kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এ বছর সাহিত্যে নোবেল পাচ্ছেন কে?

শরীফ আতিক-উজ-জামান

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



এ বছর সাহিত্যে নোবেল পাচ্ছেন কে?

প্রতিবছর আগস্ট মাস এলেই সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ী নিয়ে সাহিত্যপ্রেমীদের মাঝে জল্পনাকল্পনা শুরু হয়ে যায়। অনলাইনেও পাঠকরা পছন্দের লেখকের পক্ষে জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করে থাকেন।

ব্রিটিশ বেটিং হাউস ল্যাডব্রোকস বা অ্যালেক্স ডোনাহিউ বিশেষ লেখকের পক্ষে বাজি ধরে। কখনো কখনো তা মিলেও যায়। যেমন—গত বছর ল্যাডব্রোকস ইউক্রেনের লেখক সভেতলানা এলেক্সিয়েভিচের পক্ষে বাজি ধরেছিল। তিনি নোবেল পেয়েছিলেন। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ ও চেরনোবিল বিপর্যয় নিয়ে লেখা Zinky Boys I Voices from Chernobyl এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রসঙ্গে লেখা War’s Unwomanly Face তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিতি এনে দিলেও তার ব্যাপক ব্যাপ্তি ছিল বলা চলে না। ২০১৪ সালে প্রথম তাঁর হয়ে Ural Federal University নোবেল কমিটির কাছে মনোনয়ন দাখিল করে। সেবার তেমন কোনো সম্ভাবনা জাগাতে না পারলেও গতবার বাজির দরে একেবারে শীর্ষে অবস্থান নিয়ে দ্বিতীয় বছরই তিনি নোবেল জিতে নেন, যা বেশ ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত। ২০১২ সালে জাপানের হারুকি মুরাকামি সম্ভাব্য বিজয়ী তালিকার ১ নম্বরে ছিলেন। ওই বছর তিনি হেরেছিলেন চীনা ঔপন্যাসিক মো ইয়ানের কাছে, যাঁর লেখা বিশ্বের অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আমেরিকার পাঠকদের কাছে তিনি একটি পরিচিত নাম। আর এ ক্ষেত্রে তিনি মুরাকামির চেয়ে এগিয়ে ছিলেন। আমেরিকার পাঠকদের সঙ্গে কম পরিচয় থাকার বিষয়টি মুরাকামির নোবেল পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হতে পারে বলে ব্রিটিশ বেটিং হাউস ল্যাডব্রোকস তখন মন্তব্য করেছিল। তাদের আশঙ্কা সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। গত তিন বছর তিনি বেশ পিছিয়ে ছিলেন, কিন্তু এ বছর তাঁকে নিয়েই বাজি ধরছে ল্যাডব্রোকস। তাঁর সাম্প্রতিক উপন্যাস 1Q84 ও Tsukuru Tazaki তাঁকে আরো বেশি করে এগিয়ে রাখছে। 1Q84 উপন্যাসের একটি কেন্দ্রীয় চরিত্র তাঁর বাল্যস্মৃতি দ্বারা তাড়িত হয়। নিজের বাল্যস্মৃতির ঘোর তাঁর কাটতে চায় না। তিনি এক স্থানে উল্লেখ করেছেন যে তিন বছর বয়সের সময় বাড়ির সদর দরজা দিয়ে বের হয়ে বড় রাস্তা পেরিয়ে গভীর এক নর্দমায় গিয়ে পড়লেন। জলের তোড় তাঁকে ভাসিয়ে দীর্ঘ এক অন্ধকার টানেলের মুখে নিয়ে ফেলল। ভয়ংকর অন্ধকার সেই টানেলের মধ্যে চলে যাওয়ার আগমুহূর্তে তাঁর মা তাঁকে উদ্ধার করেন। জলের হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডা আর ভয়ধরানো অন্ধকার তাঁকে সারা জীবন তাড়া করে ফিরেছে। সেই থেকে অন্ধকারের প্রতি তাঁর বিশেষ এক আকর্ষণ। বাল্যস্মৃতিকাতরতা তাঁর লেখনীর বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য। তাঁর চরিত্ররা সব সময় অপরিচিত এক জগতের সঙ্গে বোঝাপড়ায় ব্যস্ত থাকে। তাঁর বই পৃথিবীর অনেক ভাষায় অনূদিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর খ্যাতি বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে। ১৯৯৪ সালে কেনজাবুরো ওয়ে জাপানি লেখক হিসেবে শেষবার নোবেল পুরস্কার জিতেছিলেন। মুরাকামির হাত ধরে তা আবার জাপানে ফিরে আসতে পারে বলে অনেকে মনে করছেন।

দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন আমেরিকার ফিলিপ রথ। ৮২ বছর বয়সী ঔপন্যাসিক রথ Goodbye, Columbus, Nemesis-এর মতো বিখ্যাত উপন্যাসের লেখক। তিনি আমেরিকান ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড, ফকনার প্রাইজ, পুলিত্জার প্রাইজ, কাফকা প্রাইজের মতো সম্মানজনক সব পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। নোবেলের জোরালো দাবিদার তিনি, কিন্তু ৪ নম্বরে থাকা ৭৭ বছর বয়সী আরেক ন্যাশনাল বুক অ্যাওয়ার্ড পাওয়া ক্যারোল ওটসকে নিয়েও অনেকে স্বপ্ন দেখছেন। তিনি একজন অতিপ্রজ লেখিকা। ৫৬টি উপন্যাস, ৩২টি ছোটগল্পের সংকলন, আটটি কাব্যগ্রন্থসহ আরো অনেক প্রকাশনা রয়েছে তাঁর। আমেরিকানদের প্রত্যাশা, দীর্ঘ দুই দশকের খরা কাটিয়ে সাহিত্যে নোবেল আবার তাঁর হাত ধরেই আমেরিকায় ফিরে আসবে। সেই ১৯৯৩ সালে টনি মরিসন পেয়েছিলেন এই সম্মাননা, তারপর আর কোনো আমেরিকান লেখকের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়েনি। এ বছর কি ‘আমেরিকান বছর’ হতে পারে? কিন্তু পর পর দুই বছর নারী সাহিত্যিকের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার কোনো নজির সুইডিশ একাডেমি স্থাপন করতে পারেনি। ওটসের সম্ভাবনা তাই খুব বেশি নয় বলেই মনে হয়।

২০১৩ সালে ল্যাডব্রোকসের বাজির ঘোড়া ছিলেন কেনিয়ার এনগুগি ওয়া থিয়াঙ্গো। ওই বছর আরেকটি বাজিধরা কম্পানি অ্যালেক্স ডোনোহিউও এই কেনিয়ানের পক্ষে জোরেশোরে কথা বলেছে। কিন্তু কানাডার এলিস মুনরো সেবার জিতে নিয়েছিলেন সাহিত্যের সর্বশ্রেষ্ঠ এই বৈশ্বিক সম্মাননা। কেনিয়ার সমাজের অসাম্য নিয়ে লিখিত Ngaahika Ndeenda (ও Will Marry When I Want) নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার পর এনগুগিকে যখন আটক করে কারগারে নিক্ষেপ করা হয়, তখন তিনি কারা অভ্যন্তরে টয়লেট পেপারে লিখেছিলেন উপন্যাস Caitani Mutharabaini (Devil on the Cross), আর এই উপন্যাসটি তাঁর নোবেলপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে তাঁকে এগিয়ে রাখছে। ২০১০ সালেও তিনি সম্ভাবনায় এগিয়ে ছিলেন, কিন্তু পেরুর মারিয়ো বার্গাস য়োসা পেলেন এই গুরুত্বপূর্ণ সম্মাননা। এ বছর ল্যাডব্রোকসের বিবেচনায় তিনি তৃতীয় স্থানে থাকলেও অনলাইন জরিপে তাঁর অবস্থান প্রথম। স্পেনের ঔপন্যাসিক জেভিয়ার মারিয়াসকে কেউ কেউ এগিয়ে রাখছেন এই পুরস্কারের দৌড়ে। কয়েক বছর আগে ম্যানবুকার বিজয়ী আলবেনিয়ার লেখক ইসমাইল কাদেরেও এই সম্মানের যোগ্য দাবিদার। বিশ্বের ৪০টি ভাষায় তাঁর লেখনী অনূদিত ও প্রশংসিত হয়েছে। The Castle, The Pyramid, Broken April-এর মতো বইয়ের লেখকের সম্ভাবনা বাজির দরে ষষ্ঠ স্থানে। নরওয়ের নাট্যকার জন ফসির নাম শোনা যাচ্ছে এবং ল্যাডব্রোকসের তালিকায় তিনি ওপরের দিকেই আছেন। তিনি তিন বছর আগে প্রথম মনোনয়ন পেয়েছেন, কিন্তু বয়স ফসির জন্য একটা বাধা হতে পারে। ৫৮ বছর বয়সে তিনি কি পাবেন এই পুরস্কার?

সিরিয়ার অ্যাডোনিসকে (আলী আহমেদ সাঈদ) ২০১১ সালে নিশ্চিত বিজয়ী মনে করেছিলেন অনেকে, কিন্তু সে বছর টমাস ট্রান্সট্রুমার পেয়েছিলেন সাহিত্যের এই সম্মানজনক পুরস্কার। ৮৪ বছর বয়সী সিরিয়ার এই কবি আরববিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবি হিসেবে বিবেচিত। জন্ম সিরিয়ায়, কিন্তু দীর্ঘ সময় তিনি লেবাননে অভিবাসী জীবন কাটিয়েছেন। দামেস্ক, ফ্রান্স, আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আরবি কবিতা বিষয়ে পাঠদানকারী অ্যাডোনিসের নাম প্রতিবাদ, বিদ্রোহ, প্রগতি ও আধুনিকতার সমার্থক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। অ্যাডোনিস কি আরবি সাহিত্যের জন্য এই সম্মাননা বয়ে আনতে পারবেন? নাকি মাহমুদ দারবিশের মতো চির উপেক্ষিত থেকে না-ফেরার দেশে চলে যাবেন, যেভাবে চলে গেছেন কার্লোস ফুয়েন্তেস ও চিনুয়া আচেবের মতো লেখকরা? কী হবে চেক প্রজাতন্ত্রের মিলান কুন্ডেরার? এক দশক আগেই যাঁর নোবেল পাওয়ার কথা, তিনি ৮৬ বছর বয়সে এসে কি পাবেন সেই সম্মাননা? নাকি তাঁকে একেবারেই বাদের তালিকায় ফেলে দেওয়া হয়েছে? কারণ ল্যাডব্রোকসের তালিকায় তিনি অনেক নিচের দিকে।

প্রধানত কবি, তবে উপন্যাস, ট্রাভেলগ, আত্মজীবনী মিলিয়ে ১৪০টির মতো বইয়ের লেখক দক্ষিণ কোরিয়ার কো উন অনেক দিন ধরেই বিশ্বের প্রতিনিধিত্বশীল লেখক। তাঁর সম্ভাবনাকেও কেউ কেউ উড়িয়ে দিচ্ছেন না। ল্যাডব্রোকসের তালিকায় তিনি ১৭ নম্বরে অবস্থান করছেন। তবে অনলাইন জরিপে তাঁর অবস্থান অনেক আগে। অস্ট্রিয়ার লেখক পিটার হান্দকে ১২ নম্বরে আছেন। তাঁর নাম শোনা গেলেও তাঁকে ঘিরে থাকা বিতর্ক তাঁর পুরস্কারপ্রাপ্তির পথে অন্তরায় হতে পারে। যুগোস্লাভ যুদ্ধে সার্বরা সহিংসতার শিকার হচ্ছে বলে তিনি বিস্তর লেখালেখি করেছেন। সেই কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলার সময় মিলোসেভিচ তাঁকে সাক্ষী হিসেবে তলবের অনুরোধ জানিয়েছিলেন, যদিও হান্দকে সাক্ষী হতে অস্বীকৃতি জানান। আবার আরেক লেখায় তিনি দাবি করেছিলেন যে মুসলিমরা নিজেরাই খুনখারাবি করে সার্বদের ঘাড়ে দায় চাপায়। মানবতার বিরুদ্ধে যারা অপরাধ করেছে, তাদের এভাবে আড়াল করার চেষ্টা বিশ্বমানের একজন লেখকের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তাঁকে নোবেল দিলে এই পুরস্কারের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হবে বলেই অনেকে মনে করেন।

এবার তালিকায় এমন কয়েকজন লেখকের নাম দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাঁরা বেশ অপরিচিত। গত বছর ম্যানবুকার পাওয়ার পর সাহিত্যপ্রেমীদের নজরে পড়া হাঙ্গেরির ঔপন্যাসিক ল্যাজলো ক্র্যাজনাহোরকাই, নরওয়ের অনুগল্প রচনায় বিশেষ খ্যাতি অর্জনকারী ৮৬ বছর বয়সী লেখক জেল এসকালজেন, ইতালির ক্লদিও ম্যাগরিস, স্পেনের জুয়ান মারসি কারবো, ফিনল্যান্ডের দুজন নারী লেখক সিরকা তুরকা ও টুয়া ফরস্ট্রোম, এস্তোনিয়ার কবি জান ক্যাপলিনস্কি, মিসরের নওয়াল এল সাদাওবি প্রমুখ। ম্যানবুকারজয়ী ফ্রান্সের নারী লেখক এ এস বাইয়াতের নাম কেউ কেউ বললেও পর পর দুই বছর নারী লেখকের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার নজির নেই। ৮০ বছর বয়সী এই সাহিত্যস্রষ্টাকে তাই হয়তো নিরাশ হতে হবে। পোল্যান্ডের অ্যাডাম জাগাজেবস্কির নাম শোনা যাচ্ছে। সিমবোরস্কার পর তিনি কি পারবেন পোল্যান্ডে এই পুরস্কার ফিরিয়ে নিয়ে যেতে? রুমানিয়ার লেখক মিরিতিয়া কারতারেস্কু গতবারের মতো এবারও তালিকায় আছেন, সম্ভাবনায় নয়। ডাচ লেখক সিজ নুটিবুম (কর্নেলিস জোহান্স জ্যাকোবাস মারিয়া নুটিবুম)-এর ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। কানাডার নারীবাদী লেখিকা ও সমাজকর্মী ৭৪ বছর বয়সী মার্গারেট অ্যাটউডের সম্ভাবনা যথেষ্ট কমিয়ে দিয়েছেন তাঁর স্বদেশি এলিস মুনরো তিন বছর আগে এই পুরস্কার জিতে। সোমালিয়ার নুরুদ্দিন ফারাহ, ইসরায়েলের অ্যামোজ ওজ, মনস্তাত্ত্বিক পর্তুগিজ লেখক অ্যান্তোনিও লোবো অ্যান্তুনাস প্রতিবারের মতো এবারও তালিকায় আছেন। স্পেনের জুয়ান গয়টিসলো, ইতালির উমবার্তো একো, স্পেনের জুয়ান মারসি, দক্ষিণ আফ্রিকার কারেল শোয়েম্যান প্রমুখের নাম শোনা যাচ্ছে। অস্ট্রেলিয়ার লেস মারের সঙ্গে এবার গেরাল্ড মুরনানের নাম নতুন যুক্ত হয়েছে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান লেখক রোহিনতন মিস্ত্রির নাম রয়েছে সালমান রুশদির আগে, কিন্তু খুব আশাবাদী হওয়ার তেমন কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। ইংরেজ লেখিকা হিলারি ম্যান্টেলের নামও শোনা যাচ্ছে। ডরিস লেসিংয়ের পর তিনি কি হতে পারবেন পরবর্তী ইংরেজ নোবেল বিজেতা?

অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় বৃহস্পতিবার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করার আগে সাহিত্যরসিকদের মাঝে জল্পনাকল্পনা চলতে থাকবে। তাঁদের অনুমান কখনো কখনো মিলে গেলেও অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সবার ধারণা মিথ্যা প্রমাণ করে অখ্যাত কারো মাথায় উঠে গেছে বিশ্বের সবচেয়ে সম্মানজনক এই পুরস্কারের মুকুট। সাহিত্যরসিকদের মনঃপূত না হলেও নতুন লেখককে জানার আগ্রহ তৈরি করে এই সম্মাননা। অনেকের মতো সেই নামটি জানার জন্য আমরাও অপেক্ষায় থাকলাম।


মন্তব্য