kalerkantho

26th march banner

সম্পর্ক : জন কিটস ও পার্শি বিশি শেলি

দেহের ওপর অভিন্ন ঘাসের ছায়া

রফিকুজ্জামান রণি

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



দেহের ওপর অভিন্ন ঘাসের ছায়া

ইংরেজি সাহিত্যের অকালপ্রয়াত কবি জন কিটসের সমাধিস্থল অর্থাৎ রোমের প্রোটেস্টান্ট গোরস্থানের সৌন্দর্যময় দৃশ্যাবলি দেখে তাঁর বন্ধুকবি পার্শি বিশি শেলি এক কবিতায় উচ্চারণ করেছিলেন, ‘এই স্থানটি এতটাই সুন্দর যে এখানে এসে সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর প্রেমে পড়া যেতে পারে। ’ তখন কেউ হয়তো ধারণাও করতে পারেনি, আর মাত্র এক বছর বাদে এখানকার মৃতদের কাতারে এসে শামিল হবেন বিশ্বসাহিত্যের এই ক্ষণজন্মা কিংবদন্তি নিজেই! প্রিয়বন্ধু জন কিটসের মৃত্যুর এক বছরের মাথায় স্পেজিয়ার কাসা মগনিতে এক সান্ধ্যকালীন নৌভ্রমণে ঝড়ের কবলে পড়ে সমুদ্রে ডুবে মারা যান পার্শি বিশি শেলি। তারপর তিনি বন্ধুর কবরের পাশে চিরস্থায়ীভাবে আসন গেড়ে বসেন!

কিটস ছিলেন একজন নৈরাশ্যবাদী কবি। কবিতায় ব্যক্তিজীবনের ছাপ স্পষ্টভাবে ধরা দিয়েছে বলেই তাঁর কাব্যে খুব একটা আশা সঞ্চারিত হয়নি। হতাশা, ক্ষোভ, দুঃখ-দুর্দশার ঘেরাটোপে আটকা ছিল কিটসের পুরোটা জীবন। অন্যদিকে সারাটা জীবন হতাশা আর কণ্টকাকীর্ণ পথ মাড়ালেও শেলির সাহিত্যে সে প্রভাব খুব একটা পড়েনি। ফলে শেলিকাব্যের মধ্যে হতাশাব্যঞ্জক উপাদানের চেয়ে আশা সঞ্চারণই  মুখ্য হয়ে উঠেছে।

শেলি-কিটস মৃত্যু-অবধি বন্ধুত্ব অটুট রেখেছেন বটে; কিন্তু দুজনের কবিতার আঙ্গিক-প্রকরণ, স্বর-বিন্যাস সম্পূর্ণ আলাদা ও বিপরীতমুখী। কিটসের বিষাদময়তা শেলিকে মোটেই স্পর্শ করেনি। সে কারণে তাঁকে আশাবাদী কবির অভিধায় আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে।

দুই কবির নির্মাণকলায় ভিন্নতা, ভাষাশৈলীর ব্যতিক্রম থাকার পরও পরস্পরের মধ্যে গড়ে ওঠা বন্ধুত্বে কখনোই চিড় ধরেনি। নৈরাশ্যময়তায় আবৃত কিটসের সৃষ্টিকর্মগুলোর প্রতি অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল ছিলেন শেলি; সেই সঙ্গে কিটসও ছিলেন শেলি-অনুরাগী একজন কবি-পাঠক। গবেষকদের কেউ কেউ লিখেছেন, শেলির প্রমোদতরী যেদিন সমুদ্রে নিমজ্জিত হয়, সেদিন তাঁর পকেটে জন কিটসের কিছু কবিতা ছিল। মৃত্যুর দশ দিন পর প্রায়-গলিত লাশের সঙ্গে কবিতাগুলোও উদ্ধার করা হয়েছে। এই বক্তব্যে আরো স্পষ্ট হয়, দুজনের সম্পর্ক কতটা গভীরে পৌঁছেছিল। অবশ্য শেলি-কিটসের বন্ধুেত্বর গভীরতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তাঁদের কবিতাগুলো প্রকাশনায় আনার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন তৎসময়ের প্রভাবশালী পত্রিকা এক্সামিনারের সম্পাদক লি হান্ট। তার পরই ধীরে ধীরে দুজন এগিয়ে যেতে থাকলেন কাঙ্ক্ষিত পথে, অভীষ্ট লক্ষ্যে। লি হান্ট ছিলেন দুজনের দুঃসময়ের বন্ধু। কাকতালীয়ভাবে দুই কবিই পরিণত বয়সের পূর্ণতা না নিয়ে পরপারে চলে গেছেন!

শেলির একটি দীর্ঘ কবিতা পাঠের মধ্যে ধারণা পাওয়া সহজ, কিটসের প্রতি কতটা দুর্বল ছিলেন তিনি। মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে যখন যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান জন কিটস, তখন তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে ৫৫ স্তবকের ৪৯৫টি পঙিক্তর অফড়হধরং শিরোনামের বিশাল একটি শোকগাথা রচনা করেন শেলি। সেখানে জগৎ মাতাকেও কিটসের শোকে ক্রন্দন করার জন্য আহ্বান জানিয়ে শেলি বলেছেন, ‘কিটসের মতো চির অমর আলোকশিখাকে কালের ঝাপটা কখনোই নির্বাপিত করতে পারবে না। ’ ইংল্যান্ডের ‘পয়েট লরিয়েট’-খ্যাত ভিক্টোরিয়ানযুগের বিখ্যাত কবি আলফ্রেড লর্ড টেনিসনের প্রিয় বন্ধু আর্থারের মৃত্যুতে লেখা ‘ইন মেমোরিয়াম’ শীর্ষক শিরোনামের শোকগাথাটির মতো কিটসকে নিয়ে লেখা শেলির অফড়হধরং শোকগাথাটিও পৃথিবীর ইতিহাসে ঐতিহাসিক দলিলের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছে, হয়েছে নন্দিতও। শুধু কি তাই! মৃত্যুযন্ত্রণায় যখন বিছানায় কাতরাচ্ছিলেন কিটস, তখন শেলি তাঁকে বারবার নিজের কাছে নিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। খুব কাছ থেকে বন্ধুকে সেবাযত্ন দিতে চেয়েছিলেন। শেলি জানতেন, কিটসের দেহের ভ্রাম্যমাণ ব্যাধিটা তাঁকেও আক্রমণ করতে পারে, তার পরও বন্ধুত্বের টানে তা থোড়াইকেয়ার করেছেন তিনি। কিন্তু কিটস নিজেই বন্ধুর ডাকে সাড়া দেননি। কেননা, রোগটা তিনি পেয়েছিলেন পারিবারিক সূত্রে। মা ও ছোট ভাইয়ের সেবাদানকালে যক্ষ্মা নামক ঘাতক ব্যামোটা তাঁর ওপর চেপে বসেছিল। সে কারণেই হয়তো বন্ধুকে এই রোগের অংশীদারিত্ব দিয়ে বিপদে ফেলতে চাননি তিনি। এখানেই স্পষ্ট হয় দুজনের অন্তরের টান কতটা নিবিড় ছিল।

‘এ স্থানটি এতটাই সুন্দর যে এখানে এসে সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যুর প্রেমে পড়া যেতে পারে। ’ কিটসের কবরের সৌন্দর্যতায় মুগ্ধ কবি শেলির এই বক্তব্যে লুকায়িত ছিল মৃত্যুর পর তাঁকে কিটসের পাশে সমাধিস্থ করার শৈল্পিক ইঙ্গিত। প্রকৃতির খেয়াল বোঝার সাধ্য কি আর মানুষ রাখে! দীর্ঘ চড়াই-উতরাই পেরিয়ে হলেও একদিন ঠিকই এখানে, বন্ধুর পাশে এসে আশ্রয় পেয়েছেন শেলি। কেননা, শেলির গলিত লাশ সমুদ্র থেকে উত্তোলনের পর রোমে পাঠানোর কোনো উপায়ই ছিল না। ফলে সমুদ্রপারেই তাঁকে দাহ করা হয় এবং দেহভস্ম কিটসের পাশে পুঁতে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু বিস্মিত হওয়ার কারণ হচ্ছে, শেলিকে দাহ করার কালে তাঁর সর্বাঙ্গ পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও হূিপণ্ডটি অক্ষত থেকে যায়! সেটা পোড়াতে পারেনি পার্থিব কোনো আগুন।

অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদন মুহূর্তে এমন দৃশ্য দেখে ট্রিলাওনি নামের এক ভক্ত কবির অক্ষত হূিপণ্ডটি সেখান থেকে সযত্নে তুলে নেন এবং কবির স্ত্রী মেরি ওয়ালস্টন ক্রাফট তথা মেরি শেলির কাছে তা হস্তান্তর করেন। মেরি শেলি কবির পবিত্র হূিপণ্ডখানা কিটসের স্মৃতির উদ্দেশ্যে লেখা শেলির অফড়হধরং শোকগাথার পাণ্ডুলিপিতে অনেক দিন সংরক্ষণ করে রাখেন এবং মৃত্যুর আগে মেরি তা বাক্সবন্দি করে কিটসের কবরের পাশে প্রোথিত করে রেখে যান। সেদিন দুই বন্ধুর আত্মার মিলন যেন পৃথিবীর কোনো এক দৈবশক্তি এসে নতুনভাবে ঘটিয়ে দিয়েছে আবার!


মন্তব্য