kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মঞ্চ নাটক

সংকটের গভীরে সন্তরণ ‘গহনযাত্রা’

ফাতেমা আবেদীন

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সংকটের গভীরে সন্তরণ ‘গহনযাত্রা’

‘গহনযাত্রা’ নাটকের একটি দৃশ্য

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে সংকটের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। আমাদের সংকটেই জন্ম, সেখানেই পতিত প্রত্যহ।

কেউ চেষ্টা করি সংকট ঝেরে-কেটে উঠে পড়তে, কেউ অজান্তেই আরো জড়িয়ে পড়ি। তবে সংকটের গভীরে প্রবেশ করে সেটি থেকে মুক্তির চেষ্টা খুব কম বললেই চলে। এড়িয়ে চলার অভ্যাস আমাদের। এড়িয়ে চলতে চলতেই সংকটের গহিনে যাত্রা করি। পদাতিক নাট্যসংসদ (টিএসসি) প্রযোজিত, সুদীপ চক্রবর্তীর নির্দেশনায় রুবাইয়াৎ আহমেদের আখ্যান গহনযাত্রা আমাদের কিছু প্রাত্যহিক সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।   নিত্যদিনের উচ্ছল জীবন কী করে ছন্দ হারায়, কী করে একটু একটু করে নিঃস্ব হয় সেই গল্পই গহনযাত্রা। শামছি আরা সায়েকার একক অভিনয়ে দ্বৈত সত্তার মঞ্চচারণ আমাদের মনে করিয়ে দেয় কতটা অসহায় যাপন আমাদের। আমরা দেখি মঞ্চ মাতিয়ে বেড়ানো সালমা নামের সেই একাকী নারীর প্রেম, ভালোবাসা, আনন্দ-উচ্ছলতা সব কিছু ছাপিয়ে রাজনৈতিক সংকটের কালো আচ্ছাদন অন্ধকার করে দেয় মঞ্চকে। কখনো আবার তৈরি করে হাহাকার, সালমার সন্তানসম ছোট্ট বাহারসহ প্রতিবেশীদের লাশ বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দেয়। সৃষ্টি করে হাহাকার। প্রেমিক আরিয়ানকে খুঁজে বেড়ানো, না পাওয়ার আকুতি, আবার প্রেমময় মুহূর্তের ফ্ল্যাশব্যাক মঞ্চের দর্শককে কখনো হতাশ, কখনো রোমান্টিক, কখনো কৌতূহলী করে তোলে।

তবে সালমার দ্বিতীয় সত্তা পম সব সময় আমাদের দ্বিধাগ্রস্ত করে তোলে। কে এই পম। সালমার মধ্যে বসবাসকারী এই সত্তা কখনো সালমা, কখনো অন্তর্যামী, কখনো পরম বন্ধু হয়ে ওঠে। তার পরিচয় খুঁজতে খুঁজতেই ধর্মীয় প্রহসন আর বিভেদের খড়গের নিচে একে একে প্রাণ হারায় সালমার স্বজনরা, প্রেমিক আরিয়ান এবং সব শেষে সালমা। নির্মম মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সালমা ও তার সহযোগী সত্তার যাত্রা শেষ হয়। সালমার রুখে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টা, পমের সাবধান বাণী আমাদের এই সমাজের নিত্য সংগ্রাম করা মানুষগুলোর মুখকেই বারবার মনে করিয়ে দেয়। এই মঞ্চনাটকের নাট্যকারকে এক শব্দে সফল বলা যায়, সংকটের গভীরে গিয়েও যে সমাধান না পেয়ে আমরা বারবার ফিরে আসি, বরণ করে নিই মৃত্যুকে। তবে লড়াই করে নির্মম মৃত্যু বরণ করে নেওয়া যে নারীর আখ্যান তিনি রচনা করেছেন, সেটি আমাদের ভাবালু করে তোলে, আমাদের কাঁদায়, একাকী করে তোলে। আমাদের মুখোমুখি করিয়ে দেয় প্রতিদিনকার লড়াইয়ের সঙ্গে।

নাট্যনির্দেশক নিঃসন্দেহে একটি ধন্যবাদ পান। মঞ্চে এক নারীকে ঘিরে তিনি যে শত মানুষের ভাষ্য উপস্থাপন করেছেন সেটিকে সার্থকতা নাম দেওয়াই উচিত। সংগীত ও আলোক নিয়ে কোথাও বিব্রত হতে হয়নি দর্শককে। অন্তত ব্যক্তিগতভাবে একজন দর্শক হিসেবে আমি নিজে সন্তুষ্টই ছিলাম। আমি নিজেই থেকে থেকে একজন সালমা বা পম হয়ে উঠছিলাম। অন্যদিকে পোশাক আর মঞ্চ সজ্জা নিয়ে না বললেই নয়। খুব সামান্য কিছু পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই যেসব দৃশ্যকল্পের অবতারণা হয়েছে, মঞ্চে সেটি অবশ্যই দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে। মঞ্চে ছড়িয়ে থাকা বসার টুলের মতো ছোট ছোট বাক্স যখন নাটক শেষে একটি চরিত্র হয়ে ওঠে তখন দর্শক শুধুই বিস্মিত আর বিমোহিত হয়েছে। সালমার কালো আচকানের মতো পোশাক শোকের মূর্ত প্রতীক হয়েছে কখনো, কখনো তাকে অচেনা করে তুলেছে। ময়ূরের সেই পোশাক আমাদের স্বপ্নালু করেছে। আবার অন্তিম যাত্রার সেই সাদা পোশাক মনে করিয়ে দিয়েছে শান্তির কথা। সব মিলিয়ে কিছু ক্ষুদ্র বিচ্ছিন্নতা ছাড়া এই মঞ্চনাটকটি সবাইকে নিজের মুখোমুখি করেছে। সংকটের গহিনে নিয়ে গেছে আমাদের ক্ষণিকের জন্য।

 


মন্তব্য