kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আপন কথা

আমার মনে হতো পাখির গায়ে যে রং আছে, ওটারও গন্ধ আছে

দ্বিজেন শর্মা

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আমার মনে হতো পাখির গায়ে যে রং আছে, ওটারও গন্ধ আছে

আমার স্কুলের নাম ছিল আবদুল লতিফ সিদ্দিকী প্রাথমিক বিদ্যালয়। আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ছিলেন মওলানা।

নিজের জায়গায় স্কুল দিয়েছিলেন। তবে এখন স্কুলটির আর সেই নাম নেই। এখন সরকারি হয়ে গেছে, নামটাও বদলেছে। কেন বদলেছে, আজ পর্যন্ত জানতে পারিনি। এ নিয়ে আমি কাগজে চিঠিপত্রও লিখেছি। আমাদের স্কুল শিক্ষক ছিলেন নিরোদচন্দ্র শর্মা। আমাদের বাড়ির সামান্য দূরেই ছিল স্কুলটা। স্কুলের পাশ দিয়ে রেললাইন। এই রেললাইনে আমরা ছাত্ররা দাঁড়িয়ে থাকতাম উনি আসেন কি না দেখার জন্য। কারণ স্যার ওই রেললাইন ধরেই আসতেন। আমরা শুধু ভাবতাম, আজ যদি না আসেন তবে আর তাঁর মুখোমুখি হতে হবে না। আরেকজন শিক্ষক ছিলেন, তিনি আমাদের তেমন কিছু বলতেন না। কিন্তু নিরোদ স্যার কোনো দিনই স্কুলে আসা মিস করতেন না। দূর থেকে আমরা তাঁর চেহারা দেখার আগেই দেখতাম সাদা ধুতি। আর কি আমরা সেখানে থাকি! দৌড়ে একেবারে স্কুলে।

স্কুলের বন্ধুদের এখন শুধু একজনই বেঁচে আছে। আমার পাশের বাড়ির। এখনো তার সঙ্গে কথা হয়। সেই দিনগুলোর কথা আমার চেয়ে তার বেশি মনে আছে। আমি ভুলে যাই, কিন্তু ওর মনে আছে সব। আমাদের বন্ধু ছিল মাহমুদ আলী, সে ছিল ফার্স্ট বয়, আর আমি সেকেন্ড বয়। স্কুলে হিন্দু-মুসলমান সমান সমান ছিল। স্কুলের সামনে অনেক আমগাছ ছিল। একটা বড় মাঠ ছিল। সেখানে দাঁড়িয়ে মাহমুদ আলী আমাদের ‘একে কে এক, দুইয়ে একে দুই’ ওই শেখাত। ফার্স্টবয় বলেই শেখানোর দায়িত্ব ছিল। সে অনেক মেধাবী ছিল। আমার বিভিন্ন লেখায় মাহমুদ আলীর কথা এসেছে। তারপর আমাদের গ্রামের মোছদ্দরের কথা মনে আছে। সে মধ্য বয়সে মারা যায়। গণিত আর ব্যাকরণে বেশ ভালো ছিল।

একটা ঘটনা এখনো খুব মনে আছে। আমাদের পাঠশালায় একটা কাঁঠালগাছ ছিল। একবার দুই-তিনটা কাঁঠাল একসঙ্গে পাকল। মাস্টারমশাই সবাইকে এক কোয়া করে খেতে দিলেন। এটা যে এতই সুস্বাদু, আমাদের বাড়িতে কত কাঁঠালগাছ, ঘরে কত কাঁঠাল, কিন্তু এর মতো সুস্বাদু কোয়া আর খাইনি। কিন্তু কোয়া, একটা মাত্র ভাগে।

আমার স্কুল বা পাঠশালা জীবনের আরেকটা চমত্কার ঘটনা রয়েছে। আমার খুব পাখি পোষার শখ ছিল। নিরোদচন্দ্র শর্মা খুব ভালো ছবি আঁকতেন। স্কুলে তখন ইন্সপেকশন হতো, একজন দেখতে আসতেন বছরে একবার। তখন স্যার সারা ঘর নিজের ছবি দিয়ে সাজাতেন। ফল, ফুল, পাখি, কত কিছু যে আঁকতেন, সব দেখার মতো। ইন্সপেকশন হওয়ার কয়দিন পর তিনি আবার ছবিগুলো খুলে রাখতেন। তিনি একটা ময়না এঁকেছিলেন। এটা আমার মাথার ভেতর ঢুকে পড়ে। আমি পাখি খুব ভালোবাসতাম, যাকে বলে পাগল। তাঁর আঁকা ছবিটা দেখে দেখে মনে হতো আস্তে আস্তে পাখিটা বুঝি জ্যান্ত হয়ে যাচ্ছে, উড়ে যাচ্ছে। বাড়িতে আমি বায়না ধরলাম ময়নার বাচ্চা এনে দিতে। কিন্তু আমার কথা তো কেউ শোনে না। আমার জ্যাঠতুতো ভাইয়ের জায়গাজমি ছিল পাহাড়ে, গভীর বনে। তাকে বললাম, তুমি আমার জন্য একটা ময়নার বাচ্চা এনে দাও। একদিন আমার মনে আছে, ট্রেন আসার সময় স্কুল ছুটি হলো। আমরা বাড়ি যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছি, দেখি উনি এসেছেন। হাতে একটা ময়নার খাঁচা। এটা যে কী অসাধারণ আমার জীবনে! আমার মনে হতো পাখির যে রং আছে গায়ে, ওটারও গন্ধ আছে। রঙের গন্ধ পেতাম। তারপর আমি অনেক রকম পাখি পুষেছি—রাজহাঁস, ঘুঘু, টিয়া, ময়না, শালিক কিছুই বাদ যায়নি। গ্রামের বড় বাড়ি, ক্ষেতখামার...সেটা স্বপ্নের জীবন। আমাদের বাড়িতে বাবার বড় লাইব্রেরি ছিল। সবাই পড়াশোনা করতেন। তখন বাংলা সাহিত্যের প্রধান পত্রিকা বসুমতী, ভারতবর্ষ আসত আমাদের বাড়িতে। আমরা একেবারে ছোটবেলা থেকেই বইয়ের সঙ্গে ছিলাম। মা মুখে মুখে আমাদের শরত্চন্দ্রের গল্প বলতেন। ওই দিক দিয়ে ম্যাট্রিকের আগেই বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ গল্পগুলো পড়া হয়ে গেছে। রবীন্দ্র-বঙ্কিম থেকে শুরু। শরত্চন্দ্র বিশেষ প্রিয় ছিলেন। তাঁর নায়িকারা আমাদের মডেল হয়ে যায়। এটা প্রেমিকা অর্থে না, ভগ্নি অর্থে। ওই নায়িকারা তো বয়স্ক আমাদের থেকে। আরেকটা কারণ, মা নারীবাদী ছিলেন এবং শরত্চন্দ্রের লেখা খুবই ভালোবাসতেন। তাঁর সব উপন্যাস মায়ের মুখস্থ ছিল। তিনি আমাদের ওগুলো শোনাতেন। বর্ষার দিনে মেয়েদের কাঁথা বোনায় বসিয়ে ওই গল্পগুলো বলতেন। রবীন্দ্রনাথের যোগাযোগ আমি শুনেছি, মা হুবহু বলে গেছেন সিলেটি ভাষায়। আর রামায়ণ মহাভারত তো ছোটবেলায় পড়া হয়ে গেছে। কারণ বাড়িতে এগুলো মা পড়ে শোনাতেন। মাঝে মাঝে বলতেন তুই পড়ে শোনা।

শ্রুতলিখন : চন্দন চৌধুরী


মন্তব্য