kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আ প ন ক থা

শহীদ আমাদের জীবনে এক, একাধারে অনেক কিছু

বেলাল চৌধুরী

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শহীদ আমাদের জীবনে এক, একাধারে অনেক কিছু

ঢাকায় আমি যখন প্রথম আসি, বিউটি বোর্ডিংয়ে আমাদের আড্ডা ছিল। শামসুর রাহমান ছিলেন, শহীদ কাদরী ছিলেন।

ওই সময় আমরা যাঁরা লেখালেখি শুরু করেছি, তাঁদের প্রায় অনেকেই সেখানে যেতেন। ওখানে আমাদের অনেকের সঙ্গে পরিচয়। সেখানে আমাদের বহু বন্ধু হয় এবং আমরা সে সময়ের বহু বন্ধুকে আজ হারিয়ে ফেলেছি। শহীদের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মধ্যে দূরত্ব কমতে থাকে। আমাদের বন্ধুত্ব আরো গাঢ় হতে থাকে। লেখালেখি ও আড্ডা চলতে থাকে নিয়মিত। আর তখন বিউটি বোর্ডিং হয়ে উঠেছিল আড্ডার একটি দারুণ ক্ষেত্র। সেখানে ওই সময়ের তরুণরা আসত। দারুণ আড্ডার জায়গা ছিল ওটা। ফলে দেশের নানা প্রান্ত থেকেও ওই সময়ের তরুণ লেখকরা সেখানে আড্ডা দিতে আসত। সেখানে আমাদের মধ্যে কথা হতো লেখালেখি নিয়ে, প্রকাশনা নিয়ে, সাহিত্য পত্রিকা নিয়ে। এমন আড্ডা আমি কম জায়গায়ই দেখেছি।

শহীদ খুব চমত্কার করে কথা বলত। মজা করে কথা বলতে পারত। সবাইকে হাসিয়ে সব কিছু মাতিয়ে রাখত। সে সব সময় আড্ডা জমিয়ে রাখতে পারত। দারুণ একটা ক্ষমতা ছিল তার। শহীদের আরেকটা বিশেষ ক্ষমতা ছিল। শহরের মধ্যে এমন কোনো রেস্টুরেন্ট নেই, যেখানে তার যাওয়া হয়নি। সকাল-বিকেল সব সময় কোনো না কোনো রেস্টুরেন্টে তার উপস্থিতি ছিল। শহীদ সম্পর্কে যত কথা আছে, বলে শেষ করতে পারব না। শহীদ একনাগাড়ে কথা বলে যেতে পারত। সে খুব গল্প করতে পারত। যেই তার সঙ্গে কথা বলত, দারুণ সখ্য হয়ে যেত। যেকোনো জায়গায়, যেকোনো সময়; মোটকথা সময়কে সে উপভোগ্য করে তুলত।

তখন ঢাকায় অবাঙালিদের অনেক রেস্টুরেন্ট ছিল। সেগুলোতেও সব সময় যেত শহীদ। সবার সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক ছিল। বাঙালি-অবাঙালি সবার সঙ্গে। বিষয়টা এমন, তার উপস্থিতি যেন সব জায়গায় ছিল। এই সব মিলিয়ে শহীদ একটা জীবন কাটিয়ে গেছে। সেই জীবনটা অত্যন্ত মনোরম, অত্যন্ত বর্ণিল ও চমত্কার। শহীদের জীবন আমাদের জীবনের চেয়ে ঈর্ষণীয়। শহীদের সঙ্গে আমি বহু জায়গায় গিয়েছি; বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ। অনেক সুন্দর সময় আমরা কাটিয়েছি।

তার সঙ্গে অনেক অবাঙালি মুসলমানের ভালো সম্পর্ক ছিল। শহীদ এদের এমনভাবে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখত, সেটা ভাবা যায় না।

এই তো এক কি দুই বছর আগে আমাদের মধ্যে দেখা হয়েছিল। বাংলাদেশে নয়। আমি আমেরিকা গিয়েছিলাম। সেখানে তার সঙ্গে আমার দেখা হলো হাসপাতালে।

তার সঙ্গে আমার অজস্র ঘটনা, অজস্র গল্প। তার স্বভাবসুলভ হাসির গল্পগুলো ছিল অসাধারণ। এমনভাবে হাসাতে পারত, যে কেউ শুনলে হেসে কূল পেত না। তার এটা ছিল বিশেষ একটা গুণ। সে গল্প বিউটি বোর্ডিং থেকে শুরু করত।

বাঙালি-অবাঙালি কারো সঙ্গেই তার মন্দ সম্পর্ক ছিল না। এমনকি এসব সে মানতও না। সে সবার সঙ্গে সব জায়গায় যেত, হাসিঠাট্টা করত। অবাঙালিদের সঙ্গে সে বিভিন্ন জায়গায় থাকতও। এসব জায়গায় থেকে থেকে সবার সঙ্গে ভাব করতে পেরেছিল। এমনভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করে কথা বলত, এটা বলে বোঝানো যাবে না। একসঙ্গে আমরা অনেক দিন থেকেছি। চট্টগ্রামসহ দেশের অনেক জায়গায় গিয়েছিলাম। সে অনেক স্মৃতি আমাদের। দেশের এমন কোনো জেলা নেই যে যাইনি। অনেক ঘুরেছি। আর যেখানেই গিয়েছি, শহীদের উপস্থিতির ফলে আয়োজনটা হতো কলবরমুখর আর হাস্যোজ্জ্বল।

কলকাতার বন্ধুরা শহীদ কাদরীকে নিয়ে লেখা লিখেছিলেন। একটি ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল। সেটা কলকাতায় একসময় সবার হাতে হাতে থাকত। সেখানে অনেক গল্প ছিল, শহীদের গল্প ছিল। সেই গল্পগুলো একটু অন্য রকম। বিশেষ করে বিভিন্ন সময়ে কলকাতার লোকেরা এখানে এসেছে, এখানকার লোকেরা ওখানে গিয়েছে। শহীদের সঙ্গে যেভাবে দেখা হয়েছে বা তাদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, সেগুলো ছিল। শহীদের গল্প শুরু হলে আর থামানো যেত না। এই ছিল শহীদ। শহীদ আমাদের জীবনে এক, একাধারে অনেক কিছু। শহীদের কথা বলে শেষ করতে পারব না।

শ্রুতলিখন : চন্দন চৌধুরী


মন্তব্য