kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বহুমাত্রিক প্রতিভাবান জলেশ্বরীর কবি

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



১৯৫০-এর দশকে বাংলা সাহিত্যে কয়েকজন তরুণ কবির আবির্ভাব হয়েছিল, যাঁরা বাংলা কবিতায় আধুনিকতাকে একটা ভিন্নতর পর্যায়ে নিয়ে গেলেন। শামসুর রাহমান তখন প্রবল লিখছেন।

আল মাহমুদের কবিতার বই বের হয়েছে। শহীদ কাদরী লিখছেন। আর পুরনা যাঁরা ছিলেন—জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আবুল হোসেন—তাঁদের কবিতা পড়তাম। খুব উৎসাহের সঙ্গে আমরা তখন আবিষ্কার করলাম সৈয়দ শামসুল হককে। ‘শীত বিকেল’ তাঁর অসাধারণ গল্পের বই। ‘রক্তগোলাপ’, এরপর ‘আনন্দের মৃত্যু’। এ বইগুলো নিয়ে আমরা আলোচনা করতাম। আমার এক বন্ধু ছিল শান্তনু কায়সার। ভালো গল্পকার। আমরা সৈয়দ হকের গল্পগুলো পড়তাম। কবিতা বোধ হয় ১৯৬১ সালে শুরু। ‘একদা এক রাজ্যে’ নাম দিয়ে। আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতাম, তখন তাঁর দুটি কবিতার বই বের হয়েছিল। একটি ‘বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’। ওটা তাঁকে সত্যিকার অর্থে কবিখ্যাতি এনে দিল। তারপর একটার পর একটা বই বের হতে থাকল। ‘প্রতিধ্বনিগণ’ বের হলো। ‘পরানের গহীন ভিতর’ ‘অগ্নি ও জলের কবিতা’। আমরা শুরু করেছি তাঁর গল্প দিয়ে। তারপর পড়েছি তাঁর কবিতা।

‘শীত বিকেল’, ‘আনন্দের মৃত্যু’ ও ‘রক্তগোলাপ’—এই তিনটি প্রথম দিকের বই এবং খুব সাড়া ফেলেছিল। তারপর বের হলো উপন্যাস। তাঁর প্রথম উপন্যাস, ‘সীমানা ছাড়িয়ে’। অনেক পরে তিনি যখন ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’ লিখলেন ১৯৮৯-৯০ সালের দিকে, পড়ে আমরা উদ্দীপ্ত হয়েছিলাম যে এত সুন্দর উপন্যাসও তিনি লিখছেন! সৈয়দ শামসুল হক ধীরে ধীরে নিজেকে মেলে ধরেছেন। খুব তাড়াহুড়া তাঁর মধ্যে কখনো দেখিনি।

আমাদের আকৃষ্ট করত, তা হলো শামসুল হকের ঝকঝকে আধুনিকতা। দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো অস্পষ্টতা নেই। প্রকাশে তীব্রতা আছে। যেটি মনে করেছেন প্রকাশ করতে হবে, করেছেন। যেমন—যৌনতা নিয়ে উপন্যাস লিখেছিলেন। আমাদের সময়ে সেটা ভাবা মুশকিল ছিল। কিন্তু স্বচ্ছন্দে তিনি সেগুলো প্রকাশ করে গেছেন। তাঁর অনেক লেকচারও আমাদের শোনার সৌভাগ্য হয়েছে। তিনি বলতেন, ‘এটি আমাদের সমাজে বিদ্যমান। এমন নয় যে আমি আকাশ থেকে এনে এই সমাজে রোপণ করেছি। এই সমাজের ভেতরেই সেটা বিদ্যমান। সেটি নিয়ে কথা বলতে আমার সমস্যাটা কোথায়?’

আমরা ইংরেজি সাহিত্য পড়তাম। তিনিও পড়তেন। আধুনিকতা বলতে আমরা তখন পশ্চিমের একটা আধুনিকতাকেই মানতাম। আমরা ভাবতাম যে এটাই হয়তো একটা মানদণ্ড। এখন এসে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টেছে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়ি, তখন এলিয়ট ছিল আমাদের সামনে, বোদলেয়ার ছিল আমাদের সামনে, জেমস জয়েস আমাদের সামনে। পশ্চিমের আধুনিকতাকে আমরা ধারণ করি। চিন্তার স্পষ্টতা, যুক্তিতর্ক ইত্যাদিতে বিশ্বাস। রাজনৈতিকভাবে প্রতিরোধমূলক, প্রতিবাদমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। এরপর আছে নিরীক্ষাধর্মিতা, শৈলী, শব্দচয়ন। এগুলোতে দেখতাম যে সৈয়দ শামসুল হক বাংলা ভাষায় যে চর্চা করে যাচ্ছেন, তাতে পশ্চিমের যে আধুনিকতা, প্রতিটি সেখানে চিহ্নিত করতে পারতেন। এটি আমাদের প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল। যে একজন বাংলাদেশি বাংলা ভাষায় লিখছেন, তাঁর চিত্রকল্পের ভেতরে বাংলাদেশের অনেক সৌন্দর্য আছে, মানুষের জীবনের নিমগ্নতা আছে; কিন্তু প্রকাশভঙ্গিতে এতখানি তাঁর ঋজুতা যে তাঁকে আমরা খুব সহজে আধুনিক বলতে পারছি। কোনো অস্পষ্টতা নেই, জড়তা নেই। যা বলার, সুন্দর করে বলছেন। নিরীক্ষাধর্মিতা আছে, ছন্দকে ভাঙছেন, ছন্দকে দোলাচ্ছেন—এ বিষয়গুলো আমাদের উৎসাহ দিত।

দ্বিতীয় ছিল তাঁর নিরীক্ষাধর্মিতা। তিনি এক জায়গায় কখনো স্থির থাকেননি। গল্প লিখেছেন, উপন্যাস লিখেছেন, কবিতা লিখেছেন, কাব্যনাটক লিখেছেন, প্রবন্ধ লিখেছেন। কিন্তু প্রতিটিতেই তাঁর ভাষাটা ছিল দুর্দান্ত। দ্বিতীয় যে জিনিসটা আকর্ষণ করত, সেটা হলো তাঁর ভাষা; ভাষা নিয়ে যে সুন্দর চিন্তাভাবনা এবং তাঁর যে ভাষার ব্যবহার! আমি মনে করি, এত নির্মেদ ভাষা, এত সাবলীল ভাষা, একই সঙ্গে এত অর্থবহ এবং এত দ্যোতনা সৃষ্টিকারী ভাষা—এটা খুব কম লেখকই বাংলা সাহিত্যে লিখতে পেরেছেন। আমার মনে হয়, তাঁর সমকক্ষ বাংলা সহিত্যে খুব কমই দেখা যাবে, যিনি ভাষাকে এতখানি বিশিষ্ট করেছেন। নিজস্ব একটা স্বাক্ষরযুক্ত ভাষা তৈরি করেছেন। আর প্রচুর শব্দ, বাক্প্রতিমা আমাদের উপহার দিয়েছেন, যেগুলো বাংলা ভাষায় আর কোথাও পাইনি।

তৃতীয় ছিল ব্যক্তির ভেতরে আলো ফেলার শক্তি। মনস্তাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ। আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৯৬৮ বা ১৯৭০ সালের কথা বলছি, বাংলাদেশ স্বাধীন হলো এই সময় দিয়ে। তখন বাংলা সাহিত্যে সেই যুগটা আসছে, যা পশ্চিমে হয়তো কিছুদিন আগেই এসেছে। ভেতরে দৃষ্টি ফেলার একটা তাগিদ দেখতে পেয়েছি। আমাদের তখন সমাজ থেকে দৃষ্টি ব্যক্তির দিকে যাচ্ছে। সমষ্টি থেকে ব্যক্তির দিকে যাচ্ছে। সময়টা একটু কঠিন হচ্ছে এবং তাতে মানুষ বিপন্ন হচ্ছে। ঢাকা শহর তৈরি হচ্ছে, ঢাকা শহরে নগরায়ণ শুরু হয়েছে। নগরায়ণজনিত বিপন্নতা মানুষকে পেয়ে বসেছে। একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে। গ্রাম থেকে মানুষ শহরে আসছে। এ বিষয়গুলো একটা মনস্তাত্ত্বিক মাত্রায় শামসুর রাহমান বলুন, সৈয়দ শামসুল হক বলুন—তাঁরা বিন্যস্ত করেছেন। এটি আমাদের জন্য একটা অতিরিক্ত উদ্দীপনার বিষয় ছিল যে মানুষের ভেতরে এত সুন্দর দৃষ্টি ফেলা যায়! চরিত্রগুলোকে ভেতর থেকে, ফুল যে রকম পাপড়ি মেলে, পাপড়িগুলোকে ভেতর থেকে মেলে ধরা যায়, এটিকে আমরা তাঁদের লেখালেখি থেকে জানলাম। আর পরে যখন তিনি কাব্যনাটক লিখতে শুরু করলেন, তিনি যখন জলেশ্বরী নিয়ে তাঁর একটা অণুবিশ্ব তৈরি করে ফেললেন, তখন মনে হলো, এই লেখকের নিরীক্ষা করার ক্ষমতা অসীম, সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করার একটা অসাধারণ শক্তি আছে। তাঁর কাব্যনাটকে দেখতে পেলাম, একেবারেই গ্রামবাংলার চিরায়ত ঐতিহ্য ধরা পড়েছে। ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ অথবা ‘নুরলদীনের সারা জীবন’ অসাধারণ। এ দুটিই তাঁকে অমরত্ব দিয়ে যাবে।

আমি মনে করি, সৈয়দ হকের একটা বড় শক্তি হচ্ছে, অন্তরঙ্গ বিষয়গুলো অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে পরিবেশন করেছেন। বুঝেছেন এবং পাঠককে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। যেখানে অন্য লেখক মার খেয়ে যায়, সেটা হলো ভাষার কারণে। সৈয়দ হকের ভাষা কখনো এলিয়ে পড়েনি। ভাষাকে তিনি শাসন করেছেন চাবুক দিয়ে। যখন যে অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে চেয়েছেন, তখন তিনি সেটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ করেছেন।

সৈয়দ হক প্রায় সব মাধ্যমে কাজ করেছেন।   যেখানে যেখানে তিনি হাত দিয়েছেন, সোনা ফলিয়েছেন। তাঁর গল্প পড়তে পড়তে আমাদের মনে হতো, বাংলা সাহিত্যে এই লোকের প্রয়োজন ছিল। তারপর যখন তাঁর কবিতা পেয়ে গেলাম, বিশেষ করে ‘বৈশাখে রচিত পংক্তিমালা’র পর। তারপর যখন উপন্যাস পড়লাম, কয়েকটা উপন্যাস তো অসাধারণ। ‘বৃষ্টি ও বিদ্রোহীগণ’-এর কথা তো বলেছি। তারপর ‘বালিকার চন্দ্রযান’। একটা ঈদ সংখ্যায় পড়েছি। এগুলো পড়ার পর মনে হলো, আমরা এই ঔপন্যাসিকের জন্যই বসে ছিলাম। তারপর যখন তাঁর ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ পড়লাম, এটা অভিনীত হলো, দেখলাম। ‘নুরলদীনের সারা জীবন’, সেটাও দেখলাম।   তখন মনে হলো, আমরা এই নাট্যকারের জন্য বসে ছিলাম। তাঁকে যে সব্যসাচী বলা হয়, তিনি প্রকৃত অর্থেই সব্যসাচী। বহুমাত্রিক প্রতিভা যাকে বলি আমরা, বহুমাত্রিক প্রতিভার সমাবেশ তাঁর ভেতরে ছিল। সেটা তিনি সৃষ্টিশীলতা দিয়ে অর্জন করেছিলেন। তাঁকে কারো দ্বারস্থ হতে হয়নি। কিছু অসাধারণ গান লিখে গেছেন। আমি যদি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের গানে তাঁর বিবেচনা করি, তাহলেও তিনি জাতীয় পর্যায়ের একজন সৃষ্টিশীল মানুষ। এই একটা ক্ষেত্রেই তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেন। তারপর তিনি টেলিভিশনে অনুষ্ঠানাদি করতেন। মাধ্যমটাকে একেবারে ধাতস্থ করে নিয়েছিলেন।

হক ভাইকে অনেক দিন ধরে দেখেছি। মানুষটির আমি খুবই গুণমুগ্ধ ছিলাম। সৈয়দ শামসুল হক ও শামসুর রাহমান—দুজনের সঙ্গে আমার খুব অন্তরঙ্গতা ছিল। আমি দুজনকে ভেবেছি আমাদের বাংলা সাহিত্যের সত্যিকার অর্থে দুই বাতিঘর। এবং তাঁদের আলোয় আমরা আলোকিত হয়েছি। আজকে একটা বাতিঘরের আলো নিভে গেল। আলো নিভে গেলেও হক ভাইয়ের কাছ থেকে আমি উপমাটা ধার করছি, ভেতরের আলো তো মরে না। যে আলোটা তাঁরা জ্বালিয়ে গেছেন, বাহ্যিকভাবে সেটা শেষ হলেও ভেতরের আলোটা টিকে থাকবে।

 

শ্রুতলিখন : চন্দন চৌধুর


মন্তব্য