kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


কুড়িগ্রামে সৈয়দ শামসুল হকের শেষ সাক্ষাৎকার

রেল-নৌ যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি সৈয়দ শামসুল হককে গত ১ এপ্রিল কুড়িগ্রামে নাগরিক সংবর্ধনা দিয়েছে। সেই নাগরিক সংবর্ধনা শেষে রাতে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর মাঠে বসে তাঁর এ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন তুহিন ওয়াদুদ, এস এম আব্রাহাম লিংকন ও ইউসুফ আলমগীর

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কুড়িগ্রামে সৈয়দ শামসুল হকের শেষ সাক্ষাৎকার

প্রশ্ন : হক ভাই, আপনি ৮০ বছর ধরে পৃথিবীকে দেখছেন, বাংলাদেশকে দেখছেন, কুড়িগ্রামকে দেখছেন। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই তিনের মধ্যে সম্পর্কটা কেমন দেখছেন? সমকালে কুড়িগ্রাম কতখানি এগিয়েছে বলে মনে করেন?

সৈয়দ হক : কুড়িগ্রামে অনেক পরিবর্তন হয়েছে।

এই পরিবর্তন যতটা প্রত্যাশিত ছিল যে আরো আগে হবে, সেটা হয়নি। যেমন ইংরেজরা চলে যাওয়ার পর পাকিস্তান আমলে কোনো পরিবর্তন কুড়িগ্রামে দেখিনি। উন্নয়নের এটা-ওটা খবর দিলে তো হবে না, সামগ্রিক খবর দিতে হবে। শিক্ষা, ব্যবসা, বিভিন্ন প্রকল্প এখানে কী আসছে, কী হচ্ছে—এর ওপর একটি জায়গার সমৃদ্ধি নির্ভর করে। এটা বাংলাদেশ আমলে হয়েছে। এখন আমি কুড়িগ্রামকে চিনতেই পারি না। তার দুটি কারণ—একটি হচ্ছে, যে কুড়িগ্রামে জন্মগ্রহণ করি, যে কুড়িগ্রামে আমার ১২ বছর বয়স পর্যন্ত কেটেছে, তখনো নদীভাঙনে ওই শহরটা এতটা কমে আসেনি। অনেকখানি ছিল। এটা নতুন শহর। এই শহর আমি চলে যাওয়ার পর হয়েছে। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকায় যাই। তারপর এই নতুন শহর হয়েছে। এখানে আমাদের সময়ে প্রচুর আমগাছ ছিল। এক পকেটে লবণ, এক পকেটে ছুরি নিয়ে এই খলিলগঞ্জে আসতাম টক আম খাওয়ার জন্য। গাছের ওপর বসে, ডালে বসে, এক ডালে বসে আরেক ডালে হেলান দিয়ে আম খেতাম। এই যে রাস্তাঘাট নতুন শহরে—এখানে  হাঁটুসমান ধুলো ছিল গরমের সময়। বর্ষার সময় ছিল হাঁটুসমান কাদা। গরুর গাড়িও চলতে খুব কষ্ট হতো—এত খারাপ রাস্তা ছিল। শুকনো সময় অনেক ভালো ছিল। কিন্তু এটা জংলা ও পতিত জায়গা ছিল। ধান-পাট চাষ হচ্ছে এ রকম ছিল। সেখানে নতুন শহর আমার চেনা নয়। এই শহরে যা একটা ছোট স্মৃতি ছিল—ডাকবাংলো, সেই কাঠের ডাকবাংলো, টিনের চাল। এই যে এবার এলাম ২০১৬ সালে ৩১ মার্চ রাতের বেলা। জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় ঢুকতে গিয়েই আমি চমকে উঠেছি। কই, সেই ডাকবাংলো কোথায়? শোনা গেল, সেই ডাকবাংলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভেঙে কী করা হয়েছে! একটা ছোট খেলনা বাক্স বানানো হয়েছে, যেটাকে কোনো রেপ্লিকা বলা যাবে না; আর খানিক মাঠ হয়েছে। কিন্তু মনটা খারাপ হলো। যেখানে আমি কথা বলছি, এখানে একটা ঐতিহ্যবাহী চিহ্ন নেই পুরনো কুড়িগ্রাম শহরে। এটা কী রকম করে হয়! এই ডাকবাংলোতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এসে থেকেছেন, খাজা নাজিমুদ্দিন এসে থেকেছেন, চিত্তরঞ্জন দাশ এসে থেকেছেন। নিশ্চয়ই কংগ্রেস নেতারা অনেকেই এসেছিলেন। এখানে রাত যাপন করেছিলেন। এটাই একমাত্র থাকার জায়গা ছিল। এই স্মৃতিচিহ্ন শেষ করে ফেলল?

কাজেই বিশ্বের সঙ্গে সমন্বয়—একদিকে তালেবানরা মূর্তি ভাঙছে, সভ্যতা ভাঙছে, পুরনো সভ্যতার নিদর্শন ভাঙছে, আর তোমরা কী করছ কুড়িগ্রামে বসে। বাংলাদেশের কথা তো ছেড়ে দাও, সে দুঃখ করতে গেলে অনেক দুঃখ করতে হয়। কিন্তু ভেবেছিলাম, কুড়িগ্রামের মানুষ একটু পৃথক আছে। কিন্তু দশ জায়গায় যা হচ্ছে, এখানেও তা-ই হচ্ছে। দোকান হচ্ছে, দালান হচ্ছে। বড় বড় দোকানের লিংক— আমি নাম করলে তো বিজ্ঞাপন হয়ে যাবে—এ রকম বহু প্রতিষ্ঠান আছে, যারা দেশের সব শহরে দোকান করছে—এ সবই হচ্ছে। একটা সময় ছিল, যখন কুড়িগ্রাম যেমন দরিদ্র, তেমনি নিরক্ষরতার জায়গা, তেমনি একটিমাত্র দালানবাড়ি আমার মনে আছে। আমি জন্মে দেখেছি। ১৯৩৫ সালে আমার জন্ম। তখন কোনো দালানকোটা ছিল না। রিকশা বলে কিছু ছিল না চলাচলের জন্য। যারা একটু অবস্থাপন্ন, তারা সাইকেলে করে যাতায়াত করত, আর না হলে গরুর গাড়িতে। তো এসবের থেকে এখন গাড়ি চলছে, ইজিবাইক চলছে, ট্রাক চলছে, বাস চলছে। বাসে উঠলেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যাওয়া যাচ্ছে। এখান থেকে ঢাকা যেতে অনেক সময় লাগত। প্রথমবার যখন আমি ঢাকা যাই, তখন আমার লেগেছিল ৩৬ ঘণ্টা, ১৯৪৮ সালে। তিস্তায় গিয়ে এক ঘণ্টা অপেক্ষা, কাউনিয়ায় গিয়ে ৫ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। বাহাদুরাবাদ ঘাটে গিয়ে দেখা গেল ইঞ্জিনের কী গোলমাল হয়েছে। তখন সদ্য পাকিস্তান হয়েছে। এখন রাতের বাসে উঠলে সকালে চলে যাচ্ছে ঢাকায়। এসব উন্নতি হচ্ছে বহিরাঙ্গনের। আসল উন্নতি হচ্ছে মনের এবং দৃষ্টিভঙ্গির। কুড়িগ্রামের গর্ব করার অনেক কিছুই আছে। এই যে রৌমারী এমন একটি জায়গা যে ১৯৭১ সালে একমাত্র এখানে মুক্তিবাহিনী ছাড়া আর কারো অস্তিত্ব ছিল না। পাকিস্তানিরা ঢুকতে পর্যন্ত পারে নাই। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পোস্ট অফিস সেখানে। প্রথম বিচারালয়, প্রথম ক্যান্টনমেন্ট। আর সেই কুড়িগ্রামের এই গৌরব শুধু মুখে বললে তো হবে না। গৌরবকে অন্তরে ধারণ করতে হবে। তুমি বিশ্বের কথা বলছিলে যে বিশ্বের উন্নতি, অগ্রগতি সারা বাংলাদেশের উন্নতি অগ্রগতি। কুড়িগ্রামের উন্নতি অগ্রগতি সে তুলনায় কিন্তু কুড়িগ্রামের উন্নতি বিস্ময়কর। শিক্ষাদীক্ষার দিক থেকে আমার যেটা চোখে পড়ে, আমার ছোটবেলায় ব্রিটিশ আমলে যেখানে ১০০ জনের মধ্যে পাঁচজন শিক্ষিত ছিল না, এখন সেখানে অন্তত ১০০ জনের মধ্যে ৭০-৮০ জন শিক্ষিত। এটা কিন্তু আমাদের দেশের সামগ্রিক বিচারে খুব উচ্চ একটি পর্যায়ে আছে। এটা খুব আনন্দের কথা। কুড়িগ্রামে স্কুল ছিল মাত্র তিনটি। সেখানে এখন স্কুল কয়টা তোমরাই বলতে পারবে। কলেজ কতটা দেখো। বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা হচ্ছে। কাজেই এ জায়গায় আমি খুব পরিবর্তন দেখি। বিশেষ করে শিক্ষায় যখন উন্নতি দেখছি। নিরাশ হই না। ভরসা হয় যে আরো কিছু হবে।

প্রশ্ন : আপনার লেখার মধ্যে ১৩০০ নদীর কথা ঘুরেফিরে বহুবার বলেছেন। তিস্তার কথা বলেছেন। যখন চর হয়েছে, সে কথা পরবর্তী সময়ে লিখেছেন। লেখার মধ্যে আধকোষা নদীর কথা বহুবার পাওয়া যায়। এসব বিষয়ে বলবেন?

সৈয়দ হক : আমার কল্পনায়, আমার গল্প-উপন্যাসের জন্য একটা এলাকা গড়ে তুলেছি—জলেশ্বরী। শহরের নাম জলেশ্বরী এবং এলাকার নাম জলেশ্বরী। এটার ভেতর কুড়িগ্রামের একটা প্রতিচ্ছবি খুঁজে পাওয়া যাবে। কিন্তু আমি কিছু উপাদান যোগ করেছি। যেমন, কুড়িগ্রাম শহরে আমি কোনো মাজার দেখিনি। আমি একটি প্রাচীন মাজার কল্পনা করে নিয়েছি। এটা আমার দরকার হয়েছে গল্প-উপন্যাসের জন্য। আর এই ধরলা নদীকে আমি ধরলা না বলে আধকোষা নামে ডাকি। আধকোষা মানে হচ্ছে যেটা এক মাইল। এক ক্রোশের অর্ধেক। কুড়িগ্রামের পাশ দিয়ে যে ধরলা বয়ে যেত,  তা বর্ষায় বিশাল হতো। আমার ছোটবেলায় এত বিশাল নদী খুব একটা চোখে পড়েনি। এই যে তিস্তার পার দিয়ে এলাম—তিস্তাও বিশাল নদী ছিল। নদীগুলোর কী হলো কিছুই বুঝলাম না। মানিকগঞ্জে কালীগঙ্গা, এত প্রশস্ত স্বাস্থ্যবান একটা নদী ছিল, সেটা এখন নেই। এটা ভালোই প্রশ্ন করেছ। আধকোষা নদী আমার জলেশ্বরীতে। জলেশ্বরীও যেমন কাল্পনিক, নদীটাও কাল্পনিক। আমি যে উপন্যাস লিখেছি, গত চার-পাঁচ বছর ধরে কালি ও কলমে ‘নদী কারও নয়’, সেটাও আধকোষা; যে আধকোষা আমার কাল্পনিক নদী। কাল্পনিক মানে বাস্তবে বহু জায়গায় হয়েছে। আমার ওই জলেশ্বরীতে ঘটানোর জন্য আধকোষা কথাটি বলেছি। যে একবার হিন্দুস্তানে চলে যায়, ভাগের সময়ে আবার তিন দিন পর পাকিস্তানে ফেরত আসে। আবার হিন্দুস্তানে চলে যায়, আবার পাকিস্তানে আসে—এ রকম তো দেশের বিভিন্ন জায়গায় হয়েছে। এ উপাদানগুলোকে আমার লেখার ভেতর আনার চেষ্টা করেছি।

প্রশ্ন : আপনার সব লেখা নানা অঙ্গনে আপনার যে বক্তব্য, সেখানে যেমন দেশপ্রেম আছে এবং আপনার ক্ষেত্রে যে একটি দর্শন আমরা খুবই স্পষ্ট দেখতে পাই, যেটা সব লেখকের মধ্যে অতটা দেখা যায় না; বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের কথা। তো কুড়িগ্রামকে নিয়ে আপনার প্রত্যাশার জায়গাটা কী রকম?

সৈয়দ হক : বাংলাদেশ সম্পর্কে যেটা প্রত্যাশা, কুড়িগ্রাম সম্পর্কেও সে রকম। কুড়িগ্রাম সম্পর্কে আলাদা কোনো প্রত্যাশা নেই। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধরে রাখবে এবং সেই চেতনার ভিত্তিতে যাবতীয় রাষ্ট্রীয়-জাতীয় ও ব্যক্তিগত কাজ, সমষ্টিগত কাজ করবে। এটা শুধু কুড়িগ্রাম বলে নয়। এটা পুরো বাংলাদেশ সম্পর্কে আমার প্রত্যাশা। মুুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে যদি দেখো, কী অসাধারণ! ধর্ম সম্পর্কে অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষতা। আর আজকে চতুর্দিকে যে উগ্র মৌলবাদের উত্থান দেখি, ধর্মান্ধতা দেখি, ধর্মের বহিরাঙ্গন নিয়ে বাড়াবাড়ি দেখি, তা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছাড়া। গণতন্ত্রকে যখন আমরা বিপর্যস্ত করি গণতন্ত্র থাকাকালীন, জাতীয় পরিচয়—মনে করো তুমি একটা সমিতি করেছ কুড়িগ্রামে, সেখানে গণতন্ত্রচর্চা করছ না, তাহলে তো হবে না। রাষ্ট্রে গণতন্ত্র থাকলেই চলবে না। সর্বত্র গণতন্ত্রটা প্রয়োগ করতে হবে। তুমি সংঘ করছ, সমিতি করছ, এমনকি পারিবারিক জীবনে গণতন্ত্র থাকতে হবে। সেটা যদি না করো, তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থাকছে না। আত্মপরিচয়ে আমি বাঙালি—কতটা বোধ করো। এই বাংলা ভাষা কি তোমার কাছে উচ্চাশার ভাষা মনে হয়? যদি মনে না হয়, তাহলে তুমি তো সন্তানকে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াবে। তাহলে কী থাকল? এসব বিবেচনা করে আমি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলছি। যে চেতনাকে আমাদের জীবনের সর্বস্তরে প্রয়োগ করতে হবে। আমরা যে স্বাধীন হয়েছি, সেই স্বাধীনতাকে কতখানি অনুভব করি। মূল্যবোধের ওপর স্থাপিত এ স্বাধীনতা। স্বাধীনতা মানে যথেচ্ছাচার নয়। তার একটি মূল্যবোধের ভিত্তি আছে। মানবিক ভিত্তি আছে। আমরা কতটা সেই স্বাধীনতাকে প্রয়োগ করি আমাদের কাজে। তারপর নারী-পুরুষের সমতা। সারা দেশের জন্য আমি যেমন প্রত্যাশা করি, কুড়িগ্রামের জন্যও সে রকম। এই কুড়িগ্রামে দেখেছি, যখন নিরক্ষরতা প্রচণ্ড রকম ছিল, তখন দেখেছি নারী-পুরুষ সমভাবে কাজ করছে। হাটে-বাজারে-দোকানে নারী-পুরুষ একসঙ্গে কাজ করছে। আজ শিক্ষিতের হার হয়েছে বেশি, ধর্মান্ধতা বেড়েছে। আমি কুড়িগ্রামে কখনো বোরকা দেখিনি। কখনো না। তাঁরা পর্দা মানতেন, তার এটা ধরন ছিল। যেমন নজির হোসেন খন্দকার সাহেব। উকিল। তাঁর যে স্ত্রী অধ্যাপক মোস্তফা খন্দকারের মা। তিনি কবিতা লিখতেন। নছরুদ্দিন আহমেদের বাড়িতে ঈদ রি-ইউনিয়ন হতো। সেখানে তাঁর কবিতা আমি আবৃত্তি করতাম। তিনি মঞ্চে উঠতেন না, মহিলা সাইডে থাকতেন। এভাবে তাঁরা পর্দাটা মানতেন।

প্রশ্ন : ধর্মান্ধ রাষ্ট্র তো সমগ্র জীবনকেই বিপর্যস্ত করে। এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় কী?

সৈয়দ হক : আমার জানা থাকলে তো আমি এক্ষুনি দিয়ে দিতাম। এটা হচ্ছে নিজের বোধ। এটা শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। বিশ্বের অন্তত ৪০-৫০টি দেশে এ সমস্যা। শুধু মুসলিম বা ইমলাম ধর্মান্ধতা নয়। হিন্দু ধর্মান্ধতা, ইজরায়েলি উগ্রতা—এগুলো একই পর্যায়ে পড়ে। মৌলবাদ যখন বলছি, তখন শুধু ইসলামকে বলছি, তা নয়। ভারতে যেমন দেখছি—ধর্মনিরপেক্ষতা ভুলেই গেছে। ইজরায়েল তো ঘোষিতভাবে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র। কিন্তু তারা ওই পর্যায়ে থাকেনি, উগ্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যেটা আমরা তার প্রতিবেশী ফিলিপাইন ও জর্ডানে দেখি। এ থেকে উত্তরণের একটাই উপায়, যেটা সব যুগে সেই একটাই উপায় নির্দেশ করা হয়েছে। আমাদের রাসুলুল্লাহ (সা.)ও বলেছেন, শিক্ষা আত্মশিক্ষা। শিক্ষা যখন সত্যিকার অর্থে তোমার শরীরে প্রবেশ করবে, তখন অন্ধত্ব ক্রমেই কমতে থাকবে।

প্রশ্ন : দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমাদের শিক্ষার পরিসর বেড়েছে। শিক্ষার সঙ্গে সাংস্কৃতিক বলয়টা তো আরো সম্প্রসারিত হওয়ার কথা ছিল। তা না হয়ে বিষয় দুটি সাংঘর্ষিক হলো কেন?

সৈয়দ হক : সাংঘর্ষিক অবস্থা সব সময়ই ছিল—ছোট আকারে আর বড় আকারে। ভুলে যাবে না আজকের দিনে মিডিয়ার যে প্রসার দেখি, তাতে খবরগুলো বেশি বেরোয় বলে আমরা বেশি দেখি। আগেও ঘটেছে, কিন্তু জানার উপায় ছিল না, জানানোর উপায় ছিল না।

প্রশ্ন : আর একটি বিষয়—ছয় দশক ধরে প্রায় আপনি সাহিত্যের শীর্ষ স্থানেই আছেন। বছর গণনা করলে আপনি তো প্রায় ৬৮ বছর ধরে লিখছেন। আমাদের সাহিত্যে তো একটানা এত বছর ধরে আর কাউকে পাই না। পাকিস্তান আমলে লেখায় সব কথা স্বাধীনভাবে বলা যায়নি। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী লেখায় আবেগের ছড়াছড়ি, আশি-নব্বইয়ের দশকে এসে সাহিত্যের বিভিন্ন আঙ্গিক নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট হয়েছে। কিন্তু আপনার লেখা সময়ের এত পরিবর্তনেও কিভাবে দাঁড়িয়ে আছে?

সৈয়দ হক : এটা তো অসম্ভব ব্যাপার। আমি লিখে যাচ্ছি। লিখতে আমার ভালো লাগে। আমার আনন্দ হয় এবং আমি আমার কথাটিকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পাঠকের কাছে বা শ্রোতার কাছে বিশেষ আঙ্গিক আমি অনুসরণ করে থাকি, যার ফলে হয়তো একটা বৈচিত্র্য পাওয়া যায়। আর আমি সব সময় চেষ্টা করি নিজের থেকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য। মানে এটা আত্ম-উত্তরণ। আজ যা লিখেছি, কাল মনে হয় এটা ঠিক হয়নি। আমি চেষ্টা করি আরো কিছুটা নতুন করার জন্য। সারা জীবনে আমার পেছনের লেখা আমি খুব কম পড়েছি। আমি ভুলে যেতে চাই। হয়নি কিছুই। আবার শুরু করি। যখনই লিখতে শুরু করি, মনে হয় এই প্রথম। হয়তো এ জন্যই এমনটি হচ্ছে, যেমনটি তুমি বললে। কিংবা তুমি ভালোবাসো বলে একটু বাড়িয়ে বলছ। আমারও অনেক পতন আছে, দুর্বলতা আছে। কোনো লেখকই তাঁর সেরা লেখা লিখে যেতে পারেন না।

প্রশ্ন : আপনি তো সব সময় অগ্রভাগেই থেকেছেন...

সৈয়দ হক : এটা যদি জানাই থাকত তাহলে তো সবাই অগ্রভাগে চলে আসত। এটা নিজের ভেতরেই।

প্রশ্ন : এ অঞ্চলের ভাওয়াইয়া সম্পর্কে কিছু বলবেন?

সৈয়দ হক : এ সম্পর্কে বলার কী আছে। ভাওয়াইয়া আমাদের গৌরবের জায়গা। বাংলাদেশে প্রচলিত যত পল্লীগীতির ধারা আছে, তার মধ্যে ভাওয়াইয়া সবচেয়ে মানবিক ও ইহলৌকিক, পারলৌকিক নয়। ভাটিয়ালির মধ্যে একটা আধ্যাত্মিক টান আছে। ভাওয়াইয়ায় নেই। এটা নিয়ে আমার বলার অপেক্ষা রাখে না। ভাওয়াইয়া যাঁরা সৃষ্টি করেছেন, তা তো একদিনে নয়। তাঁরা নামহীন। এই যে দু শ, পাঁচ শ বছর ধরে তৈরি করেছেন। তাঁরা নমস্য। মানবিক পল্লীগীতি পৃথিবীতে খুব কম দেশ আছে, যেখানে পাওয়া যায়। খুব মানবিক। এখনকার দিনে যাঁরা নারীবাদী বলে পরিচিত, তাঁরাও এর ভেতরে এসে অবাক হয়ে যান। যে নারীর দুঃখ-কষ্ট-বেদনা-যন্ত্রণার কথা এভাবে আধুনিক লেখকরাও বলতে পারেননি। অসাধারণ!

প্রশ্ন : হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যখন ক্ষমতায়, তখন আপনি লিখেছেন ‘কোথায় যাচ্ছ বাংলাদেশ’ কবিতাটি। সেখানে অনেক শক্ত শক্ত কথাই আপনি লিখেছেন। তার কিছু দিন পর যখন স্বৈরাচার এরশাদের পতন হলো, তখন লিখলেন ‘অভিবাদন বাংলাদেশ’ কবিতাটি। আপনি যখন ‘কোথায় যাচ্ছ বাংলাদেশ’-এর মতো কবিতা লিখতেন, তখন আপনার ওপর কোনো প্রেশার আসত কি না?

সৈয়দ হক : প্রেশার তো এ আমলেও আছে। একটু বেশি করে বললাম। বিভিন্নভাবে প্রেশার ছিল। লেখকদের ওপর একটা চাপ থাকে। লেখক তো গুহাবাসী নন। তার ওপর চাপ থাকবে। এমনকি লালনের যুগেও লালনের ওপর চাপ ছিল। সমাজের একটা চাপ। তুমি স্বীকার করো তুমি মুসলমান। তুমি স্বীকার করো যে তুমি কাফের। লেখকদের ওপর চাপ সব সময় থাকে। তুহিন—ওটা ব্রিটিশ আমলে ছিল, পাকিস্তান আমলে ছিল, বাংলাদেশ আমলে আছে। তবে এটা বলব, বাংলাদেশে সেই অর্থে লেখকদের ওপর প্রবল চাপ নেই। খুব ওপরে যাঁরা আছেন, তাঁরা অনেক সময় নিজেরাই চাপটা গ্রহণ করেন।

হক ভাই, সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

তোমাদেরও ধন্যবাদ।


মন্তব্য