kalerkantho


বই আলোচনা

অন্তর উৎসারিত কথামালা

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



অন্তর উৎসারিত কথামালা

আত্মধ্বনি : কুমার চক্রবর্তী। প্রকাশক : সংবেদ। প্রচ্ছদ : মোস্তাফিজ কারিগর। মূল্য : ২০০ টাকা

বইমেলায় আমরা কজন বসে আড্ডা দিচ্ছি। কথাসাহিত্যিক হামীম কামরুল হক দুই হাতে বইয়ের ব্যাগ নিয়ে হাজির।

একটি ব্যাগ থেকে কবি কুমার চক্রবর্তীর বই ‘আত্মধ্বনি’ বের করে বললেন, ভালো বই। বইটি তাঁর হাত থেকে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখি। বিক্ষিপ্তভাবে লেখায় চোখ বুলাই। ছিয়ানব্বই পাতার ছোট বই। গল্পকার পারভেজ হোসেনের প্রকাশনাপ্রতিষ্ঠান ‘সংবেদ’ থেকে প্রকাশিত। ভালো বইয়ের ধরন বোঝার জন্য পুরোটা পড়তে হয় না, কয়েক লাইন পড়লেই বোঝা যায়। ‘আত্মধ্বনি’র গদ্যের স্টাইল দেখে তা-ই মনে হলো। অর্থাৎ বইটি ভালো। পড়া দরকার। মাসুদ হাসান বললেন একটা রিভিউ করে দিতে, কালের কণ্ঠ’র সাহিত্য পাতায় ছাপার জন্য।

বাসে করে বাসায় ফিরতে ফিরতে বইটি পড়া শুরু করি। প্রথম পাতা পড়ে মনে হলো, না, এভাবে নয়, বইটি পড়তে হবে নির্জনে, গভীর মনোযোগ দিয়ে, লাল কালিতে দাগিয়ে দাগিয়ে। বই পড়ার সময় আমাকে আবার প্রচুর দাগাতে হয়। যে বইয়ে দাগানোর মতো কোনো লাইন খুঁজে পাই না, সেটি বই বলে মনে হয় না। মনে হয়, পত্রিকার কলাম। পড়লাম আর খাটের নিচে ঢুকিয়ে রাখলাম। তারপর ভুলে গেলাম।

‘আত্মধ্বনি’ টেবিলে পড়ে থাকল টানা ১০ দিন। পড়ার মতো সময় করে উঠতে পারিনি। সেদিন ছিল ছুটির দিন। প্রায় দুপুরে ঘুম থেকে উঠে বইটি পড়তে শুরু করি। কাব্যগন্ধি সুগঠিত গদ্য। শব্দ প্রয়োগে লেখক অত্যন্ত সচেতন। পড়তে ভালো লাগছিল। ১৩ নম্বর পাতা পর্যন্ত পড়ে কলম খুঁজতে থাকি। অর্থাৎ দাগাতে হবে। দাগালাম। কী দাগালাম? দাগানো লাইনগুলো ছিল এমন, ‘পৃথিবীতে যদি অন্ধকার না থাকত, তাহলে কবিতার জন্ম হতো না। কেননা তখন জন্ম হতো না অস্তিত্বময় চাঁদ বা নক্ষত্রের। ’

কথাগুলো আমাকে মুগ্ধ করে। মনে হয়, না, এমন কথা আগে কখনো পড়িনি। এই পাঠ আমার জন্য একেবারেই নতুন। যে পাঠ নতুন বলে মনে হয় এবং নতুন চিন্তা আর উপলব্ধির জন্ম দেয়, সেই পাঠ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তার মানে বইটি গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আমি পড়া ক্ষ্যান্ত দিই না। পড়তে থাকি। পড়তে পড়তে খেয়াল করি, অসংখ্য নতুন কথায় ভরপুর প্রতিটি পাতা।

যে কথামালা দিয়ে কুমার চক্রবর্তী বইটি সাজিয়েছেন, তা একজন প্রকৃত কবির কথা। পাঠের গভীরতা, উপলব্ধির ব্যাপকতা ছাড়া দার্শনিকতায় ভরপুর এমন গদ্য লেখা যায় না। আমাদের কবি তো হাজার হাজার। কজনের আছে এমন বোধ, এমন উলব্ধি? হয়তো আছে। কিন্তু তাঁরা ঠিক ঠিক ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন না। যেমন পেরেছেন কুমার চক্রবর্তী।

কথামালার অধিকাংশই কবিতাবিষয়ক। আমি গদ্যকর্মী। কিন্তু পড়তে পড়তে একবারও মনে হলো না, কথাগুলো আমার নয়, শুধুই একজন কবির। যেন তিনি আমার মনের কথাগুলোই লিখেছেন। গদ্যকর্মী হিসেবে আমিও ভেতরে এসব কথা লালন করি। ভাবি। যেমন তিনি লিখেছেন, ‘আমি মনে করি, যাপনের ভেতরে যিনি কবি তাঁর কোনো শত্রু নেই, বন্ধুও হয়তো নেই। কবির শত্রু কোনো কবি হয় না, কবির শত্রু মূলত কবিতা এবং যথাযথ বললে তাঁর নিজের কবিতা। যা কবিতা হয়ে ওঠে না অথচ লিখিত হয়ে যায় কোনোভাবে, আর প্রকাশিতও হয়তো হয়, সেই কবিতাগুলোই পরে কবির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। ’

একজন গদ্যকর্মী হিসেবে তাঁর এই কথাগুলো নিজের সঙ্গে মিলাই। আসলেই তো, যে গল্প-উপন্যাসগুলো আমি আগে লিখেছি, যেগুলোর শব্দ আর বাক্যবিন্যাস ছিল অসংখ্য দুর্বলতায় ভরা, সেগুলোর দিকে আমি এখন আর তাকাতে পারি না। ইচ্ছা করে যাদের হাতে বইগুলো পৌঁছে গেছে তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সেসব বই উদ্ধার করে এনে বস্তায় ভরে নদীতে ফেলে দিই।

আর সত্যি, কবি বা লেখকের কোনো শত্রু নেই। কোনো বন্ধুও নেই। কবির শত্রুতা তো সেই শব্দটির সঙ্গে, যে শব্দটি ঠিকঠাকমতো ধরা দেয় না। কবি প্রথম পঙক্তি লিখে বসে আছেন, পরের পঙক্তিটি আর লিখতে পারছেন না, আসছে না কিছুতেই। বন্ধুর সাহায্য নেবেন? পারবেন না। কোনো বন্ধুই তাঁকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারবে না। পঙক্তিটি তাঁকেই লিখতে হবে। তাঁকেই সাজাতে হবে শব্দশিল্পের ঘর। কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, প্রাবন্ধিক—সবার ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য।

কবি কুমার চক্রবর্তীর চিন্তার নির্যাস হচ্ছে ‘আত্মধ্বনি’। কবি ও কবিতার প্রতি তিনি নানা দিক থেকে আলো ফেলেছেন। বুঝতে চেয়েছেন এবং আমাদের বোঝাতে চেয়েছেন কবি কে, কবিতা কী। ‘আত্মধ্বনি’ সব লেখকের চিন্তা আর উপলব্ধির জগেক শাণিত করার মতো একটি বই। বইটি ছড়িয়ে পড়ুক লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত সবার কাছে।

স্বকৃত নোমান


মন্তব্য