kalerkantho


আ প ন ক থা

অন্যদের লেখা প্রশংসা করতে শেখো

পূরবী বসু

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



অন্যদের লেখা প্রশংসা করতে শেখো

আমার লেখালেখির শুরু চতুর্থ শ্রেণিতে পড়াকালে। তখন একটি হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকায় আমার একটি গোয়েন্দা গল্প প্রকাশিত হয়। তারপর থেকে মাঝেমধ্যে লিখতাম দৈনিক পত্রিকার ছোটদের পাতায়। যেমন—কচিকাঁচার আসর, সাত ভাই চম্পা, খেলাঘর। এমনি করে আস্তে আস্তে একটু-আধটু বড়দের কাগজে, ম্যাগাজিনে লেখা শুরু করি। ছোটবেলায় লেখালেখিতে বাবার উৎসাহ পেয়েছি। ১৯ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর পরিবার থেকে আমার লেখার ব্যাপারে জ্যোতি (জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত) ছাড়া যার সবচেয়ে বেশি আগ্রহ ও উৎসাহ পেয়েছি, সে আমার বড় বোনের বড় ছেলে অলক কুমার মিত্র। জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের মতো শক্তিশালী গল্প লেখকের সঙ্গে আমার বিয়ে এবং তা অতি অল্প বয়সে। আমার তখন ১৮ বছর বয়স। সত্যি বলতে গেলে, সাহিত্যচর্চার কথা বলতে গেলে স্বীকার করতেই হয়, আমি জ্যোতির কাছে, জ্যোতির সঙ্গেই বেড়ে উঠেছি, যদিও আমার লেখার ঢং তার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। সে ধৈর্য সহকারে আমার ভালো-মন্দ প্রায় সব লেখাই সমান উৎসাহে পড়ে। তবে কখনো কোনো লেখার সরাসরি বিরূপ সমালোচনা করে না। পরিবর্তন বা পুনর্লিখনের ব্যাপারেও উৎসাহ দেয় না বা নিবৃত্ত করে না। আরো ভালো লেখার জন্য কী করতে পারি সে সম্পর্কে কোনো ধারণা দেয় না। বলে, আমি একজন স্বতন্ত্র লেখক। পাঠকরাই আমার মূল্যায়ন করবে। লেখক-পাঠকের মাঝখানে সে ঢুকতে চায় না। তবে মুখে কিছু না বললেও ওর চোখ-মুখের অভিব্যক্তি, সুনির্বাচিত শব্দ ব্যবহারে আমি টের পেতাম, এখনো পাই, গল্পটা  কেমন হয়েছে।

সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় লিখলেও আমি গল্প ও প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। আমি তেমন গল্প লিখতে চাই, যে গল্প পাঠ শুরু করে শেষ করতে সাধারণ পাঠক আগ্রহী হবেন। তার মানে লেখাটা মোটামুটি সুখপাঠ্য হবে। কিন্তু একবার পড়ে যা মনে হলো, দ্বিতীয়বার পড়লে বা বেশি মনোযোগ দিয়ে পড়লে তার চেয়ে বেশি কিছু আবিষ্কার করা যাবে অথবা সেখানে নতুন কিছু উন্মোচিত হবে। মনে হবে গল্পগুলো সব সময় এক রৈখিক না হয়ে বহুমাত্রিক বা বহুকৌণিক গল্প হলে ভালো হয়। যেখানে সাদামাটা কাহিনীর অন্তরালে লুকিয়ে থাকে কিছু মোচড় বা বাঁক, মানে আরেক গল্প—অন্য কোনো কথা। এ রকম বহু স্তরের বা বহুমাত্রিক গল্প কিন্তু পড়তে সহজ-সরল। এমন বহুমাত্রিক গল্প লেখাই আমার পরম আরাধ্য। সতর্ক পাঠক অবশ্য প্রাথমিক পাঠেই বহুমাত্রিক গল্পের সেই স্তরের বা মাত্রার বিন্যাস টের পান। তবে এক রৈখিক ভালো গল্প যে হয় না, তা নয়। আমি খুব সহজ বাক্য গঠনে, অতি পরিচিত শব্দ ব্যবহারে, ভণীতাহীন গল্প লিখতে চাই। পড়তে ঝরঝরে ও সহজ, সুখপাঠ্য লাগবে। কিন্তু তার ভেতর লুকিয়ে থাকবে আরো কিছু মালমসলা, যা ধরতে না পারলেও গল্পপাঠের আস্বাদন থেকে বঞ্চিত হবেন না পাঠক।   ধরতে পারলে আরো বেশি আকর্ষণীয় মনে হবে।

লেখার পাশাপাশি আমি প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু পড়তে চেষ্টা করি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতি ভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সমরেশ বসু, কবিতা সিংহ, মৈত্রেয়ী দেবী, হাসান আজিজুল হক, সৈয়দ শামসুল হক, জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শামসুর রাহমান, বুদ্ধদেব বসু, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, অসীম রায়; আর রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও জীবনানন্দের লেখাগুলো বারবার পড়ি। পুতুল নাচের ইতিকথা, পদ্মা নদীর মাঝি, উত্তরঙ্গ, জগদ্দল, বিবর, গোপাল দেব, গল্পগুচ্ছ আমার প্রিয় বই।

আজকাল বেশ কয়েকজন তরুণ লেখক ভালো গল্প লিখছেন। এটা খুব আনন্দের ব্যাপার আমার জন্য যে এই নতুন প্রজন্ম কথাসাহিত্যের দিকে ঝুঁকছে তুলনামূলক বেশি। এটা আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ। সঠিক না-ও হতে পারে।

তরুণদের উদ্দেশে বলব, অনেক অনেক পড়াশোনা করো। স্বদেশের ও বিদেশি সাহিত্য সাম্প্রতিক—ক্লাসিক উভয়ই। একটি লেখা লিখে মনমতো না হলে আবার লেখো। আজকের কম্পিউটারের যুগে পুনর্লিখন ও সম্পাদনা তো খুব সহজ। আর বই ছাপানোর জন্য বেশি তাড়াহুড়া করো না। অন্যদের লেখা প্রশংসা করতে শেখো।

অনুলিখন : মুহাম্মদ ফরিদ হাসান


মন্তব্য