kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


নিষিদ্ধ কুকুরের গল্প ও জ্যাক লন্ডন

ফারহানা রহমান

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



নিষিদ্ধ কুকুরের গল্প ও জ্যাক লন্ডন

জ্যাক লন্ডনের ‘হোয়াইট ফ্যাং’ বইটি প্রথম পড়ি ক্লাস সেভেনে পড়া অবস্থায়। সদ্য চোখ ফোটা নেকড়ে শাবকের গুহার মুখ থেকে প্রথম আলোকময় পৃথিবী দর্শনের বিস্ময়কর বর্ণনা পড়ে বিস্ময়ে অভিভূত ছিলাম বেশ কিছুদিন। সেই থেকে শুরু। একে একে পড়ে ফেললাম ‘কল অব দ্য ওয়াইল্ড’, ‘দ্য সি উলফ’, ‘আগুন জ্বালতে হলে’, ‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘বিধর্মী’, ‘গল্পের শেষে’, বিশেষ করে ‘এক টুকরো মাংস’ গল্পটি আমাকে আজও ভাবায়। তবে তাঁর মাস্টারপিস ‘কল অব দ্য ওয়াইল্ড’ সম্পর্কে আলোকপাত না করলেই নয়। কারণ এই উপন্যাসটি একসময় ইতালি ও যুগোস্লাভিয়ায় নিষিদ্ধ হয়েছিল।

জ্যাক লন্ডন ছিলেন একই সঙ্গে মার্কিন ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক, ছোট গল্পকার ও প্রাবন্ধিক। তিনি ১৮৭৬ সালের ১২ জানুয়ারি ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রানসিসকোতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম জন গ্রিফিথ চেনে। মাত্র ৪০ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবন  ছিল ঘটনাবহুল। অনেকটা রূপকথার মতোই। ১৯১৬ সালের ২২ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

জ্যাক লন্ডন বেড়ে ওঠেন শ্রমিক শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত একজন হিসেবে। দারিদ্র্যপীড়িত শৈশবে জীবন ধারণের জন্য প্রতিদিন ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত তাঁকে পরিশ্রম করতে হতো। তাঁর শৈশব কেটেছে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডের এক বস্তিতে। একসময় ঝুপড়ি ছেড়ে জ্যাক বেরিয়ে পড়েন পৃথিবীর পথে, আর ধার করা টাকা দিয়ে কিনে ফেলেন যার্জেল ড্যাজেল নামক পুরনো এক জাহাজ এবং বনে যান ঝিনুকদস্যু। আর সে জাহাজ ডুবে গেলে বাধ্য হয়ে তিনি মত্স্যজীবীদের দলে যোগ দেন। এর পরের কয়েক বছর খাবার কারখানার শ্রমিকের কাজ থেকে শুরু করে কয়লা উত্তোলন, পাটকলের কেরানি,  শুঁড়িখানার বিক্রেতা ইত্যাদি কাজ করেছেন। ভবঘুরে হিসেবে সারা আমেরিকা ঘুরে বেড়িয়েছেন। আর এ জন্য তাঁকে জেলও খাটতে হয়েছে।  

জেল থেকে বেরোনোর পর জ্যাক বুঝতে পারেন যে পেশিশক্তির চেয়ে মেধাশক্তি বাড়ানোই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। ফলে তিনি ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে স্কুলে ভর্তি হলেন। কলেজে পড়ার সময় দৈনিক পত্রিকার একটি গল্প প্রতিযোগিতায় জয়ী হন। তখনই সিদ্ধান্ত নেন, লেখালেখিকেই পেশা হিসেবে গ্রহণ করবেন। এর মধ্যে ১৮৯৭ সালে তিনি স্বর্ণসন্ধানীদের প্ররোচনায় কলেজ ত্যাগ করে আলাস্কা ও ক্লোনডাইকে যাত্রা করেন আর কপর্দকহীন অবস্থায় ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিরে আসেন। তবে সঙ্গে নিয়ে আসেন সোনার চেয়েও অনেক মূল্যবান  অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার, যা তাঁর সাহিত্যকর্মে প্রভাব ফেলে।

উত্তর আমেরিকায় প্রচণ্ড শীতে কুকুর ও নেকড়েদের মধ্যে থাকাকালে তিনি যে অভিজ্ঞতা লাভ করেছিলেন, পরবর্তী সময়ে সেই অভিজ্ঞতা থেকেই লিখেছেন একের পর এক জগদ্বিখ্যাত সব গল্প-উপন্যাস। তিনি লিখেছিলেন ১৯টি উপন্যাস, ১৮টি ছোটগল্প ও প্রবন্ধের বই এবং আরো বেশ কিছু অন্যান্য বিষয়ভিত্তিক বই।

১৯০২ সালের শেষ দিকে জ্যাকের কুকুর নিয়ে একটা গল্পের কাহিনী মাথায় আসে। এটিকে তিনি চার হাজার শব্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে একটা গল্প লেখার চেষ্টা করেন। কিন্তু একসময় আবিষ্কার করেন যে গল্পটি আসলে মাত্র বলা শুরু হয়েছে, যেতে হবে আরো অনেক দূর। সেই প্রথমবারের মতো তিনি বুঝতে পারেন, লেখার সময় গল্পের চরিত্রগুলো নিজে থেকেই জীবন্ত হয়ে ওঠে আর সে চলে তার নিজের খেয়ালে, গতিতে; যেখানে লেখকের তেমন কিছুই করার ক্ষমতা থাকে না। জ্যাক গল্পটির নাম দেন ‘কল অব দ্য ওয়াইল্ড’, যা বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে আজও বিখ্যাত এক গ্রন্থ।

গল্পটি এ রকম। বাক একটি চার বছর বয়সী বিশালদেহী আধা সেন্ট বার্নারড ও আধা স্কটিশ মেষপালক কুকুর। এই কুকুরটি তার ধনী প্রভু জজ মিলারের অত্যন্ত প্রিয় এবং আদর পেয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার সান্টা ক্লারা ভ্যালির রেঞ্জে সুখে-শান্তিতে দিন যাপন করে আসছিল। এ সময়েই উত্তর আমেরিকায় স্বর্ণখনি আবিষ্কৃত হয় এবং বড় সাইজের কুকুরগুলো হঠাৎ খুবই মূল্যবান উপাদানে পরিণত হয়। কারণ, এরা গভীর বরফক্ষেত্র থেকে স্লেজগুলো টেনে আনতে পারত। ঠিক এ সময়ই হঠাৎ একদিন বাকের জীবনে নাটকীয় মোড় নেয়, যা এক অর্থে নারকীয়ও বটে।

জুয়ায় আসক্ত জজের এক অসাধু দাস বাককে চুরি করে উত্তর আমেরিকার কুকুর ব্যবসায়ী একদল চোরের  কাছে বিক্রি করে দেয়। সে এই প্রথমবারের মতো খাঁচায় বন্দি হয়ে ভ্রমণ শুরু করে এবং আলাস্কায় বিক্রি হয়ে যায়, যেখানে কুকুর স্লেজই পরিবহনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছিল।

বাক এখানে কুকুর দলের সঙ্গে থেকে কী করে স্লেজগাড়ি টানতে হয়, কী করে ঘুমের জন্য বরফের ভেতর গর্ত তৈরি করতে হয়, কী করে চিরস্থায়ী ক্ষুধা-যন্ত্রণার মধ্যে বেঁচে থাকতে হয় এবং কখন কী করে পশুদের সহজাত বুদ্ধিমত্তার ওপর নির্ভর করে চলতে হয়—এসব তাকে বাধ্য হয়ে শিখতে হয়। একটি ব্যাপার সে বুঝতে পারে যে তার মধ্যে সহজাত পশুপ্রবৃত্তি অত্যন্ত প্রখর। ফলে আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে পাল্টা আক্রমণ করে প্রতিপক্ষকে মুহূর্তের মধ্যে ঘায়েল করে ফেলতে হবে, আর তা না হলে যে নিজেরই জীবন এসব পরিস্থিতিতে বিপন্ন হয়ে উঠতে পারে, সেটাও তার বুঝতে বাকি থাকে না। একই সঙ্গে সে বুঝতে পারে যে এই বরফাচ্ছন্ন উত্তরের জীবনে তাকে প্রতিমুহূর্তে সতর্কতার সঙ্গে নানা ধরনের অস্বস্তি ও ক্রমাগত ব্যথা-বেদনার সঙ্গে জীবনধারণ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

দিনের পর দিন ক্ষুধার্ত থেকে বাকের কাঁচা মাংস ও রক্ত খাওয়ার আদিম প্রবৃত্তি জেগে ওঠে। একই সময়ে স্লেজগাড়ি টানার প্রধান কুকুর স্লেজের দ্বারা নানাভাবে উত্ত্যক্ত হয়ে একসময় বাক সুযোগ বুঝে ওই কুকুরটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আর যুদ্ধ করেই নিজের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে নেয়। ফলে সে তার দুই মাস্টার ফ্রাসোয়াঁ ও পেরল্টের কাছে একসময় খুবই প্রিয় হয়ে ওঠে।

পরে বাকের নতুন স্কটিশ প্রভু একটি অত্যন্ত প্রতিকূল পরিবেশে প্রায় অসহনীয় অবস্থায় বাককে কাজ করতে বাধ্য করে। বাক ছাড়া অন্য কুকুরগুলো এ অবস্থায় পথিমধ্যেই মারা পড়ে। যদিও এ পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে ক্ষুধা-তৃষ্ণায় বাককে ভয়ংকরভাবে ওজন হারাতে হয়।

এ সময় বাকের সঙ্গে পরিচয় হয় জন থর্নটন নামের এক দয়ালু ব্যক্তির, যাঁর নিরলস সেবায় বাক একসময় নিজের হারানো স্বাস্থ্য ফিরে পায়। এর প্রতিদান হিসেবে বাক তার নতুন প্রভুর প্রতি গভীর আনুগত্য ও নিষ্ঠা প্রদর্শন করতে থাকে । প্রভুর সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে থেকে তাঁকে সব ধরনের বিপদের হাত থেকে রক্ষার চেষ্টা অব্যাহত রাখে। কিন্তু এত কিছুর পরও বাক একদিন গভীর জঙ্গল থেকে এক রহস্যময় ডাক শুনতে পায়, যা তার ভেতরের বহু পুরনো সুপ্ত সত্তাকে তীব্রভাবে জাগিয়ে তোলে।

এরপর জন থর্নটন বাককে নিয়ে সভ্যজগতে ফিরে এলে একজন মাতাল খনিজীবী তার ওপর হঠাৎ আক্রমণ করে বসে। ফলে বাক তত্ক্ষণাৎ লোকটাকে মেরে ফেলে এবং পরে তার প্রভু নদীর স্রোতে ভেসে গেলে বাক তীব্র স্রোতের প্রতিকূলে নিজের জীবন বিপন্ন করে প্রভুকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। জন থর্নটনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় সভ্যজগতের সঙ্গে বাকের সব লেনদেন। সে ফিরে যায় তার বন্য জীবনে নেকড়েদের মাঝে। কিংবদন্তি আছে যে বাক নেকড়ে ও কুকুরের সংমিশ্রণে একটি নতুন বংশবৃদ্ধি করে, যারা এখনো সেই গহিন উত্তরের বন্য জায়গাগুলোয় ঘুরে বেড়ায় এবং মধ্যরাতের প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় মানুষ তাদের গান এখনো শুনতে পায়।

১৯০৩ সালে প্রকাশিত কল অব দ্য ওয়াইল্ড জ্যাক লন্ডনের নিঃসন্দেহে একটা মাস্টারপিস রচনা। লন্ডনের এই লেখাটি ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বেশ কয়েকজন ইউরোপীয় একনায়কতান্ত্রিক শাসক ও তাঁদের শাসনব্যবস্থার জন্য মোটেও গ্রহণযোগ্য ছিল না। ফলে কোনো কোনো দেশ লেখাটিকে নিষিদ্ধ করে। যেহেতু লন্ডন এই লেখায় স্পষ্টভাবে সমাজতন্ত্রের সমর্থক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন, ফলে ১৯২৯ সালে ইতালি ও যুগোস্লাভিয়া উপন্যাসটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এ ছাড়া ১৯৩৩ সালে নািস বাহিনী লন্ডনের কাজগুলোকে আগুনে পুড়িয়ে ফেলে।

কল অব দ্য ওয়াইল্ডে আমরা দেখতে পাই, বাক প্রথমে তার আরামদায়ক অস্তিত্ব থেকে দূরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে এবং নিজেকে একটি সফল স্লেজগাড়ির কুকুর হিসেবে গড়ে তুলছে এবং একসময় নিজেকে নেকড়ে দলের নেতা হিসেবে প্রমাণিত করছে। ফলে সে নিজেই নিজের দেবতা হয়ে উঠছে।

সম্ভবত এ ব্যাপারটিই ইউরোপীয় শাসকশ্রেণির কাছে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যেখানে দেখানো হয়েছে যে শ্রমিকশ্রেণি নিজেদের ক্ষমতা উদ্ধারের জন্য শাসকশ্রেণির সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হচ্ছে এবং নিজেদের ক্ষমতাধর হিসেবে সমাজে তুলে ধরছে। আসলে একনায়কতন্ত্রের শাসনব্যবস্থা তত দিনই টিকিয়ে রাখা সম্ভব, যত দিন রাষ্ট্রের জনগণকে অবরুদ্ধ করে রাখা যায়। ফলে ওই শাসকরা এমন একটি বইকে চিরকালের জন্য ঢালাওভাবে নিষিদ্ধ করার চেষ্টা চালিয়েছিল, যেখানে একজন নিজের সত্তাকে খুঁজে নিতে এবং সব বশ্যতাকে অস্বীকার করে নিজেকে নিজের দেবতা ভাবতে পারে বলে মনে করা হয়।


মন্তব্য