kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


তোমাকে অভিবাদন কবি

আসাদ চৌধুরী

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



শহীদ কাদরী, চুল থেকে নখ পর্যন্ত কবি, আর নেই। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি প্রবাসী।

পশ্চিম জার্মানিতে ছিলেন বেশ কিছুদিন, কিছুটা সময় কাটিয়েছেন লন্ডনে, তারপর যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টনে, বোস্টন থেকে নিউ ইয়র্কে। সেখানেই হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

কলকাতা থেকে তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। ‘ও’ লেভেল পাস করেছিলেন, তারপর আর প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনা না করলেও তাঁর পাঠাভ্যাস ছিল ঈর্ষণীয়। বেশির ভাগ পাঠকেরই প্রিয় কবিতা, যাঁরা সুযোগ পাননি, তাঁদের জন্য কবিতার সামান্য অংশ তুলে দিচ্ছি। ফল দিয়েই বৃক্ষের পরিচয়। প্লিজ, চোখ বুলিয়ে যাবেন না, কয়েকবার পড়লেই কবির ইশারা-ইঙ্গিতগুলো ধরতে পারবেন। আগে তো কবিতাটি পড়ুন, পরে বলছি।

 

তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা

 

ভয় নেই

আমি এমন ব্যবস্থা করবো যাতে সেনাবাহিনী

গোলাপের গুচ্ছ কাঁধে নিয়ে

মার্চপাস্ট ক’রে চ’লে যাবে

এবং স্যাল্যুট করবে

কেবল তোমাকে প্রিয়তমা।

 

ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো

বন-বাদাড় ডিঙিয়ে

কাঁটা-তার, ব্যারিকেড পার হ’য়ে, অনেক রণাঙ্গনের স্মৃতি নিয়ে

আর্মার্ড-কারগুলো এসে দাঁড়াবে

ভায়োলিন বোঝাই ক’রে

কেবল তোমার দোরগোড়ায় প্রিয়তমা।

 

ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো—

এমন ব্যবস্থা করবো

বি-৫২ আর মিগ-২১গুলো

মাথার ওপর গোঁ-গোঁ করবে

ভয় নেই, আমি এমন ব্যবস্থা করবো

চকোলেট, টফি আর লজেন্সগুলো

প্যারাট্রুপারদের মতো ঝ’রে পড়বে

কেবল তোমার উঠোনে প্রিয়তমা।

 

ভয় নেই, ভয় নেই

ভয় নেই...আমি এমন ব্যবস্থা করবো

একজন কবি কমান্ড করবেন বঙ্গোপসাগরের সবগুলো রণতরী

এবং আসন্ন নির্বাচনে সমরমন্ত্রীর সঙ্গে প্রতিযোগিতায়

সবগুলো গণভোট পাবেন একজন প্রেমিক, প্রিয়তমা!

 

আধুনিক, নাগরিক কবি হওয়ার স্বপ্ন দুচোখে মেখে ছয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে আমরা যখন সবেমাত্র লেখালেখি শুরু করেছি, সে সময় আমাদের আদর্শ ছিলেন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক আর শহীদ কাদরী। যতটা জানি, শামসুর রাহমানের সঙ্গে তাঁর বয়সের পার্থক্য প্রায় ১৫ বছর, তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল বোধ করি সবচেয়ে বেশি। ফজল শাহাবুদ্দীন, হাসান হাফিজুর রহমান—এঁরা সবাই একসঙ্গে ওঠাবসা করতেন। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই তাঁর কবিতা বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। প্রথম থেকেই বিষয় ও কাব্যভাষা সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। বিস্ময় লাগে, এত এত বছর প্রবাসজীবনেও তাঁর তরতাজা ভাষা অমোঘ অর্থটি বহন করে, চূড়ান্তভাবে ইশারা করার ক্ষমতা রাখে। তাঁর অবলোকনের চোখ পষ্ট করেই দেখতে পেত, দৃষ্টিভঙ্গি জটিল নয়, প্রকাশক্ষমতা দেখে বিস্ময় মানতে হয়।

একটু আগে যে কবিতাটি পড়েছেন, আমাদের দেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা স্মরণ করতে অনুরোধ করি। যে কবি গ্রাম্যতাকে বিষের মতো পরিহার করতেন (সর্ব অর্থেই), যিনি আধুনিক বিশ্ব সম্পর্কে অনেক বেশি খোঁজখবর রাখতেন (পেশাগত কারণের বাইরেও), তিনি আমাদের লোকছড়ার ফ্যান্টাসি আর অ্যাবসার্ডিটিকে, আরো পষ্ট করেই বলি, বাউল কবিদের উদ্ভট ও অবিশ্বাস্য ইচ্ছাগুলোকে আধুনিকভাবে ব্যবহার করেছেন। কোথাও ক্রোধ নেই, প্রতিহিংসার বিচ্ছুটি গায়ে চেপে ধরেন না, বরং একেবারে বিপরীতভাবে—প্রেমের কবিতায়, তা এমনভাবে প্রয়োগ করেছেন, যার বাংলা আমার জানা নেই।

চাখানায় আর মাঠে-ময়দানেই তাঁর সঙ্গে দেখা হতো। দু-একবার রেডিও-টেলিভিশনে কবিতা পড়েছি, বাংলা একাডেমির একুশে ফেব্রুয়ারির কবিতাপাঠের আসরেও। সেই ’৭৪ সালে। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তাঁকে কতটা নিজেদের লোক মনে করতেন, সে তো আমি দেখেছি। তাঁর ঘনিষ্ঠতা ছিল গোলাম রসুলের সঙ্গে, রফিক আজাদের সঙ্গে, আবিদ আজাদ আর শিহাব সরকার। মুহম্মদ খসরু, জামাল খান, ফারুক আলমগীর, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস—কখনো ‘আর্ট ফিল্ম’ দেখার পর, কখনো বা আরজু, স্টার—এবং অবশ্যই বিউটি বোর্ডিংয়ের উজ্জ্বল জ্যোতির্ময় আড্ডায়; যেমন—রণজিৎ পালচৌধুরী, বিপ্লব দাশ, কায়েস আহমদ, জিয়া আনসারী, কালেভদ্রে সৈয়দ শামসুল হক, শুভ রহমান, আবু নাহিদ, ইউসুফ পাশা। আহ্ স্মৃতি, চুল পাকা ধরলে বোধ হয় এমনই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। মনে পড়ে একটি অনুষ্ঠানের কথা। সরদার জয়েনউদ্দিন সে সময় জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের পরিচালক, এখনকার বায়তুল মোকাররমের সিঁড়ির সঙ্গেই ছিল সংস্থাটির দোতলা দপ্তর। আমার সহপাঠী আবদুল মান্নান সৈয়দকে মূল কবিতার পঙিক্ত বলে দিচ্ছিলেন, আর মান্নান তড়িঘড়ি করে টুকছিল। আমি আমার ছেলেকে নিয়ে গিয়েছিলাম। মান্নান কিছুটা উদাসীনভাবেই শামসুর রাহমানের পঙিক্ত আর ইংরেজি কবিতার পঙিক্ত পাশাপাশি পড়েছিল। আমি সাধ্যমতো মান্নানকে এই অংশটুকু না পড়ার জন্য বলেছিলাম। আমাকে, বোধ হয় মান্নানকে চমকে দিয়ে, অবাক করে দিয়ে শহীদ কাদরী শামসুর রাহমানকেই ঘুরেফিরে সমর্থন দিলেন। সেই রাতেই পল্টনের বাসায় আমি আর নিজেকে সামলাতে পারিনি। রফিক আজাদ, আবিদ আজাদ, বোধ হয় শিহাব সরকার আর অরুণাভ সরকারও ছিলেন। আমার বিস্ময় তখন ক্ষোভে পরিণত হয়েছিল।

তখন বুঝতে পারিনি, পরে শুনেছিলাম, এটা নাকি ছিল তাঁর ‘ফান’। কি জানি, হবে হয়তো।

জার্মানিতে তাঁর স্ত্রী নাজমুন নাহার পিয়ারী আমার সহকর্মী ছিলেন। ‘তোমাকে অভিবাদন, প্রিয়তমা’ গ্রন্থটি তিনি তাঁর স্ত্রীকে উৎসর্গ করেছিলেন।

উৎসর্গ

পিয়ারীকে

গানগুলো যেন পোষা হরিণের পাল

তোমার চরণচিহ্নের অভিসারী

নাজমুন অবশ্য মাঝেমধ্যে কবিতাও লেখেন। শহীদ কাদরী তাঁর স্ত্রীর সঙ্গেই জার্মানির কোলনস্থ ডয়চে ভেলে, ভয়েস অব জার্মানিতে ছিলেন। সে সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অফিসার আবদুল্লাহ আল ফারুক, পাকিস্তানে খবর পাঠ করতেন আবদুস সাত্তার আর বহুভাষাবিদ আহমদ রফিক—এঁরাও ছিলেন। আমি সামান্য পরে যাই। সুমন চট্টোপাধ্যায় (কবির সুমন) আর ফারুক তত দিনে ভয়েস অব আমেরিকা থেকে ফিরে এসেছেন কোলনে। সুমন একটি গানের ক্যাসেট দিয়েছিলেন। এ ক্যাসেটেই প্রথম এই গানটি শুনি। এঁদের মুখে শহীদ কাদরীর অনেক গল্প শুনতাম।

লোবিদ, তাঁদের একমাত্র ছেলেকে দেখার জন্য নাজমুন প্রায়ই আমেরিকা যেতেন। বছর কয়েক আগে ঢাকায় লোবিদের বিয়ের অনুষ্ঠানে আমরা গেলেও শহীদ কাদরী আসতে পারেননি। লোবিদের আসল নাম যে আদনান কাদরী, তা বেশ পরে জানতে পারি। ১৯৭৮-এ প্রকাশিত ‘কোথাও কোনো ক্রন্দন নেই’ বইটি আদনান কাদরীকে উৎসর্গ করেছেন শহীদ।

শহীদ কাদরী যেকোনো আড্ডার মধ্যমণি হয়ে উঠতেন। তিনি এখন চুপ হয়ে গেছেন। তাঁর লেখাগুলোই অনেক অনেক বছর ধরে কথা বলবে। এটা তো জানাই যে, শহীদ কাদরীকে বাংলা কবিতার পাঠকরা কোনো দিনই হারাতে রাজি হবেন না।

সবে তো বলতে শুরু করলাম, আরো কত বলব। বলতেই হবে, কেননা তিনি শহীদ কাদরী। হাত ধরে আমাদের কাব্যরুচি তৈরি করে দিয়েছেন, তিনি পদ্য আর কবিতার ফারাকটি ধরিয়ে দিয়েছিলেন। আর ভাষাই যে কবিতার প্রাণ, তাঁর মতো ব্যঙ্গবিদ্রূপ করতে করতে বলতে পারবেন দ্বিতীয় ব্যক্তি তো দেখছি না।

শহীদ কাদরী নেই, জয়তু শহীদ কাদরী।


মন্তব্য