গান শুনতাম, তাঁদের না দেখলেও তাঁদের চেহারা কল্পনা করে নিতাম। তাঁরা কী ধরনের পোশাক পরেন, তাঁদের চলাফেরা কেমন ইত্যাদি মনে মনে এঁকে নিতাম।

প্রশ্ন : এ গানগুলো যদি নিজে লিখে থাকতেন?

ডিলান : এক দিক থেকে ভালোই লাগে যে আমি এগুলো লিখিনি। আমার নিজের না লেখা হলেও যেসব গান ভালো লাগে, সেগুলোর প্রাপ্য সম্মান আমি দিয়ে থাকি। আর যেহেতু আমি জানি, এ গানগুলো কিভাবে করতে হয়, সেহেতু আমার স্বাধীনতা তো রয়েছেই। আমি এ গানগুলো বুঝতে পারি। প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর কিংবা তার চেয়েও বেশি সময় আগে থেকে এগুলো শুনে আসছি। এগুলো আমার কাছে বিশেষ অর্থ বহন করে। নানা জায়গা ঘুরলে নানা রকম জিনিস দেখা যায়। যেমন আমি শেকসপিয়ারের নাটক পছন্দ করি। অন্য ভাষায় হলেও অসুবিধা নেই। আমি ‘ওথেলো’ দেখেছি, ‘ম্যাকবেথ’, ‘হ্যামলেট’ দেখেছি, ‘মার্চেন্ট অব ভেনিস’ দেখেছি, অনেক বছর আগে দেখেছি। নাটকগুলোর ভিন্ন ভিন্ন উপস্থাপনার মধ্যে একটার চেয়ে আরেকটা ভালো। ভালো কেন? অনেকটা গানের খারাপ উপস্থাপনা শোনার মতো। কিন্তু খারাপটা শোনার পর অন্য কারো কাছে ভালো উপস্থাপনাটা শুনতে পাওয়া যায়।

প্রশ্ন : এ গানগুলো এখন তো আগের চেয়ে আলাদা শ্রোতা পাবে। আপনার নিজেকে প্রত্নতত্ত্ববিদের মতো মনে হচ্ছে না?

ডিলান : না, না। এ গানগুলো আমার পছন্দের। গানগুলোর সঙ্গে নিজেকে একাত্ম করতে পারি আমি। আশা করি, অন্যরাও আমার মতো করেই এ গানগুলোর সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করতে পারবেন। গানগুলো নতুন শ্রোতা পাবে মনে করলে বেশি অহংকার প্রকাশ করা হয়ে যায়। গানগুলো তো আর এই প্রথম শ্রোতাদের সামনে আসছে তেমন নয়।

প্রশ্ন : এত সব প্রশ্ন করলাম। আপনি উদারভাবে নিয়েছেন।

ডিলান : প্রশ্নগুলো আসলে মজারই মনে হয়েছে আমার। আমার বিগত সাক্ষাৎকারে প্রশ্নকর্তা অন্য অনেক কিছু সম্পর্কেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, শুধু সংগীত ছাড়া। জানেন তো, আমি হলাম সংগীতেরই মানুষ। সেই ষাটের দশক থেকেই অনেকে আমার কাছে ওই রকম প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে আসছেন। তাঁরা এমন প্রশ্ন করেন যেন আমি কোনো চিকিৎসক, মনোবিদ, অধ্যাপক কিংবা রাজনীতিবিদ। কেন? কেন এসব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয় আমাকে?

প্রশ্ন : কোনো সংগীতজ্ঞের কাছে আপনার প্রশ্ন কী বিষয়ে হতে পারে?

ডিলান : সংগীত বিষয়ে। শুধুই সংগীত।


মন্তব্য