kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শহীদ কাদরীর সঙ্গে

ইমদাদুল হক মিলন

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শহীদ কাদরীর সঙ্গে

শহীদ কাদরীর ডান হাত ধরে বসে আছি। স্থান নিউ ইয়র্ক শহরের জামাইকা অঞ্চল।

শহীদ ভাই যে ফ্ল্যাটে থাকেন তার নিচতলার হলরুম। বিকেলবেলা কবিতাপাঠের আসর। প্রবাসী কবিরা কবিতা পাঠ করবেন। প্রধান অতিথি শহীদ কাদরী। তাঁকে ঘিরেই আয়োজন। ২০১৫ সালের অক্টোবর। ৩৪ বছর পর শহীদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। হাঁটতে পারেন না। এলেন হুইলচেয়ারে। আমি উঠে গিয়ে তাঁর গলা জড়িয়ে ধরলাম। বললেন, আরে রাখো মিয়া। চশমা ভাইঙ্গা ফালাইবা।

এত বছর পর দেখা হওয়া অনুজ বন্ধুকে শহীদ কাদরী ছাড়া আর কে এভাবে বলবেন!

তাঁর আবেগ টের পাওয়া গেল খানিক পর। আমাকে পাশে বসিয়ে ফেলে আসা দিনের অনেক কথা বললেন। অনেকের কথা জানতে চাইলেন। আমি একটু বেশি আবেগপ্রবণ মানুষ। আমার চোখে বারবার পানি আসছিল। তাঁর স্ত্রী নীরা ভাবির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমি চোখের পানি সামলে তাঁর দিকে তাকালাম।

কবিতাপাঠ শুরু হলো। আমার কানে কবিতা ঢুকছে না। মন চলে গেছে ছিয়াত্তর-সাতাত্তর সালে। এক সন্ধ্যায় আমার বন্ধু ইকবাল হাসান নিয়ে গিয়েছিল শহীদ ভাইয়ের কাছে। ইকবাল কাজ করে ‘পূর্বাণী’তে। কবি। কবিতার উন্মাদনায় টগবগ করে ফুটছে। শহীদ ভাই খুবই ভালোবাসেন তাকে। আমি গল্প-উপন্যাস লেখার চেষ্টা করছি। ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায় রফিক আজাদ ধারাবাহিকভাবে ছাপছেন আমার প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন’।

প্রথম দিনই শহীদ কাদরীর ভক্ত হয়ে গেলাম।

তিনি থাকেন পুরানা পল্টনের উত্তর দিককার খালের ধারের একটা বাড়িতে। দোতলা বাড়ির নিচতলার রুমে। তাঁর প্রথম স্ত্রী নাজমুন নাহার পিয়ারীদের বাড়ি। একচিলতে উঠোন আছে বাড়িটায়। গ্রামের বাড়ির মতো। পিয়ারী থাকেন জার্মানির কোলন শহরে। ডয়চে ভেলেতে কাজ করেন। শহীদ ভাইয়ের একমাত্র ছেলে আদনান এই বাড়িতেই তার নানির কাছে থাকে। মাঝেমধ্যে বাবাকে এসে দেখে যায়। শহীদ ভাই গভীর মমতায় তাকে বুকে জড়িয়ে আদর করেন।

প্রথম দিন রফিক আজাদকে দেখে যেমন ধাক্কা খেয়েছিলাম, শহীদ ভাইকে দেখেও একই অবস্থা। কালো মোটা শরীর। স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙ্গি পরে বিছানার মাঝখানে বুম ভোলানাথ হয়ে বসে আছেন। হাতে স্টার সিগ্রেট। সামনে শেষ হওয়া চায়ের কাপ। কাপ উপচে পড়ছে সিগ্রেটের পশ্চাৎ অংশ আর ছাই। মিনিটে একটা করে সিগ্রেট শেষ করছেন। আবদুল নামে সার্বক্ষণিক একটা কাজের ছেলে। পাঁচ মিনিট পর পর চা আসছে। চার-পাঁচটা স্টার সিগ্রেট শেষ হওয়ার পর বালিশের আড়াল থেকে ফাইভ ফিফটি ফাইভের প্যাকেট বের করে একটা ধরাচ্ছেন। স্টার সিগ্রেট সবার জন্য, ফাইভ ফিফটি ফাইভটা ধরাচ্ছেন নিজে। চারপাশে বিছানায় চেয়ারে বসে আছেন ভক্ত অনুরাগী বন্ধুরা। রফিক আজাদ, মাহমুদুল হক, বেলাল চৌধুরী, আবদুল মান্নান সৈয়দ, মুহাম্মদ খসরু, আবুল হাসনাত, মফিদুল হক। ইকবালকে দেখে বললেন, আহো মিয়া। এইডা কারে লইয়াইছো?

সেই যে শুরু হলো, তারপর প্রতি সন্ধ্যায় শহীদ ভাইয়ের ওখানে যাই। কয়েক দিনের মধ্যে আমি তাঁর আড্ডার চেনা মুখ। সিগ্রেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হওয়া রুমে শহীদ ভাইয়ের গলা ফাটানো হাসি আর পরচর্চা, ঢাকাইয়া ভাষার খিস্তি আর অপছন্দের কবির চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার, প্রথম যৌবনের গল্প আর সারা পৃথিবীর আধুনিক কবিদের কবিতার অনুষঙ্গ, আমরা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকি। এত বড় বড় লেখক-কবি আড্ডায়, কিন্তু শহীদ ভাইয়ের ওপর দিয়ে কথা বলবার কেউ নেই। সবাই তাঁকে ‘ওস্তাদ’ ডাকছেন। তাঁর পড়াশোনা বিস্ময়কর, ইংরেজি জ্ঞান বিস্ময়কর। পরে জেনেছি শহীদ কাদরী ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে পড়েছেন। পড়া শেষ করেননি। কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে যানইনি, কিন্তু সাহিত্যজগতের তিনি সম্রাট। শামসুর রাহমান খুবই ভালোবাসেন তাঁর এই অনুজ কবিবন্ধুকে। আল মাহমুদ, ফজল শাহাবুদ্দীন সমীহ করেন। সৈয়দ শামসুল হক পছন্দ করেন। শক্তি, সুনীলকে তুমি করে বলেন শহীদ ভাই। নির্দ্বিধায় উড়িয়ে দেন অনেকের কবিতা। এমন ঠোঁটকাটা, স্পষ্ট উচ্চারণের মানুষ! যত দেখি বিস্ময় তত বাড়ে। বাংলাদেশের সাহিত্যের মহীরুহরা তাঁর পাশে ম্লান হয়ে থাকে। সমসাময়িক, অগ্রজ বা অনুজ বাছবিচার নেই, আড্ডায় সবাই সমান। ঠাট্টা খিস্তিখেউড় পরচর্চা, অমুককে উড়িয়ে দেওয়া, তমুককে তুচ্ছ করা শহীদ কাদরীর মতো আর কেউ পারেনি। কবিতায় তিনি যেমন অনন্য, তাঁর তুলনা তিনি নিজে, আড্ডায়ও তা-ই। ’৭৮ সালে জার্মানিতে চলে গেলেন তিনি। সেই সঙ্গে শেষ হয়ে গেল ঢাকার শেষ সাহিত্যের আড্ডা।

বছর দেড়-দুয়েক ঘনিষ্ঠভাবে শহীদ ভাইকে পেয়েছিলাম। একটা পর্যায়ে লক্ষ করলাম, তিনি আমাকে একটু বেশিই প্রশ্রয় দিচ্ছেন। সকাল দুপুর সন্ধ্যা রাত্রি যখন তখন তাঁর কাছে যাই। তিনি আড়াল থেকে আমাকে একটা ফাইভ ফিফটি ফাইভ সিগ্রেট বের করে দেন। এইটা এমুন দামি  সিগ্রেট, হিসাব কইরা খাইতে হয়।   লও, খাও একটা।

‘আবে হালায়’, ‘খাতারনাক’ ‘মালে মহব্বত’ আর একটা ঢাকাইয়া শব্দ প্রায় প্রতি বাক্যে ব্যবহার করতেন, সেই শব্দটা বলা যাবে না।

দিনের পর দিন গোসল করতেন না শহীদ ভাই। শরীরে শ্যাওলা পড়ে যেত। তাঁর প্রধান খাদ্য চা-সিগ্রেট। এই জায়গাটায় বিরাম নেই। আড্ডা ছাড়া বাঁচেন না। তার ফাঁকে কখন যে দু-চার লাইন লিখছেন, কখন যে পড়ছেন! শুধু কবিতা ইত্যাদি না। বিচিত্র সব বিষয় পড়ছেন। একদিন দুপুরবেলা গেছি তাঁর কাছে, দেখি ‘স্মিথসুনিয়ান’ নামের একটা পত্রিকা পড়ছেন। বিষয় তিমি। তিমিরা যে গান গায় প্রথম শুনলাম শহীদ ভাইয়ের কাছে। সেই গান নাকি রেকর্ডও করা হয়েছে।

কারো ওপর বিরক্ত হলে তার জানটা খেয়ে ফেলতেন শহীদ ভাই। একদিন উগ্র ধরনের, আধপাগলা এক তরুণ কবি এলো আড্ডায়। শহীদ ভাইয়ের কোন কবিতা নিয়ে যেন মূর্খের মতো কথা বলল। আমাদের সামনে গামলাভর্তি মাখানো মুড়ি আর চা। শহীদ ভাই গম্ভীর মুখে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, মুড়ি আর চা খাও, তারপর চলে যাও। ওই কবি শেষ।

কিছুদিনের জন্য বিটিভির প্রডিউসার হয়েছিলেন। এক অনুষ্ঠান রেকর্ডিংয়ে ক্যামেরাম্যান শট নেওয়ার আগে শহীদ ভাইকে জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করল। আমি এভাবে শটটা ওভারল্যাপ করব। শহীদ ভাই তাঁর ওই ঢাকাইয়া প্রিয় শব্দটা প্রয়োগ করে ধমক দিলেন। সেই ক্যামেরাম্যান তাঁর ধারেকাছে আর ভেড়ে না। একদিন নিজের রুমে বসে মুড়ি খাচ্ছেন, সঙ্গে আরো কে কে আছে। এক রুমে দু-তিনজন প্রডিউসার বসার ব্যবস্থা। সেই ক্যামেরাম্যান এসেছেন অন্য এক প্রডিউসারের কাছে। মুড়ি খেতে থাকা একজন ভদ্রতা করে ক্যামেরাম্যানকে বলল, মুড়ি খান। শহীদ ভাইয়ের ওপর তার রাগ। গম্ভীর মুখে বলল, না, খাব না। শহীদ ভাই তার দিকে তাকিয়ে বললেন, খাওয়ার দরকার নেই। মুড়িটা মুখে ওভারল্যাপ করুন।

এই হচ্ছেন শহীদ কাদরী।

এক সিনিয়র কবির বাড়িতে শহীদ ভাইকে নিয়ে গেছেন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ আর ফজল শাহাবুদ্দীন। সেই কবির বাড়ি দেখে শহীদ ভাই অবাক। অবাক হলে মাঝেমধ্যে উর্দু বলতেন। সেদিনও বললেন। ‘এতনা ছোটা কাবিকা এতনা বাড়া মাকান?’ এত ছোট কবির এত বড় বাড়ি? তাঁর এই উচ্চারণ কবিমহলে মিথ হয়ে আছে।

[বাকি অংশ পরের সংখ্যায়]


মন্তব্য