kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সৈয়দ শামসুল হক

শূন্যতাকে অর্থপূর্ণ করে গেছেন আজীবন

মাসুদুজ্জামান

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শূন্যতাকে অর্থপূর্ণ করে গেছেন আজীবন

‘জীবন? জীবন তো এক চলচ্চিত্র! শুরুতে শাদা পর্দা, শেষেও শাদা পর্দা। মাঝখানে ওই ছবিটাই সব কিছু।

’ জীবন সম্পর্কে এই ছিল সৈয়দ শামসুল হকের অভিজ্ঞান। জোছনার ধবলতা নিয়ে ঝরে গেল তাঁর জীবন। সে জীবন সাধারণ কোনো জীবন নয়, মহান এক লেখকের জীবন। অবিরাম অবিরল অবিশ্রান্তভাবে যিনি শুধু সারা জীবন লিখে গেছেন। লিখে গেছেন সাহিত্যের সব শাখায়, এমনকি গান ও চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্যও ঢুকে পড়েছে তাঁর লেখার ভুবনে। নিজেই একবার বলেছেন, চার কুড়ি বছর তো কাটিয়ে দিয়েছেন এই লেখালেখি করে। আশি বছর, হ্যাঁ, আশি বছরের জীবন-পরিসর ছিল তাঁর, কিন্তু আমাদের মহান এই লেখকের শূন্যতা কখনো পূরণ হওয়ার নয়।

শূন্যতা? শব্দটা লিখেই থমকে যেতে হলো। শূন্যতাও তো জীবনের অনিবার্য আরেকটা দিক। সৈয়দ হকই তো এই শূন্যতা, সার্ত্রীয় সত্তাতাত্ত্বিক ধারণার সঙ্গে যে ভাবনাটি সমীকৃত বা প্রেরণা বলে ভেবে নিতে পারি, বলে গেছেন এর কথা : ‘কখনো কখনো মনে হয়, এ জীবন এক শূন্য ক্যানভাস। ... তার পরও লক্ষ করা উচিত, শূন্য মানেই নিরম্বু শূন্য নয় এবং ওই শূন্যতাটিও নয় অজর অক্ষয়। শূন্যতা একটি অপেক্ষার সংকেত দেয়। শূন্যতাই আমাদের প্রেরণা দেয় শূন্যতাকে পূরণ করার। আমাদের জীবনকাহিনী শূন্যতা পূরণেরই ইতিহাস। ’ আত্মজীবনী লেখার কৈফিয়ত হিসেবে এই কথাগুলোই বলেছিলেন সৈয়দ হক। অস্তিত্বের গভীরতাকে স্পর্শ করে নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণ করার দিকেই ঝোঁক ছিল তাঁর। লেখালেখি ছাড়া তাই অন্য কিছু করার প্রলোভন থেকে নিজেকে সব সময় দূরে সরিয়ে রেখেছেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন সার্বক্ষণিক লেখক। লেখক হওয়াটাই ছিল তাঁর জীবনের লক্ষ্য ও পরিণাম। কিন্তু নিজেকে তিনি কবি অভিধায় পরিচিত হতে ভালোবাসতেন।

এরই সূত্র ধরে প্রশ্ন উঠতে পারে, কবি কে? পাবলো নেরু দা এর একটা ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। ‘আত্মস্মৃতি’তে তিনি লিখেছিলেন, ‘অতীতে অন্ধকারের সঙ্গে ছিল তাঁর সম্পর্ক। কিন্তু এখন তাঁকে অবশ্যই আলোর ব্যাখ্যা দিতে হবে। ’ আগে কবি ছিলেন পুরোহিত, এখন তিনি ‘সামাজিক কবি’। সৈয়দ শামসুল হকের কথা ভাবতে শুরু করলে বারবার এই কথাটাই মনে পড়ে আমার। শুধু কি কবি? সৈয়দ হক তো একজন সব্যসাচী লেখক। সব্যসাচী কথাটি বহুশ্রুত একটা শব্দ, সৈয়দ হকের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হতে দেখেছি। কিন্তু এই শব্দ দিয়ে কী তাঁর লেখালেখির ব্যাপ্তি স্পর্শ করা যাবে? ব্যাপ্তি ছাড়িয়ে তাঁর সব ধরনের রচনার অন্তর্গূঢ় মহিমাকে? সব্যসাচীর মধ্যে কিন্তু ধরা নেই সেই সাফল্যের শীর্ষবিন্দু। সৈয়দ হকের অনন্যতা মূলত এইখানেই। তিনি যদি শুধু কবিতা লিখতেন, বাংলা কবিতায় তার আসন স্থায়ী হয়ে যেত। যদি লিখতেন কেবলি উপন্যাস, তাহলেও ঔপন্যাসিক হিসেবে বাংলা সাহিত্যের শীর্ষে থাকত তাঁর অবস্থান। নাটক রচনায়ও তাঁর সাফল্য ঈর্ষণীয়। একজন লেখক কিভাবে এতটা বহুমুখী হতে পারেন, কোথাও যাঁর লেখা এতটুকু টাল খায় না; বরং নিজেকে অতিক্রম করে যেতে যেতে হয়ে ওঠেন প্রতিষ্ঠানবিশেষ, তাঁর মহিমা কি এই সামান্য কথামালা দিয়ে বর্ণনা করা সম্ভব?

বাংলা সাহিত্যে এই মুহূর্তে তাঁর তুল্য লেখক আছেন হাতেগোনা কয়েকজন। মনে পড়ছে শঙ্খ ঘোষ আর আলোকরঞ্জন দাশগুপ্তের কথা। বাংলাদেশে নেই একজনও। প্রয়াত হুমায়ুন আজাদের কথা কেউ কেউ বলতে পারেন কিংবা আবদুল মান্নান সৈয়দের। কিন্তু আজাদ সাফল্য পাননি বহুস্বরায়িত ন্যারেটিভ উপন্যাসে, মান্নান সৈয়দ কবিতায়। এ নিয়ে যদি কেউ তর্ক তোলেন, সেই তর্কে আমি সানন্দে অংশগ্রহণ করতে প্রস্তুত আছি। শঙ্খ আর অলোকরঞ্জনের কবিতা নিঃসন্দেহে শিখরস্পর্শী, সমালোচনামূলক সৃজনীগদ্য দুজনেরই তুলনারহিত, প্রাতিস্বিকতায় উজ্জ্বল। কিন্তু কথাসাহিত্যের ভুবনে তাঁরা বিচরণ করেননি, নাটক রচনায়ও নয়। সৈয়দ শামসুল হকের অনন্যতা এইখানেই।

 

এক.

শুরু করেছিলাম কবিতার কথা দিয়ে। কবি হিসেবে চিহ্নিত করা হলে সৈয়দ হক আত্মশ্লাঘা বোধ করেন। হাইদেগারও তো বলেছিলেন, কবিতাই হচ্ছে ‘চিন্তার কণ্ঠস্বর’। কবিতাই সত্যি কথা বলে। সৈয়দ হক লেখালেখির ভেতর দিয়ে এই সত্যের সন্ধান করেছেন বলেই কবি হওয়ার আত্মগৌরবে লেখক হয়ে উঠতে পেরেছেন তিনি। এ কারণেই বলতে পারেন, ‘সত্য কথা বলা উচিত, সত্যপথে চলা উচিত। ’ নেরু দা যেমন বলেছিলেন, অস্মিতাকে ছাড়িয়ে এভাবেই সামাজিক কবি হয়ে উঠেছেন সৈয়দ হক। সামাজিকতার মর্মেই প্রবিষ্ট থাকে রাজনীতির প্রখর বোধ। তবে এটা ঘটেছে ধীরে ধীরে, অনেকটা আত্মআবিষ্কারের মধ্য দিয়ে। কিন্তু আমিত্বকে বাদ দিয়ে কিংবা পাশ কাটিয়ে কী কবিতা রচনা করা সম্ভব? সাহিত্যমাত্রই আমিত্বের বয়ান, সম্প্রতি এই কথাটাই আবার নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন প্রখ্যাত ইতিহাসতাত্ত্বিক রণজিৎ গুহ তাঁর ‘তিন আমির কথা’ শীর্ষক গ্রন্থে। আমিত্বের সঙ্গেই যুক্ত থাকে ‘মানবিকতার ধারণা’। সেই ধারণার চারিত্রও বহুমুখী। কেননা ‘সে ধারণার মূলে আছে প্রখর সমাজচেতনা, তার চারিদিকে বৃহত্তর এক স্বাদেশিকতার বৃত্ত এবং আবার তাকে ঘিরে শিথিল চেতনা-বলয়ে বিধৃত মনুষ্যত্বের সামগ্রিক আদর্শ। ’ সৈয়দ হকের কবিতায় এসবেরই বহুস্বরিক প্রতিফলন লক্ষ করি।

স্বীকারোক্তিমূলক আত্মজৈবনিক কবিতা হচ্ছে আধুনিক কবিতা। সৈয়দ হক তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একদা এক রাজ্যের’ কবিতাগুলো স্বীকারোক্তির এই ধরনটাকেই অন্তর্লীন অনুভবে করে তুলেছেন আরো গভীর। অন্তর্গূঢ় ভাষাশৈলী আর একান্ত ব্যক্তিগত প্রসঙ্গের চমৎকার ব্যবহার ঘটেছে এর ‘পুরনো প্রাসাদ’, ‘মহিলাকে, শিল্পীর উত্তর’, ‘আত্মার মৃত্যু ও কবি যা দেখেছে’, ‘নীল-সবুজ-লাল তমসা’ ইত্যাদি কবিতায়। প্রেমের তীব্র অনুভব আর রিরংসাজনিত বহুমুখী ভাবনায় তখন আচ্ছন্ন ছিলেন কবি। এই প্রথম কাব্যগ্রন্থেই তীব্র ভাষাসচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন তিনি। মগ্নচেতনাস্রোত, পারম্পর্যহীনতা, স্বয়ংক্রিয় লিখন পদ্ধতি, উল্লম্ফনের চমৎকার চকিত ব্যবহারে তাঁর কবিতাকে ভ্যালেরি যেমন বলেছেন, সংগীতের প্রতিস্পর্ধী করে তুলেছেন। তবু এরই মধ্যে ‘আসন্ন পরদেশ’ শীর্ষক কবিতার কয়েকটি পঙিক্ত এই কবিপরিব্রাজকের ভবিষ্যৎ পথকে ঠিক ঠিক চিনিয়ে দেয় : আমি এক নিতান্তই গেঁয়ো লোক, সহজেই ভীত। / পরম করুণা মানি সামান্য রুটি ও জল, / ... ঘরে আছে প্রিয়তমা, তাকে প্রেম—সন্তানেরা, / আমার সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে। এরই ধারাবাহিকতায় পরবর্তী তিনটি কাব্যগ্রন্থ ‘বিরতিহীন উৎসব’, ‘বৈশাখে রচিত পঙিক্তমালা’ এবং ‘প্রতিধ্বনিগণ’-এ আত্মজৈবনিকতার সূত্রে সমকাল ও মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ উপজীব্য হয়েছে। ‘বৈশাখে রচিত পঙিক্তমালা’য় আত্মজৈবনিক স্মৃতিচারণার মধ্যে উঠে এলো উত্তর-ঔপনিবেশিক পূর্ব বাংলা, যেখানে ‘অনুপম শান্তি সমর্পণে বলতেন পিতা একসঙ্গে থাকিস বাছারা। ’ শিকড়চ্যুতি ঘটছে মানুষের। কবি নিজেও তাঁর ‘নীল সুটকেসে’ বহন করে এনেছিলেন ‘কুড়িগ্রাম থেকে ক্রুদ্ধ ধরলার / একটি কল্লোল আর আকন্দের পাতা আর শ্যামলের ছবি। ’  কিন্তু এখন ‘বিয়ারের মাত্রা চড়ে’, ‘দিন বেড়ালের ঘুমে একাকার হয়ে গেছে ডাবলিন ও ঢাকা। ’ গ্রাম-নগরের সংঘাত এড়িয়ে সৈয়দ হক জীবনানন্দের মতোই ফিরে আসতে চেয়েছেন এই বাংলায় : ‘আবার উঠব জেগে খরচৈত্রে চর / হয়ে তোমার পদ্মায়। ... জন্মে জন্মে বারবার / কবি হয়ে ফিরে আসব আমি বাংলায়। ’ স্বাভাবিকভাবেই প্রতিধ্বনিগণে দেশই হয়ে উঠল তাঁর কবিতাভাবনার কেন্দ্রবিন্দু। স্বাদেশিকতা থেকে তিনি উত্তীর্ণ হলেন বিশ্বাত্মবোধে। লিখলেন, ‘এশিয়ার ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে / পূর্ণিমায় কাননঘেরা বিদ্যালয়ের দিকে যেতাম / সেই ধানক্ষেতের ভেতর দিয়েই আমি আজ / অমাবস্যায় আগুনঘেরা বসতির দিকে যাই। ’ রিরংসাজনিত মনোজাগতিক ব্যক্তিসংকট থেকে দেশভাবনায় এবং দেশভাবনা থেকে বৈশ্বিক সংগ্রামী অনুভবে এসে পৌঁছলেন কবি। সম্পূর্ণতা পেল তাঁর কবিতাভাবনার বৃত্তটি।

সৈয়দ হক এরপর মূলত যে বিচিত্র ভাষাভঙ্গিতে যত ধরনের কবিতা লিখবেন, তা এই ভাবার্পণেই আবর্তিত হয়েছে। মানবিক অভিজ্ঞানের ভাবচ্ছবিই মূর্ত হয়ে উঠেছে তাঁর যাবতীয় কবিতায়। প্রাথমিক পর্বে যে ঘন সংহত কবিতার প্রতি তাঁর আকর্ষণ লক্ষ করা গিয়েছিল, তা থেকে সরে এসে বিবৃতির প্রতি বৃদ্ধি ঝোঁক তৈরি হয়েছে। নিজেই এখন তাই অনুভব করতে পারছেন, ‘কত কথা এখনো রয়ে গেছে না-বলা, কত কথা কত নতুন—এখনো আছে আসবার, তারা আসছে এবং তাদের অক্ষরপাত্রে ধরে ফেলবার মুহূর্তেই নতুনতর কথা এসে মধ্যরাতে আমাকে জাগিয়ে দিচ্ছে। ’ মানুষের মর্মমূলে পৌঁছার জন্য এভাবেই তিনি খুঁজে নিয়েছেন নানা পথ। নিজেকে খুঁড়ে খুঁড়েই অনন্ত মানুষের দিকে তাঁর অনিঃশেষ অভিযান। সৈয়দ হক রচিত কবিতাগ্রন্থের সংখ্যা অনেক, প্রায় পঁচিশ ছুঁঁয়েছে। রচনাসম্ভারের প্রাচুর্য নয়, প্রসঙ্গের গভীরতাই তাঁর কবিতার বৈভব। প্রসঙ্গের দিক থেকে প্রায় প্রতিটি কাব্যগ্রন্থেই তিনি নিজেকে অতিক্রম করে নতুন পথের অভিসারী হয়েছেন। তাঁর জীবনব্যাপী কবিতাভিযানের বাঁকে বাঁকে বাতিঘরের মতো জ্বলছে বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ : ‘বৈশাখে রচিত পঙিক্তমালা, পরানের গহীন ভিতর, এক আশ্চর্য সঙ্গমের স্মৃতি, অস্তিত্ব পথিক আমি, বেজান শহরের জন্যে কোরাস, অমা-চন্দ্রিমার কাল, ভালোবাসার রাতে। ’ ভাবানুষঙ্গ ও বিষয়বৈচিত্র্যে ভরা তার কবিতাবিশ্ব। বাকিবভূতি আর বিষয়-বিভঙ্গে রূপময়।

এই ছোট্ট রচনায় ওই অপরিমেয় বৈচিত্র্যের সংকুলান হবে না, তবু কিছু উদ্ধৃতি দিচ্ছি : [১] কখনো কবিকে তুমি খুব কাছে নিয়ো না তোমার, / নিয়ো না দরোজা খুলে তোমার বাড়ির; ধরো যদি তুমি তার / দেখা পেলে, জানতে চেয়ো না সে কেমন আছে; তার / জামার বোতাম যদি খোলা থাকে লাগিয়ে দিয়ো না; / তার চেয়ে চলে যেও তুমি যেমন যাচ্ছিলে পথে, / তার চেয়ে বন্ধ রেখো দরোজা তোমার, তার চেয়ে / ব্যস্তায় সরে যেও সে যদি নিজেই খুব কাছাকাছি আসে [কখনো কবিকে]। [২] যখন দশ লক্ষ ধর্ষিতার আর্তনাদে নষ্টমান আমার শ্রুতি, / এখনো তো আমার শ্রুতি; / যখন তিরিশ লক্ষ মানুষের রক্তে প্লবমান আমার স্মৃতি, / এখনো তো আমার স্মৃতি; / যখন তিন কোটি মানুষের গৃহত্যাগে বিলীয়মান আমার সভ্যতা, / এখনো তো আমার সভ্যতা; / যখন বলীবর্দের দ্বিখণ্ডিত খুরে কম্পমান আমার স্বপ্ন, / প্রিয় ব্রহ্মপুত্র, এখনো তো আমার স্বপ্ন [ব্রহ্মপুত্রের প্রতি]। [৩] কী কামে মানুষ দ্যাখে মানুষের বুকের ভিতরে / নীল এক আসমান—তার তলে যমুনার ঢল, / যখন সে দ্যাখে তার পরানের গহীন শিকড়ে / এমন কঠিন টান আচানক পড়ে সে চঞ্চল? / কিসের সন্ধান করে মানুষের ভিতরে মানুষ? [পরানের গহীন ভিতর # ১৪] [৪] দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ তুমি দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, / তুমি ভাঙলে কেন? পড়লে কেন? দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ? / তুমি দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ [দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের গান]!

কিছুটা উদ্ধৃতি কণ্টকিত হয়ে গেল, কিন্তু এই ছোট্ট রচনায় সৈয়দ শামসুল হকের কবিতার গভীরতা বোঝানোর আর কোনো উপায় ছিল না। ‘সেই রচনাই ভালো, যা নাটকীয় ভঙ্গিতে লেখা হয়,’ কথাটা বলেছিলেন রবার্ট ফ্রস্ট। সৈয়দ হক কবিতায় এই নাটকীয়তার আশ্রয় নেন তাঁর বলার মতো কথা গভীর করে তোলার জন্য। লক্ষ করলে দেখা যাবে, এই বঙ্গদেশ, বঙ্গদেশের মানুষ আর তার সমকালীন ইতিহাস রক্ত, স্বেদ, সমীপতায় সমর্পিত হয়েছে তাঁর কবিতায়। এ কালে মহাকাব্যিক বীরগাথা রচিত হয় না। কিন্তু সৈয়দ হকের লিরিকগুলো যদি বিচ্ছিন্ন না ভেবে একক সমগ্রতায় দেখা হয়, তাহলে মহাকাব্যেরই মহিমা খুঁজে পাবেন আজকের পাঠক।

 

দুই.

কবিতায় সব কথা বলা যায়নি বলে জীবনানন্দ দাশ আরেকটি মাধ্যমে কাজ করেছিলেন, সেটা আখ্যানে। সৈয়দ হকও কি এই অভিপ্রায়ে উপন্যাস রচনায় হাত দেননি? নিজেই তো জানাচ্ছেন, ‘আমি খুঁজি, আমরা কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাচ্ছি এবং কেন?’ কেননা তিনি জানেন, তিনি ‘একা মানুষ, কিন্তু একক’ নন। অনেকের মতো একজন। এই ব্যক্তি আমিকেই তিনি আমাদের জীবনপ্রবাহের মধ্যে নানা রূপে দেখতে চান বলেই রচনা করেছেন উপন্যাস। আশ্রয় নিয়েছেন আখ্যানের। তার এই আখ্যানে ‘আছে মানুষ, আছে দেশ, আছে ঈশ্বর, আছে জগৎ, আছে মানবজীবন, এমনকি পশুও এর বাইরে তো নয়! প্রকৃতিও আছে। আছে নীল আকাশ ও সবুজ প্রান্তর, আছে পর্বত, আছে মরু, আছে মোহনা, আছে সমুদ্র, আছে নক্ষত্র, আছে নভোমণ্ডল, ছায়াপথ। ’ তিনি ‘এই গল্প-প্রবন্ধের লেখক। ’

কিছুদিন আগে ম্যান বুকার পুরস্কার পাওয়া জুলিয়েন বার্নের একটা লেখা পড়ছিলাম, সেখানে তিনি লিখেছেন ‘তীব্র মানবিক আবেগ’ প্রকাশের তাড়নায়ই তিনি উপন্যাস রচনা করেন। সৈয়দ হকের উপন্যাসেও এই মানবিক আবেগের বহুমুখী প্রকাশ খুব সহজেই চোখে পড়ে। শুরু হয়েছিল ‘দেয়ালের দেশ’ ও ‘এক মহিলার ছবির’ মধ্য দিয়ে; শীর্ষস্পর্শী হয়ে উঠলো ‘গুপ্ত জীবন প্রকাশ্য মৃত্যু’তে। দেয়ালের দেশের কাহিনী ও সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে তাহমিনা। মাতৃভাবানুষঙ্গ আর প্রেম—এই দ্বন্দ্বে প্রেমই জয়ী হয়েছে। পরের উপন্যাসটিতে নাসিমা আখতারের নিরাবলম্ব প্রেমহীন জীবনে মাতৃত্বই মুক্তির উৎস হয়ে উঠেছে। মাতৃভাবনা আধুনিক নারীবাদের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। তবে মাতৃত্বের প্রতি সমর্পণ নয়, আত্মজাগৃতিকেই নারীবাদীরা প্রাধান্য দিয়েছেন। সৈয়দ হক বাঙালির সনাতন মাতৃভাবনাকে মান্য করেই রচনা করেছেন ‘এক মহিলার ছবি’। পরের দুটি উপন্যাস ‘অনুপম দিন’ ও ‘সীমানা ছাড়িয়ে’। প্রেম, আত্মসংকট এবং সংকট অতিক্রমের ছবি উপন্যাস দুটির প্রধান উপজীব্য। ‘খেলারাম খেলে যা’ উপন্যাসেও পাওয়া যায় প্রেমশূন্য, বোধশূন্য নায়কের জৈবতাড়িত জীবনের নিষ্করুণ ছবি। নাগরিক পটভূমি আর চিত্রাত্মক ও কাব্যময় ভাষায় রচিত এই উপন্যাসগুলো যে তাঁর সৃজনী প্রতিভাকে রুদ্ধ করে দিয়েছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ খুলে দেয় তাঁর সৃজনী সাফল্যের পথ। উত্তর-ঔপনিবেশিক বাংলাদেশ নানা চেহারায় উপস্থাপিত হয় ‘দূরত্ব’, ‘মহাশূন্যে পরান মাস্টার’, ‘আয়না বিবির পালায়’। কৃষিজীবন থেকে উন্মূলিত মানুষ, নাগরিক নষ্টামি, উত্তর-উপনিবেশবাদী রাষ্ট্র ও জনজীবনের ধারাবাহিক রূপান্তরের ছবি এসব উপন্যাসে উজ্জ্বল। রাষ্ট্র যেখানে বিপন্ন, আত্মপরিচয়ের সংকট সেখানে খুবই স্বাভাবিক। এ রকম পরিস্থিতিতে মানবিক সম্পর্কও যে অমানবিকতায় ক্লিন্ন, খিন্ন, জীর্ণ হয়ে পড়বে, তারই বৌদ্ধিক আখ্যানরূপ লক্ষণীয় হয়ে ওঠে উল্লিখিত তিনটি উপন্যাসে। এসব প্রসঙ্গই অসাধারণ নৈপুণ্যে অনূদিত হলো তার পরবর্তী উপন্যাস ‘স্তব্ধতার অনুবাদে’। নির্জিত জাতিসত্তা, মধ্যবিত্তের ভীতি ও জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার অনুষঙ্গে উপন্যাসটি হয়ে উঠেছে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। তবে এসবের মাঝেও বাঙালি জাতিসত্তাকে এই উপন্যাসে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন ঔপন্যাসিক : ‘বড় শহরে আমি আর কিছু আশা করি না, আমি এই গণ্ডগ্রামগুলোতেই এখন ভবিষ্যৎ প্রত্যক্ষ করি। ’ প্রান্তকে কী এভাবেই কেন্দ্রের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে চেয়েছিলেন সৈয়দ হক, নাকি প্রান্তকেই করে তুলেছিলেন কেন্দ্র? ঔপন্যাসিকের বৌদ্ধিক দায়বদ্ধতা এভাবেই যে উত্তর-উপনিবেশবাদী রাষ্ট্রের রক্ষাকবচ হয়ে ওঠে, লক্ষ করেছিলেন চিনুয়া আচেবে। সব কিছু শুধু ভেঙেই পড়ে না, গড়েও তুলতে হয়।

সৈয়দ শামসুল হক, আমাদের দৃষ্টি এড়িয়ে যায় না যে মুক্তিযুদ্ধের কাহিনীকার হিসেবে অসাধারণ সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন। এই সাফল্য শুধু তাঁর আখ্যান নির্মাণের কারু কীর্তির জন্য নয় অথবা নয় মুক্তিযুদ্ধকে বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বলে। তিনি আমাদের প্রখর ইতিহাস সচেতন, যে ইতিহাস বিকৃতিতে আবিল হয়ে পড়েনি, সফল কাহিনীকার। ব্যক্তিসত্তা ও মনোবিশ্লেষণের প্রতি তাঁর আগ্রহ, কিন্তু এই আগ্রহ আবর্তিত হয়েছে বাঙালি জাতিসত্তা ও মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে তিনি আমাদের জাতীয় কথাকার। মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশ তাঁর বিভিন্ন উপন্যাসে এপিকতুল্য গ্রন্থনায় বিধৃত। ‘নীল দংশন’, ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’, ‘অন্তর্গত’, ‘এক যুবকের ছায়াপথ’ খণ্ড খণ্ড আখ্যান হলেও বাঙালি জাতিসত্তা আর বোধের একক বিন্দুতে স্থির হয়েছে তাঁর ভাবনা।

 

তিন.

লেখক শুধু যা ঘটে যায় তার কথাই বিবৃত করেন না। ব্যক্তিমানুষ আর জাতি ভবিষ্যতে কোন পথে অগ্রসর হবে, জাতিরাষ্ট্রের চরিত্র কী দাঁড়াবে, সেসবের ইঙ্গিতও থাকে তাঁর লেখায়। লেখক এভাবেই জাতিকে বিনির্মাণ করেন। তাঁর এই বিনির্মিত পথেই জাতির উত্থান ও স্থিতি। কথাটা বলেছিলেন কিউবা জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা হোসে মার্তি। সৈয়দ শামসুল হককে আমরা এ রকমই একজন লেখক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে দেখেছি, যাঁর লেখার মধ্যে সমীকৃত হয়ে আছে আবহমান বঙ্গ আর সমকালের বাংলাদেশ। কী কবিতা, কী উপন্যাস, কী নাটক—প্রসঙ্গ ও ভাষাশৈলীর অনন্য কম্পোজিশনে অসাধারণ তাঁর রচনাবলি। লেখক হিসেবে তাঁর যেমন ছিল প্রণীত জীবন, তেমনি তিনি এই বঙ্গদেশেরই হয়ে উঠেছিলেন প্রধান লেখক। জীবনযাপনকেই করে তুলেছিলেন লেখালেখির বিষয়-আশয়, লক্ষ্য ও পরিণাম। পেয়েছিলেন ঈর্ষণীয় সাফল্য। তাঁর লেখকজীবন সাধারণ জীবন ছিল না, ছিল অস্তিত্বমথিত জীবন। নিজেই এ প্রসঙ্গে যে কথা বলেছেন, এখানে তা স্মরণ করতে পারি : ‘আমাদের জন্ম যদিও অর্থহীন ঘটনা, জীবনের অর্থসন্ধানই তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে জীবনকে। এটাও দেখে উঠি, ওই অর্থসন্ধান বস্তুত এক অর্থকল্পনাই বটে। কল্পনার হস্তপদ নেই, কিন্তু মস্তিষ্ক আছে; সেই মস্তিষ্কবোধটাই বুঝি জীবন। জীবনের অনুভবই জীবন আসলে। ’

তাঁর মৃত্যুতে আমরা মর্মাহত, শোকাহত। সব পাঠকের পক্ষ থেকে মহান এই লেখকের প্রতি পরম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জ্ঞাপন করছি।


মন্তব্য