kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শহীদ কাদরীর অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শহীদ কাদরীর অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

বাংলা ভাষার প্রধান কবিদের একজন শহীদ কাদরী। নিউ ইয়র্কে এসে নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকে তাঁর সঙ্গে প্রথম টেলিফোনে আমার যোগাযোগ হয়।

তাঁর কবিতার সঙ্গে যতই পরিচিত হতে থাকি, ততই মনে হতে থাকে, এই কবিকে বাংলার তরুণ প্রজন্ম কেন বিস্মৃত হবে? আমি তাঁর বেশ কিছু সাক্ষাত্কার দেশের বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশ করতে থাকি। বিশেষত দৈনিক আজকের কাগজের সাহিত্য সাময়িকীতেই এগুলো প্রকাশিত হয়। পরে অবশ্য রফিক আজাদের সৌজন্যে ওই লেখাগুলোই আবার ধারাবাহিকভাবে ‘কালের যাত্রা’য় স্থান করে নেয়। ২০০৫ সালে আমার লেখা বই ‘শহীদ কাদরী : সময়ের সম্পন্ন স্বর’ প্রকাশ পায়। এসব কাজে আমি চারবার বোস্টনে যাই কাদরীর সঙ্গে দেখা করার জন্য। একবার বন্ধু রনকের বাসায়, এমনকি এক খাটে ঘুমানোর অভিজ্ঞতা হয়। ২০০০ সালে প্রথম শব্দগুচ্ছ কবিতা উৎসবে তাঁকে নিয়ে আসি নিউ ইয়র্কে। থাকেন আমার বাসায়। কত কত গল্প, কত কত আড্ডা! আজ আনন্দের ব্যাপার হলো, শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের পাশাপাশি আমাদের দেশের তরুণ কবিরা একই রকম গুরুত্ব দিয়ে শহীদ কাদরীর কবিতা পড়েন। আমার সম্পাদিত ‘বিশশতকের বাংলা কবিতা’ সংকলনেও তিনি একজন প্রধান কবির মর্যাদা পেয়েছেন। গত ২৮ আগস্ট নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ড জুইশ হাসপাতালে ঘুমের মাঝে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। কিন্তু তাঁর কবিতা ‘সাদা ভাত ঠিক উঠবেই ফুটে তারাপুঞ্জের মতো’—এমন চিত্রকল্প, বলার আলাদা কৌশল, ভাষার নতুন জৌলুস অম্লান হয়ে থাকবে। তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে আমার নেওয়া তাঁর একটি সাক্ষাত্কার কালের কণ্ঠে ছাপা হলো।

হাসানআল আব্দুল্লাহ

 

হাসানআল আব্দুল্লাহ : যে নাটকটা হারিয়ে ফেললেন তার কত দিন পর থেকে কবিতা লেখা শুরু করেন?

শহীদ কাদরী : একই সময়ে। মানে ক্লাস টুতে! একই সময়ে আমি কবিতা লেখা শুরু করি। আমার প্রথম লেখার নাম ‘পরিক্রমা’ ছাপা হয়েছিল ‘স্পন্দন’ নামের একটি পত্রিকায়। তবে আমার কবিতার আর্লি ডেভেলপমেন্ট খুব কুইক। চার নম্বর কবিতা ছাপা হয় ‘কবিতা’ পত্রিকায়।

হা. আ. : এটাই কি বুদ্ধদেব বসুকে পাঠানো প্রথম কবিতা? না, আগেও পাঠিয়েছিলেন।

শ. কা. : এটাই প্রথম। শামসুর রাহমান কপি করে পাঠিয়েছিলেন। কবিতাটি পড়ে বললেন, এটি একটি ভালো কবিতা, তুমি কবিতা পত্রিকায় পাঠিয়ে দাও। আমি বললাম, আমার হাতের লেখা তো ভালো না। তখন শামসুর রাহমান নিজেই কপি করে পাঠালেন।

হা. আ. : বুদ্ধদেব বসু কোনো চিঠি দিয়েছিলেন কি?

শ. কা. : হ্যাঁ, উনি তো তখন পোস্ট কার্ডে লিখতেন। এক লাইন লিখেছিলেন, তোমার কবিতাটি মনোনীত হয়েছে। বু ব। বুদ্ধদেব বসু। নিজের নামকে সংক্ষিপ্ত করে ওভাবে লিখতেন।

হা. আ. : দেখুন অনুভূতিটা কেমন। ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখা ছাপা হয়েছে, কবি হয়ে গেছি—এমন একটি আত্মবিশ্বাস। আর আমাদের সময়ে এ রকম একটি পত্রিকাও নেই...

শ. কা. : এর আগে অবশ্য ‘পূর্বাশা’য় ছাপা হয়। ভুল বলেছি, চার নম্বর কবিতা, ‘গোধূলির গান’ ছাপা হয়েছিল ‘পূর্বাশা’য় আর পাঁচ নম্বর কবিতা ‘এই শীতে’ ছাপা হয় ‘কবিতা’য়। ‘গোধূলির গান’ কোনো বইয়ে নাই। চার-পাঁচটা কবিতা বইয়ে নাই। সব মিলে ওই সময়ের সাত-আটটা কবিতা বইয়ে নাই।

হা. আ. : প্রথম বই বেরোনোর পর থেকে সম্ভবত  গুরুত্ব দিয়ে কবিতাগুলো সংগ্রহ করা শুরু করেন।

শ. কা. : প্রথম বই বেরোনোর পর সব কবিতাই আমার কাছে ছিল। তার কারণ, প্রথম বই বের হওয়া নিয়ে বেশ গণ্ডগোল হয়েছিল। আমাকে আল মাহমুদ বললেন, আমার সঙ্গে এক প্রকাশকের কথা হয়েছে। তিনজনের [শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী] বইয়ের একটি প্যাকেট করে বের করবে। আমার কাছে তখন কবিতা নেই। এই প্রস্তাবের পরও দু-তিন বছর পার হলো। একদিন আল মাহমুদ বাসায় এসে বললেন, তোমাকে ছাড়াই প্রকাশক বই বের করবে। শামসুর রাহমান জিজ্ঞেস করলে আমি বললাম, আমার কাছে একটি কবিতাও নেই। তবে অধিকাংশ কবিতাই বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। ‘কবিতা’ পত্রিকায় প্রকাশিত কবিতাগুলো ছিল শামসুর রাহমানের কাছে। তখন আল মাহমুদ ও শামসুর রাহমান দুজনই বিভিন্ন পত্রপত্রিকা থেকে কবিতা কেটে ‘উত্তরাধিকার’ বইয়ের পাণ্ডুলিপি করে দেন। আমি সব সময়ই কবিতার অরিজিনাল কপি ছাপতে দিতাম। আল মাহমুদ তখন সমকাল-এ কবিতার পাতা দেখতেন। বাসায় এসে কবিতা চাইলে অরিজিনাল দেখাতাম। তখন খাতার পাতা ছিঁড়ে কবিতা নিয়ে যেত।

হা. আ. : এভাবে দুটি বই বেরিয়ে গেল?

শ. কা. : প্রথম বই বের হওয়ার পর আমার নাইন্টিনাইন পার্সেন্ট কবিতা আল মাহামুদ নিয়ে ‘সমকাল’-এ ছেপে দেন। ‘বৃষ্টি বৃষ্টি’ কবিতাকে ভেবে ছিলাম পরিমার্জনা করব। কিন্তু আল মাহমুদ নিয়ে যান। বলেন, এটাই ঠিক আছে। পরে আর সংশোধন করা হয়নি। তবে এর পরে আমি একটু সিরিয়াস হয়েছিলাম। কবিতাগুলো সংগ্রহ করতাম। প্রথম বই বের হওয়ার বেশ কয়েক বছর পর দ্বিতীয় বই বের হয়। প্রথম বই ১৯৬৭, দ্বিতীয় বই ১৯৭৪ বা ৭৫ সালে।

হা. আ. : আপনি এইট্টিফাইভে যে পাণ্ডুলিপি হারিয়ে ফেলেন, কতগুলো কবিতা ছিল ওটাতে?

শ. কা. : স্পষ্ট মনে নেই। তবে ধরো গোটা পঁচিশেক। তার মধ্যে কিছু ছিল ঢাকায় ছাপা কবিতা। আমার মনে হয় গোটা তিনেক আউটস্ট্যান্ডিং কবিতা হারিয়েছি।

হা. আ. : তিনটি ভালো কবিতা কিন্তু কম নয়। আপনি দেশের বাইরে তো আসেন এইট্টি টুতে?

শ. কা. : না, দেশের বাইরে আসি সেভেন্টি নাইনে, আদতে সেভেন্টি এইটের আগস্ট কি সেপ্টেম্বরে।

হা. আ. : তার মানে সেভেন্টি এইট পর্যন্ত আপনি কলাম লিখেছেন।

শ. কা. : কলাম লিখেছি স্বাধীনতার পর থেকে...। একটি পত্রিকায় আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী এডিটর ছিল...নাম ভুলে গেছি। দৈনিক পত্রিকা। ওটাতেই প্রথম কলাম লেখা শুরু করি। গাফ্ফার বলল, কলাম লেখো...ওখান থেকেই শুরু। গাফ্ফার চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের মানুষ ছিলেন।

হা. আ. : আবার কবিতার কথায় ফিরে আসি। আপনাদের সময়ে কবিতার উন্মাদনা ছিল কেমন?

শ. কা. : ভয়াবহ। আমাদের সময় তো নয়, আমাদের মধ্যে ছিল, আল মাহমুদ বলো, শামসুর রাহমান বলো, প্রতিমুহূর্তে কবিতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কবিতা ছাড়া কিছু ভাবিনি আমরা। বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন না সুধীন দত্ত সম্পর্কে যে তিনি অনেক কিছু হতে পারতেন, দার্শনিক হতে পারতেন, বিজ্ঞানী হতে পারতেন...। কিন্তু কিছুই করলেন না। শুধু কবিতা লিখলেন, নাকি মন্ত্রমুগ্ধ কানে আর কোনো আহ্বানই তিনি শুনতে পাননি। এটাই বলা যায়, আমাদের মন্ত্রমুগ্ধ কানে অন্য কোনো আহ্বান পৌঁছায়নি। এটাকে ঠিক উন্মাদনা না, একাগ্রচিত্তে অনুশীলন। এটাই আমাদের মধ্যে ছিল।

হা. আ. : উন্মাদনা বলতে কবিতার স্বরলিপি জানা নেই, যুগের সঙ্গে নেই সম্পৃক্ততা তার পরও লিখে যাওয়া এবং লেখার সঙ্গে সঙ্গে ছোটাছুটি শুরু হয় সেটা কোথায় ছাপানো যাবে, কোন মাঠে গিয়ে জনতার সামনে সাততাড়াতাড়ি পড়ে আসা যাবে।

হা. আ. : শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ দুজনের অনেক ছোট আপনি...

শ. কা. : ওঁদের সঙ্গে ঘুরতাম...

হা. আ. : কিন্তু তাঁদের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্বের সম্পর্ক কী করে হলো? ধরুন শামসুর রাহমান, শামসুর রাহমান থেকে তো আপনি অনেক ছোট, প্রায় ১৪ বছরের ছোট।

শ. কা. : শামসুর রাহমানের ছোট ভাই ও আমি একই সঙ্গে পড়তাম, একই ক্লাসে। বাট হি [রাহমান] লাইকড মি ভেরি মাচ। আবার শামসুর রাহমান যখন ইউনিভার্সিটিতে মাস্টার্স পড়ছেন—অবশ্য তিনি অনেকবার লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন, কয়েকবার বিএ পরীক্ষা দেননি, কয়েকবার মাস্টার্স পরীক্ষা দেননি, তখন একটি ইংরেজি পত্রিকা বেরোত ‘কাউন্টার পয়েন্ট’, ইংরেজি লিটারারি ম্যাগাজিন, যার সুবাদে আমার বড় ভাইয়ের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক হয়। শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার ও আমার বড় ভাই উভয়েরই সম্পর্ক ছিল। শামসুর রাহমান আমাকে ছোট ভাইয়ের মতো দেখতেন। তিনি প্রতিদিনই বাসায় আসতেন।

হা. আ. : আল মাহমুদের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব হলো কিভাবে?

শ. কা. : একদিন ‘সওগাত’ অফিসে... আমার একটি কবিতা ছাপল আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। গাফ্ফার তখন ছাত্র ছিল। সওগাতে চাকরি করত। তা একদিন বসে আছি বেশ কয়েকজন। আল মাহমুদ এলো, একটি পত্রিকা সবার হাতে দিল। দেখি, পত্রিকায় আল মাহমুদের কবিতা। ‘বিছানায় শরীর ঢেলে, জানলায় দৃষ্টির তীর মেরে...। ’ আমি পড়ে বেশ হাসাহাসি করলাম, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্ ছিলেন সেখানে, বললাম, দেখেন কী লিখেছেন। তিনি আমাকে ইশারায় সতর্ক করে দিলেন, পত্রিকাটির বাহকই আল মাহমুদ। আমি তো আর জানি না উনিই আল মাহমুদ। অবশ্য ঢাকায় নতুন এসেছেন। যদিও এরই মাঝে দু-একটি কবিতা ছাপাও হয়েছে বিভিন্ন পত্রিকায়। মুনীর চৌধুরী যখন জেলে গেলেন, তখন ‘সওগাত’-এ ছাপা হয় ‘অধ্যাপক কান্না পায়’ কবিতা। কবিতাটি বেশ ভালো ছিল। তবে ওই দিন আর আল মাহমুদের সঙ্গে কথা হয়নি। পরে একদিন সাহিত্যসভায় বা ‘সওগাত’ অফিসে—ঠিক মনে নেই—বেশ আড্ডা-টাড্ডা মেরে বের হলাম। আল মাহমুদ বাংলাবাজার যাবেন। বললাম, চলেন আমিও যাই। তিনি বললেন, আপনি তো আমার লেখা পছন্দ করেন না। আমি বললাম, কে বলেছে। তিনি বললেন, না, ওই যে ওই দিন। আমি বললাম, ওই দিন আমি ঠাট্টা করছিলাম। আপনার লেখা আমি পছন্দ করি, আপনার ‘অধ্যাপক কান্না পায়’ কবিতাটি অনেকবার পড়েছি, মনেও আছে। পরে বললেন, চলেন আমার বাসায় যাই। ওঁর বাসায় নবাবপুরে গেলাম। কবিতা পড়ে শোনালেন। আড্ডা দিলাম। কার কবিতা পছন্দ না-পছন্দ তা নিয়ে কথা হলো। ওই এক রাতে বন্ধুত্ব জমে গেল। তার মাত্র মাস দু-তিন আগেই সে ঢাকায় এসেছে। আমরা তখন বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডা দিতাম।

হা. আ. : আচ্ছা, বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডাটা নাকি আপনি শুরু করেন?

শ. কা. : হ্যাঁ, আমিই শুরু করি। বাংলাবাজারের বইয়ের দোকানের কাছে ছিল। ওখানে আমার বন্ধু সুকুমার মজুমদার থাকত। সে ছিল খুব পণ্ডিত লোক। তার থেকেই আমি প্রথম এম এন রায় ও শিবনারায়ণ রায়ের বই পড়ি। ‘এ ম্যান অন হিজ ওন ইমেজ’, শিবনারায়ণ রায় ও এলেন রায়ের লেখা বই প্রথম পড়ি সুকুমারের থেকে। আমি তখন মার্ক্স ও মার্ক্সিজমের ওপর প্রচুর বইপত্র পড়ি। আরেকটা ছেলে ছিল, খুকু, ওরা বসত ওখানে—গোবিন্দ রামের রেস্টুরেন্টে। সুকুমার আড্ডা মারত ওখানে। আমিও আসতাম, ছোট্ট রেস্টুরেন্ট, গ্লাসে করে চা দেয়। একই সময়ে বিউটি বোর্ডিং খুলল, পাশেই ওপেন এয়ার—ঘাস, মাঠ; মাঠের মধ্যে ওপেন এয়ারে চেয়ার-টেবিল থাকত। আমরা গোবিন্দ রামের রেস্টুরেন্ট ছেড়ে ওখানে চলে এলাম আড্ডা দিতে। ইতিমধ্যে শামসুর রাহমানের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। প্রথমে শামসুর রাহমান আমার বাসায় আসত; ফজল শাহাবুদ্দীন, কায়সুল হক, আল মাহমুদ আসতেন। আমরা বাসায় আড্ডা দিতাম। পরে বাসা থেকে সরিয়ে বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডা শুরু করি।

হা. আ. : তার মানে দেখা যাচ্ছে, আপনারা এক গ্রুপ খুব শক্তিশালী কবি; আবার সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুবান্ধবের মধ্যে মাইনর কবিও...

শ. কা. : তখন ফজল শাহাবুদ্দীন খুব বিখ্যাত লেখক। তখনকার বিখ্যাত লেখকরা হলেন—শামসুর রাহমান, ফজল শাহাবুদ্দিন, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ্, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী। আমরা থাকতাম সাইডে। তবে এই সব বিখ্যাত কবির চেয়ে শামসুর রাহমানের ঘনিষ্ঠতা আমাদের সঙ্গে খুব বেশি ছিল। তিনিও আমাদের প্রতি টানটা বেশি অনুভব করতেন, ফলে অন্যরা খুব অবাক হতো। বলত, শহীদ আল মাহমুদের সঙ্গে ঘুরিস, ওরা তো ছোকরা মানুষ। অন্যদিকে আমরা আবার শামসুর রাহমান ছাড়া আর কাউকে রিকগনাইজ করতাম না। বলতাম, শামসুর রাহমান ছাড়া আর কারো কিছু হয়ই না। ফলে অন্যরা সবাই আমাদের হেট করত। সবাই হেট করত।

হা. আ. : আসলে আপনারা তো ঠিক কথাই বলতেন।

শ. কা. : আমরা যেমন শামসুর রাহমানকে চিনেছিলাম, তিনিও আমাদের চিনতে পেরেছিলেন। তখনকার অনুষ্ঠানগুলোতেও আমাদের ডাকা হতো না। আমরা যেতাম শামসুর রাহমানের কবিতা শুনতে। আমাদের নাম হয়েছিল স্বাধীনতাযুদ্ধের পর...

হা. আ. : ইট টেকস এ লং টাইম...

শ. কা. : স্বাধীনতাযুদ্ধের পর টেলিভিশন প্রোগ্রাম করলাম... সিক্সটি সেভেনে আমার প্রথম বই বেরিয়েছে... তবে শামসুর রাহমান টেলিভিশনে একটা ঘণ্টা ধরে ওই বইয়ের ওপর আলোচনা করেছেন। রিভিউ করেছেন বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, সংবাদে খুব ভালো রিভিউ করেছেন সন্তোষ কুমারগুপ্ত, ইউনিভার্সিটির ক্লাসে মুনির চৌধুরী ওই বই সম্পর্কে বলেছেন—রফিক আজাদ তখন ওই ক্লাসের ছাত্র। কবিতাগুলো অনুবাদ করলেন কবির চৌধুরী।

হা. আ. : ওই একই সময়ে!

শ. কা. : ওই সময়েই। বাংলা একাডেমির পত্রিকায় ছাপা হয় তাঁর অনুবাদ। সৈয়দ আলী আহসান তাঁর বই ‘আধুনিক কবিতা ও তার অনুষঙ্গ’তে লিখলেন। এর পরেই সিক্সটি নাইনের মুভমেন্ট শুরু হয়ে গেল। সব কিছু এলোমেলো হয়ে গেল। স্বাধীনতা এলো। স্বাধীনতার পর আমার ডাক পড়া শুরু হলো।

হা. আ. : বাংলা কবিতা সম্পর্কে আপনার ধারণা কী? বাংলা কবিতার ইতিহাস তো হাজার বছরের ইতিহাস।

শ. কা. : হাজার বছরের ইতিহাস তো মুখের। একমাত্র মৈমনসিংহ গীতিকা আর বৈষ্ণব কাব্য ছাড়া আগের আর কিছু নেই। এগুলো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কাব্যের অংশ। তা ছাড়া রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত আর কিছুই নেই। মাইকেল মোটামুটি বাংলা ভাষাকে দাঁড় করিয়ে গেলেন। সত্যিকার অর্থে তিনি যে বাংলা ভাষায় লিখেছেন, তা ছিল সংস্কৃতঘেঁষা। রবীন্দ্রনাথই বাংলাকে তার পায়ে দাঁড় করালেন। রবীন্দ্রনাথের পর থেকে এ পর্যন্ত, মাইকেলকে বাদ দিলে, আউটস্ট্যান্ডিং কবি এ ছয়জনই। শামসুর রাহমান সম্পর্কে এখনো বুঝি না তিনি কত বড় কবি। বুঝতে পারি না এই কারণে যে তিনি আমাদেরই সময়ের।

হা. আ. : আউটস্ট্যান্ডিং ছয়জন বলতে ত্রিশের পাঁচজন আর...

শ. কা. : রবীন্দ্রনাথ। ... আমার মনে হয়, শামসুর রাহমানের যে টোটাল কাব্যিক কৃতি সেটা ত্রিশের সমমানের। আল মাহমুদ আর আমি! আমরা একটু খাটো আছি। তার কারণ, আল মাহমুদ সম্পর্কে আমার ধারণা, আল মাহমুদ অত্যন্ত পাওয়াফুল কবি; কিন্তু তার মননের অভাব আছে। মননের অভাবজনিত কারণেই তাঁর কবিতা নেচারালি লিমিটেড। আর আমার কথা বলতে পারি যে আমি প্রস্তুতি নিয়েছিলাম বড় কবি হওয়ার, আমার মনন যে পরিমাণ বিস্তারিত, সংহত এবং প্রতিষ্ঠিত, সেই পরিমাণ কবিতায় আনতে পারিনি।

হা. আ. : আপনি শক্তি সম্পর্কে তো কিছু বললেন না। শিবনারায়ণ রায় মনে করেন, তিনি এ সময়ের সমগ্র পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কবিদের একজন।

শ. কা. : আমি তা মনে করি না। আমি মনে করি, মাঝেমধ্যে অত্যন্ত শ্রবণযোগ্য স্মরণীয় লিরিক লিখেছেন। বিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য তাঁর কবিতার মধ্যে নেই। কিন্তু বলতে পারি না, এগুলো কবিতায় থাকতেই হবে। হয়তো না থাকলেও চলে। তা ছাড়া শক্তির অনেক কবিতাই জীবনানন্দ দাশ দ্বারা আচ্ছন্ন। আমাদের সময়ের কোনো মেজর অনুভবপুঞ্জ তাঁর কাব্যে আসেনি। আমি তাঁকে মাইনর কবি মনে করি।

হা. আ. : আপনি যখন ত্রিশের পাঁচজন ও রবীন্দ্রনাথের কথা বলেন, তখন ইংরেজি সাহিত্যের কোন কোন কবির কথা মনে রাখেন?

শ. কা. : টি এস এলিয়ট, এজরা পাউন্ড, ডাব্লিউ এইচ অডেন, এমনকি গিন্সবার্গের কথাও মনে করি। কারণ গিন্সবার্গও কবিতার এমন এক প্রদেশে ঢুকেছিলেন, যা আগে কেউ পারেননি। আমাদের সময়ের আর্তনাদ গিন্সবার্গের কবিতায় পাওয়া যায়। ধরো জীবনানন্দ দাশকে সবচেয়ে বড় কবি মনে হয় এই কারণে যে তাঁর ইতিহাস-চেতনা ছিল প্রখর। তা ছাড়া আধুনিক জীবনের বেদনা, আশা, উল্লাস, ক্লান্তি, হতাশা—সব জীবনানন্দ দাশে রয়েছে। এভাবে দেখলেই বুঝতে পারবে, আল মাহমুদ বা আমার সীমা কোথায়। আমাদের মধ্যে যিনি জীবনের সবচেয়ে বেশি দিক স্পর্শ করেছেন তিনি শামসুর রাহমান। বড় কবি, ছোট কবির মধ্যে ক্রাফট্ম্যানশিজের তফাত থাকে না, এটা মোটামুটি সব কবিরই সমান। কিন্তু বড় কবি জীবনের বিভিন্ন দিক স্পর্শ করেন।

হা. আ. : রফিক আজাদ তো আপনাকে গুরু বলতেন!

শ. কা. : না, না, গুরু কেন! ওস্তাদ। আসাদ চৌধুরীও ওস্তাদ বলত। সিনেমায় গুণ্ডাপাণ্ডাদের ওস্তাদ বলা হতো।

হা. আ. : এ সময়ে তো ওয়ার্ল্ড লিটারেচারের ওপর প্রচুর বই পাওয়া যায়। সম্পাদকের ওপর নির্ভর করে কোন লেখক স্থান পাবেন, কে পাবেন না।

শ. কা. : ওভাবে না। শুধু গাইড হিসেবে ব্যবহার করবে। তাতে ধারাবাহিকতা থাকে। প্রত্যেক ভাষার শ্রেষ্ঠ লেখকদের নামগুলো পাওয়া যাবে। আমেরিকায় সবই অ্যাভেইলেবল। যেমন—ধরো ডিক্যামেরন, বুকাচিও পড়বেই। ডিক্যামেরনের প্রভাব আবার পড়েছে চসারের ক্যান্টরবেরি টেলসের ওপর—প্রথম কনসাসলি লেখা শর্ট স্টোরিজ। আবার ডিক্যামেরনের ওপর প্রভাব পড়েছে ভারতীয় পঞ্চতন্ত্রের। এগুলো কেমনে জানি! পড়তে পড়তে কেমনে যেন জেনে গেছি। পড়তে থাকলে মনের মধ্যে যোগসূত্রগুলো আস্তে আস্তে চলে আসবে। আর তখন লিখতে গেলে দেখবে তোমার লেখাও রিচ হয়ে গেছে। টমাস মান লিখছেন উপন্যাস, [টেবিলে রাখা ‘ডক্টর ফস্টাস’ দেখিয়ে] কিন্তু লিখতে লিখতে ঢুকে যাচ্ছেন মিউজিকের হিস্ট্রির ভেতর, চলে যাচ্ছেন দর্শনের হিস্ট্রির ভেতর... গ্রিকরা কিভাবে মিউজিক ব্যবহার করত... মানে আস্তে আস্তে হয়ে যাচ্ছে টোটাল একটা জিনিস। শোনো, আমার প্রথম বইয়ে একটি কবিতা আছে ক্যানিবালিজমের ওপর।

হা. আ. : এবার আসি চতুর্থ কাব্যগ্রন্থের কথায়।

শ. কা. : দেখি আমি দু-চার দিনের মধ্যে আমার লেখাগুলো নিয়ে আসব। [এক বন্ধুর বাসায় রয়েছে তাঁর খসড়া কবিতাসহ একটি ব্যাগ। ] পা-টা ভালো হোক, শনি-রবিবার ছুটি নিয়ে ওদের বাসায় একদিন থাকব, ওদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। ব্যাগটা নিয়ে এসে খুঁজে বের করব। আল্লাই জানে কয়টা কবিতা আছে! ওগুলো খুঁজে বের করে মেরামত করব। মেরামত হয়ে গেলে অক্টোবরের ৭ তারিখে আমি নিউ জার্সি যাচ্ছি। ওখানে দু-তিন দিন থেকে নিউ ইয়র্কে তোমার ওখানে আসব। পাণ্ডুলিপি নিয়ে তোমার সঙ্গে বসব। এক সপ্তাহর ছুটি নেব। সত্যি কথা বলি, বই একটি বের করতে চাই। তার আগে তোমাকে নিয়ে বসতে হবে। এ ব্যাপারে আমার কোনো অসুবিধা নেই। ঢাকায় যখন থাকতাম রফিক আজাদকে নিয়ে বসতাম। তৃতীয় বইয়ের সময় আবিদকে নিয়েও বসেছি। আমার মধ্যে কোনো রকম অহমিকা নেই। সব কবিতা ফুটে না উঠলেও আবিদের কনসেপ্ট ভালো। ...

হা. আ. : আপনার কবিতায় একটি বিষয় লক্ষ করেছি, সহজভাবে শুরু করে আস্তে আস্তে গভীরে ঢুকে যান। আধুনিক বাংলা কবিতার শুরুর লাইনগুলো তো একটু বেশি ভাবগম্ভীর, যেমন—সুধীন দত্ত, বিষ্ণু দে...পাঠককে প্রথমেই ভয় ধরিয়ে দেয়। আপনার ক্ষেত্রে সেটা ঘটে না। সহজ থেকে গভীরে ঢুকে যাওয়ার ব্যাপারটি আপনার কবিতায় কিভাবে সম্ভব হলো?

শ. কা. : আমি এটা নাটক থেকে শিখেছি। আগেই বলেছি আমি নাটক দিয়ে লেখা শুরু করি। নাটক সাদামাটাভাবে জীবনের বাস্তব দিকগুলো তুলে ধরার ভেতর দিয়ে গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করে।

টেপরেকর্ডার বন্ধ হওয়ার পরও আমাদের আলাপ চলতে থাকে। তখন রাত প্রায় সাড়ে ১০টা। বন্ধু সৌমেনের বাসায় ফিরতে সাড়ে ১১টা বাজবে। উঠে দাঁড়ালাম। দরজার বাইরে এসে কাদরী বললেন, ্ওদের কিছু বলা ঠিক নয়, ওরা কবিতা নিয়ে মাথাই ঘামায় না। দোতলার সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভাবলাম, রুমমেটদের দুর্ভাগ্য তারা একজন কবিকে চিনতে পারল না। দুর্ভাগ্য কি বাংলাদেশের সাহিত্যামোদীদের কম, যারা বছরের পর বছর এই কবির সান্নিধ্যবঞ্চিত!


মন্তব্য