kalerkantho


তাহের আলী মাস্টারের বাড়ির ঠিকানা

মঈনুস সুলতান

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



তাহের আলী মাস্টারের বাড়ির ঠিকানা

পুকুরের ঘাটলায় বসে তাহের মাস্টার পানির দিকে তাকান। চাঁদনী রাত, তাই জলে ঝলমল করছে জ্যোত্স্না। তিনি পকেট থেকে রমনা সিগারেটের প্যাকেট বের করে শার্টের চার-চারটি পকেটে খোঁজাখুঁজি করে অবশেষে তলপকেটে তালাশ পান দেশলাইয়ের। শার্টের পকেটের সংখ্যাধিক্য আজকাল তাঁর জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কোমরের দুই পাশে পাঞ্জাবির কায়দায় ঝুলে থাকা দুই পকেটের একটিতে কখনোসখনো তিনি সিগারেটের প্যাকেট ও দেশলাই রাখেন। তাঁর বুকপকেটে আছে ছোট্ট একটি নোটবুক ও সুলেখা কলম। ঘড়িপকেটে মাঝেমধ্যে তিনি পাঁচ-দশ টাকা লুকিয়ে রাখেন। তার পরও যখন তিনি একশলা রমনা ফুঁকতে চান, তখন সঠিক পকেটে সিগারেট কিংবা ম্যাচ খুঁজে পান না। এই কিসিমের শার্টও আজকাল কেউ পরে না। মাঝেমধ্যে মাস্টারের আবছামতো কিছু স্মৃতি ফিরে আসে। মনে হয়, এক জামানায় তিনি টেট্রনের বেলবটম প্যান্টের সঙ্গে জংলি ছিটের ফুরফুরে হাতাকাটা হাওয়াই শার্ট পরতেন। তাঁর পায়ে থাকত বাটার এক জোড়া হকি শু। মিছিলে স্লোগান দেওয়ার কথাও মনে আসে। তবে ঠিকমতো ইয়াদ করতে পারেন না—কোন শহরে তিনি শোভন শার্ট-প্যান্ট পরে, কোন রাজনৈতিক দলের তরফে কিসের প্রতিবাদে বাতাসে ছুড়ে দিতেন মুষ্টিবদ্ধ হাত।

জলে জ্যোত্স্নার জাফরিকাটা নকশা দেখতে দেখতে মাস্টারের ঘাড়ে ঘাম ফোটে। তিনি শার্টের কলারের নিচে ভাঁজ করে রাখা রুমাল খুলে তা দিয়ে গলা-মাথা মুছতে গেলে জিলকির চমকের মতো চিলিক পেড়ে আধকপালি ব্যথায় কানের পাশে রগ দপদপ করে ওঠে। মাস্টারের প্রতি মাসে দুই বা তিনবার করে আধকপালি ব্যথা হয়। তখন তিনি দু-চারটা কডোপাইরিন ট্যাবলেটও খান। তাতে উপশম কিছু হয় না। তবে এক-দেড় দিন পর একা কোথাও বসে একশলা রমনা ধরালে চিনিক পেড়ে দপদপিয়ে তা আপনা-আপনি কমতে শুরু করে। তখন খেয়াল করেছেন, ঝড়-তুফানের রাতে বজ্রবিদ্যুতে জিলিক পাড়লে যে রকম ঘর-দুয়ার, গাছপালা খানিকটা আলোকিত হয়ে ওঠে, সে রকম তাঁর স্মৃতির আন্ধারেও যেন চেরাগ ঝলকায়। মনে পড়ে যায় কিছু কিছু বিষয়। যেমন এই মুহূর্তে তাঁর পরিষ্কার মনে পড়ছে, আত্মগোপনের একপর্যায়ে দল থেকে তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হয় ‘মেহনতি মানুষের সঙ্গে একাত্ম হতে’। এই আদেশের অনুবর্তী হয়ে তিনি খদ্দরের পাজামা-পাঞ্জাবি পরে ট্রেনে চড়ে চলে আসেন একটি প্রান্তিক গাঁয়ে। ওখানে পিতৃদত্ত নাম বদলে নতুন একটি নাম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পরতে শুরু করেন চেককাটা লুঙ্গি ও চার পকেটওয়ালা শার্ট। ঘাড়ে ভাঁজ করা রুমাল গোঁজারও সূত্রপাত তখন থেকে। তবে মাস্টার ঠিকমতো ইয়াদ করতে পারেন না, তাঁর আদি নাম কী ছিল, আর কোন দলের রাজনৈতিক তত্পরতায় তিনি যুক্ত ছিলেন এবং দলের তরফ থেকে কে তাঁকে গাঁয়ের মেহনতি মানুষের সঙ্গে একাত্ম হতে নির্দেশ দিয়েছিলেন?

রমনা সিগারেটের তীব্র গন্ধ তাঁর স্মৃতির অন্ধকারাচ্ছন্ন ঝোপঝাড়ে যেন টর্চের আলো ফেলে। বৃত্তাকার ফোকাসের ভেতর তিনি পরিষ্কারভাবে দেখতে পান—শীতের রাতে আরো দুজন সঙ্গী কমরেডের সঙ্গে কুয়াশা মাখতে মাখতে বন কোনাকুনি ছুটছেন। গাঁয়ের একটি ঢেঁকিঘরে তিনজনে শেল্টার নিয়েছিলেন দিন কয়েক। তারপর শিয়ালডাকা সন্ধ্যায় বাজার থেকে চায়ের দোকানের একটি ছেলে ছুটে এসে তাঁদের খবর দেয়, পুলিশের গাড়ি গাঁয়ের দিকে আসছে। গ্রাম ছাড়িয়ে অনেক দূর যেতে যেতে পথে হাটের পাশে সবাই একটু থেমেছিলেন। সঙ্গী কমরেড দুজনের চাদরের তলায় ছিল কাটা রাইফেল। তাঁরা মাস্টারকে হাটে পাঠান দুই প্যাকেট স্টার সিগারেট কিনে আনতে। কুপির আলোয় বিক্রি হচ্ছে মলা তামাক আর বান্ডিল বান্ডিল কুম্ভিপাতার বিড়ি। অনেক খুঁজে মাস্টার জোগাড় করেছিলেন এক প্যাকেট রমনা সিগারেট। সেই থেকে মাঝেমধ্যে সংকট দেখা দিলে মাস্টার দু-এক শলা রমনা ফুঁকে থাকেন।

শিমুলঘাটা গ্রামের মোনাফ উল্লা বেলদারের বাড়ির দলিজঘরে তাহের আলী মাস্টার বাস করছেন আট কিংবা দশ বছর ধরে। বেলদারের জমিজমা ক্ষেতি-গেরস্তি নিয়ে সম্পন্ন পরিবার। বাজারে তাঁর রাইস মিল ও আটার হলার আছে। বেলদার পরিবারের ছেলেমেয়ে সব কটিকে অঙ্ক ও ইংরেজি পড়িয়েছেন মাস্টার। তারা ম্যাট্রিক পাস করে কলেজে গেছে। চাকরিবাকরি পেয়েছে, মেয়েদের বিয়ে হয়েছে। এই পরিবারে প্রাইভেট পড়ানোর মতো ছেলেমেয়ে কেউ বাকি নেই। কিন্তু তারা এখনো মাস্টারকে তিন বেলা খেতে দেয়। তাদের পুকুরে তিনি দুপুরবেলা শর্ষের তেল মেখে গোসল করেন। বাদ আসর মাস্টার বাজারের দিকে এলে দোকানদারদের কেউ কেউ তাঁকে দিয়ে হিসাবের খাতা লেখায়। এতে তাঁর দু-পাঁচ টাকা আয়-ইনকামও হয়।

সপ্তাহখানেক আগে আরেকবার তাঁর আধকপালি মাথাব্যথা উঠলে তিনি রেললাইনের আউটার সিগন্যালের কাছে গাবগাছের তলায় বসে জিরোচ্ছিলেন। একটু আগে মন-আনচান-করা ভেঁপু বাজিয়ে ডাউন ট্রেন চলে গেছে ধানক্ষেতের ভেতর দিয়ে। তখনই তাঁর মনে পড়ে, এ ধরনের একটি রেলগাড়িতে তিনি কিছুদিন নিম টুথ পাউডার ফেরি করেছেন। একটি কচুয়া রঙের রেক্সিনের ব্যাগে নিম টুথ পাউডারের বান্ডিলের নিচে থাকত পার্টির ইশতেহার, লিফলেট ও লিটারেচার। স্টেশনে গাড়ি থামলে অজানা কোনো লোকের সঙ্গে বহুদিনের চেনা লোকের মতো কথাবার্তা বলতে বলতে দোকান থেকে খিল্লি কিনে বোঁটায় চুন লাগাতে লাগাতে চাপলিশে তিনি পাচার করে দিতেন ইশতেহারের বান্ডিল।

বিষয়টি ঘটে গেল বুধ বা বৃহস্পতিবারের বিকেলবেলা। বেলদারের রাইস মিলে বসে জমা-খরচের হিসাব মেলাতে মেলাতে বুঝতে পারেন, তাঁর মন ছেয়ে যাচ্ছে ভালো লাগার অনুভূতিতে। এ ধরনের ব্যাপার ঘটে খুবই কাজা-ক্বচিৎ। তিনি টেবিলে বসে আমদানির অঙ্ক থেকে তেল-মবিল ও চালুনি কেনার খরচটা বিয়োগ দিচ্ছিলেন। জানালা দিয়ে দেখেন এক নারী, ছুটা কামকাজের গরিবগোর্বা মেয়ে মানুষ কুলা দিয়ে চাল থেকে আলগা করছে ভুসির গুঁড়া। ঝাঁকুনিতে তার শরীরে খেলছে হিল্লোল। তখনই বিয়ের ব্যাপারটা মনে আসে। যেন আগের জীবনে ঘটে যাওয়া কোনো দৃশ্যপট। জাঁকজমকের উৎসব কিছু নয়। কেবল এক মোল্লার কাছে কবুল পড়ে সাদামাটা নিকা। নারীটি মাসখানেকের মতো থিতু হয়েছিল তাঁর সঙ্গে। বোধ করি ভালোও বেসেছিল। মাস্টার তাকে কাছে চেয়েছিলেন তীব্রভাবে। কিন্তু কিছুতেই তাঁর শরীর সাড়া দিচ্ছিল না। তালাক দিয়ে তার কাছ থেকে নিকাশ নিয়েছিলেন স্বেচ্ছায়। তখন শরীরে এই খামতি কেন হলো ঠিক বুঝতে পারেননি। কিন্তু রাইস মিলের জমা-খরচের খাতায় আঁকিবুঁকি কাটতে কাটতে বাদলা দিনে কই মাছের মতো মনে উজিয়ে আসে একটি ঘটনা। শুয়ে ছিলেন কাঁথা মুড়ি দিয়ে টিনের চারচালা ঘরে। রাতে রেইড হলে জানালা দিয়ে ডাল পাকড়ে উঠে পড়েন গাছের আগায়। ঘর সার্চ করে ঝোপঝাড়ে টর্চের আলো ফেলে পুলিশ পুবের ভিটার ভাঁড়ারঘরে ঢুকলে তিনি গাছ থেকে আলগোছে নামতে গিয়ে নরম ডাল ভেঙে নিচের শক্ত মাটিতে পড়েন। কোমরে বেদম আঘাত পান এবং তা নিয়ে লেংচাতে লেংচাতে বাড়ির বাল্লা ধরে নেমে নয়ানজুলি পেরিয়ে এসে পৌঁছেন পুড়ো ইটভাটায়। মাস কয়েক পর কোমরের ব্যথা কমে আসে। আর তাঁর মন থেকেও তিরোহিত হয় নারীদেহের প্রতি স্বাভাবিকভাবে সাড়া দেওয়ার বিষয়টি।

জুমাবারের সন্ধ্যাবেলা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে মাস্টার বসেছিলেন গাঁয়ের মসজিদের সিঁড়িতে। সারা বিকেল ধরে তাঁর মন কি জানি কিসের জন্য হাহাকার করছিল। চোখ মুদতেই মেঘের মতো ভেসে আসে টুকরো টুকরো কিছু স্মৃতি। তখনো বালক বয়স। পার্টির ক্যাডার হিসেবে এক বাড়িতে শেল্টার নিয়ে আছেন। সারা মহল্লা রক্ষীবাহিনী ঘিরে ধরলে ঘরের মেয়েরা তাঁকে পরিয়ে দেয় শাড়ি। ব্লাউজের ভেতর জোড়া গ্রেনেড নিয়ে ঘোমটা টেনে বসে ছিলেন। সার্চ হয়; কিন্তু রক্ষীরা মেয়েদের জ্বালাতন করে না কিছু। তারা চলে যেতেই গৃহকর্তা তাঁকে সে রাতে অন্যত্র চলে যাওয়ার বিনীত অনুরোধ জানান। গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে অবশেষে মাস ছয়েকের জন্য থিতু হয়েছিলেন এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়িতে। ভদ্রলোক তাঁকে হাফিজিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন। কোরআন শরিফের পয়লা দিকের কয়েক সিপারা জবানিও হয়েছিল। কিন্তু মিশতে পারতেন না কারো সঙ্গে। হাফেজ হতে যাওয়া ভূমিকার সঙ্গে মানিয়ে নিতে অসুবিধা হচ্ছিল। মাঝেমধ্যে যে জীবন ছেড়ে এসেছেন, তার কথা ভেবে হাহাকারও হতো। কোথাও যেতে সাহস পেতেন না। তাই গম্বুজওয়ালা একটি মসজিদের বারান্দায় বসে থাকতেন চুপচাপ।

দুপুরে মাস্টার ভাত খেতে বেলদারবাড়ি আসেননি। বাজারের পানের আড়তে বসে আলগা রসিদ ও চালান থেকে টাকার অঙ্ক টুকে টুকে জাবেদা খাতায় তুলছিলেন। চা খেয়েছেন কয়েক কাপ, সঙ্গে মিষ্টি ও নিমকি। বুক জ্বলতে শুরু করলে তিনি আড়ত থেকে বেরিয়ে রাজ-আইল ধরে ছড়া নদীর দিকে হাঁটেন। অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানেন যে হাঁটাহাঁটি করলে জ্বালাপোড়া কমে, মনও শান্ত হয়। তখনই মনে হয়, ছায়ার মতো তাঁর সঙ্গে সঙ্গে চলছে কিছু টুকরো স্মৃতি। নিজেকে দেখতে পান পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে হাতে বাঁধানো ডায়েরি নিয়ে কোনো এক কলেজের ক্যান্টিনে বসে চায়ের সঙ্গে ক্যাপস্টান সিগারেট ফুঁকতে। কিছু ডিটেইলস্ তাঁর পরিষ্কার মনে পড়ে। তখন একশলা ক্যাপস্টানের দাম ছিল চার আনা। এক টাকায় চার শলার প্যাকেট কিনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ক্লাসে পেছন দিকে বসেছিলেন। পড়াশোনায় তাঁর মন ছিল না। বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল আলগা দুটি বেঞ্চে সারি দিয়ে বসা মেয়েদের দিকে। একটি মেয়ের সঙ্গে আলগোছে দৃষ্টি বিনিময়ের কথাও মনে পড়ে। মৃদু হাসিতে তার মন বিষণ্ন হয়েছিল। ইচ্ছা হয়েছিল ক্লাসের পর নোট বিনিময়ের অসিলায় কথা বলতে। রোলকলে ‘প্রেজেন্ট স্যার’ বলে বেরিয়ে এসেছিলেন পেছনের দুয়ার দিয়ে।

হাঁটতে হাঁটতে মাস্টার চলে এসেছেন ছড়া নদীর তীরে। স্মৃতি আজ তাঁকে সহজে ছেড়ে যেতে চায় না। আরেকটি দৃশ্যপটে নিজেকে দেখতে পান—বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে গুলতানি করতে করতে ভিডিও দেখছেন। এর আগে তিনি ভিডিওর নামও শোনেননি। মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনা রঙিন টিভির সঙ্গে ভিসিআর। পর্দায় একই সঙ্গে অমিতাভ বচ্চন ও দিলীপ কুমারের রোল ছিল। ভেবে তাজ্জব হয়েছিলেন যে বই দেখার জন্য আর সিনেমা হলে যেতে হবে না, এখন থেকে ড্রয়িং রুমে বসে সে রকমের আমোদ পাওয়া যাবে। সে সন্ধ্যায় ভিডিওর পর জম্পেশ আড্ডা দিয়ে ছাদে বন্ধুবান্ধব দু-তিনজনে মিলে কেরু কম্পানির ছোট্ট একটি পাইপ থেকে গলায় ঢেলেছিলেন সামান্য সুরা। এসব ভাবতে ভাবতে মাস্টার এসে ওঠেন ছড়া নদীর পুলে। বুঝতে পারেন, আবার আধকপালি ব্যথাটা ফিরে আসছে জোরেশোরে। তিনি পানি ছাড়াই একটি কডোপাইরিন ট্যাবলেট গেলেন। মুখ তাঁর ভরে যায় তিতকুটে বিস্বাদে। একটি বিষয়ের হিসাব তিনি কিছুতেই মেলাতে পারেন না। কলেজে পড়াশোনা তিনি কখন করলেন? তবে কি হাফিজিয়া মাদ্রাসার কভারে আত্মগোপন হালতের তামাদি হয়েছিল, আর তিনি ফিরে গিয়েছিলেন স্বাভাবিক জীবনযাপনে? কিন্তু কোন কলেজের ছাত্র ছিলেন তিনি? তখন কি মা-বাবা ও সংসারের সঙ্গে তাঁর ফের যোগাযোগ হয়েছিল?

আধকপালি ব্যথাটা কানের পাশে রগে দপদপিয়ে উঠছে। তিনি দু-আঙুলে কপালের দুই পাশ চেপে ধরে নিচের মৃদু স্রোতে বয়ে যাওয়া জলের দিকে তাকান। ওখানে তাঁর শরীরের ছায়া প্রতিবিম্বিত হচ্ছে। মগজের কোষে কোষে বাজ পড়ার মতো বিজলি চমকে কিছু বিস্ফোরিত হয়। আর ঘটনাটি তাঁর রোমকূপে কাঁটা দিয়ে ফিরে আসে। স্পেশাল ব্রাঞ্চ অফিসের পেছন দিকে একটি ঘরের ছাদে দুই পা বেঁধে তাঁকে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর চেতনা বাতাসের সঙ্গে মিশে মোমের শিখার মতো নিভতে নিভতে জ্বলে উঠছে ফের। নাক থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় রক্ত ঝরে নিচের সিমেন্টের মেঝেতে আঁকা হচ্ছে লোহিত আলপনা। একজন অফিসার নেপথ্য থেকে হাঁকেন, ‘স্টপ ইট। দিস ইজ এনাফ। বাঁচিয়ে রাখো একে। জ্ঞান ফিরলে দেখো কিছু কথা বের করতে পারো কি না। তাঁর নোটবুকে যেসব লোকের নাম পেয়েছ, চেষ্টা করো তাদের অ্যাড্রেস পেতে। ’ মাস্টার মনে করতে চেষ্টা করেন—কাদের নামের তালিকা লেখা ছিল তাঁর নোটবুকে? আর তাদের ঠিকানা পাওয়ার জন্য তাঁকে স্পেশাল ব্রাঞ্চে কেন টর্চার করা হয়েছিল? পায়ের দড়ি কেটে নামানোর সময় সিমেন্টের ফ্লোরে তাঁর মাথা ঠুকে যায়। সঙ্গে সঙ্গে মোমের আলো নিভে যাওয়ার মতো হাসুমিসু যে চেতনা অবশিষ্ট ছিল, তা-ও বিলুপ্ত হয়। স্রোতে ভেসে যাওয়া ছোট ছোট মাছের দিকে তাকিয়ে মাস্টার ভাবেন—বোধ করি আধকপালি মাথাধরার সূত্রপাত হয় এখান থেকে।

বেলদারবাড়িতে ফিরে মাস্টার শুয়ে ছিলেন দলিজঘরে অবেলায়। এক পেয়ালা কড়া চা নিয়ে এসে সামিনা জুমরা লেগে পড়ে থাকা মাস্টারকে বালিশে হেলান দিয়ে বসায়। এ বাড়ির বড় মেয়ে সামিনা কোলে ১৪ মাসের শিশু নিয়ে বাপের বাড়ি নাইওর এসেছে। কয়েক বছর আগে মেয়েটি তার তদারকিতে ম্যাট্রিক পাস করে। তার অঙ্কের মাথা খুব ভালো, লেটার পেয়েছিল। কিন্তু বেলদার মেয়েটিকে কলেজে পাঠালেন না। বিয়ে হয়ে সে চলে গেল দূরের এক থানা শহরে। কবে যেন বেলদারের স্ত্রী মারা গেলেন। তার পর থেকে মাস্টারের তিন বেলার খাবার থেকে মাছের টুকরা, লেবু, আচার বা ভর্তা বাদ পড়তে শুরু করল। কালে কালে বেলদারের মনও সংসার থেকে ওঠল। তিনি মাঝেমধ্যে গাঁয়ের মসজিদে যান। তারপর লাঠি ভর দিয়ে বাড়ি ফিরে দলিজের বারান্দায় একা বসে বসে তসবিহ টেপেন। মাস্টারের সঙ্গে চোখাচুখি হলেও কথাবার্তা কিছু বলেন না। সামিনা মাস্টারের কপালে হাত দিয়ে তাপ উঠেছে কি না পরীক্ষা করে বলে, ‘স্যার, এইবার বাড়িঘরে ফেরেন। আমার মা-ও তো চলে গেছেন। আপনার কিছু হলে এখানে কে যত্ন নেবে?’ মাস্টার কোনো জবাব দিতে পারেন না। তাঁর মনও ঘরে ফিরতে চায়। জানতে ইচ্ছা করে মা এখনো বেঁচে আছেন কি না। এবার নাইওর এসে সামিনা তাঁর দিকে একটু খেয়াল দিচ্ছে। গতকাল বাইরের পুকুরের ঘাটলায় বসে জলে তাঁর প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে কমেট ব্লেড দিয়ে মাস্টার শেভ করছিলেন। মেয়েটা তা নজর করে তাঁর বিছানার পাশে রেখে যায় ছোট্ট একটি আয়না। তাতে মাস্টার নিজের চেহারার দিকে খুঁটিয়ে কিছুক্ষণ তাকান। তাঁর বয়স নেমে যাচ্ছে ভাটিতে। চুল পেকে কাশফুল হতে চলেছে। কুঁচকে এসেছে মুখের চামড়াও।

বেশ কিছুক্ষণ হলো সামিনা চলে গেছে। মাস্টার বিছানা থেকে উঠে হারিকেনের আলোয় রেক্সিনের ব্যাগে খুলিবিলি করেন। চেন দেওয়া একটি পকেটে খুঁজে পান কিছু টাকা। গুনে দেখেন মোট ৭৪৩। সামিনার মা মারা যাওয়ার পর থেকেই বাজারে জমা-খরচের খাতা লিখে যে পাঁচ-দশ টাকা পান, তা থেকে একটু একটু করে জমাচ্ছেন। বাড়ি ফিরে যাওয়ার বিষয়টাও তাঁর মাথায় ব্যাপকভাবে ঘুরছে। পাথেয়ও জোগাড় হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে—তাঁর আসল বাড়ি কোথায়? কোন জেলার কোন গ্রামে, সঠিক ঠিকানা তিনি কিছুতেই মনে করতে পারেন না। এ এলাকায় পয়লা যখন আসেন, তখন কেউ কেউ আদতে তাঁর বাড়ি কোথায়, সাকিন কী—এসব জানতে চাইত। এদের তিনি এত দিন যে মহকুমার, যে পরগনার লোক বলে পরিচয় দিয়ে এসেছেন, তা কিন্তু আদতে কাল্পনিক। একসময় আত্মগোপনের কৌশল হিসেবে তিনি এ রকম বানোয়াট ঠিকানা ব্যবহার করতেন। বিষয়টি অভ্যাসের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। হারিকেনের চারদিকে আলোভুক পতঙ্গগুলো ঘুরপাক করছে। আর তাহের মাস্টার তব্দা লেগে বসে বসে ভাবেন—আধকপালি ব্যথার সঙ্গে কোনো দিন কি তাঁর মনে ফিরে আসবে আসল বাড়ির স্মৃতি?


মন্তব্য