kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভালো থেকো দোস্ত

আল মাহমুদ

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ভালো থেকো দোস্ত

ড্রইং : মাহবুবুল হক

আজকাল আর বাইরে যাওয়া হয় না। শরীরটা সায় দেয় না।

মনটা ভালো রাখা জরুরি। লিখলে মনটা বড্ড ভালো হয়ে যায়। কিন্তু অনেক দিন নতুন কিছু লেখাও হয়নি। তবে বই পড়ি। পত্রপত্রিকা পড়তে ভালো লাগে না। মন খারাপ করে কী লাভ? কিন্তু চাইলেই তো আর সব কিছু এড়িয়ে যাওয়া যায় না। কিছু সূক্ষ্ম পিছুটান মানুষকে বারবার আকর্ষণ করবেই। ফোন করে কে যেন খবরটা দিল। কে দিল এই মুহূর্তে মনে করতে পারছি না। শুনেই যেন হতবিহ্বল আমি। বর্তমানে অনেক অস্বাভাবিক বিষয় মেনে নিতে হয়। কিন্তু কাদরীর চলে যাওয়া মন থেকে মেনে নিতে কষ্টই হচ্ছে। দীর্ঘদিনের বন্ধু তো? কম বয়সের বন্ধুত্ব, একেবারে নিখাদ। অসংখ্য স্মৃতি আর কথামালা আমার মানসপটে সরে সরে যাচ্ছে। কিন্তু উপযুক্ত প্রকাশের সামর্থ্যের বাইরে এখন আমি। কাদরীকে নিয়ে লিখতে গেলে ভালো কিছুই লিখতে পারতাম হয়তো।

তবে ওকে নিয়ে লিখতে হবে কখনো ভাবিনি। আপনজনদের নিয়ে কেউ এমন কিছু ভাবার অবকাশ পায় না। ঢাকায়ই আমাদের পরিচয়। কবে কিভাবে কার মাধ্যমে পরিচয় ঠিক নির্দিষ্ট করে বলতে পারব না, মনেও নেই। ও খুব ভালো লিখত, সবচেয়ে বেশি খুশি হতো কেউ ওর নতুন লেখাটা শুনতে চাইলে। লেখার প্রতি প্রেমটাও ছিল। সমমানসিকতার হওয়ায় বন্ধুত্ব হতে সময় লাগেনি। প্রায় প্রতিদিনই পুরান ঢাকার বিউটি বোর্ডিংয়ে আড্ডা হতো। তখন তো ওই একটি জায়গাতেই সৃজনশীল মানুষের আনাগোনা ছিল। আমরাও যেতাম, ওটা একটা নেশা হয়ে গিয়েছিল। কোনো বিষয় লাগত না কথা বলার জন্য। প্রায়ই আমাদের বাগিবতণ্ডা হতো, লেখালেখি নিয়ে মতবিরোধ হতো। শুধু লেখালেখি বলছি কেন, বন্ধুদের মধ্যে মান-অভিমান, ঘাত-প্রতিঘাতের কোনো উপলক্ষ লাগে? একে অপরকে তুমি সম্বোধন করতাম, দোস্ত বলে ডাকতাম। দোস্তর সঙ্গে ঝগড়া করার জন্য যেমন সময়-অসময় ছিল না, আবার একটি দিনও একজন আরেকজনকে না দেখে থাকতে পারতাম না। বিউটি বোর্ডিংয়ে কোনো দিন ও না এলে ওর অফিসে যেতাম। দু-তিনবার গিয়েছি।

তত দিনে কাদরী খুবই পরিণত হয়েছে লেখালেখিতে। কিন্তু লেখায় মন দিতে পারেনি শতভাগ। একটু খেয়ালি তো ছিলই, তবে চতুর লোক ছিল না। মানুষের সঙ্গে দুষ্টুমি করত, তবে কাউকে ঠকিয়েছে বলে শুনিনি। সোজা-সরল ছিল আমার কাছে। উচ্চমার্গীয় কবি ছিল, নিজেকে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখত। কিন্তু পারিবারিক জীবনে একটু অস্থিতিশীলতা সব সময় ভর করে রাখত ওকে। জীবনটা গোছানো ছিল না ঠিকই, কিন্তু চেষ্টাটা চোখে পড়ার মতো। এ জন্যই হয়তো দেশ ছেড়ে আমেরিকা পাড়ি জমায়। খুব অভিমান হয়েছিল, ‘ও কেন চলে গেল?’ তবে সেই অভিমান ভাঙিয়েছিল ও নিজেই। আমেরিকা থেকে ফোন করত প্রায়ই। নিজেই খোঁজখবর নিত। দূরে থেকেও কাছেই আছে—এমন একটা আশ্বাস দিত। প্রবাসে লিখতে না পারাটা ওকে একরকম মৃদু কষ্টই দিত। এ জন্যই ওর বইয়ের সংখ্যা এত কম কি না আমি সঠিক বলতে পারব না।

দেশে ফিরে এসে নিজেই আমার সান্নিধ্য কামনা করে। আমি বন্ধুর সঙ্গে অনেক দিন বাদে দেখা হওয়ায় আবেগাপ্লুত হয়েছিলাম খানিকটা। আজ তার মহাপ্রয়াণের খবরে আমি সত্যিই অনেক বেশি ব্যথিত। জাতি একটি মেধাবী ও জ্ঞানী ব্যক্তিকে হারাল, আর আমি প্রাণের দোস্তকে। ভালো থেকো দোস্ত...।

[ শ্রুতলিখন : মাসিদ রণ]


মন্তব্য