kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভার্চুয়াল অ্যাকচুয়াল

স্বকৃত নোমান

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ভার্চুয়াল অ্যাকচুয়াল

অঙ্কন : মাহবুবুল হক

প্রকাশক বারবারই বলছিলেন, দেখেন আপা, বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। বাংলাদেশে বইয়ের বিজনেস আগের মতো নাই আর।

দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। হাতেগোনা কয়েকজন লেখকের ছাড়া আর কারো বই তেমন চলে না। আপনি আশ্চর্য হবেন জেনে, বিখ্যাত এক কবির বই পুরো ২৮ দিনের বইমেলায় বিক্রি হয়েছে মাত্র সাত কপি। আপনি তো নতুন। রিক্স নেওয়া ঠিক হবে না। দরকার হলে পরে আবার প্রিন্ট করা যাবে। আপাতত ৩০০ কপিই ছাপি, কী বলেন?

খুশিতে হাসবে, না রাগে ফুঁসবে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিল না লোপা। মুখে করুণার হাসি, চোখে বিস্ময়। বলে কী লোকটা! মাহমুদা লোপা কে, সে জানে? ইচ্ছা হয়েছিল মুখের ওপর বলে দিতে, মূর্খ কোথাকার! কষ্ট করে সংবরণ করেছে। ভাতের সঙ্গে কথাটাও গিলে ফেলেছে।

দোষ অবশ্য প্রকাশকেরও দেওয়া চলে না। দেশে তো কবি-সাহিত্যিকের অভাব নেই। ফেব্রুয়ারি এলে টের পাওয়া যায় লেখকের শুমার। বইমেলায় তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার বই বেরোয়। একেকজন লেখকের দু-চারটা করে। কারো কারো আবার ৩০-৪০টাও। এত এত লেখকের ভিড়ে মাহমুদা লোপাকে আলাদা করে চেনার তো কোনো উপায় নেই। তা ছাড়া প্রকাশক হিসেবে তিনি নতুন। একটা দৈনিকের প্রুফ রিডার ছিলেন। চাকরির পাশাপাশি বাড়তি ইনকামের জন্য বাইরের কাজও করতেন টুকটাক। যাকে বলে খেপ মারা। প্রুফে হাত ছিল মোটামুটি। বাংলাবাজারের প্রকাশকদের কাছ থেকে বছরে ২০-২৫টা পাণ্ডুলিপি পেতেন। ফর্মাপ্রতি দেড় শ করে মাসে হাজার সাত-আট আসত।

বিনা নোটিশে পত্রিকার চাকরিটা চলে গেল একদিন। পত্রিকার চাকরি এমনই, হুটহাট চলে যায়। যাঁরা প্রতিদিন মানবিকতার কথা লেখেন, বাস্তবে তাঁরাই সবচেয়ে বেশি অমানবিক। দুপুরে অফিসে ঢুকে নিজের ডেস্কে বসতে না বসতেই বিভাগীয় চিফ এসে বলে দিলেন, আপনাকে আর অফিসে আসতে হবে না। মাস শেষে সেলারি নিয়ে যাবেন এসে। এখন যান।

নতমুখে তিনি চলে এলেন। ওই কদিনের সেলারির জন্য আর যাননি। অনেক চেষ্টা করেছেন আরেকটা চাকরি জোগাড়ে। পেলেন না। সাত-আট মাস বেকার ঘোরাঘুরির পর চাকরি পেলেন বাংলাবাজারের এক নোট-গাইড প্রকাশনায়। প্রুফ রিডার। ১৫ হাজার টাকা সেলারি। দৈনিক ৮ ঘণ্টা ডিউটি। কখনো কখনো ১০-১১ ঘণ্টা।

দুই বছর চাকরিটা করার পর প্রকাশনা জগৎ সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা হলো তাঁর। ভেবেচিন্তে চাকরি ছেড়ে নিজেই নেমে পড়লেন প্রকাশনায়। প্রতিষ্ঠানের নাম রাখলেন ‘সূর্যতরু প্রকাশন’। নামটা জনৈক কবির দেওয়া। এক গ্রাফিকস ডিজাইনারকে দিয়ে একটা গোলাকার বৃত্তে সূর্য এঁকে তার চারদিকে দুখানা তরু বসিয়ে লোগোও বানিয়ে নিলেন একটা। প্রতিষ্ঠানের নামে ফেসবুকে একটা আইডিও খুললেন। বছর না ঘুরতেই আইডিটার ফ্রেন্ড সংখ্যা দাঁড়াল প্রায় আড়াই হাজার। বেশির ভাগই অলেখক, মানে আমজনতা, প্রকাশনা জগৎ সম্পর্কে যাদের কোনো ধারণা নেই। অখ্যাত কবি-সাহিত্যিকও আছেন কয়েকজন, ঘণ্টায় ঘণ্টায় যাঁরা একটা করে স্ট্যাটাস দেন এবং চান্স পেলেই আত্মপ্রচারে মেতে ওঠেন। বিখ্যাতদের তিনি চেনেন না। চিনলেও রিকোয়েস্ট পাঠালে তাঁরা একসেপ্ট করেন না।  

ফেসবুক সেলিব্রেটি ফ্রেন্ডদের মধ্যে অন্যতম একজন মাহমুদা লোপা, যার একটি ছবিতে লাইক পড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার। ভালো ছবি হলে চার হাজার ছাড়িয়ে যায়। সাধারণত ছবি ছাড়া অন্য কিছু সে পোস্ট দেয় না। সপ্তাহ বা ১০ দিনে একবার কবিতা। ছবির চেয়ে কবিতায় লাইক অবশ্য কম পড়ে। তাও সাত-আট শর কম নয়। শেয়ারও হয় শ-দেড় শ। কবিতার সঙ্গে নিজের একটা ছবি যুক্ত করে দিলে তো কথাই নেই, বৃষ্টির মতো লাইক পড়তে থাকে। আর পড়তে থাকে শয়ে শয়ে কমেন্ট। কিছু কমেন্টের নমুনা : ওয়াও! অসাধারণ! এগিয়ে যান। অভিনন্দন। বাংলা সাহিত্য আরেকটা উজ্জ্বল নক্ষত্র পেতে যাচ্ছে। চমত্কার! আপনাকে দিয়েই হবে। বন্ধু তালিকায় যোগ করলে ভালো লাগবে। এমন ভালো কবিতা আর পড়িনি। হেব্বি! এত সুন্দর লেখেন কী করে? আহা! এপিক, জাস্ট এপিক! ক্যামনে পারেন! মনটা ভরে গেল। চালিয়ে যান। দিন দিন আপনার ফ্যান হইয়া যাইতেসি, ব্রো! পুরাই মাথা নষ্ট অবস্থা! কবে যে আপনার মতো করে লিখতে পারব! জোস। ফেসবুকে আপনিই সেরা। জাক্কাস! আপনার কি কবিতার বই বেরিয়েছে? বাহ! বই বের করছেন না কেন? নাইস। একদিন আপনি অনেক বড় কবি হবেন। দারুণ! আপনার মতো ভালো কবিতা কজনে লিখতে পারে? লাইক ইট। শুভ কামনা।  

লোপা সাধারণত কোনো কমেন্টের রিপ্লাই দেন না। লাইকও না। সেলিব্রেটিদের দিতে নেই। দিলে ইমেজ কমে। দিলেও বেছে বেছে দেন। তাঁর মতো কোনো সেলিব্রেটি, মোটামুটি নামকরা কোনো কবি-লেখক বা রুলিং পার্টির কোনো নেতা কমেন্ট করলে লাইক না দিয়ে পারেন না। রিপ্লাইও দেন। যেমন সূর্যতরুর প্রকাশক। সেলিব্রেটি না হলেও প্রকাশক হিসেবে তাঁকে গুরুত্ব না দিয়ে পারে না। একবার তিনি কমেন্ট করলেন, ‘আপনার তো অনেক কবিতা জমা হয়েছে, একটা বই করছেন না কেন?’ সঙ্গে সঙ্গে লাইক। রিপ্লাইও। তবে কমেন্টবক্সে নয়, ইনবক্সে। লিখলেন, আমার বই কে বের করবে ভাই? প্রকাশক কোথায় পাব? দিন না একজন প্রকাশক ভাও করে।

আপনি রাজি থাকলে আমরাই আপনার বই করতে পারি।

বাহ! তাহলে তো খুব ভালো হয়।

তবে একটা শর্তে।

শর্ত! কী শর্ত?

দুই শ কপি বিক্রির নিশ্চয়তা দিতে হবে।

হা হা হা।

হাসছেন যে?

এমনি।

সত্যি বলছি, আপনি অনেক ভালো লেখেন। বই করলে খারাপ হবে না।

আমি তো করতে চাই।

তাহলে আর দেরি কেন? পাণ্ডুলিপি রেডি করেন। আগামী মেলায়ই বের হয়ে যাক, কী বলেন?

ওকে। আমি কিন্তু সিরিয়াস।

আমরাও।

ওকে। ডান।

মাসখানেকের মধ্যে প্রায় পৌনে দুই শ কবিতা থেকে বাছাই করে ৮০টা কবিতা দিয়ে ৯৬ পৃষ্ঠার একটা পাণ্ডুলিপি রেডি করে ফেললেন লোপা। বেশির ভাগ কবিতাই এক পৃষ্ঠার। অল্প কিছু আছে দেড়-দুই পৃষ্ঠার। বাছাই করা কবিতাগুলো তাঁর খুবই প্রিয়। তাঁর জানামতে এত ভালো কবিতা সমকালীন কবিদের কেউ লিখতে পারেন না। একটা কবিতার নমুনা : আমি একাকী যমুনার পাড়ে বসে/অপার লীলাময় প্রকৃতির সৌন্দর্য/উপভোগ করছি চিত্তের হরষে/নদীর বুকে মাছরাঙা আর গাঙচিলেরা খেলা করিতেছিল/এ অপার সৌন্দর্য অবলোকনে আমার/চোখযুগলে গভীর তন্ময়তা ভেসে এলো/কোলাহল করে পাখিগুলো নদীর কূলে কূলে/দলবেঁধে ঝাঁকে ঝাঁকে নীড়ে ফিরছে/তারি সাথে সাথে লাল সূর্যের টুকরাগুলো/কি অপরূপ ঝিলিক মারতেছে...।

এটা তার অন্যতম একটা প্রিয় কবিতা। কবিতাটা যেদিন ফেসবুকে পোস্ট করলেন, এক ঘণ্টার মধ্যে লাইক পড়ল সাড়ে ৭০০ এবং কমেন্ট ৮৬টা। কবিতার শেষে ব্রাকেটের মধ্যে ছোট্ট একটা ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন : জীবনে এত ভালো কবিতা আমি আর লিখিনি। এটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ কবিতা। বাংলা কবিতায় এটা একটা উল্লেখযোগ্য সংযোজন বলে আমি মনে করি।

পাণ্ডুলিপি তো রেডি, কিন্তু নাম খুঁজে পাচ্ছিলেন না ঠিক। এমন একটা নাম দিতে হবে পাঠকদের, যেটা সহজে আকর্ষণ করবে। একটু প্রেম, একটু বিরহের ব্যাপার থাকতে হবে। অনেক ভেবেচিন্তে নাম একটা খুঁজে পেলেন : তুমি যেখানে প্রিয়। কবিতার বইয়ের নাম হিসেবে এটা কেমন, মতামত চাইলেন ফেসবুক ফ্রেন্ডদের। দু-একজন ছাড়া প্রায় সবার একই মন্তব্য : অসাধারণ! জাক্কাস! অপূর্ব!

বিপুল সমর্থন পেয়ে নামটা চূড়ান্ত করে ফেললেন তিনি। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পাণ্ডুলিপি মেইল করে দিলেন প্রকাশককে। দিন দশেকের মধ্যে প্রচ্ছদও হয়ে গেল। প্রচ্ছদ আঁকলেন জনৈক উদীয়মান শিল্পী। ঠিক আঁকলেন নয়, আসলে বানালেন। কিছু পেঁজাতুলো মেঘ, পাখির একটা ভাঙা ডানা এবং জনৈক সুন্দরীর মুখের একাংশ দিয়ে দৃষ্টিনন্দন একটা প্রচ্ছদ তিনি বানালেন।

পাণ্ডুলিপি প্রেসে তোলার আগে ফাইনালি একবার চেক দেওয়ার জন্য বাংলাবাজার গেলেন লোপা। প্রকাশক তাঁকে ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিংয়ে লাঞ্চ করালেন। আরো কয়েকজন প্রকাশকের সঙ্গে আলাপ-পরিচয় করিয়ে দিলেন। খেতে খেতে প্রকাশক জানতে চাইলেন, কত কপি ছাপব আপা?

লোপা বললেন, আপাতত দুই হাজার কপি।

খিক করে হেসে দিলেন প্রকাশক। কয়েকটা ভাত ছিটকে পড়ল মুখ থেকে।

হাসছেন যে?

কবিতার বই এত বেশি কেউ ছাপে আপা?

কেন! কী হবে ছাপলে? আপনি কত ছাপতে চান?

বড়জোর ৩০০।

কী আশ্চর্য! এসব কী বলছেন আপনি? জানেন আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড আর ফলোয়ারের সংখ্যা কত? প্রত্যেকে এক কপি করে কিনলে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার বই লাগবে।

না আপা, আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বললেন প্রকাশক। কেন সম্ভব নয়, অনেক যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু কোনো বুঝই মানতে নারাজ লোপা। শেষে বিরক্ত প্রকাশক বললেন, চার হাজার বই ছাপতে অনেক খরচ পড়বে। ইনভেস্ট করার মতো এত টাকা আমার হাতে নেই এখন। ৪০টা বই করছি এই বছর। এমনিতেই প্রচুর টাকা খরচ হয়ে গেছে।

বই বিক্রি হলে মেলায়ই তো আপনার খরচ উঠে যাবে। চিন্তা কী?

এত সোজা না আপা।

খাওয়া শেষে টিস্যুতে হাত মুছতে মুছতে লোপা বললেন, ওকে। আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি এক হাজার কপি ছাপেন। বিক্রি না হলে সব কটি আমি কিনে নেব। ওকে?

প্রকাশক কি আর অমত করেন? খুশিতে বরং আটখানা। একে একটা বড় দাঁও মারা হিসেবে দেখলেন তিনি। এত বড় সুযোগ প্রকাশকজীবনে আর আসেনি। এক হাজার কপির দাম কমিশন বাদ দিয়ে ১২০ করে এক লাখ ২০ হাজার টাকা। নিট লাভ থাকবে সত্তর হাজার। আনন্দের আতিশয্যে তরুণ কবি হিসেবে মাহমুদা লোপার প্রশংসা করে একেবারে ভাসিয়ে দিলেন।

মেলার তৃতীয় দিনেই বইটি স্টলে এলো। প্রকাশকের ইচ্ছা ছিল আরো দু-চার দিন পরে আনার। বাঁধাইটা এখনো ভালোভাবে শুকায়নি। কিন্তু লেখকের অব্যাহত তাগাদায় রীতিমতো বিরক্ত হয়ে ১০টা কপি না এনে পারলেন না। খবর পেয়ে সেদিন বিকেলে প্রচ্ছদটি ফেসবুকে দ্বিতীয়বারের মতো পোস্ট দিলেন লোপা। লাইক পড়ল সাড়ে তিন হাজার এবং কমেন্ট এক হাজার ৪০০। বেশির ভাগ কমেন্টই অভিনন্দন আর বই সংগ্রহের প্রতিশ্রুতি। এত এত লাইক কমেন্ট দেখতে দেখতে সেদিন বিউটি বোর্ডিংয়ে খেতে খেতে লোপার মুখে করুণার যে হাসিটা ঝুলেছিল সেটা আবারও ঝুলতে লাগল। আরো প্রসারিত হয়ে। একবার ভাবলেন প্রকাশককে ফোন করে বলতে, একটাবার ফেসবুকে ঢুকে দেখেন আমার পাঠকের সংখ্যা কত। এক হাজার কপি ১০ দিনেই ফুরিয়ে যাবে, বুঝলেন? আপনি বরং আরো এক হাজার ছাপার ব্যবস্থা করেন। কী ভেবে ফোন আর দিলেন না। এক সপ্তাহ যাক, তারপর না হয় বই রিপ্রিন্টের কথা বলা যাবে।

শুক্রবার ছিল সেদিন। মেলার পঞ্চম দিন। ইউনিভার্সিটির এক বান্ধবীকে নিয়ে মেলায় এলেন লোপা। বাসা থেকে বেরোনোর সময় ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছিলেন : ‘মেলায় যাচ্ছি। থাকব ১৭২ নম্বর সূর্যতরুর স্টলে। দেখা হবে বন্ধুরা। ’ স্টলের সামনে এসে ফেসবুক লগইন করে দেখল লাইক পড়েছে এক হাজার ৩০০, আর কমেন্ট আড়াই শ। ওয়াও! হর্ষধ্বনি দিয়ে উঠলেন তিনি। আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠা মুখটার দিকে তাকিয়ে বান্ধবীটার মনে হলো, লোপার বয়স ১০ বছর কমে আঠারোতে ঠেকেছে।

প্রথম বইটা কিনল বান্ধবী। অটোগ্রাফের জন্য বাড়িয়ে দিল লোপার দিকে। ফেসবুক লগআউট করে আইফোনটা তাঁর হাতে দিয়ে একটা ছবি তুলতে বললেন লোপা। জীবনে প্রথম অটোগ্রাফ দেবেন, ছবি না তুললে হয়! অটোগ্রাফ দেওয়ার সময় চোখে প্রায় জল এসে যাচ্ছিল তাঁর।

ছবিটা ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার পর তো রীতিমতো তুলকালাম কাণ্ড। লাইক আর লাইক। কমেন্ট আর কমেন্ট। এত লাইক-কমেন্ট আগে কখনো পড়েনি। রাত সাড়ে ১১টার দিকে প্রকাশককে ফোন করে বললেন, আগামী শুক্রবার যেন সবকটি বই স্টলে রাখা হয়। তাঁর ফ্রেন্ডদের অনেকেই সেদিন মেলায় আসবে। প্রকাশক হাসতে হাসতে বললেন, টেনশন নিয়েন না আপা। বই দেওয়া যাবে।

সেদিন সন্ধ্যায় এক আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল বলে মেলায় যেতে পারলেন না লোপা। রাত সাড়ে ৮টায় প্রকাশককে ফোন দিলেন। ফোন ধরলেন না প্রকাশক। আবার ডায়াল করলেন। তবু না। গুনে গুনে পাঁচবার ডায়ালের পর রিসিভ করলেন প্রকাশক। কত কপি বই বিক্রি হলো আজ, জানতে চাইলেন লোপা। প্রকাশক হাসতে হাসতে বললেন, কই আপা, আপনার বন্ধুরা তো কেউ এলো না।

লোপা তো তবদা! তিনি আসতে পারেননি বলে তাঁর বন্ধুদের কেউ আসবে না এমন তো হওয়ার কথা নয়। নিশ্চয়ই মিথ্যে বলছেন প্রকাশক। লেখকদের সঙ্গে প্রকাশকদের ছলচাতুরির কথা তিনি শুনেছেন। প্রকাশক সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, মেলা তো মাত্র শুরু। ১৫ তারিখের আগে মেলা ঠিক জমেও না। দেখা যাক কী হয়।

মেলার ২৫ দিন কেটে গেল। সপ্তাহে দুদিন করে মেলায় এসেছেন লোপা। অটোগ্রাফও দিয়েছে কয়েকটা। ক্রেতারা তাঁর ফেসবুক ফ্রেন্ড। প্রত্যেকের সঙ্গে ছবি তুলে আলাদা আলাদা পোস্ট দিয়েছেন। যথারীতি লাইক কমেন্ট পড়েছে বিস্তর।

মেলার ২৭তম দিন ছিল সেদিন। বিকেল ৩টা থেকে স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে লোপা। মানুষ আর মানুষ। ধুলাবালিতে একাকার। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে পায়ে ব্যথা ধরে গেছে। অতিষ্ঠ হয়ে সাড়ে ৫টার দিকে উদ্যান থেকে বেরিয়ে বাংলা একাডেমির মাঠে গেলেন। বহেরাতলার বেদিতে একাকী বসে থাকলেন কিছুক্ষণ। মন সায় দিচ্ছিল না আবার উদ্যানের মেলায় ঢুকতে। এত ভিড়ের মধ্যে তিষ্টানো যায়! কয়েকজন কবি-লেখকের সঙ্গে দেখা হলো, যাঁদের সঙ্গে ইনবক্সে আলাপ হয় মাঝেমধ্যে। প্রত্যেককে অটোগ্রাফসহ নিজের বইটি গিফট করলেন। কেন্টিনে গিয়ে একজনের সঙ্গে কফিও খেলেন।

আড্ডায় আড্ডায় বেজে গেল রাত সাড়ে ৮টা। এবার বাসায় ফেরা দরকার। স্টলে গিয়ে প্রকাশকের সঙ্গে দেখা করার কথা ভাবলেন, কিন্তু গেটে ভিড় দেখে মন সায় দিল না।

ঠিক তখনই প্রকাশকের ফোন, আপা কই আপনে?

আমি তো গেটের সামনে।

ভেতরে আসেন।

আজ আর না ঢুকি। কাল দেখা হবে।

আরে আসেন তো। চা খাব একসঙ্গে।

ভিড় ঠেলে কোনোমতে ঢুকে পড়লেন ভেতরে। স্টলের সামনে গিয়ে যখন দাঁড়ালেন সময় তখন ৮টা ২৫। মেলা বন্ধ হওয়ার পাঁচ মিনিট বাকি। তাঁকে দেখে স্টল থেকে বেরিয়ে এলেন প্রকাশক। লোপা বললেন, কী খবর বলেন তো ভাই। কেমন বিক্রি হচ্ছে?

মেলা শেষ হোক, তারপর না হয় শুনবেন।

বলেন না এখন শুনি। কী হবে বললে? রিপ্রিন্ট করতে হবে নিশ্চয়ই?

রিপ্রিন্ট! হাসলেন প্রকাশক। কত কপি বিক্রি হয়েছে শুনবেন?

কত?

সতের কপি। হে হে হে।

সহসা মেলার মাঠজুড়ে আধো অন্ধকার নেমে এলো। মেলার নিয়ম এমনই, সময় শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সব লাইট অফ হয়ে যাবে। লোপা ভাবলেন, ভালোই হয়েছে। আধো অন্ধকারে তাঁর লাল হয়ে যাওয়া মুখটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন না প্রকাশক। গেট দিয়ে বেরোনোর সময়ও তাঁকে কেউ চিনতে পারবে না। বাসা থেকে জরুরি ফোন আসার কথা বলে প্রকাশকের কাছ থেকে বিদায় নিলেন তিনি। পার্স থেকে একটা টিস্যু বের করে ঘাড় ও কপালের ঘাম মুছতে মুছতে ফুটপাত ধরে টিএসসির দিকে দ্রুতপায়ে হাঁটতে লাগলেন।


মন্তব্য