kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আ প ন ক থা

হাসান হলো সব কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ঘটক

নির্মলেন্দু গুণ

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



হাসান হলো সব কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ঘটক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাশে শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে আবুল হাসানের সঙ্গে পরিচয়। পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল মলয় ভৌমিক।

পরিচয়ের প্রথম সূত্রেই ‘কণ্ঠস্বর’-এ প্রকাশিত তার কবিতার জন্য ধন্যবাদ দিলাম। সে আমাকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। আবেগে তার হাত কাঁপছিল। সেই আবেগে কম্পিত হাতটি বহু সময় ধরেছিলাম। এমনকি আমার মনে হয়, আমি তার হাত মৃত্যু অবধি ধরেছিলাম।

কণ্ঠস্বর পত্রিকায় যাঁরা যুক্ত ছিলেন তাঁরা প্রায় সবাই শরীফ মিয়ার ক্যান্টিনে আসতেন। তাঁদের মধ্যে হুমায়ুন কবির, সাযযাদ কাদির, আবদুল মান্নান সৈয়দ, মোহাম্মদ রফিক, রাজীব আহসান চৌধুরী এবং মাঝেমধ্যে রফিক আজাদ আসতেন। শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন ছাড়া পল্টনের আউটার স্টেডিয়াম মাঠের কোনো এক কোনায় আমাদের আরেকটি আড্ডার স্থান ছিল। সেখানে শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন, রশীদ সিনহা ও দিলু ভাই আসতেন। দিলু ভাই মানে কবি দিলওয়ার। দিলু ভাই আমাদের সবাইকে কবিতার জীবনবোধ ও সমাজসচেতনতা নিয়ে কথা বলতেন। তাঁর কথা কিছুটা আমি মানলেও হাসান পাত্তা দিত না। আমি ও হাসান দুজন দুজনকে প্রভাবিত করেছি, কিন্তু আমাদের কাব্যযাত্রার পথ ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত।

শামসুর রাহমানের সঙ্গে পরিচয় ১৯৬৭ সালে। হাসানই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। হাসান শুধু শামসুর রাহমান নয়, আমাদের সমসাময়িক প্রায় সব কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। রাহমান ভাই তখন পুরান ঢাকার আওলাদ হোসেন রোডের পৈতৃক বাড়িতে থাকতেন। কোনো এক সন্ধ্যায় তাঁর বাড়িতে গেলাম। বাড়ির চারপাশে উঁচু উঁচু দালান থাকায় সে বাড়িতে অনেকটা গোধূলি আলোর মায়া লেগে থাকত। এ বাড়িতে বসেই তিনি ‘দুঃখ’, ‘রূপালি স্নান’, ‘কখনো আমার মাকে’-এর মতো অনেক বিখ্যাত কবিতা লিখেছিলেন। আমাদের আপ্যায়ন করে ভেতরে নিয়ে গিয়ে চা-বিস্কুট খাইয়েছিলেন। সম্ভবত আমাদের সঙ্গে জীবনানন্দ দাশের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাতের স্মৃতিচারণা করেছিলেন। জীবনানন্দ দাশের মৃত্যুর কিছুদিন আগে এই সাক্ষাৎ ঘটেছিল।

হাসান হলো সব কবি-সাহিত্যিকের সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার ঘটক। একদিন আমরা মতলব করে দুজন মিলে দৈনিক পাকিস্তানে গেলাম। মতলব ছিল, কবি আহসান হাবীবকে পটানো। কবিতা ছাপার আগে তিনি কবিদের শিল্প-সাহিত্য ও কবিতার ছন্দ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেন। তাই বড় ভয় পেতাম। দৈনিক পাকিস্তানে এর আগে অনেকবার হাসানের কবিতা ছাপা হয়েছে। তাই হাসান তাঁর স্নেহভাজনে সফল ছিল। তবে মূল ব্যাপারটা ছিল আমাকে নিয়ে। আহসান হাবীব সম্পর্কে ভয়ের মূল কারণটা ছিল, তাঁর কবিতা পাঠ্যপুস্তকে পাঠ করেছি এবং পরীক্ষার খাতায় তাঁর ‘এই মন, এই মৃত্তিকা’ থেকে প্রশ্ন এসেছে। তাঁর রুমে ঢুকতেই দেখি, অনেক কবিতা ও পাণ্ডুলিপি নিয়ে তিনি কাটাকাটি করছেন এবং অধিকাংশই ঝুড়িতে ফেলে দিচ্ছেন। একটি সিগারেট ধরিয়ে তিনি আমাদের সঙ্গে কথা শুরু করলেন। হাসান আমার পক্ষে হাবীব ভাইয়ের সঙ্গে ওকালতি করছিল। হঠাৎ সে হাবীব ভাইকে বলল, আপনার কবিতা নির্মলের মুখস্থ। তখন তাঁর ‘এই মন, এই মৃত্তিকা’ কবিতাটি পাঠ করলাম।

একবার তো হাসান হাফিজুর রহমান আমাদের বন্ধুত্বে ফাটল ধরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ‘পরিক্রম’ পত্রিকায় একই পদে আমাদের দুজনকে চাকরি দিয়েছিলেন। আমাদের কাজ ছিল, লেখকদের লেখা সংগ্রহ ও প্রুফ দেখা। প্রথম প্রথম তাই মন কষাকষি হতো। পরে দুজনই মানিয়ে নিয়েছিলাম। যা মাইনে পেতাম, ভাগ করে নিতাম। দ্রৌপদীকে যদি পাঁচ ভাই মিলে ভাগ করে নিতে পারে, আমাদের সমস্যা কোথায়? আরেকবার আমাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছিল। বিষয় কবিতা—কে কাকে ছাপিয়ে যেতে পারে।

প্রথম বই প্রকাশের জন্য ১৯৭০ সালে নওরোজ কিতাবিস্তান, মাওলা ব্রাদার্স ও বইঘর প্রকাশনীতে ধরনা দিয়ে বারবার ব্যর্থ হয়েছি। কোনো প্রকাশকই আমার বই প্রকাশের ঝুঁকি নিতে চায়নি। কবিতার বইয়ের তখন কাটতি কম থাকায় আল মাহমুদের ‘লোক লোকান্তর’ কবি-সাহিত্যিকদের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশ পেয়েছিল। আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর প্রথম বই ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ নিজের টাকায় প্রকাশ করেছিলেন। অবশেষে খান ব্রাদার্স নিজে থেকে আমার প্রথম কবিতার বই প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। এমন সৌভাগ্য আমার কাছের কবিদের মধ্যে আমারই প্রথম ঘটে।

শ্রুতলিখন : গিরীশ গৈরিক


মন্তব্য