kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রেমব্রান্টের বাড়িতে একচক্কর

ফারুক মঈনউদ্দীন

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



রেমব্রান্টের বাড়িতে একচক্কর

রেমব্রান্টপ্লেইনের নাইটওয়াচ ছবির ভাস্কর্য

আমস্টারডামে প্রথম দফায় উঠেছিলাম নভোটেল হোটেলে। সেখানকার পাট চুকিয়ে দ্বিতীয় দফায় উঠি মূল শহরের মধ্যে প্রিন্সেনখ্রাখতের খালপাড়ের হোটেল আইটিসিতে।

রিসিপশনের চীনা চেহারার মেয়েটি জানায়, দুপুর ১টার আগে তো ওঠা যাবে না, তবে ইচ্ছা করলে আমি ওদের জিম্মায় বাক্স-প্যাটরা রেখে ঘুরে-ফিরে আসতে পারি। প্রস্তাবটা মন্দ নয়, এই সুযোগে কোনো বইয়ের দোকানে ঢু মারা যাবে। রিসিপশনের মেয়েটি ম্যাপে দাগিয়ে দেখিয়ে দেয় কিভাবে যেতে হবে কালভারস্ট্রাট, বইয়ের বিখ্যাত দোকানটি ওখানেই। ম্যাপ হাতে নিয়ে মনে হলো, আমস্টারডাম শহরের মূল কেন্দ্রে ঘুরতে হলে ম্যাপের সাহায্য না নিয়ে একটা মাকড়সার জালের ছবি নিলেও চলে, শুধু চক্রাকার খাল আর রাস্তার নামগুলো বসিয়ে নিতে হবে জায়গামতো।

কালভারস্ট্রাট গেলে দেখা যায়, রাস্তায় ট্যুরিস্টে-নাগরিকে সয়লাব। ঝকঝকে রাস্তার দুই পাশে দুনিয়ার অভিজাত সব শোরুমের সারি। শোকেসের মতো সেসব দোকানের বিপণিবালাদের কেউই আমাকে আকর্ষণ করতে পারে না। এই রাস্তার এমন সাজসজ্জা দেখে কে বিশ্বাস করবে ২০০ বছর আগে এটা ছিল গরু বা বাছুরের হাট। ওলন্দাজ ভাষায় ‘কালভার’ অর্থ বাছুর, আর ‘স্ট্রাট’ মানে গলি বা রাস্তা। এখন এখানকার দোকানগুলোর ভাড়া হচ্ছে প্রতি বর্গমিটার তিন হাজার ইউরো অর্থাৎ ২০১৬ সালের মুদ্রামানে বাংলাদেশি টাকায় প্রায় দুই লাখ ৬৫ হাজার টাকা। যা-ই হোক, এখানকার দোকান ভাড়া নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই, আমি খুঁজছি গ্রন্থবিপণি ওয়াটারস্টোন।

হোটেলে ফিরে আসতে আসতে দুপুর গড়িয়ে যায়। আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম, দুপুরের পর রেমব্রান্টের বাড়ি দেখতে যাব। তাই সকালের অভিযানের অভিজ্ঞতার ওপর ভর করে হেঁটে চলে যাই রেমব্রান্টপ্লেইন, ভেবেছিলাম ওটাই ইংরেজিতে রেমব্রান্ট হাউস। ভিন দেশে কারো সাহায্য না নিয়ে নিজেকে তালেবর ভাবা যে ঠিক নয়, সেটা টের পাই রেমব্রান্টের নামাঙ্কিত জনাকীর্ণ চত্বরে গিয়ে। প্লেইন মানে চত্বর। ওখানে গিয়ে দু-একজনকে জিজ্ঞেস করি, ভাই, এখানে রেমব্রান্টের বাড়িটা কোন দিকে? তাদের জবাব তেমন সুবিধার মনে হয় না, তাদের কারোরই জানা নেই এদিকে রেমব্রান্টের কোনো বাড়ি আছে কি না। অবশেষে একজনকে পাওয়া গেল, তিনি বলেন, ওহ, রেমব্রান্ট হাউস তো এখানে নয়, জোডেনব্রিস্ট্রাট। এখান থেকে দুই দিক দিয়ে যাওয়া যায়। আপনি বরং ওয়াটারলুপ্লেইন দিয়ে যান।

এই ফাঁকে রেমব্রান্টপ্লেইনের চারপাশ ঘোরা হয়ে যায় আমার। এখন যে রকম চত্বরের চারপাশ ঘিরে রেস্তোরাঁ, বার, হোটেল আর মানুষে মানুষে থই থই করছে, ৪০০ বছর আগে এই জায়গার যখন পত্তন হয়, তখন চেহারা এ রকম ছিল না। এটা ছিল নিছক একটা ডেয়ারি মার্কেট, গোয়ালা বাজার বললে বোধ হয় যথার্থ হয়। দুধ, মাখন, পনির—এসব দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার বসত এখানে। রাস্তার ধারে বসত নানা জিনিসের আড়ং। বিশ শতকের শুরুতে আমস্টারডামের চেহারা যত খোলতাই হতে থাকে, তার সঙ্গে বাড়তে থাকে লোকসংখ্যাও। তখন থেকে এই চত্বর হয়ে ওঠে সব শ্রেণির মানুষের অবসর কাটানোর কেন্দ্র। সেই সঙ্গে চারপাশে গড়ে ওঠে হোটেল-রেস্তোরাঁ, পানশালা ও বিভিন্ন ধরনের দোকানপাট। সে সময় এই চত্বরের নাম দেওয়া হয় রেমব্রান্ট চত্বর। বেলজিয়াম নেদারল্যান্ডস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে রুবেন্সকে তাদের জাতীয় চিত্রকর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলে, ওলন্দাজরাও রেমব্রান্টকে তাদের শিল্পী চূড়ামণি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এই চত্বরের মাঝখানে তাঁর একটা মূর্তি বসিয়ে দেয়। সামান্য মাথা ঝুঁকিয়ে অনেক ওপর থেকে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকা মূর্তিটার পায়ের কাছে তাঁরই বিখ্যাত ছবি ‘দ্য নাইট ওয়াচ’ অবলম্বনে সৃষ্ট ভাস্কর্য। জনাবিশেক বন্দুকধারী মিলিশিয়ার ব্রোঞ্জ মূর্তির সশস্ত্র অবস্থায় নানা ভঙ্গিতে দাঁড়ানো ভাস্কর্যকর্মটি তৈরি করা হয় ২০০৬ সালে রেমব্রান্টের ৪০০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে। ২০১২ সালে এখানে স্থায়ীভাবে বসানোর আগে এটি ঘুরে এসেছে নিউ ইয়র্ক ও মস্কো। পেইন্টিং থেকে ত্রিমাত্রিক এই ভাস্কর্য তৈরির আইডিয়াটা ভালো, দর্শক যাতে ছবিটার মধ্যে ঢুকে পড়তে পারে—এটাই ছিল উদ্দেশ্য। আক্ষরিক অর্থেও দেখলাম ধারণাটা মিলে গেছে, ট্যুরিস্টরা সেই সব মূর্তির গায়ে হেলান দিয়ে কিংবা ওগুলোর সারির মধ্যে ঢুকে নানা ভঙ্গিমায় ছবি তুলছে।          

আমস্টারডামের সব বাড়ি যেমন গায়ে গা লাগানো খাড়া তিনতলা বা চারতলা অপ্রশস্ত, গাছগাছালিতে ঢাকা; ৪ নম্বর জোডেনব্রিস্ট্রাটের এই বাড়িটাও ঠিক তেমন। এ বাড়িটি তৈরি হয়েছিল ১৬০৬ সালে, আর রেমব্রান্ট কিনেছিলেন ১৬৩৯ সালে। তখনকার বাজারে দাম পড়েছিল ১৩ হাজার গিল্ডার, এখনকার মূল্যে আড়াই কোটি টাকার কাছাকাছি। শিল্পী হিসেবে তাঁর খ্যাতি তখন তুঙ্গে। বাড়িটা তিনি বেশি দিন রাখতে পারেননি। দুর্ভাগ্য তাড়া করছিল তাঁকে। এই বাড়িতে ওঠার তিন বছরের মাথায় তাঁর স্ত্রী সাসকিয়া যক্ষ্মা রোগে মারা যান। চার সন্তানের মধ্যে তিনটিই মারা যায় অল্প বয়সে। বছর দশেকের মাথায় তাঁর আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকে। দেনার বোঝা মাথায় নিয়ে দেউলিয়া হয়ে পড়েন তিনি। ১৬৫৮ সালে পাওনাদাররা বাড়িটার দখল নিয়ে ভেতরের মালামালসহ বিক্রি করে দেয় ১১ হাজার গিল্ডারে। কেনার ১৯ বছর পর বাড়িটি হারিয়ে রেমব্রান্ট রোজেনগ্রাখটের ছোট একটা ভাড়াবাড়িতে ওঠেন, সেই বাড়িতেই জীবনাবসান ঘটে তাঁর।

বাড়িটিতে ঢোকার টিকিট আগেই ইন্টারনেটে কেনা ছিল, ভেতরে ঢুকে শুধু অডিও গাইড ভাড়া নিতে হয়। সেখান থেকে জানা যায়, এ বাড়ি যখন বিক্রি হয় তখন তাঁর আসবাবপত্র, পেইন্টিং, ভাস্কর্য, নানা ধরনের অস্ত্র, তৈজসপত্র—সব কিছুর একটা তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। বর্তমান  জাদুঘরের বেশির ভাগ আসবাব ও অন্যান্য সামগ্রী সেই তালিকার বর্ণনামাফিক তৈরি কিংবা জোগাড় করা হয়েছে। এই বাড়িতে বসেই তিনি তাঁর বহু বিখ্যাত ছবি আঁকেন। ‘নাইটওয়াচ’ ছবিটাও এ বাড়িতে বসে আঁকা।

পাওনাদারদের হাতে বিক্রি হওয়ার পর ২৫০ বছর ধরে এই সম্পত্তি বহুবার হাতবদল হয়। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ কিনে নিয়ে ১৯১১ সালে এটিকে জাদুঘরে পরিণত করে। ১৯৯০ সালে আরো কিছু অংশ যুক্ত করা হয় বাড়িটির সঙ্গে।

ভেতরে ঢোকার পর একটি মাঝারি আয়তনের ঘরে ছিল তাঁর রিসেপশন। এখানে বসে তিনি আর্ট ডিলার ও খদ্দেরদের সঙ্গে কথা বলতেন। বিক্রির জন্য ঘরের দেয়ালে প্রদর্শনীর মতো ঝোলানো থাকত তাঁর নিজের ছাড়াও অন্যান্য শিল্পী ও তাঁর শিষ্যদের ছবিগুলো, যাতে সহজেই বাছাই করা যায়। শোয়ার ঘরের একপাশে ফায়ারপ্লেস, তার দুই পাশে দুটি প্রমাণসাইজের মর্মরমূর্তি, একটি পুরুষ, আরেকটি নগ্নবক্ষা নারীর। অন্য দেয়ালের সঙ্গে একটা অনেকটা পালকির আকৃতির খুপরির মধ্যে বিছানা-বালিশ পাতা, খুপরিটা অনেকটা জাহাজের বাঙ্কের মতো, তবে দৈর্ঘ্যে একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের তুলনায় খাটো। এই বিছানায় কিভাবে ঘুমাতেন তিনি, সেই ভাবনা ভাবতে ভাবতে অডিও গাইডের কণ্ঠ শোনা যায়। ‘৪০০ বছর আগে ওলন্দাজ জাতি এখনকার মতো এত লম্বা ছিল না। তাই বর্তমান বাস্তবতায় পৃথিবীর দীর্ঘতম জাতির জন্য এই খাটের দৈর্ঘ্য ছোট মনে হতে পারে। বর্তমানে ওলন্দাজদের গড় উচ্চতা ৬ ফুটের ওপর। ’

ওলন্দাজ জাতির এই লকলক করে বেড়ে ওঠার বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রচুর গবেষণাও হয়েছে, কিন্তু কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ আবিষ্কার করা যায়নি। এমনকি ১৮৬০ সালেও এদের গড় উচ্চতা ছিল ৫ ফুট ৪ ইঞ্চি। তারপর থেকে মানুষের গড় উচ্চতা বিভিন্ন দেশে বাড়লেও ওলন্দাজদের মতো এমন ধাই ধাই করে বাড়েনি কোথাও। সে সময় থেকে ১৫০ বছরের মধ্যে তাদের গড় উচ্চতা বেড়ে গেছে প্রায় আট ইঞ্চি; অথচ একই সময়ে আমেরিকানদের বেড়েছে মাত্র ২.৩ ইঞ্চি। কারো কারো ধারণা, হল্যান্ডের দুগ্ধশিল্পের উত্কর্ষের সঙ্গে এই জাতির উচ্চতা বাড়ার সরাসরি যোগসূত্র আছে।

আমস্টারডামে পৌঁছার পর প্রথম সন্ধ্যায় আমাদের জন্য যে ককটেল পার্টির আয়োজন ছিল, সেখানে গ্লাস হাতে মেজবানদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বলার পরই আমার ঘাড় ব্যথার কারণ পরিষ্কার হয় গাইডের কাছ থেকে শোনা এই তথ্যে। কতক্ষণ আর মাথা উঁচু করে রেখে কথা বলা যায়, ঘাড়ের দোষ দিয়ে কী হবে?

যা-ই হোক, স্বল্পদৈর্ঘ্যের বাক্স আকৃতির খাট সম্পর্কে আরো একটি তথ্য জানা যায় যে তখনকার মানুষের বিশ্বাস ছিল, বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে ঘুমালে শরীরের রক্ত মাথায় গিয়ে জমা হয়, আর তাতে দম বন্ধ হয়ে মারা পড়তে পারে মানুষ। রক্ত যাতে মাথায় জমা হতে না পারে সে জন্য মাথার দিকটা খাড়া রেখে আধশোয়া হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস করেছিল তারা।

রেমব্রান্টের ছিল বিচিত্র সব জিনিস সংগ্রহের নেশা। তাই তাঁর কেবিনেট রুমে পাওয়া যায় রোমান সম্রাটদের আবক্ষ মূর্তি, জাবদা বইয়ের মতো বাঁধানো পুরনো পাণ্ডুলিপি, কাচের গ্লাস, বিভিন্ন তৈজস, বড় বড় ঝিনুকের খোল, নানা সাইজের ভাস্কর্যের ক্ষুদ্র সংস্করণ, ঝুলিয়ে রাখা পশুর চামড়া, বিভিন্ন দৈর্ঘ্যের বর্শা, বড় বড় ঝিনুক, স্টাফ করা প্রজাপতি ইত্যাদি।

বাড়ির বেশ বড়সড় রান্নাঘরে ঢুকলে মনে হয় মাত্র সেদিনও এখানে রান্নাবান্না হয়েছে। হাতা, কড়াই, খুন্তি এসব পরে জোগাড় করা হলেও প্লেট-বাটি ধোয়ার বহু ব্যবহারে ক্ষয়ে যাওয়া বেসিনটা পুরনো বাড়ির সিমেন্ট বাঁধানো কলতলার কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রাচীন রংচটা তৈজসগুলো থেকে এখনো যেন ছড়াচ্ছে রান্নাঘরের পরিচিত ঘ্রাণ। একটি বাড়ির অকপট পরিচিতি হচ্ছে সেই বাড়ির রান্নাঘর। ৩০০ বছরের পুরনো রান্নাঘরে ঢুকে যেন সেই ঘ্রাণটি পাওয়া যায়। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির রান্নাঘরে গিয়েও একই ধরনের ঘ্রাণ পেয়েছিলাম। তবে আমাদের দেশের হেঁশেলে রেমব্রান্টের বাড়ির মতো প্রশস্ত পরিসর থাকে না। এ বাড়িতে দেখছি রান্নাঘরেই ১০-১২ জন লোকের বসার মতো ডাইনিং টেবিল পাতার জায়গা রয়েছে। তামার ভাণ্ড, বড় ছোট নানা চেহারার বাটি, রুপার চামচ সাজিয়ে রাখা আছে, যাতে সে সময়কার একটা বিশ্বস্ত ছবি বোঝানো যায়। ফায়ার প্লেসের পাশে ছোট একটা চেয়ার, অডিও গাইড বলছে ওটা বেবি চেয়ার নয়, ওটা রাখা হতো যাতে বাড়ির রাঁধুনি বসে বসে স্যুপ নাড়তে পারে। রাঁধুনির ঘুমানোর জন্য রয়েছে পালকি আকৃতির খুপরির মতো খাট ও বিছানা। ওসব দেশের মেইডরা তো আর আমাদের দেশের কাজের মেয়েদের মতো রান্নাঘরের মেঝেতে মাদুর পেতে ঘুমায় না।

স্টুডিওতে ঢুকে মনে হলো শিল্পী কাজ অসমাপ্ত রেখে কিছুক্ষণের জন্য কোথাও বের হয়েছেন, আর সেই ফাঁকে আমাদের মতো দর্শকরা চুপিসারে ঢুকে পড়েছি সেখানে। হলরুমের মতো বিশাল ঘরটিতে ওলন্দাজ স্থাপত্য নকশামাফিক পেল্লায় সব জানালা, বাইরের উজ্জ্বল আলো এসে ভাসিয়ে দিচ্ছে ঘর। ঘরের এক মাথায় দাঁড় করানো ইজেল একটা বিশ্বাসযোগ্য রূপ দিয়েছে স্টুডিওটাকে। এই স্টুডিওতে বসেই রেমব্রান্ট ছবি এঁকেছেন ১৯ বছর। সেই সময়ের আদলে সাজানো ঘরে বহু পেইন্টিং, ছাপচিত্র এদিক-সেদিক ছড়ানো। অন্যদিকের ছোট এক কামরায় রাখা জাহাজের স্টিয়ারিংয়ের মতো বড় চাকা লাগানো ছাপচিত্রের প্রেস। এই প্রেসে রেমব্রান্ট তাঁর এচিং প্রিন্ট করতেন। তামার পাতের ওপর ছবি খোদাই করে সেটা থেকে ছাপচিত্রের কৌশল আবিষ্কার করেছিলেন তিনি। সেই তামার পাতের ওপর ভেজা কাগজ বিছিয়ে ছাপযন্ত্র দিয়ে ছাপ দিতেন কাগজে। পরে ছাপমারা সেই ভেজা কাগজ ধোয়া কাপড়ের মতো তারে ঝুলিয়ে শুকানো হতো। ওখানকার স্বেচ্ছাসেবকরা আমাদের ছাপচিত্রের কাজ করে দেখিয়ে দেন রেমব্রান্টের যুগে কিভাবে ছাপচিত্র তৈরি করা হতো। স্টুডিওর একপাশে এক তরুণী ঢাকার ফার্মগেটে স্ট্রিট ক্যানভাসারকে ঘিরে দাঁড়ানো দর্শকদের মতো একদল দর্শনার্থীকে বিভিন্ন রং ছেনে দেখিয়ে দিচ্ছিল তেল রং বানানোর কায়দা। মেয়েটির সামনে ছড়ানো কয়েক ডজন পটে নানা বর্ণের গুঁড়া, বড় দুটি বাটির একটিতে সিঁদুরের মতো লাল আরেকটাতে হলুদ গুঁড়ার মতো রং। সেখান থেকে রাজমিস্ত্রির কর্নিকের মতো ছোট চামচ দিয়ে আলতো করে রং তুলে নিয়ে পাথরের মসৃণ প্লেটে তেলের সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করে মেয়েটি দেখায় কিভাবে র্যামব্রান্টের সময় তেল রং তৈরি হতো। এসব কাজ মূলত রেমব্রান্টের নির্দেশে করতেন তাঁরই ছাত্ররা। রং তৈরির বর্ণনা দিতে দিতে হাত চলে মেয়েটির, মাঝেমধ্যে হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে অবাধ্য চুল ঠিক করতে গিয়ে চুলে-কপালে লেগে যায় ফাগের মতো রং, তার পোশাকেও রং-তুলি নিয়ে খেলতে যাওয়া বাচ্চাদের মতো নানা রঙের ছোপ লাগা। ঘরটি থেকে বেরিয়ে আসার সময় তাকে দেখতে গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানের বর বা কনের রং মাখানো বোনটির মতো মনে হয়।


মন্তব্য