kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নিজের শিল্পকর্ম সম্পর্কে

ফ্রিদা কালো

রাজু আলাউদ্দিন

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ফ্রিদা কালো

জার্মান মেক্সিকান ইহুদি পরিবারে ফ্রিদা কালো মেক্সিকোর কয়োআকানে ১৯০৭ সালের ৬ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। ছয় বছর বয়সে ধরা পড়ে তাঁর পোলিও রোগ।

সারা জীবন তিনি এই রোগের প্রভাব বহন করেছেন। আরো একটি জন্মগত রোগকেও তিনি সারা জীবনের জন্য বহন করেছিলেন, সেটি হলো স্পিনা বিফিদা।

১৯২৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর স্কুলে যাওয়ার পথে বাস দুর্ঘটনায় মারাত্মভাবে আহত হন তিনি। এ দুর্ঘটনায় তাঁর মেরুদণ্ড, কাঁধের হাড়, বুকের হাড় ও কোমরের হাড় ভেঙে যায়। ডান পায়ে ১১টি ফ্রাকচার হয়েছিল। এ ছাড়া বাসের একটি লোহার দণ্ড তলপেট দিয়ে ঢুকে জরায়ুকে চিরকালের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এই দুর্ঘটনা জীবনব্যাপী দুঃসহ শারীরিক যন্ত্রণার কারণ হয়েছিল। তিনবার তিনি সন্তানসম্ভবা হলেও দুর্ঘটনার ফল তাঁকে কখনোই মাতৃত্ব অর্জনের সুযোগ দেয়নি।

দুর্ঘটনার পর তিনি পড়াশোনা ছেড়ে আঁকাআঁকিতে মনোযোগী হয়ে পড়েন। সারা জীবনে তিনি ১৪০টি ছবি আঁকেন, যার মধ্যে ৫৫টিই হচ্ছে আত্মপ্রতিকৃতি। অনেকেই তাঁর ছবিকে পরাবাস্তববাদী বলে অভিহিত করেন, যেমনটা করেছেন স্বয়ং আঁদ্রে ব্রেতোঁ। কিন্তু ফ্রিদার নিজের ভাষ্য হচ্ছে, ‘আমি কখনোই স্বপ্ন আঁকিনি, আমি আমার নিজের বাস্তবতাই এঁকেছি। ’

মেহিকোর বিখ্যাত মুরালিস্ট দিয়েগো রিবেবার সঙ্গে পরিচিত হন ফ্রিদা। পরিচয় দ্রুতই পরিণয় এবং পরে ১৯২৯ সালে মায়ের অমত সত্ত্বেও ফ্রিদা বিয়ে করেন রিবেবাকে। বিয়ের কয়েক বছর না যেতেই দাম্পত্য সম্পর্ক ক্রমেই দুর্বল হতে থাকে। সন্দেহ, অবিশ্বাস আর অসহিষ্ণুতা পরস্পরকে দূরে ঠেলে দেয়। শেষে ১৯৩৯ সালের নভেম্বরে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। পরস্পরের বিরুদ্ধে পরস্পরের অভিযোগ বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক। ফ্রিদা ক্রোধে ফেটে পড়েছিলেন, যখন জানতে পারেন তাঁরই ছোট বোন ক্রিস্তিনার সঙ্গে রয়েছে দিয়েগোর সম্পর্ক।

অন্যদিকে ফ্রিদার বিরুদ্ধে নারী ও একাধিক অপর পুরুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টিও আর আড়ালে থাকেনি। লেয়ন ট্রটস্কি, জোসেফাইন বেকারসহ আরো কেউ কেউ ছিলেন তাঁর প্রেমিকদের তালিকায়। এসব সত্ত্বেও বিচ্ছেদ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। বছরখানেকের মধ্যে আবারও তাঁরা পরস্পরকে বিয়ে করেন। এর পরও ফ্রিদা বেঁচেছিলেন সাত বছর। তবে দাম্পত্য জীবনে সুখ ততটা ফিরে আসেনি। দৈহিক যন্ত্রণা ও মানসিক পীড়ন তাঁকে ধীরে ধীরে কাবু করে ফেলেছিল।

চিকিৎসা সেবাগুলো তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিল বটে, তবে তা নারকীয় যন্ত্রণার মতো ছিল। ১৯৫৪ সালের ১৩ জুলাই মাত্র ৪৭ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে তাঁর দিনপঞ্জিতে লিখেছিলেন, ‘আশা করি প্রস্থান আনন্দময় আর কখনো ফেরার আশা করি না—ফ্রিদা। ’

ফ্রিদা শিল্পী হিসেবে যতটা পরিচিত, ততটা পরিচিত নন তাঁর লেখা চিঠিপত্র বা বিভিন্ন উপলক্ষে রচিত কবিতা ও নিজের শিল্পকর্ম সম্পর্কে দু-একটি নিবন্ধের জন্য। খুব সম্ভবত নিজের শিল্পকর্ম সম্পর্কে তিনি দুটি মাত্র ছোট্ট লেখা লিখেছিলেন। একটি তাঁরই আঁকা Moises  ছবির বিষয়বস্তু ব্যাখ্যা করে, আর অন্যটি এখানে প্রকাশিত এই ছোট্ট লেখাটি। লেখাটি কী  উপলক্ষে, কেন লেখা হয়েছিল সে সম্পর্কে তথ্য রয়েছে মূল লেখাটির নিচে ‘দ্রষ্টব্য’ অংশে। এই দ্রষ্টব্য অংশটিও  Escrituras de Frida Kahlo (Edited by Raquel Tibol, published by Lumen, 2007) গ্রন্থের পাদটীকার অনুবাদ। এই পাদটীকায় লেখাটির উৎস ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য রয়েছে বলেই এই লেখাটির সঙ্গে যুক্ত করা হলো।

আইএনবি (INB)-এর প্রশ্নের জবাবে ফ্রিদা কালো

দুর্ঘটনায় মেরুদণ্ড, পা ও আরো কিছু হাড়গোড় ভেঙে যাওয়ায় শারীরিক দুর্ভোগের পর বছরখানেক বিছানায় বিশুদ্ধ বিরক্তি থেকে আঁকতে শুরু করি। তখন আমার বয়স ১৬। মেডিসিন নিয়ে পড়ার প্রবল আগ্রহ ছিল। কিন্তু ট্রাম আর কয়োয়াকান-এর বাসের সংঘর্ষ এই স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দেয়। তখন যেহেতু বয়স কম ছিল, তাই এই দুর্ঘটনা সে সময় এত বড় কিছু মনে হয়নি। ডাক্তারি পড়ার বদলে অন্য সব কিছু করার জন্য এক উপচেপড়া শক্তি অনুভব করতাম। আর অজান্তেই শুরু করে দিয়েছিলাম আঁকাআঁকি।

আসলে আমি জানি না আমার ছবিগুলো পরাবাস্তববাদী কি না, তবে এটুকু জানি যে কারোর কোনো মূল্যায়ন বা অবমূল্যায়নকে বিবেচনায় না নিয়েই এগুলো আমার নিজেরই অস্পষ্ট প্রকাশ। ন্যূনতম গৌরব বা উচ্ছাশা ছাড়াই, কেবল নিজের ভালো লাগা এবং পরে এই কাজ দিয়ে জীবিকা নির্বাহের জন্য কিছুটা আঁকাআঁকি করেছি। যখন ঘুরে বেড়িয়েছি, তখন যতটা পেরেছি দেখেছি এবং লক্ষ করেছি ভালো শিল্পকর্ম যেমন, তেমনি বাজে শিল্পকর্মও। এ থেকে দুটি ইতিবাচক জিনিস আমি বের করার চেষ্টা করেছি : একটা হলো যতটা সম্ভব সব সময় নিজের মতো হওয়া, আরেকটা হলো আমি যেভাবে চাই ও যা কিছু চাই তা আমার জন্য বহু মানুষের জীবন যে যথেষ্ট নয়—সে সম্পর্কে তিক্ত ধারণা।

১৮ থেকে ২০ শতকের মেহিকানো শিল্পীদের ৪৫টি আত্মপ্রকৃতির প্রদর্শনীর একটা আয়োজন করেছিল জাতীয় চারুকলা ইনস্টিটিউট (INB) ১৯৪৭ সালে সেখানে প্রত্যেক আত্মপ্রতিকৃতির (ফ্রিদার আঁকা Diego en mi Pensamiento, 1943, তাতে প্রদর্শিত হয়েছিল) পাশে অত্ঃবং ঢ়ষধংঃরপধং বিভাগের প্রধান ও প্রদর্শনীর আয়োজক ফের্নান্দো গামবোয়ার অনুরোধে প্রত্যেক শিল্পীর লেখা অনুভূতি সংযুক্ত হয়েছিল।

সংক্ষিপ্ত জীবনীতে জন্মসাল ভুলক্রমে ১৯১০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা স্বয়ং ফ্রিদাই বহু আগে এই তথ্য দিয়েছিলেন। সত্যিকারের জন্ম তারিখটি ৬ জুলাই ১৯০৭—আকস্মিকভাবে প্রকাশিত হয় ১৯৮১ সালে, যখন জার্মান টেলিভিশনের দুই পেশাদার লোক, জিসলিন্ড নবাকৌস্কি ও পিটার নিকোলাই ফ্রিদা সম্পর্কে আধা ঘণ্টার একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করতে মেহিকো আসেন। এই তথ্যচিত্রে যাতে নতুন কিছু অন্তর্ভুক্ত হয়, সেই আশায় আমি লেখক মার্কো আন্তোনিও কম্পোসকে অনুরোধ করেছিলাম তিনি যেন ধর্মমাতা ইসাবেল কাম্পোসসহ জার্মান টেলিভিশনের ওই দুজনকে সহযোগিতা করেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণের সময় ইসাবেল কাম্পোস দুই জার্মান ভদ্রলোককে বলেছিলেন যে ফ্রিদার জন্ম ১৯১০ সালে নয়। কারণ ফ্রিদা ছিলেন তাঁর চেয়ে এক বছরের ছোট। ইসাবেলের জন্ম ১৯০৬ সালে। ইসাবেলের বক্তব্য যাচাই করার জন্য ফ্রিদার জন্ম নিবন্ধন মিলিয়ে দেখা হয়েছে। —রাকেল তিবোল


মন্তব্য