kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিত্ত নয়, মানুষ জমাতে চেয়ে কবি

মাহমুদ শাওন

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বিত্ত নয়, মানুষ জমাতে চেয়ে কবি

শুধু বাংলায় নয়, সারা পৃথিবীতেই গত শতকের ছয়ের দশক শিল্প-সাহিত্য ও সংগীতে উন্মাতাল এক সময়। তখন পৃথিবী যেন প্রতিভাবান উন্মাদদের ইচ্ছাধীন।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যালেন গিনসবার্গ, কর্সো, ফালেেগত্তি, ফিলিপ ল্যামান্তিয়ারদের হাতে ‘বিট জেনারেশন’—তাদের আক্ষেপ ও ধিক্কারজনিত কোলাহল; অন্যদিকে টম গানের নেতৃত্বে ব্রিটেনে দানা বাঁধছে ‘অ্যাংরি জেনারেশন’-এর অসংবৃত উচ্ছ্বাস, ক্রুদ্ধ আন্দোলন। থেমে নেই পশ্চিমবঙ্গ। কলকাতায় মলয় রায়চৌধুরীর নেতৃত্বে দেবী রায়, সুবিমল বসাক, বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ কবির সমন্বয়ে গড়ে ওঠে ‘হাংরি জেনারেশন’ এবং তাদের মেটাফিজিক্যাল ক্ষুধার আর্তচিত্কার ও বিশৃঙ্খলা। এ সব কিছুর রেশ যে তত্কালীন পূর্ববঙ্গেও ছড়িয়ে পড়বে, তা যেন নির্ধারিতই ছিল। সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত ‘কণ্ঠস্বর’, রফিক আজাদ সম্পাদিত ‘স্বাক্ষর’, ফারুক সিদ্দিকী সম্পাদিত ‘বিপ্রতীক’ ইত্যাদি লিটল ম্যাগাজিনের মাধ্যমে ষাটের দশকের তত্কালীন কবিরা নতুন চেতনা, নতুন সাহিত্য বিনির্মাণে ছিলেন উচ্ছল, দ্রোহী। কবিতার সেই পালাবদলে ছয়ের দশকের কতজন কবিই না নেতৃত্ব দিয়েছেন! উনিশ শতকের পৃথিবীর ছয়ের দশক আর এই ভূখণ্ডের ছয়ের দশক সৃষ্টিশীল, নতুনত্ব সন্ধানের প্রচেষ্টাগত কৌশলে, উন্মাতালে মিল থাকলেও, সচেতন বা অবচেতনের অমিল ছিল অন্য জায়গায়। আর তা হলো ‘রাজনীতি’। ছয়ের কবিরা সেই প্রজন্ম, যারা প্রত্যেকে বুকে রাখে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের স্বপ্ন। দ্রোহে, প্রেমে, বিরহে ‘বাংলা’ই এসেছে বারবার। এ অঞ্চলের মানুষের ‘স্বাধীনতা’ আর ‘স্বপ্ন’—এ দুই-ই ছিল তাঁদের সচেতন ও অবচেতনের ভাষা।

সেই ছয়ের দশকের একজন কবি হেলাল হাফিজ। মাত্র দেড়খানা (!) বই তাঁর। ৫৬টি কবিতা নিয়ে ১৯৮৬ সালে প্রকাশ পায় ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। এর ২৬ বছর পর, ২০১২ সালে প্রথম বইয়ের কবিতার সঙ্গে মাত্র ১৫টি কবিতা নিয়ে প্রকাশ পায় ‘কবিতা একাত্তর’ নামে আরেকটি বই। সন্দেহ নেই, তাঁর সমসাময়িক তো বটেই, বাংলা ভাষার আর কোনো কবিই এত কম কবিতা লেখেননি। কিন্তু পাঠকপ্রিয়তায়, কিংবদন্তিতে তাঁর সমকক্ষ দ্বিতীয়জন সারা পৃথিবীতেই পাওয়া যাবে না। ভাবা যায়, আটের দশকের মাঝামাঝি প্রকাশিত ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র ৫৬টি কবিতা বিগত ৩০ বছর ধরে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই জনপদকে প্রভাবিত করে চলেছে! আজও পাঠক সেই বই কেনেন বলেই ২৬তম সংস্করণ (বৈধ) এখন বাজারে। আর অবৈধ সংস্করণের সংখ্যার কোনো হিসাবই নেই।

ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান তখন তুঙ্গে। এর আঁচ এড়াতে পারেন কোন সংবেদনশীল মানুষ? কবি হেলাল হাফিজও পারেননি। যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার সশস্ত্র ডাক দিলেন কবি।

‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। /মিছিলের সব হাত/ কণ্ঠ/ পা এক নয়। /...শাশ্বত শান্তির যারা তারাও যুদ্ধে আসে/ অবশ্য আসতে হয়/মাঝে মধ্যে/ অস্তিত্বের প্রগাঢ় আহ্বানে,/ কেউ আবার যুদ্ধবাজ হয়ে যায় মোহরের প্রিয় প্রলোভনে। /কোনো কোনো প্রেম আছে প্রেমিককে খুনি হতে হয়। /যদি কেউ ভালোবেসে খুনি হতে চান/তাই হয়ে যান/উত্কৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়। /এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়। ’—নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়

এই কবিতা প্রকাশের পর পুরোটাই ইতিহাস। এমন কোনো শিক্ষিত মানুষ নেই, যাঁরা এই কবিতার প্রথম দুই পঙিক্তর কথা জানেন না। একবার আমাকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে কবি হেলাল হাফিজ বলেছিলেন, কিভাবে এই কবিতার লাইনগুলো মানুষের কাছে পৌঁছে। কিভাবে উদ্বুদ্ধ করে বাঙালিকে। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে এটা রচিত এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’ এই পঙিক্তগুলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে উত্কীর্ণ ছিল। তখনো কিন্তু এটা সারা দেশে ছড়ায়নি।  

মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ যখন স্বাধীন হলো, ১৯৭২ থেকে ধীরে ধীরে এই কবিতা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। এটা কেন ছড়াল, এটা কি তখনকার শাসকদের ব্যর্থতার জন্য, নাকি তাদের কোনো নিপীড়ন-নিষ্পেশনের কারণে, নাকি মানুষ স্বপ্নভঙ্গের বেদনা প্রশমিত করার জন্য এটা ব্যবহার করত—জানি না। বিশেষ করে, তখন আন্ডার গ্রাউন্ড রাজনৈতিক দল অর্থাৎ বাম রাজনৈতিক দলগুলো এই কবিতাটিকে তাদের একেবারে সূচনা সংগীতের মতো ‘সূচনা কাব্য’ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে। যৌবনের ‘চিরধর্ম’ কী অপার মহিমায় উত্কীর্ণ হয়ে আছে তাঁর এই কবিতায়। এই মহিমা কোনো দিন ম্লান হওয়ার নয়।

কবি হেলাল হাফিজের পুরো জীবনটাই কবিতাময়। ছয়ের দশকের সেই উদ্ভ্রান্ত, উন্মাতাল সময়ের এক যোগ্য প্রতিনিধিই তিনি। মাতৃহীনতার বেদনা নিয়ে কবিতা লিখতে এসে যে জীবন তিনি যাপন করেছেন, তা লিখতে গেলে আস্ত উপন্যাস হয়ে যাবে। কী করেননি তিনি! ১৯৭২ সালে ‘দৈনিক পূর্বদেশ’-এ, সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ শুরু করেন। পঁচাত্তরে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে গেলে সরকারি চাকরির সুযোগ পেয়েও যোগ দেননি। তিনি জুয়াকে পেশা হিসেবে নিলেন। কবি আমাকে বলেছিলেন, ‘তখন বিচিত্র জীবনের মধ্যে ঢুকে গেলাম। সেটা হলো, আমি তখন বেশ কয়েক বছর জুয়া খেলে জীবিকা নির্বাহ করেছি। অর্থাৎ তাস খেলে। এবং আমার ভাগ্য এত ভালো ছিল যে প্রায় প্রতিদিনই জিততাম। ফলে আমার অর্থের কোনো অভাব হতো না। পত্রিকা অফিসে যে বেতন পেতাম তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল উপার্জন। এভাবে কয়েক বছর বেকার থাকার পর ১৯৭৮ সালে ‘দৈনিক দেশ’ নামে আরেকটা কাগজ বেরোল। তারা আমাকে ডাকল ওই পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে। সেখানে আমি কাজে যোগ দিলাম, কিন্তু তাস খেলা ছাড়তে পারলাম না। একই সঙ্গে চাকরিও করেছি, জুয়াও খেলেছি। তখন লেখালেখিজগতে যাঁরা ছিলেন বা যাঁরা আমাকে চিনতেন, তাঁরা সবাই জানতেন যে আমি একজন নামকরা কবিই শুধু নই, নামকরা জুয়াড়িও বটে! তো এটা আমাকে কখনো অস্বস্তিতে ফেলেনি। ’ এমনই অকপট কবি হেলাল হাফিজ। কখনো রূপকথার গল্পের কোনো মনোযোগী চরিত্র। কখনো উধাও, আবার কখনো হঠাৎ উদিত নক্ষত্রটি, উজ্জ্বল। জন্ম ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর, নেত্রকোনা জেলার বড়তলী গ্রামে। ব্যক্তিজীবনে চিরকুমার রয়ে গেছেন। ২০১৩ সালে একটি নতুন কবিতার বই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’ প্রকাশের আগ্রহের কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু ২০১৬-তে এসেও বইটির জন্য পর্যাপ্ত কবিতা লিখতে পারেননি। কবি জানান, ‘এখনো ২৬টি কবিতা লিখতে হবে। বাম চোখ প্রায় গেছে। ডান চোখেও কম দেখছি। ’

কবি বলেন, ‘সবাই জমায় টাকা, আমি চাই মানুষ জমাতে’। অর্থবিত্তের কাঙাল তিনি নন। শুধু মানুষের ভালোবাসা চেয়েছেন কবি হেলাল হাফিজ। পেয়েছেনও মুঠো ভরে। সামান্য কয়েকটি কবিতা দিয়ে, দশকের পর দশক মানুষ জমিয়ে রেখেছেন। জমাবেন আগামীতেও। শুভ জন্মদিন, কবিতার রাজপুত্র, কবি হেলাল হাফিজ।


মন্তব্য