kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মৃত্যু নয়, দ্বিতীয় জন্মকাল

ইমতিয়ার শামীম

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



কবে যেন ছিল সেই শীতে আর্দ্র সকাল? বিদেশ-বিভুঁইয়ে কথা হলো আমাদের, তা-ও আপনারই উদারতার জোরে; অচেনা কারো মোবাইল নম্বর, প্রায় সারা রাত বিনিদ্র থেকে ভোররাতে ঘুমিয়ে পড়া আমি তবু ঘুম ঘুম চোখে ফোন ধরলাম। আর আপনি ওদিক থেকে ভরাট গলায় বলে উঠলেন, ‘সৈয়দ হক বলছি...।

’ এই পৃথিবীতে একজনই সৈয়দ হক—অন্তত আমার কাছে; ধড়মড়িয়ে উঠে বসি আমি, ‘হ্যাঁ, হক ভাই...’, যেন কত চেনা তিনি, যদিও কস্মিনকালেও কথা হয়নি আমাদের মধ্যে। আমি তাঁর লেখা পড়েছি, মুগ্ধ হয়ে পড়েছি, কিন্তু কথা বলার প্রয়োজন বোধ করিনি—এইভাবে আমার বয়স ৪০ পেরিয়ে গেছে! অপরিচয়ের দূরত্ব ঘোচাতে তিনি নিজেই আমার টেলিফোন নম্বর জোগাড় করে নিয়ে এসেছেন লন্ডনে আসার আগে। শুনতে শুনতে আমার গা শিরশিরিয়ে ওঠে, হেমন্তের কণ্ঠে শোনা রজনীকান্ত সেনের গান মনে পড়ে, ‘আমি অকৃতী অধম বলেও তো মোরে কম করে কিছু দাওনি...’

কিন্তু এখন তো এসব বলার সময় নয়, হিমঘরে শুয়ে আছেন তিনি। সেখানে কি খুব শীত নেমেছে? নাকি হিম হিম স্নিগ্ধতায় তিনি চিন্তা করছেন নতুন কোনো বেল্-লেত্র লেখার? এ ধরনের লেখা বড় প্রিয় ছিল তাঁর। বঙ্কিমেও পেয়েছিলেন এ লেখার স্বর কমলাকান্তের কণ্ঠে, পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের পত্রসাহিত্যে, দেখেছিলেন এমন সব লেখার মধ্যে ফজলে লোহানী যেন আড্ডাই দিচ্ছেন আর বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর যেন ডায়েরি লিখছেন; কিন্তু তিনি নিজে চেয়েছেন সামান্য কথায় অসামান্য চিন্তার দরজা খুলে দিতে। তাই ‘মার্জিনে মন্তব্য’ লিখেছেন, ‘হৃত্কলমের টানে’ লিখেছেন, ‘কথা সামান্যই’ লিখেছেন এবং চেয়েছেন আরো লিখতে। শুধু গল্প-উপন্যাস লিখতে নয়, কবিতা-সংগীত লিখতে নয়, চিত্রনাট্য ও নাটক লিখতে নয়, প্রবন্ধ-নিবন্ধও নয়, কিংবা সেই যে নতুন বিষয়বন্ধ ‘গল্পপ্রবন্ধ’—সে রকম কিছুও নয়, চেয়েছেন এ রকম কিছু লিখতে, কালীপ্রসন্ন সিংহ যাকে ‘নক্শা’ বলেছেন, রবীন্দ্রনাথ যাকে ‘বিচিত্র প্রবন্ধ’ বলেছেন; তবে তিনি নিজে কোনো নাম দেননি এসব লেখার, স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন—বঙ্কিমচন্দ্রও প্রয়োজন বোধ করেননি সেসব লেখা-ধারার কোনো নাম দিতে। বড় আক্ষেপ ছিল তাঁর, বই প্রকাশের জন্য পাণ্ডুলিপি তৈরি করার পরেও লোহানীর সে পাণ্ডুলিপিটা হারিয়ে গেছে বলে; আক্ষেপ ছিল কি বাংলাদেশে কি পশ্চিমবঙ্গে সবাই ‘কাজের মানুষ’ হয়ে উঠেছে, কেউই আর এ ধরনের লেখা লেখে না! তাহলে আজ কি তাঁকে মনে করব সেই বেল্-লেত্র কিংবা তাঁর প্রিয় বন্ধু বোরহানের দেওয়া নাম ‘ব্যক্তিগত প্রবন্ধ’ লিখে? কিন্তু সেসব লেখার ধরন তো হক ভাইয়ের মতেই, ‘খোশ মেজাজে গল্প করা। ’ তেমন ‘খোশ মেজাজ’ আজ কী করে জাগবে, বলুন তো হক ভাই?

যে নিয়তি নির্ধারিত হয়েই আছে, তাকে নিয়েও আমরা নির্ঘুম রাত জাগি আর দুঃখ করি, দুঃখের পরও প্রত্যাশা করি যে এ নিয়তি পাল্টে যাবে—কেননা আমরা মানুষ, আর মানুষের মধ্যেই ঘুমিয়ে থাকে নূরলদীনরা, ঘুমিয়ে থাকে ‘দূরত্ব’র স্কুল শিক্ষকরা, ঘুমিয়ে থাকে জন্মের অভিলাষ আর মৃত্যুরও অভিলাষ। তাই আমাদের সব ‘খোশ মেজাজ’ নিরুদ্দেশে যায় সৈয়দ হকের মৃত্যুসংবাদে। পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দোর্দণ্ড প্রতাপের সঙ্গে বয়ে গেলেন তিনি, বয়েই গেলেন, যেন বা তাঁর সেই কবিতার মতোই, ‘আমি এই একটুখানি দাঁড়িয়েই/এখান থেকে/চলে যাব’। এবং সত্যি সত্যি চলেও গেলেন। একে কি মৃত্যুই বলব? নাকি এ দ্বিতীয় জন্ম তাঁর? এত দিন আমরা যারা ছিলাম, আবেগঘন সম্পর্কে, অথবা ঘোরবিদ্বেষে তাঁর যাপিত জীবনের পক্ষে-বিপক্ষে—তাঁদের পর্বও শেষ হতে চলেছে। এবার তাঁর জীবন ও লেখার সত্যিকারের মূল্যায়ন হবে, পূণর্মূল্যায়ন হবে। যারা তা করবেন, তাঁদের সঙ্গে হক ভাইয়ের সম্পর্ক হিসাবনিকাশের—দেশপ্রেমের, ভাষাপ্রেমের, সাহিত্যপ্রেমের হিসাবনিকাশের। তারা হক ভাইয়ের দেশপ্রেমকে খুঁজবেন ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’ থেকে, যা পড়া ছিল বলে আমাদের অনেকেই নিঃস্ব হওয়ার মতো উচ্ছ্বসিত হইনি শহীদুল জহিরের ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’ পেয়ে, তাঁরা হক ভাইয়ের দেশপ্রেম খুঁজে পাবেন ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘নীল দংশন’, ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’, ‘স্মৃতিমেধ’, ‘নুরলদীনের সারাজীবন’ কিংবা ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ থেকে। তখন তাঁরা জানবেন, তিনি লিখেছেন, ‘...বিশ্বাস থেকে বাস্তব যখন অন্তর্হিত হয়ে যায়, তখন সে বড় দুঃসময় আমাদের। ’ (স্মৃতিমেধ) তাঁর এই বাক্য তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকেও বুঝতে সাহায্য করবে এবং আমাদের অনেকে এখন রাজনৈতিকভাবে তাঁর প্রতি যত অসহিষ্ণুই হই না কেন, ভবিষ্যতের তারুণ্য কোমল মমতার সঙ্গেই ধারণ করবে তাঁকে। মানুষের রাজনৈতিক অবস্থানের পরিবর্তনের ব্যাখ্যায় সমসময় যত অস্থির উত্তেজনায় ফেটে পড়ে, দূর থেকে দূরতর ভবিষ্যৎ তা করে ততই স্থিরতা নিয়ে। ওই স্থিরতাই তাদের সমর্থ করে তুলবে মায়াবী হতে—যেমন আমরাও কালক্রমে প্রচণ্ড মায়াবী হয়েছি কোমল তলস্তয়, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলদের ক্ষেত্রে। তাঁরা জানবেন, কী করে তিনি প্রতিটি গ্রন্থেই নিজেকে ভাঙার চেষ্টা করেছেন, নির্মাণও করেছেন নতুন করে। লেখা যাঁর কাছে ছিল ‘প্রেমে পড়ার চেয়েও অনেক বেশি উত্তেজক ও ব্যক্তিগত, দূরাভিলাষী ও উড্ডয়নশীল’ (মার্জিনে মন্তব্য) লেখার মধ্যেই তো খুঁজতে হবে তাঁকে। লেখার মধ্য থেকেই মানুষ খুঁজে নেবে তাঁকে।

লালনের মতো ১১৬ বছর বাঁচতে চেয়েও এই যে থেমে গেছেন তিনি—কিন্তু মনে তো হয় না থেমেই গেছেন; মনে হয়, যেন বা বলছেন তিনি আমাদের মনের কথাই, “...দরকার, একটি বিশ্বাস, একটি দর্শন, একটি দৃষ্টিভঙ্গি। এই বিশ্বাস, এই দৃষ্টিভঙ্গি যাঁর আছে, গল্প তাঁকে খুঁজতে হয় না; তাঁকে বরং বেশি করে ভাবতে হয়, কোন গল্প লিখবো আর কোন গল্প লিখবো না। গল্প লেখকের মাথার ভেতরে জন্ম নেয় না, মাথার ভেতরে থাকে না, গল্প পড়ে আছে লেখকের চারপাশে, এত গল্প যে, একজীবনে সব লিখে ফেলার আশা করাও মূর্খতা। ” এই তো আপনি চলে গেলেন, আপনারই সমসাময়িক কেউ বললেন, ‘সবাই যাকে সব্যসাচী বলে’...সবাই বলে কি না জানি না হক ভাই, তবে অন্তত আমি বলি, আমি ভাবি ‘সব্যসাচী’ বলেই তাঁকে ছুঁয়েছেন দেখল না কেউ; এখন তাঁর দ্বিতীয় জন্মকাল, যত দিন যাবে, ততই উজ্জ্বল হবেন তিনি।

কত না বছর আগে, বোধ হয় সেই ‘হ্যারো অন দ্য হিল’ নামের এক টিউব স্টেশনে অনেক-অনেক কথা-কাহিনীর মধ্য দিয়ে স্রোতের সঙ্গে আরো কত না স্রোত মিলেমিশে বোধ হয় কোনো গল্পেরই জন্ম হয়েছিল। সেই গল্প বলার সময় হয়েছে কি হক ভাই? ‘তোমার সঙ্গে আমি কেন দেখা করছি, জানো?’ সত্যিই কি জানি হক ভাই? কী অব্যক্ত ক্ষুধা ফুটে উঠছে আপনার চোখের ভেতর? কী দেখছেন আপনি আমাদের চোখে? ‘তিন পয়সার জোছনা’য় আপনার ‘তুমুল’ বিশেষণযুক্ত ‘লেখক’ও দেখুন কী স্তব্ধ হয়ে যায়, অজস্র বেল্-লেত্র ম্রিয়মাণ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে তার স্মৃতিঘরটাতে, কিন্তু সে কেবলই ভাবে, প্রশ্ন করতে চায় আপনার মতো বিপন্ন বিস্ময় নিয়ে, ‘এমন পত্র কি নাই বাক্যে যার নাই নিরাময়/এমন শস্য কি নাই যার বীজ বোনে নাই চাষা/এমন মৃত্যু কি নাই যাতে নাই খোয়াবের লয়?’


মন্তব্য