kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সৈয়দ শামসুল হকের গল্প

ঠিকানায় থাকে না আবদুল খালেক

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। তিনি ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় তাঁর স্ত্রী কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হকের অনুলিখনে ‘ঠিকানায় থাকে না আবদুল খালেক’ নামে গল্প লিখেছেন কালের কণ্ঠ’র জন্য। কালের কণ্ঠ পরিবারের প্রার্থনা—সুস্থ হয়ে উঠুন এই সব্যসাচী ঔষশ

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ঠিকানায় থাকে না আবদুল খালেক

হৃদপিণ্ড না থাকলে শরীর চলে? জন্ম থেকে কাজ করে, মৃত্যু পর্যন্ত কাজ করে যায়। আলো-বাতাসের মধ্যে হৃদযন্ত্রের কাজটি আমরা অনুভবও করতে পারি না।

কিন্তু যখন সামান্য বৈকল্য দেখা দেয়, আমরা চমকে উঠি, এত দিনের বিশ্বস্ত ভৃত্যের বেচাল দেখে ত্রুদ্ধদ্ধ হই, পকেটের অজস্র পয়সা ঢেলে তাকে সোজা পথে আনতে চেষ্টা করি।

কিছুদিন আগে আমার এ রকম হয়েছিল। অনেক ছোটাছুটির পর এক বিশেষজ্ঞ বললেন, হৃদযন্ত্রে বাইপাস করাতে হবে। করালামও। আচ্ছন্নের মতো শুয়ে আছি রোগশয্যায়। দিন কী রাত কিছুই বুঝি না। কে যেন কানের কাছে ফিসফিস করে একবার বলল, অ্যানেসথেসিয়া একটু বেশিই পড়েছে। তাই এই আচ্ছন্নতা এখনো কাটছে না।

আর এই আচ্ছন্নতার ভেতরে থেকে থেকেই মনের মধ্যে ছবি উঠে আসছে। কত মানুষের ছবি। যাদের আমি একবার দেখেছিলাম, ভুলে গিয়েছিলাম, হঠাৎ তারা স্পষ্ট হয়ে আমার সমুখে দাঁড়িয়েই মিলিয়ে যাচ্ছে।

আমি ঘুমিয়ে পড়ি, আবার জেগে উঠি, আবার ছবি দেখি। ছবির পর ছবি। মানুষের মুখের ছবি। এই ছবির ভেতরে একদিন গভীর বিকেল কী রাত জানি না, একটি মুখ আমার চোখের সম্মুখে সেই তার চিরচেনা বাঁকা ভ্রুকুটি নিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।

তাকে চিনে উঠতে আমার একমুহূর্ত দেরি হয় না। কোথায় যেন স্মৃতির কালো কাক কা কা করে ওঠে।

মনে পড়ে যায় বহু দিনের পুরনো এই বন্ধুর কথা। বহু দিন যাকে ভুলেছিলাম।

আমার সেই বন্ধু—নানা রাজনীতির ঘাটের মানুষ—আওয়ামী, বিএনপি, জাসদ, বাসদ, এমনকি সর্বহারা—কিছুই সে বাদ রাখেনি। টাকাও করেছে প্রচুর। লোকে মুখে মুখে বলে কোটি কোটি। গাড়ি আছে তিনটি—মার্সিডিজ, অভি আর টয়োটা, সবচেয়ে দামি সংস্করণ। বাড়িও তার তিনটি। গুলশানে দেড় বিঘা জমির ওপরে রাজার প্রাসাদ, বনানীতে ফুটবল মাঠের মতো ফ্ল্যাট আর নিভৃতে সময় কাটানোর জন্য বারিধারায় গোপন একটি ছোট্ট নিবাস।

আচ্ছন্ন হয়ে আবদুল খালেকের ছবিখানা আমার বুকের ওপরে টেনে নিই। যদিও তার সঙ্গে আমার মত, পথ ও ভাবের কোনো মিল নেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাকে তো একটা লম্বা চড়ও কষে দিয়েছিলাম রাজাকারের দলে যোগ দেওয়ার জন্য, সে রাগ পড়েনি; বরং চড়টা খেয়ে খেপা পাগলা একখানা হাসি দিয়েছিল, তোর কানে কানে বলে রাখি এ পাকিস্তান থাকবে না, আমি শুধু সেই বিদায়ী পাকিস্তানের ঝুল ধরে খানিকটা বিত্ত খামছে ধরে রাখার চেষ্টা করছি।

আমি চিৎকার করে উঠেছিলাম। তোর কাছে বড় হলো বিত্ত? বাংলার স্বাধীনতা কিছু নয়? তখন মনে হয়েছিল আমি তাকে জন্মের মতো ছেড়ে চলে আসি।

সেই আবদুল খালেক। আবার আবদুল খালেক। আমার খুব ইচ্ছা করতে লাগল একবার তাকে ডাকি। কাকে যেন বললাম, আবদুল খালেককে চেন? আমার বন্ধু? সে বলল, আবদুল খালেকের মতো নষ্ট-দুষ্ট, হৃদয়হীন একটা মানুষ আপনার বন্ধু?

আমি বলেছিলাম, বন্ধু সেই ছেলেবেলার। তখন সে নষ্টও ছিল না, দুষ্টও ছিল না। সময় তাকে বদলে দিয়েছে। সময় আমাদের এভাবেই বদলে দিয়ে যায়—তাকে খুঁজে পাওয়া এ শহরে অতি সহজ। তার অফিসে গিয়ে একবার খবর দাও, আপনার বন্ধু যে হাসপাতালে আপনি জানেন? আপনাকে সে দেখতে চায়।

দিন যায়, রাত রায় রবিবার থেকে রবিবার ঘুরে আসে, সোমবার থেকে সোমবার, আবদুল খালেকের দেখা আর পাই না।

তারপর কে একদিন আমার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে, ‘স্যার, আপনার বন্ধুকে পাওয়া যাচ্ছে না। ’

আমিও তন্দ্রার ভেতরে অস্পষ্ট উচ্চারণ করে উঠি, সেকি? লোকটি তখন বলে, ‘তাঁর তিন বাড়িতেই গেছি। কোনো বাড়িতেই তাঁকে পাইনি। কোনো বাড়িতে বহু দিন তিনি আসেননি, থাকেননি। ’

আমি জিজ্ঞেস করি, তার ছেলেমেয়ে?

সে উত্তর করে, বোধ হয় মালয়েশিয়ায়।

তাহলে সেও কি সেখানে?

কী জানি স্যার, আমরা খোঁজ নিয়েছি, তিনি সেখানেও নেই।

আমি আচ্ছন্নের মতো বালিশে মাথা দিয়ে পড়ে যাই। আবদুল খালেক ঠিকানায় থাকে না—তবে কি সে শেষ ঠিকানায়? সে আর বেঁচে নেই?

দিন যায়, রাত যায়, হাসপাতাল আমাকে ধরে রাখে।

স্যার, আপনাকে আরো কিছুদিন আমরা রাখব।

না চেতন, না অচেতন আমি রাজধানীর এই বিশাল হাসপাতালের বেডে এপাশ-ওপাশ করি। আর উচ্চারণ করি—কোথায় তুমি, কোথায় তুই, একবার আয়।

আমার কথা কি তার কানে পৌঁছায়? টেলিপ্যাথি বলে একটা কথা আছে। সেটাও কোনো কাজে লাগে না। আবদুল খালেক আমার ডাক শুনতে পায় না।

তারপর একদিন হঠাৎ কয়েকটি প্রশ্ন আমার মাথায় আসে। বোধ হয় আমার আচ্ছন্নতা একটু একটু করে কাটছে। আবদুল খালেক যে তার ঠিকানায় থাকে না, সে কি কোনো নারীর ভয়ে, যে তাকে তাড়া করে ফিরছে? নাকি ব্যাংকের রক্তচক্ষুর ভয়ে, যে তার সম্পদের পাহাড় ভেঙে পড়বে। তাই তার পালিয়ে বেড়ানো অথবা শুধুই একাকী সে থাকতে চায়? তাই কি সে অন্য কোথাও বাসা নিয়েছে?

ওই যে টেলিপ্যাথির কথা বললাম, ওটা তাহলে এখনো মাঝেমধ্যে টিকটিক করে কাজ করে। চোখ খুলে দেখি আমার সম্মুখে আবদুল খালেক সটান দাঁড়িয়ে। আমার মুুখ আমি টের পাই হাসিতে ভরে উঠছে। আমার সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধু। সে তার ঠিকানায় আর থাকে না। কোথায় থাকে জিজ্ঞেস করতে রহস্যময় একটা হাসি দিয়ে বলে, দোস্ত, আমি এখন আমার নিজের ভেতরে থাকি!

নিজের ভেতরে?

বুকের ওপর টোকা মেরে আবদুল খালেক দেখায়, এই তো এখানে! বিস্ময়ে আমি বলি, তুই? তোর মুখে এই কথা! আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকি। সে বলল, দোস্ত, মেয়ে মানুষ দেখেছি, টাকার পাহাড় দেখেছি, সন্তানের উজ্জ্বল মুখ দেখেছি আর—

বল তো কী?—তারপর বলে, তোকে দেখেছি! তুই আমার সোনার কপাট খুলে দিয়েছিস। সেই কপাট খোলা ঘরের ভেতরে কোনো নষ্ট-দুষ্ট বা ধ্বংসের অধিকার নেই। আছে শুধু তোর সেই কথা, আবদুল খালেক, ভালো হয়ে যা। মানুষের কোনো ঠিকানায় না থেকে আমি সেই ভালো হওয়ার চেষ্টা করছি। যদি কোথায় থাকি জানতে চাস, তাহলে আমি আমার দাদার সেই ভেঙে পড়া জলেশ্বরীর বাড়িতে যাই। আবদুল খালেক আমার বুকের ওপর মাথা রেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।

জগৎ তার চোখের জলে ভেসে যায়। দক্ষিণের বিপুল বিশাল জীবন সমুদ্রের দিকে।


মন্তব্য