kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আলো-অন্ধকারে যাই

মাসউদ আহমাদ

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আলো-অন্ধকারে যাই

অঙ্কন : মাহবুবুল হক

মতিঝিল থেকে শাহবাগ এমন কিছু দূরের পথ নয়, তবু ৪০ মিনিটের বেশি লেগে গেল। শাহবাগে এসে গাড়ি থেকে নেমে পড়ে রোমেল।

এখন বাসায় গিয়ে টুক করে ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে কল্যাণপুর যেতে হবে। কল্যাণপুর থেকে দূরপাল্লার বাসে করে উত্তরবঙ্গে, রাজশাহীতে।

এখান থেকে বাসাটা কাছেই, পরীবাগে। বাস থেকে নামার পর আজ শাহবাগকে অন্য রকম লাগে। কেন লাগে? এমন অসময়ে অফিস ডেতে খুব একটা আসা হয় না। শাহবাগ যেন এক স্মৃতিকুঞ্জ, ভাবে সে। কত আনন্দ-বেদনার গল্প জমে আছে বুকের তোরণে, শাহবাগকে ঘিরে। বছরখানেক আগে শাহবাগের পটভূমিতে সে একটা কবিতাও লিখেছিল। কবিতা? আহা, যৌবনে কবিতার মতো কিছু রচনার চেষ্টা কে না করেছে! কিন্তু রোমেলের নিজের ধারণা, তার কবিতায় সময়-পরিপার্শ্ব আর অনুভূতির টুকরো কণাগুলো এমনভাবে ধরা পড়ে, পুরনো হতে অন্তত মুহূর্ত কয়েক সময় নেবে।

সহসা টুকরো একটি বাক্য মাথায় উঁকি দেয় তার—দূরত্ব কি দূরত্ব আরো বাড়িয়ে দেয়, সম্পর্কে?

মুঠোফোনে সময়টা দেখে নেয় রোমেল। এগারোটা পঞ্চাশ। মতিঝিলের অফিসপাড়ায়, সকালের তুমুল ভিড়-জ্যাম ও মানুষের কোলাহল ঠেলে বাস থেকে যখন নামে সে, একবারও কি ভাবতে পেরেছিল কিছু সময় পরে আবার ফিরে আসতে হবে? প্রতিদিনের মতো অফিসের লিফটের সামনে লম্বা সারি পেরিয়ে একসময় সে ১২-তলায় এসে নিজের ঘরে গিয়ে বসে। যথারীতি দুধ-চিনি ছাড়া লিকার চা এসে যায়। লেট লতিফ তখনো আসেনি, খেয়াল করে সে; আর তখন অফিসে পৌঁছনোর কুড়ি মিনিটের মধ্যে ফোনটা আসে। ফোন যিনি করেন, প্রায় ফুরিয়ে আসা সম্পর্কের ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র বড় ভাই করিম শেখ। তিনি ফোন করে কোনো ভূমিকায় না গিয়ে সরাসরি সংবাদটা দেন—‘হ্যালো রোমেল, আজ সকালে মা মারা গেছেন। অফিস থেকে ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে আয়। ’

টেলিগ্রাফের মতো সংক্ষেপে খবরটুকু দিয়েই তিনি নিঃশব্দ হয়ে যান। তখন নীরবতা নামে ফোনে, ইথারের এপার-ওপার।

চোখের পলকে চেনা অফিস ঘরও ভীষণ অচেনা আর বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো লাগে রোমেলের। মুঠোফোনটা কোনো রকমে টেবিলে রেখে সামনের দিকে ঝুঁকে আসে। দুই হাতে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ শূন্য অনুভূতি নিয়ে বসে থাকে। এসি ঘরে বসেও সে ঘামতে থাকে। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। মাথাটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। ধাতস্থ হতে দুদণ্ড সময় লাগে। কিন্তু বস তার টেবিলের সামনে এসে কখন দাঁড়িয়েছেন, মাথায় হাত রেখে একই প্রশ্ন বারকয়েক জিজ্ঞেস করে ফেলেছেন, একদম টের পায়নি। সে উঠে দাঁড়িয়ে যায় এবং কোনোমতে বলতে পারে—স্যার...

সাধারণত এই অফিসে ছুটি মেলে না। কিন্তু আজ অন্য রকম ব্যাপার ঘটে। মাসের ২১ তারিখ চলছে, ছুটি তো বটেই, বস রোমেলকে অগ্রিম কিছু টাকাও দিয়ে দেন। সান্ত্বনা দেন। বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করে দরজাও খুলে ধরেন।

রাস্তায় নেমে প্রথম যে কথাটি মনে আসে—মায়ের সঙ্গে শেষ কথাটুকুও আর হলো না...বুক চিরে চাপা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে রোমেলের।

মাকে শেষ কবে দেখেছে, দিনক্ষণের হিসাবটা ঠিক মেলাতে পারে না রোমেল। এখন যে কোনো কিছুতেই হিসাব মেলানো কঠিন ঠেকে তার কাছে। কিন্তু মায়ের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আলাদা। কী আশ্চর্য, এত দ্রুত মায়ের মুখখানা এমন অস্পষ্ট হয়ে উঠতে পারছে? হায়, নিয়তি!

নাগরিক ব্যস্ততা আর কাজের বাহানা কিংবা সত্যিই কিছু কাজের দেয়াল থাকেও; দেয়ালগুলো আলুর বস্তার মতো। দুই হাতে সরিয়ে সামনের কুয়াশাময় দরজা খুলতে হয়। এসব করতে গিয়ে শরীরের চেয়ে মনটাই বরং ক্লান্ত ও বিপন্ন হয়ে চলে, দিনের পর দিন।

কিন্তু আজ সব কাজ ও ব্যস্ততা স্তিমিত হয়ে আসে রোমেলের। মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়ে স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই মনের ভেতর সাড়া ফেলে না।

ছয় ঘণ্টার মতো পথ সব মিলিয়ে। এই পথটুকুই ছয় মাসের পথ হয়ে যায়। কখনো বছর। মাকে দেখা হয়নি, ছয় ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে। কেন হয়নি? অভিমান? এই শহরে অভিমান বা ঠুনকো দুঃখ-সুখের কোনো মূল্য নেই, গুরুত্ব তো নয়ই। সেটুকু অনুধাবন করতে পেরিয়ে গেছে কয়েক বছর। মা কত দিন বলেছেন—কবে বাড়ি আসবি বাপ?

রোমেল এড়িয়ে গেছে—মা, জুন মাসের ক্লোজিং চলছে। আর প্রায় নিয়মিত হরতাল। এখন বাড়ি গেলে ফিরতে পারব না। অফিসে সমস্যা হবে।

তাহলে থাক বাবা। কাজ শেষ হোক, পরেই আসিস।

কিন্তু মাকে দেওয়া কথা আর রাখতে পারল না।

সিএনজি স্টার্ট বন্ধ করে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। জ্যাম। একটা গাড়িও নড়ে না। ফার্মগেট পেরিয়ে আসাদ গেটের পরে কলেজ গেটে এসে গাড়িগুলো থিতু হয়েছে, দীর্ঘ সময়। এই জ্যাম কখন ছুটবে কে জানে। কখন কল্যাণপুর পৌঁছব আমি? বাস ধরব? কখন বাড়ি পৌঁছব? মাকে শেষ দেখাটুকুও কি দেখতে পাব না...ভেতরে অস্থিরতা টের পায় রোমেল। আজ পরিষ্কারভাবেই সে বুঝতে পারে, মৃত্যু সবচেয়ে নির্মম। একপেশে সত্য। বাস্তব। মৃত্যু সব শেষ করে ফেলে জীবনের। সব রকম অজুহাত, ক্ষোভ এবং অভিমান...

গাড়ি স্টার্ট নিয়ে নিয়েছে। কল্যাণপুর থেকে বাস পাল্টে রাজশাহীগামী কোচে পুঠিয়া। পুঠিয়া থেকে রিকশাভ্যানে ধোপাপাড়া। সেখান থেকে ভ্যানে করে কুসুমপুর। কিন্তু কুয়াশা। সিএনজি থেকে নেমেই রোমেলের মনে হয় সমস্ত চরাচরই নয়, মনের আকাশটুকুও অভেদ্য কুয়াশার দেয়ালে আড়াল হয়ে আছে।

রোমেলের ঢাকার জীবনের স্থিতিকাল নেহায়েত কম নয়, বছর পনেরো তো হবেই। এই যে দীর্ঘ সময়, খুব কি পরিবর্তন এসেছে তার জীবনে—চিন্তা বা চরিত্রে? ১৫ বছরে সে একটুও লম্বা হয়নি, বরং কমেছে; তা নিশ্চিত করে বলা যায়। মাথার চুলও খোয়া গেছে বেশ কিছু। এরই মধ্যে বাবা গত হয়েছেন। বাবার সঙ্গে মায়ের সম্পর্কটা ছিল অদ্ভুত—চোর-পুলিশের মতো কি? হতে পারে। বৈঠকখানায় বাবার একটা বড় ফটোগ্রাফ ছিল। বাবা চলে যাওয়ার পর মা এমনিতেই কথা কম বলতেন, আরো নিঃশব্দ হয়ে গেলেন। প্রায়ই গম্ভীর মুখে সেই ছবির সামনে দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করতেন, একা। কী বলতেন মা? বলতেন কি—আমাদের ফতুর করে ওপারে চলে গিয়ে মজা দেখছ, না? রাবিশ!

আহা, এমন করে কেউ বলে নাকি?

একসময় নিজেকেই যেন শুধায় রোমেল—কত দিন পর বাড়ি যাচ্ছি আমি?

একটা বয়স্ক মহিলা বন্ধ দরজার ওপাশে ভিক্ষার জন্য হাত বাড়ায়; তখনই কথাটুকু মনে আসে। সচরাচর বাড়িতে সে যায় না। হয়তো বছরে কিংবা দুই বছরে একবার যায়। এবং বাড়ি থেকে ফেরার সময় তার আচরণ ও চোখ-মুখ থেকে এমন ইঙ্গিত কেউ দেখে ওঠে না যে সে আবার এই পথে আসবে। মাঝেমধ্যে সে এত দীর্ঘ সময় বাড়ি যাওয়া থেকে বিরত থাকে যে বাড়ি যাওয়ার কথা মনেও থাকে না। ঢাকা শহর মানুষের মনকে এমন ভোঁতা করেও রাখতে জানে গো!

কল্যাণপুরে নেমেই বাস পেয়ে যায় রোমেল। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা একটা পেরিয়েছে। তাড়াহুড়োয় কিছু খাওয়াও হলো না। অনেক দিন পর বাড়ি যাচ্ছে সে, কিন্তু মা আর নেই ভাবতেই শ্বাস ভারী হয়ে আসতে থাকে। চোখ ফেটে জল আসে না ঠিক, কিন্তু গলার কাছে কিছু আটকে আছে মনে হয়। আর তাতে খুব অস্বস্তি হয়।

গাবতলী ব্রিজ পেরিয়ে শ্যামলী পরিবহনের গাড়ি দ্রুতবেগে ছুটে চলে। কিন্তু তার চেয়েও দ্রুত গতিতে মনটা পেছনের দিকে ছুটে যায়। হঠাৎ মনে হয়, মা-ই একমাত্র ব্যক্তি, যাঁর কাছে সব অভিযোগ ও দাবি তোলা যায়—খেতে দাও, ঘুম পাড়িয়ে দাও; নতুন জামা লাগবে, কুঁচকিতে এত চুলকায় কেন মা? মা, আমার কিন্তু এটা লাগবে, টাকা নেই, তোমার বোনের মেয়েটা কিন্তু খুব জ্বালাচ্ছে...

এই শহরে এসে জীবনের কত কিছু শেখা হলো, কত কিছু খোয়া গেল হৃদয়ের। হিসাব মেলানো যায় না। হিসাব মেলাতে গেলেই ভাবনা আসে। ভাবনাটুকু মাথায় নিতে চায় না সে। ভাবতে যে সে পছন্দ করে না, এমন নয়। বিশেষ করে নীলিমাকে নিয়ে ভাবতে। কিন্তু এখন যে কোনো রকম ভাবনা বড় যন্ত্রণা দেয় তাকে। জীবনকে রোমেল পরিষ্কার দুই ভাগে ভাগ করে নিতে পেরেছে এখন। ঢাকার জীবন এবং ঢাকায় আসার আগের জীবন। যে জীবনে ঢাকা শহর নেই বা ছিল না কখনো—ঢাকার রূপ-গন্ধ-অভিজ্ঞতা নেই, সেই জীবন যত বর্ণিলই হোক, পূর্ণাঙ্গ নয়। এভাবে বলতে ইচ্ছা করে তার। স্বপ্ন ও কল্পনা বাস্তবায়নের শহর ঢাকা, স্বপ্ন ভঙ্গেরও কি নয়? এই শহরে এত মানুষ, এত আয়োজন, প্রতিদিনই যেন হাটবার এখানে। গ্রাম থেকে হঠাৎ ঢাকায় এলে এমনটিই মনে হবে। প্রেম ও প্রতারণার শহর যেমন ঢাকা, তেমনি প্রত্যাখ্যানেরও।

এত দিনেও একাই আছে রোমেল। মায়ের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে তাই এমন টুক করে বেরিয়ে পড়তে পেরেছে। বিয়ে করে সংসারী হয়ে গেলে কি পারত, অফিস থেকে বেরিয়েই বাসে উঠে পড়তে? আর বিয়ে! এই বৈরী মানসিক অবস্থার মধ্যেও নিজের মনেই একবার হেসে ওঠে সে। ঢাকায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রফেসর আছেন রোমেলের পরিচিত। খুব মজার মানুষ সেই প্রফেসর। সৈয়দ বংশের মানুষ। ক্লাসে তিনি ইংরেজি পড়ান। বিদেশ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি আছে ভদ্রলোকের। তাঁর নানা ছিলেন আর এক ত্যাদড়, মজার লেখক হিসেবে তাঁর নানার খ্যাতি গোটা বাংলায়, আজও। অবশ্য তাঁর কথা কে না জানে! প্রফেসর সাহেব একদিন বললেন, জানো রোমেল, নানা বলতেন, তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল হচ্ছে বিয়ে করা। ভুল করে বিয়ে না হয় করলেন, কিন্তু বেশি বয়সে বাচ্চার বাবা হওয়া—সেটি তার চেয়েও বড় ভুল।

প্রফেসরের গল্প শুনে রোমেল মুখ টিপে হাসে। —কিন্তু স্যার, মানুষের একটাই তো জীবন; বিয়ে না করলে এই জীবনটা কি সুন্দর বা আনন্দময় হয়? আর নতুন বউয়ের গন্ধ যে কখনো পেল না জীবনে, নীল ঘূর্ণি আঁচল ও রঙিন দোপাট্টার প্রান্ত যার নাকে বাড়ি খেলো না—তার জীবনে কী আর থাকল, বলুন!

আচ্ছা, বেশ বলেছ তো তুমি...

রোমেল বলে, একটা সময়ে এসে পৃথিবীর সব তরুণই হয়তো নতুন বউয়ের স্বপ্নময় নীল শাড়ির ঘূর্ণি, লাজুক মুখ, আনত চোখ, কম্পিত চাপাকলার মতো হাত দেখতে আর গন্ধ পেতে নিজের ঘ্রাণেন্দ্রীয় তীব্র করে রাখে...

প্রফেসর হা হা করে হেসে ওঠেন। বলেন, নানা বলতেন, পরের ভুলটা হচ্ছে, তা না হয় হলো, কিন্তু আরো বড় ভুল হচ্ছে বাচ্চা মানুষ না করে দেশে-বিদেশে ঘোরাঘুরি করা...

তখন, সদ্য চশমা পরতে শুরু করেছে রোমেল। হঠাৎ সে টের পেল, সামান্যতর কিছু রাগ ও বিরক্তিতে তার নিঃশ্বাস ভারী ও দ্রুত হয়ে উঠেছে।

প্রফেসর কি কিছু বুঝে উঠলেন? বললেন, এই, তুমি চা খাবে তো! চলো, ক্যাফেটেরিয়ায় গিয়ে বসি। ওখানে ভালো মিষ্টিও পাওয়া যায়।

রোমেল বলতে গেল—স্যার, এই শহরে কত যে রং-রূপ ও সৌন্দর্য ভেসে বেড়ায়, সবাই কি সেই সৌন্দর্যের ঘ্রাণ পায়? ঢাকায় এসে মনে হয়, বিয়েটা করার আগে নিজের পায়ে একটু দাঁড়িয়ে নিই। আরে, কী অদ্ভুত কথা! যেকোনো সুস্থ-সবল মানুষ তো নিজের পায়েই দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু একসময়, জীবনের প্রায় সব কিছু স্থিতিশীল ও সম্মানজনক আয়েশে দাঁড়িয়ে যায়। ভাবনা কিংবা সামর্থ্যও। কিন্তু দুঃখ এই—সেই জিনিস তো আর দাঁড়ায় না। তখন বিয়ে করে লাভ কী?

কিন্তু কথাগুলো সে নিজের মনেই রেখে দেয়, স্যারকে আর বলতে পারে না।

 

বাড়ি পৌঁছানোর পর...

ভ্যান থেকে যখন নামল সে, বহু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা পেরিয়েছে বেশ আগেই। সমস্ত পরিবেশ বিষণ্ন, মানুষের মুখগুলোও ছেয়ে আছে গভীর বিষাদে। সবাই রোমেলের জন্য অপেক্ষা করছিল। রোমেল বাড়ির সীমানায় পা রাখতেই আরেক দফা কান্নার দমক উঠল; মুহূর্তখানেক পরে থেমেও এলো সব কিছু। বড় ভাইকে দেখল দূরে দাঁড়িয়ে আছে রসাল চোখে। ছোট দুই বোন এসে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আকুল হয়ে কাঁদতে থাকল—ও ভাই রে, তুমি আস্যাছো...আমাহারে আর কেহু থাইকল না গো...

জানাজা শেষ হওয়ার পর কেউ একজন বলে, মায়ের মুখটা বাপজিকে একটু দেখাও। মুহূর্তে মাথা ঘুরিয়ে সে বলে ওঠে, ‘না, থাক। ’ মায়ের যে মুখটি অন্তর্গত চোখে ধরা আছে রোমেলের, এখনকার ছবির সঙ্গে তা কিছুতেই মিলবে না। বিবর্ণ-ধূসর মুখ দেখে মাকে আরো পর করে দিতে চায় না সে। তারপর কী যে হয় রোমেলের, হঠাৎ এক দৌড়ে বাসস্ট্যান্ডে চলে যেতে ইচ্ছা করে। বুক ফেটে যেতে চায়, তবু কান্না আসে না। শুকনো চোখে সে একবার আকাশের দিকে তাকায়। আকাশ এত অন্ধকার। আজ অমাবস্যা নাকি?

সবার অলক্ষে সে বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ায়। উঠোনেও অনেক মানুষ, তার দিকে নরম চোখে তাকায়। এত মানুষ, এত আলো, কিন্তু কেউ তাকে বসতে বলে না, এগিয়ে এসে হাতটি ধরে না। কলতলার ওপাশে ঝিঁঝিপোকার ডাক ভেসে আসে।

গাঢ় ভঙ্গিতে রাত বাড়তে থাকে।


মন্তব্য