kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ জানুয়ারি ২০১৭ । ১১ মাঘ ১৪২৩। ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮।


প্রীতির চিত্রকর্মে সংবেদনশীল পরিদৃশ্য

খান মিজান

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



প্রীতির চিত্রকর্মে সংবেদনশীল পরিদৃশ্য

মানবিক চেতনাবোধে উজ্জীবিত প্রীতি আলীর চিত্রমালা বিষয়ের অন্তর্গত সৌন্দর্যকে উপস্থাপন করে। ভাবনাজাত বিষয়কে একত্রিত করে প্রকৃতির উপাদানের সঙ্গে সূক্ষ্ম ব্যঞ্জনায় তা নান্দনিক পরিশীলিত আর রহস্যঘেরা।

কাগজ ক্যানভাস আর বোর্ডে বিবিধ মাধ্যমে প্রীতির কুশলী বিন্যাস; তাতে নতুন করে জন্ম নেয় বর্ণময়তা। অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন শিল্পের পাঠক চিরকালের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অনুভূতি নিয়ে ডুব দিতে পারে তাঁর সৃজনরাজ্যে।

রাজধানীর গুলশানে ইন্দিরা গান্ধী কালচারাল সেন্টারে চলছে এই শিল্পীর একক চিত্র প্রদর্শনী। ‘পাওয়ার অব পেইন অ্যান্ড প্যাথোস’ শিরোনামে প্রদর্শিত চিত্রমালায় পরিচয় মেলে প্রীতির শিল্পসত্তার সঙ্গে, এর সঙ্গে তাঁর কাজের ভেতরগত সাযুজ্য। প্রকাশিত ইঙ্গিতময় ভাষা পাঠে স্পষ্ট হয়, এই শিল্পী কিভাবে ধরতে চান বৃষ্টিপতনের শব্দ। প্রকৃতির রাজ্যে সবুজ বর্ণাভার উচ্ছ্বাস, সুখী চিত্তাকর্ষক প্রকৃতি—এসব উপাদান তাঁর আবেগময় দরদি অনুভূতি তৈরি করে, একাকার হয়ে যায় চিত্রপটে কুশলী বিন্যাসে।   

বিমূর্ত ধারার হলেও প্রীতির কাজ অনেক বেশি স্পষ্ট। কেননা তাঁর ছবিতে ব্যবহূত রং আর উপাদান প্রকৃতি থেকে আহরিত। বাংলার নিসর্গই তাঁর ছবিতে সৃষ্ট শব্দতরঙ্গের উৎস। ফলে তাঁর ছবির ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়া যায় প্রকৃতির রাজ্যে। প্রকৃতি থেকে মৃদু শব্দতরঙ্গ পৌঁছে যায় কানে। ক্যানভাসের কোথাও তিলধারণের জায়গা থাকে না। পুরো জমিনজুড়ে অজস্র রং-রেখার মিথস্ক্রিয়া। স্তরান্তরে প্রস্তুত জমিনে রঙের গতিময় অবস্থান, ব্রাশস্ট্রোকের আঁচড় আর রেখার কারুকাজ তাঁর কাজে বিভ্রম তৈরি করে।

আকাশের গা বেয়ে চুইয়ে পড়ে জলের ফোঁটা, জলমগ্ন নিসর্গে শব্দমাধুর্যের ওঠানামা একাকার তাঁর কাজে। ঋতুবৈচিত্র্যে রূপবৈচিত্র্য, জীবনের সচলতা, বাতাসের গতিময়তা তাঁর ছবিতে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এভাবে প্রকৃতি রাজ্যের তরঙ্গমালার তরঙ্গায়িত রূপ ধরা দেয় তাঁর ছবিতে। রং-রেখায় গড়া শব্দ ছন্দোবদ্ধ ঐক্য গড়ে তোলে প্রীতির কাজে। বৈচিত্র্যময় রং ও টেক্সচারে তিনি নিজের আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ করতে ভালোবাসেন। তাঁর কাজে পাওয়া যায় ব্যতিক্রমী কৌশল ও বিমূর্ততার ছোঁয়া। তবে তা তাত্ক্ষণিক দৃশ্যমানতা থেকে উৎসারিত নয়। ধীরে ধীরে বস্তু, দৃশ্য বা অনুভবের চূড়ান্ত আহ্বান তাঁকে চিত্রপটের কম্পোজিশন সৃষ্টিতে উদ্বুদ্ধ করে।  

প্রীতির বেশির ভাগ ছবি কাগজে। রয়েছে ক্যানভাস আর বোর্ডেও। মিডিয়া হিসেবে অ্যাক্রিলিক আর মিশ্র মাধ্যম। হলুদ, সবুজ, কালো, নীল, ধূসর রঙের প্রাধান্য সেখানে। ঈষৎ লালও কোনো কোনো কাজে রোমান্টিক প্রেরণার উৎস হয়ে ওঠে। শিল্পীর ব্যবহূত এসব রঙের ব্যঞ্জনায় গতিময়তা থাকলে বর্ণময় রূপের হাতছানি সেখানে। এর মধ্য দিয়ে বয়ে যায় এক ধরনের সুরের ধারা। সুরের সে ধারা আমাদের কাছে ধরা দেয় নানা প্রতীকী ব্যঞ্জনায়। শিল্পের পাঠককে রীতিমতো পাঠোদ্ধার করে নিতে হয় তা। তবে ছবির পরতে পরতে সেই পাঠোদ্ধারের উপাদান বিদ্যমান।

আধুনিক আঙ্গিকবাদিতায় নির্বস্তুক ফর্মে শিল্পী তাঁর অনুভূতি তুলে ধরেন। ছবিগুলো দেখে মনে হয়, তিনি যা দেখছেন কিংবা যা দেখেছিলেন অনেক দিন আগে, সেসব বিষয়ও জায়গা পেয়ে যায় চিত্রজমিনে। অবচৈতনিক ভাবনাজাত বিষয়ও তাঁর চিত্রকর্মের পটভূমি নির্মাণে ভূমিকা রাখে। এটা করতে গিয়ে তিনি প্রকৃতির সূক্ষ্ম জ্যামিতিক ফর্মভুক্ত আকৃতি পরিত্যাগ করেন না। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা ঢাকা পড়ে যায় রঙের ব্যঞ্জনায়। কাগজে কাঠ কয়লায় আঁকা কিছু কাজও রয়েছে প্রীতির। সেসব কাজে রয়েছে যন্ত্রের বিচিত্র আকৃতির স্বরূপকে উন্মোচন করার প্রয়াস।  

অনেক কাজে শিল্প সৃষ্টির তাঁর এ প্রচেষ্টা শুরু বিন্দু থেকে। কোনো কোনো বিন্দু পরিবর্ধিত হয়ে উল্লম্ব ও আনুভূমি দেয়াল  তৈরি করে। এসব দেয়ালের স্তরান্তর ভেদ করে সীমানাহীন না দেখা জগতে ঢুকে পড়া যায়। অলক্ষেই শিল্পের পাঠক একসময় পৌঁছে যায় নতুন কোনো অন্তর্লোকের কাছে। বিন্দুর এমন বিস্তারে ক্রমেই তার সৃজনজগৎ পেয়ে যায় নিজস্ব মাত্রা। এ মাত্রাকে নানা যোজন-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে তিনি নতুন সংবেদনশীল ভুবনের খোঁজ করেন। তাঁর প্রথম একক প্রদর্শনী এটি। তবে কাজগুলো দেখে স্পষ্ট বোঝা যায়, করণকৌশল ও শিল্পধারা আয়ত্ত করেই চিত্রকর্মে মনোযোগী হয়েছেন এই শিল্পী।

প্রীতির কাজের বিষয়বস্তু হিসেবে আনন্দ-উচ্ছ্বাস প্রেমের যেমন আছে, তেমনি রয়েছে নিঃসঙ্গতা, দুঃখ-বিষাদগ্রস্ততা। তবে নৈরাশ্য বিষাদময়তাকে তিনি দিব্যি ঢেকে রাখেন। এসব উপাদান উজিয়ে যে বিষয়টি মুখ্য হয়ে ওঠে তা হলো, আনন্দময় রূপের বন্যা। এই রূপময়তাই তাঁর ছবির বিস্তৃত অবাধ দৃশ্যপট নির্মাণ করে।


মন্তব্য