kalerkantho

শনিবার । ২১ জানুয়ারি ২০১৭ । ৮ মাঘ ১৪২৩। ২২ রবিউস সানি ১৪৩৮।


কেন লেখক হলাম

মুখ বুজে মুক্তা ফলাও

সুশান্ত মজুমদার

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



মুখ বুজে মুক্তা ফলাও

আপনি কেন লেখক হলেন? এমন নিরীহ অথচ মোক্ষম ধারালো প্রশ্নে আমি অপ্রস্তুত হই। শেষাবধি নিজের মধ্যে জিজ্ঞাসার উদয় হয়—সত্যি কি লেখক হয়েছি? জ্বলতে জ্বলতে আগুন যেমন উনুনে নেমে আসে, তেমনি আকস্মিক চাঞ্চল্য শান্ত হলে পর ভাবনা খনন করি—ব্যবসায়ীকে কি জিজ্ঞাসা করা হয় আপনি কেন ব্যবসায়ী? কিংবা চাকরিজীবীকে বলা হয়, আপনি চাকরিজীবী কেন? তাহলে লেখকের বিষয়ে কৌতূহলের কারণ কী এই যে লেখালেখির স্বতন্ত্র কোনো মূল্য আছে; আর দশ-পাঁচটা কাজের মধ্যে লেখালেখি বিষয়টা আলাদা নজরে দেখা হয়! হতে পারে, লেখা আজও রহস্যময়, গল্প-কবিতা-উপন্যাস কিভাবে রচিত, এর বিস্তারিত ভেতরের হদিস মানুষ পায়নি। লেখক কি পেয়েছেন?

এই অব্দি ভাবতেই আন্তর আন্দোলন টের পাই—তাহলে লেখক কি বিশেষ কোনো নির্মাতা! কেবল রচয়িতা হওয়ার সুবাদে তিনি উত্তম! সকাল থেকে রাত, জেগে ওঠা এবং ঘুমিয়ে পড়া, প্রতিদিন উদ্যাপনে যা কিছু ব্যবহার করি তার কোনো উপকরণই আমার তৈরি না। ভোগের জন্য আমি পরনির্ভরশীল, দয়া-দাক্ষিণ্য গ্রহণ করে দৈনন্দিন আয়ু যাপন করি। শ্রমজনের কর্মপ্রবাহে আমি তুচ্ছ শরিক। আমার চারপাশের দুঃসহ প্রতিবেশ বিভিন্ন তেতো ও অম্লমধুর অভিজ্ঞতা আমাকে জোগান দেয়। আমার মধ্যে প্রস্তুত করে পুস্তকি অর্থে মনোদৃষ্টি, অবলোকন ও উপলব্ধি। তার নিঃশব্দ নিস্তারহীন চাপে নাছোড় বোধের উদ্রেক হয়। বিষয়টা কাগজ-কলমে লেখা ছাড়া তা ব্যক্তকরণে ভিন্ন কোনো মাধ্যম নেই। মানে একটা—আমার নিজস্ব কিছু না কিছু কথা জমেছে। আমি লিখে আচ্ছন্ন ভাবনা যথাসম্ভব প্রকাশ করি। দূর ও নিকট অতীতে কেন লিখি, এর উত্তরে অনেক গুণী লেখক আমার মতো গড়পড়তাজনের যাচাইযোগ্য নিরিখ, বিচারবুদ্ধি মজবুত করতে দারুণ সব জ্ঞানের কথা বলেছেন। এসব পাঠ করে আমি বিদ্যাতৃষ্ণা মেটাই।

মুশকিল, আবার আমার মধ্যে জিজ্ঞাসার উত্থান ঘটে—লিখলেই কি লেখক হওয়া যায়? লেখার নিয়ম-কানুন আছে। স্বতঃস্ফূর্তভাবে আমরা যখন কথা বলি, তখন ব্যাকরণ মেনে বলি না। লেখার মাধ্যম ভাষা, এই ভাষার সঠিক ব্যবহারে ব্যাকরণের কাছে আমাদের হাত পাততে হয়। আবার ব্যাকরণসম্মত গদ্য রচনা করলে কি আমি লেখক? লেখা যদি হয় সাহিত্য, তবে সাহিত্যের শর্তপূরণ আবশ্যক। কথাবস্তুর গাঁথুনির জন্য লিপিকৌশল বা আঙ্গিক, গদ্যের যথাযথ প্রয়োগ অনিবার্য চলে আসে। জানতে হয়, এক শব্দের কত রকম অর্থ, কত তার উল্লেখ। অবশ্য লেখা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেলে ব্যাকরণের কেতাবি ধারণা নিয়ে বাড়তি মাথা খাটানোর দরকার হয় না। এখানে লেখার অভ্যাসের কথা বলেছি। অভ্যাস—মানে ছাপার অক্ষরে স্বীয় নাম দেখার নিয়ত আচরণজাত স্বভাবের গোপন হুল্লোড় যদি হয়, তবে হুঁশের গোড়ায় টান পড়বে। সাহিত্যচর্চা লেখকের দায়িত্বের অংশ। অভিজ্ঞতা ও অধ্যয়নপ্রাপ্ত শক্তি পোড়ানো—নির্দয় চণ্ডালের কাজ তাঁর। সাহিত্যের উপযোগিতা ব্যাপক ও গভীর। শিল্প সৃষ্টির ক্ষমতা তাই অর্জন ও হূদয়ঙ্গম না করলে সময়ের প্রহার সয়ে লেখক নামে টিকে থাকা অসম্ভব। নচেৎ নিজের মুদ্রিত নাম দেখা হবে ব্যক্তিগত উপভোগের বাহাদুরি মাত্র। পুরোপুরি অন্য কাজে অক্ষম আমি, তাই লেখক হওয়ার নিরন্তর চেষ্টায় তত্পর আছি।

এই পর্যন্ত পড়ার পর কারো মনে হতে পারে, আমি বুঝি বিনয়ের অবতার। প্রতিদিন কর্কশ, রুক্ষ, নীরস, নিরেট বাস্তবতা, অবাঞ্ছিত ঘটনার মুখোমুখি হয়ে যেকোনো অভাজনের মতো আমিও পীড়িত হই। সেই মানুষ, প্রত্যহ বাঁচার জন্য রোজ যার কায়ক্লেশ, লেখায় কেমনে সে আমোদ বিতরণ করবে! তাঁর কাছে লেখালেখি বিনোদনের মাধ্যম হতে পারে না। পায়ের নিচের জমিন, তার ওপরের ঘর-সংসার-প্রাণ-প্রকৃতি সব আমার কাছে দাবি জানায়। লেখায় আমি যেন তাদের কথা বলি। লেখকের স্বশ্রেণির প্রতিনিধিত্ব ছাড়া নিষ্কৃতি নেই। জীবনবেদ ও জীবনবোধের আমানত খরচ করতে করতে গড়ে ওঠে নতুন চেতনা; আবার তা ভেঙে যায়। সংশোধন, সংযোজন, পরিমার্জনা ও পুনর্বিন্যাস ছাড়া নিষ্ফলা হয়ে যায় লেখার কলাকৌশল। বাতিল হয়ে যায় প্রাক্তন ধ্যান-ধারণা। উদিত নতুন সময়, উদয়োন্মুখ নতুন রীতির সারাৎসার ধারণে শুরু নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া, চলতে থাকে নতুন নির্মাণের নিরলস প্রয়াস। প্রকৃতপক্ষে লেখালেখি একটা চলিষ্ণু প্রক্রিয়া। অন্তর্লীন স্বপ্নসাধের সঙ্গে লেখক হওয়ার অবিচ্ছেদ্য অনুশীলন আমাকেও করে যেতে হচ্ছে।


মন্তব্য