kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাংলাদেশ ও বব ডিলান

মোহীত উল আলম   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশ ও বব ডিলান

বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে আসলে জীবনে। আমার মায়ের অনুরোধে ছোট ভাই সাযেদকে (সেতার ও গিটার বাদক এবং সোলস ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সাযেদ উল আলম) দেখতে আমি স্পেন যাই ২০০৫ সালে।

সাযেদ ৩৬ বছর ধরে ইউরোপে প্রবাসী। ইতালি হয়ে ফেরার পথে দুবাই বিমানবন্দরে ট্রানজিটের সময় একটি বুক স্টলে বব ডিলানের ক্রনিকলস : ভলিউম ওয়ান বইটা কিনি। সেটা বের করেছিল সাইমন অ্যান্ড সুস্টারের প্রকাশনী লন্ডন থেকে এর আগের বছর, ২০০৪ সালে। তবে আমি যেটা কিনি সেটি পকেট বুকস প্রকাশনী ২০০৫ সালে বের করে। ২৯৩ পৃষ্ঠার বইটির প্রচ্ছদে লিন্ডা ডিংলারের ডিজাইনে শোভা পাচ্ছে বব ডিলানের তরুণ বয়সের একটি সাদাকালো ছবি। অত্যন্ত সুদর্শন চেহারার এক ঝাঁক কোঁকড়া চুল, গায়ে আস্তিন গোটানো সাদাকালো ডোরা শার্ট, বসে আছেন সম্ভবত মেঝেতে, ভাঁজ করা এক হাঁটুর ওপর হাত দুখানি বেড় দিয়ে।

সাযেদ গিটারে হাত দেয় স্কুল বয়সে স্বাধীনতার আগে থেকে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করার পর দেশ স্বাধীন হলে সে আমাদের কাজীর দেউড়ির বাসায় নকীব খান, তপন চৌধুরী (দুজনেই এখন বাংলাদেশের প্রথম কাতারের শিল্পী) ও সুব্রত বড়ুয়াসহ আরো কয়েকজনকে নিয়ে সোলস ব্যান্ড শুরু করে, যেটার আদি নাম ছিল সুরেলা। ওরা প্রতিদিনই প্র্যাকটিস করত বিকেলে আর সারা কাজীর দেউড়ি ওদের ড্রাম ও গিটারের আওয়াজে রীতিমতো কাঁপত। সে সময় বব ডিলান খ্যাতিতে পৌঁছে গেছেন, আর সাযেদরা তাঁর গান গাইত, আরো গাইত নিল ইয়ং, জোন বায়েজসহ বিটলসের গান, সানটানা গ্রুপের গান, ডিউক এলিংটন, হ্যারি বেলাফন্টে—যাঁরা সে সময়ে সুপরিচিত স্টার ছিলেন পাশ্চাত্য সংগীতে। পঞ্চাশের দশকের গায়ক-গায়িকা এলভিস প্রিসলি, পল আংকা, কনি ফ্রান্সিস, জেমি জেইমস—তাঁদের গানও তারা গাইত। তখন রাস্টাফারিয়া আন্দোলনের গায়ক ও বামপন্থী চিন্তার নেতা বব মার্লে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী তরুণ প্রজন্মকে তাঁর প্রতিবাদী গান, ‘গেট আপ অ্যান্ড স্ট্যান্ড আপ, স্ট্যান্ড আপ ফর ইয়োর রাইট’, ‘নো উইমেন, নো ক্রাই’ বা ‘বাফেলো সোলজারস/ইন দ্য হার্ট অব আমেরিকা’ ইত্যাদি গান দিয়ে উদ্বুদ্ধ করেন। বিটলসের জর্জ হ্যারিসন, পল ম্যাকার্টনি, রিংগো স্টার ও জন লেনন তখন পৃথিবীকে তাঁদের ‘লেট ইট বি’ গানটা দিয়ে মাতিয়ে তুলেছেন। তাঁরা সবাই লম্বা চুল রাখতেন, যা ১৯৭২-৭৩ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মও রাখতে শুরু করে। সাযেদদের সে সময়কার ছবি ওই লম্বা চুলেরই ইয়াং অ্যাংরি জেনারেশনের ছবি। একটা ধারণা আমার হয়েছে, আমেরিকার পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের ফোক, কান্ট্রি ও রক সংগীতের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর প্রতিবাদী চরিত্র। সেটি কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসের মুক্তির জন্য হোক, যেমন ‘ফাইভ হান্ড্রেড মাইলস, ফাইভ হান্ড্রেড মাইলস’ বা নির্যাতিত মানবতার পক্ষে হোক, যেমন ‘দ্যাট নাইট দে ড্রৌভ ওল্ড ডিক্সি ডাউন’, এ গানগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের একটি চরিত্রগত মিল ছিল। বেলাফন্টের ‘নাগিলা হাবা’ গানটিও এ সময় সাযেদরা বাজিয়ে গাইত। আর গাইত সাইমন অ্যান্ড গারফানকেলের গোল্ড ডিস্ক থেকে ‘ও মিসেস রবিনসন’, ‘সাউন্ড অব সাইলেন্স’ ও ‘লাইক আ ব্রিজ ওভার ট্রাবল্ড ওয়াটার/আই লে মি ডাউন। ’ 

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক চক্র কর্তৃক পরিচালিত গণহত্যা এবং তার থেকে উদ্ভূত শরণার্থী সমস্যার বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য রবিশংকর ও জর্জ হ্যারিসনের উদ্যোগে ১ আগস্ট নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ নামে অপরাহ্নে ও সন্ধ্যায় পরপর দুটি সংগীতানুষ্ঠান উপস্থাপিত হয়। বিশ্বসংগীত জগতের ইতিহাসে এই কনসার্ট মোড় ঘোরানো হিসেবে কথিত। কারণ এর আগে আর্তমানবতার সেবায় সংগীতের অবদান তত্ত্বীয়ভাবে স্বীকৃত থাকলেও এর কার্যকর ব্যবহার ওই কনসার্টের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয়। এরিক ক্ল্যাপ্টন, জিমি হেন্ড্রিক্স, রিংগো স্টার, জন লেনন, পল ম্যার্কাটনি, জোন বায়েজসহ বব ডিলান তাতে যোগ দিলেন। ৪০ হাজার দর্শক সে অনুষ্ঠান দুটি উপভোগ করে এবং এক দিনেই বাংলাদেশের জন্য চাঁদা ওঠে আড়াই লাখ ডলার, যা ইউনিসেফের কাছে জমা দেওয়া হয়। তখনো বাংলাদেশে ভিডিও ক্যাসেটের যুগ শুরু হয়নি, অথচ শুধু অডিও ক্যাসেটে শুনে সাযেদরা জর্জ হ্যারিসনের ‘মাই ফ্রেন্ড কেইম টু মি, উইথ স্যাডনেস ইন হিজ আইজ’ কিংবা জোন বায়েজের ঐন্দ্রজালিক কাঁপা সুরেলা গলায় বাংলাদেশের গণহত্যার নির্মমতার সাংগীতিক ভীতিকর চিত্র ফুটিয়ে তোলা গানটা, ‘বাংলাদেশ, বাংলাদেশ, হোয়ার দ্য সান সিংগস ইন দ্য ওয়েস্ট’ কিংবা বব ডিলানের ‘হাউ মেনি রোডস মাস্ট আ ম্যান ওয়াক ডাউন বিফোর ইউ কল হিম আ ম্যান’, অর্থাৎ ‘ব্লোয়িং এন দ্য উইন্ড’সহ ইত্যাদি গান তারা আকাশ-বাতাস মুখরিত করে গাইত। আমি গান গাইতে পারি না, বাদ্যও পারি না, কিন্তু তখন আমি ইংরেজি অনার্সের সিলেবাসের অলিগলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছি, আর সাযেদদের গাওয়া গানগুলো নিশ্চয় আমার অবচেতন মনে ঢুকে যেত।

ফলে বব ডিলানের ক্রনিকলস আমি কেনামাত্রই পড়া শুরু করে আনন্দ পেতে লাগলাম, এক, যেন আমার প্রথম জীবনে বুঁদ হয়ে শোনা পশ্চিমা রক সংগীতের জগতে ফিরে গেলাম; দুই, ডিলানের ভাষার চমৎকারিত্বে। এত কাব্যিক আর ঝরঝরে ভাষা, যেকোনো লিখিয়ের স্বপ্ন-আরাধ্য। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে প্রকাশিত অক্সফোর্ড বুক অব আমেরিকান পোয়েট্রি ২০০৬ সালের সংস্করণে তাঁর ‘ডেজোলেশন রো’ কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত করে।

ক্রনিকলস দুটি জিনিস পাঠককে উপহার দেয় : এক, আমেরিকার ফোক, রক, ব্লুজ ও কান্ট্রি সংয়ের ঐতিহ্যপুষ্ট ইতিহাস, যার বিবরণে ফুটে উঠেছে বিভিন্ন রক স্টার, সংগীতজ্ঞ ও গীতিকারের সঙ্গে লেখকের পরিচয় হওয়া, তাঁদের চরিত্রের বিবরণ এবং ডিলানের নিজের জীবন সংগ্রামের কথা, অন্যদিকে ডিলানের গভীর সংগীত সাধনার কথা, যার সঙ্গে মিশে আছে তাঁর গভীর সাহিত্য পাঠ থেকে জীবনের আকর খুঁজে পাওয়ার অনুপম বর্ণনা।

বব ডিলানের উঠতি সময়ে নিউ ইয়র্ক শহরে কিংবা শিকাগো বা লস অ্যাঞ্জেলেসে, পাড়ায় পাড়ায় ক্লাব, ক্যাফে এবং বারে ব্যান্ড সংগীত বাজিয়ে দর্শক বিনোদনের রীতি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। নিউ ইয়র্কে তিনি প্রথম যে পাড়ায় থাকতে শুরু করেন সেখানে ‘গ্যাসলাইট’ নামক ক্লাবে গাইতেন ডেইভ ভ্যান রংক। রংকের গাওয়ার শৈলী ছিল কখনো উচ্চনিনাদে, কখনো ফিসফিসিয়ে, আবার কখনো তিনি ব্যালাডকে ব্লুজে আবার ব্লুজকে ব্যালাডে পরিণত করতে পারতেন। কিন্তু মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের কানাডা-আমেরিকার সীমান্ত শহর ডুলুথ থেকে মাত্র ১৯ বছর বয়সে নিউ ইয়র্ক মহানগরীতে সংগীত জীবনে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে আসা বব ডিলানের কাছে জীবন-দর্শন হিসেবে তখন তাঁর বৃদ্ধ দাদির উপদেশই একমাত্র সম্বল। দাদি নাতিকে বলেছিলেন, সুখ খুঁজতে কোন পথ পাড়ি দিতে হবে সেটা নয়, পথটাই সুখ। ঘুরতে ঘুরতে তিনি ম্যাকডুগাল স্ট্রিটে দ্য ফোক সেন্টার দোকানটিতে ঢুকলেন। দোকানের মালিক ইজ্জি ইয়াংয়ের সঙ্গে তাঁর এর মধ্যে খাতির হয়েছে। শীতকালের বিকেল। হঠাৎ এক বিশাল আকৃতির লোক ঢুকলেন। ওভারকোট থেকে বরফের কুচি ঝেড়ে ফেলে দোকানের ভেতর দাঁড়ালেন। যেন রাশিয়ার দূতাবাসের কেউ। লোকটার হাবভাবে মনে হলো, দুনিয়ার কাউকে তিনি পরোয়া করেন না। দেখতে চাইলেন একটা গিবসন গিটার। ইয়াং গিটারটা নামালেন। লোকটা গিটারটাতে খানিকটা টুংটাং করে রেখে দিলেন। ডিলান চিনলেন, ডেইভ ভ্যান রংক। বলছেন, যখন তিনি গিটারটা রাখলেন, আমি দেখলাম আমার আর লোকটার মাঝখানে আর কোনো দেয়াল নেই। আমি গিটারটা নিয়ে ছড় টানলাম আর তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘গ্যাসলাইট’ ক্লাবে কাজ পেতে গেলে কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে? ভ্যান রংক মুখে মহা বিরক্তি ফুটিয়ে বললেন, ‘তুমি ঝাড়ুদারের কাজ পারবে কি না। ’ ডিলান বললেন, তিনি গান করেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর জন্য খানিকটা বাজিয়ে শোনাতে পারেন কি না। ভ্যান রংকের ইশারা পেলে ডিলান গাইলেন, ‘নোবডি নওজ হোয়েন ইউ আর ডাউন অ্যান্ড আউট। ’ রংক সেটি পছন্দ করলেন এবং বললেন, ‘গ্যাসলাইটে’ এসে তাঁর সেটে সন্ধ্যার সময় কয়েকটা গান গাইতে।

সেই শুরু ডিলানের এবং তাঁকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। টেলেনিয়াস মংক নামক একজন কৃষ্ণাঙ্গ গায়কের বহুল পরিচিত ‘রুবি, মাই ডিয়ার’ গানের কথা উল্লেখ করে তিনি তাঁকে প্রভাবিত করেছেন—এমন একজন গায়কের বর্ণনা দেন। গায়কের নাম হ্যাংক উইলিয়ামস, যাঁর গাওয়া একটি বহুল পরিচিত গান হলো, ‘কোল্ড, কোল্ড হার্ট’ (যেটা আমার সংরক্ষণে আছে এলটন জনের গাওয়া। )। হ্যাংক উইলিয়ামসের কণ্ঠ যেন তাঁর ভেতরে বিদ্যুতের প্রবাহ সঞ্চার করল, বললেন, বুলবুলি পাখিকে তিনি কাঁদতে দেখেননি, কিন্তু হ্যাংক উইলিয়ামসের গলায় সেটা জীবন্ত হয়ে উঠত।

ডিলানের গান সম্পর্কে আমার ধারণা, তাঁর গীতিগুলো বাণীসর্বস্ব। কিন্তু তিনি যেন আমার ধারণাকে খণ্ডন করছেন, সেভাবে লিখছেন, ‘সমালোচকরা বলেন আমার গান কথায় পরিপূর্ণ। সেটা যদি সত্য হয় তাহলে বিখ্যাত রক অ্যান্ড রোল বাদক ডুয়েন এডি কেন আমার গীতিগুলো বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে একটি পুরো অ্যালবাম তৈরি করছেন। ’ তারপর বলছেন, ‘যাঁরা আমার গানের সমালোচনা করেন, তাঁরা অনেকে গানের লোক নন। ’

বইটি শেষ হচ্ছে, তাঁরই রাজ্য মিনেসোটা থেকে উঠে আসা দুজন সাহিত্যিকের উল্লেখ করে। বিখ্যাত মার্কিন উপন্যাস ‘দ্য গ্রেট গ্যাটসবি’র রচয়িতা এফ. স্কট ফিটজেরাল্ড ছিলেন মিনেসোটার সেইন্ট পল নগরীর সন্তান এবং একই রাজ্যের সোক সেন্টার থেকে আগত মেইন স্ট্রিট ও অ্যালমার গ্যান্ট্রি নামক জনপ্রিয় উপন্যাসদ্বয়ের রচয়িতা সিনক্লেয়ার লুইস, যাঁর সম্পর্কে ডিলান গর্ব করে লিখছেন যে লুইস হলেন প্রথম আমেরিকান, যিনি সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার পেলেন। লুইস নোবেল পান ১৯৩০ সালে, আর ডিলান ৮৬ বছর পর একই পুরস্কার পেয়ে প্রমাণ করলেন যে জীবনে অনেক পথ পাড়ি দিলে শুধু একটা অবস্থানে পৌঁছানো যায়।


মন্তব্য