kalerkantho

26th march banner

মহেঞ্জোদারো ১৯৭১

অদিতি ফাল্গুনী

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মহেঞ্জোদারো ১৯৭১

‘তুনজো দাড়ো-এত্থে আও (এদিকে আসো ভাই!)!’

সিন্ধিতে তাকে কে ডাকল? রোহিত কুমার না? সিন্ধুর হিন্দু ছেলে। তার মতোই আঠারো বছর বয়স। রোহিত কোন দিক থেকে তাকে ডাকছে? হিন্দি-উর্দু সিনেমার গান দারুণ গাইতে পারে রোহিত। গজল বা ভজন। আসলে করাচি শহর থেকে তিন ঘণ্টার জার্নি করার পর ডি. জে. সিন্ধ কলেজের বিএ প্রথম বর্ষের ছাত্রদের বহনকারী বাসটি এসে মহেঞ্জোদারোর সামনে থামতেই বুকের ধুকপুক বেড়ে গেছিল তার। সহপাঠী সবাই বলতে গেলে পশ্চিমা। মানে কেউ সিন্ধি, কেউ পাঠান, কেউ পাঞ্জাবি আবার কেউ বালুচ। বাঙালি সে একাই। একটু একটু করে অল্প অল্প সিন্ধি, টুকটাক পশতু বা বালুচ পর্যন্ত তার শেখা হয়ে যাচ্ছিল এই বহুভাষী শহরে এসে। উর্দু তো আছেই! তবু কেন জানি দল থেকে আলাদা হয়ে পড়েছিল সে মহেঞ্জোদারোতে ঢোকার পথে। সে কি কোনো ভুল টার্ন নিয়েছে?

‘তু-ন-জো দা-রো-এ-ত্থে আও! ইফতেখার! এ ইফতেখার!’

রোহিতের গলা গানের সুরের মতো, বর্ণিল কোনো স্বরসপ্তকের মতো বাতাসের দ্রাঘিমাবৃত্তে ঘুরে ঘুরে পাক খায়।

‘অলাকা দিল তারাশা, মাক্কারাশা (ভাই, এদিকে এসো! তাড়াতাড়ি এসো)!’

এই গলাটা পশতু ছেলে কামালের। পশতুতে ডাকছে সে। তার বাবা আর্মিতে কাজ করে। উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের ছেলে কামাল। বাবা করাচি ক্যান্টনমেন্টে আছে এখন। কামাল আপাতত বিএ ইতিহাস প্রথম বর্ষে ভর্তি হলেও বাবা চায় সে আর্মিতে যোগ দিক। চোখে পুরু চশমার কারণে সে দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষায় আটকে গেছে। আটকে গিয়ে খুশি। কামাল আর্মিতে কাজ করতে চায় না। সে ইতিমধ্যেই বাবাকে লুকিয়ে সিন্দ-হারি পার্টির (সিন্ধের কৃষক পার্টি) ছাত্র সংগঠনের  ডি. জে. সিন্ধ কলেজ শাখায় নাম লিখিয়েছে।

‘ইফতেখার, তু কাঁহা গ্যয়ি?’

এবার গলাটা যার শোনা যাচ্ছে সে করাচির মোহাজির—মানে ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে আসা মেহবুব। ভেতরে ভেতরে সিন্ধিরা যেমন তার ক্লাসেরই রোহিত কুমার বা আবদুর জিলানী, তারা কেউ-ই এই মোহাজিরদের পছন্দ করে না। মোহাজিরদের জন্য সিন্ধিরা সংখ্যায় কমে যাচ্ছে, উর্দুর দাপটে সিন্ধি ভাষা সংখ্যালঘু হয়ে যাচ্ছে সিন্ধিদের প্রাণকেন্দ্র খোদ করাচি শহরে...এসব নিয়ে চাপা ক্ষোভ আছে তাদের।

‘এই ত আমি’, এটুকু বাংলায় বলেই সহপাঠীরা বুঝতে পারবে না ভেবে জিব কেটে আবার গলা তোলে ইফতেখার, ‘হাম ইধার হো!’

টিলার বাঁ কিনার থেকে বন্ধুদের দেখে হেসে হাত নাড়ে মার্চের গনগনে গরমে ঘামতে থাকা ইফতেখার। সে ডান দিক থেকে উঠছিল।

‘লো খানা লো!’

মেহবুবের হাতে ব্রেকফাস্টের প্যাকেট। মামা-মামির বাসা থেকে কলেজের বাসে সকাল ৮টায় ওঠার সময় তাড়াহুড়ো করে কিছু খাওয়া হয়নি।

‘দিন-কাল ভালো না। দেখেশুনে যাবি। তোর ক্লাসে তো একটাও বাঙালি ছাত্র নেই। আপা চাইল তুই করাচিতে এসে বিএ-তে ভর্তি হ। দেশে থাকলে তো টো টো করতি, দেশে তোর বয়সী বাঙালি ছেলেরা তো এখন কেউ ঘরে থাকে না। এ ছাড়া পাকিস্তান যত দিন আছে, করাচি-লাহোরে এসে না পড়লে কি আর ভালো চাকরিবাকরি মেলে? কিন্তু এখন আমরা তো এদের জাতশত্রু হয়ে যাচ্ছি। ৭ মার্চ ঢাকায় যে ভাষণ শেখ সাহেব দিয়েছেন, তোর মামিকে বলিস, শাড়ি না পরে সালোয়ার-কামিজ পরে বের হতে। রাস্তায় শাড়ি দেখে তো বুঝে ফেলে আমরা বাঙালি। ভয়ে ঘরে চাল কিনি না আজ কত দিন! চাল কিনতে দেখলেই বুঝে যাবে বাঙালি, ভাত খাই। এমনিতে বড় শহর। ফ্ল্যাটের একতলার মানুষ আরেকতলার মানুষের খোঁজ নেয় না। তবু দেখেশুনে যাবি বাবা!’

‘অত চিন্তা কোরো না তো মামা!’

‘চিন্তা না করে কী করব? এই মাউরাদের দেশে কাজে এসে আটকা পড়ে গেছি। ওপারে যারা আছে, তারা মরতে মরতে মারবে কী বাঁচবে। আমরা কোথায় যাব? আল্লাহ ভরসা! যা বাবা!’

মেহবুবের হাত থেকে ব্রেকফাস্টের প্যাকেট নিতে গিয়ে সে দেখে, তার দিকে তাকিয়ে আছে কলেজের ট্রাস্টি কমিটির একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর ইসহাক আর সহপাঠী রোহিত কুমারের বাবা এবং এই কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক ভরদ্বাজ কুমার। বিশ-পঁচিশজন ছাত্রের সঙ্গে দু-তিনজন শিক্ষক ও মেজর ইসহাক। পাঞ্জাবিদের একদম পছন্দ করেন না। এত ছেলের ভেতর তাঁর দিকেই কেন বিশেষভাবে তাকিয়ে আছেন ভরদ্বাজ কুমার ও মেজর ইসহাক?

‘হাউ আর ইউ বয়? ইওর প্যারেন্টস লিভ ইন ঢাকা?’

মেজর ইসহাকের ভ্রু কুঁচকানো। তার হাতে একটা ইংরেজি নিউজ পেপার। তবে কাগজের ঝকঝকে ছাপা দেখে মনে হচ্ছে, এটা ব্রিটেন বা আমেরিকা-জাতীয় কোনো দেশের কাগজ। মেজর ইসহাক করাচি প্রেসক্লাব থেকে সৌজন্যে নাকি খান তিনেক বিদেশি কাগজ পান। এ দেশে মামার বাড়িতে ইংরেজি কাগজই রাখা হয়। ডন। সিন্ধি-পশতু-বালুচ-পাঞ্জাবি...পড়বে কী করে? উর্দু, তা-ও খানিকটা পড়া যায়! আজ সকালে বাসা থেকে পেপার দেখে বের হয়নি ইফতেখার। সময়ও ছিল না। ঘুম থেকে উঠতেই দেখে, সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। এ ছাড়া সেজ মামার বাড়ির হকারটি বেশ ফাঁকিবাজ। নটার আগে এক দিনও পেপার দেয় না। ঢাকার কি কিছু হলো? আজ মার্চের কত তারিখ যেন? ছাব্বিশ, না সাতাশ?

‘নো, পার্বতীপুর! ইন নর্থ বেঙ্গল!’

‘আই সি!’

মেজর ইসহাক আর ভরদ্বাজ কুমার পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করেন।

‘পলিটিশিয়ানস উইল নট মেক আ ফেয়ার গেম অ্যান্ড আর্মি উইল বি দ্য ক্রুয়েলেস্ট! ক্যান পাকিস্তান সারভাইভ?’

...ভরদ্বাজ কুমার সিগারেটের গোড়া জুতায় মাড়াতে মাড়াতে বলেন। মেজর ইসহাক তার ন্যাড়া মাথার ঘাম রুমালে মুছে বিষণ্ন ভঙ্গিতে মাথা নাড়েন, ‘দ্যাটস ইট। এনিওয়ে, লেট আস বেটার ভিজিট মহেঞ্জোদারো। ’

 

২.

‘সিন্ধি ভাষায় মহেঞ্জোদারো অর্থ মৃত মানুষের টিলা। ২৫০০ অব্দে আমরা সিন্ধুর মানুষরা এই সভ্যতার সূচনা করেছিলাম’—প্রফেসর ভরদ্বাজ কুমার বলতে থাকেন সিন্ধি, উর্দু আর ইংরেজি মিলিয়ে। “মজার ব্যাপার কী ছেলেরা জানো? কোনো কোনো ইতিহাসবিদ দাবি করছেন যে আমাদের এই নগরের নাম আরো আগে নাকি ছিল ‘কুক্কুতরমা’। বুনো মোরগ বা মুরগিকে এই নগরীর মানুষ প্রথম গৃহপালিত করে। তাই এই নগরীর অনেক প্রাচীন শিলালিপি বা পুরাকীর্তিতে তোমরা মোরগ লড়াইয়ের ছবি পাবে। ধর্মীয় আচারের নিষ্ঠায় পালিত হতো এই মোরগ লড়াই। আমাদের এই সভ্যতা মিসর বা মেসোপটেমিয়া সভ্যতার চেয়ে কম পুরনো নয়। তাকিয়ে দেখো পূর্বে সিন্ধু আর পশ্চিমে ঘাঘঘর-হাকড়া নদীর মাঝেই এই গোটা উপত্যকা। এখান থেকে মাত্র ২৮ কিলোমিটার দূরেই লারকানা—ভুট্টো সাহেবের শহর! ঘাঘঘর-হাকড়া অবশ্য বহু দিন হয় শুকিয়ে গেছে!”

ছাই সিন্ধু নদী! ইফতেখার ভাবে। উত্তর বাংলার ছেলে সে। বাবার বাড়ি পার্বতীপুর, আর মামাবাড়ি তো খোদ বগুড়ায়ই। যমুনা নদীর থেকেও ছোট সিন্ধু নদী। তবু করাচির সমুদ্রসৈকতে আরব সাগরের জলে বুঝি আরব সাগরের জলও মিশে আছে!

‘ইফতেখার, তুম বঙালি হ্যায় না?’

অধ্যাপক ভরদ্বাজ কুমার এবার প্রশ্ন করেন উর্দুতে।

‘জি, স্যার!’

‘এক বংগালি আর্কেওলজিস্ট...সাম আরডি, ব্যানার্জ্জি পহিলে আয়া থা ইস সাইট মে-ইট ওয়াজ নাইনটিন নাইন্টি নাইন টু টোয়েন্টি। হি ফার্স্ট আইডেন্টিফায়েড দ্য অ্যান্টিক্যুইটি অব দিস সাইট। দেন কেইম কাশিনাথ নারায়ণ দিত, জন মার্শাল, আর্নেস্ট ম্যাকায়, আহমাদ হাসান দানি অ্যান্ড আদার গ্রেট আর্কেওলজিস্টস। নাউ বয়েজ- হেয়ার- সি দ্য ভিউ অব দ্য এন্টায়ার সিটি। ইট ওয়জ ডিভাইডেড ইন টু মেজর পার্টস...’

অধ্যাপক ভরদ্বাজের গলার সঙ্গে সঙ্গে মাথার ওপর দুপুর বারোটার রোদ চড়তে থাকে। গোটা মহেঞ্জোদারোই তো দুটো অংশে ভাগ। একটি অংশে দুর্গ, আর একটি অংশ নিচু বা ঢালুর শহর। দুর্গ শহরটি পোড়া ইটের প্রায় ফুট আটত্রিশ উঁচু। পুরনো দিনের স্নানঘর, প্রায় হাজার পাঁচেক নাগরিকের বসবাস করার মতো জায়গা আর দুটো সভাগৃহের ভগ্নাবশেষ ঘুরে ঘুরে দেখল ইফতেখাররা। স্থানীয় কোনো কোনো বাচ্চা ডাব বা চা বিক্রি করছে। স্নানঘর বলে যে ভগ্ন পুরাকীর্তিগুলো দাঁড়িয়ে আছে, সেখানেই কি এমন কোনো চৈত্রের দুপুরে নির্জনে বসন খুলত ইফতেখারের বয়সী কোনো অষ্টাদশী? তাদের সময়ে কোনো সাবান ছিল কি? কী মাখত তারা রূপসজ্জায়?

‘দিস ওয়াজ দ্য সেন্ট্রাল মার্কেট- সি বয়েজ!’ অধ্যাপক ভরদ্বাজ বাঁ হাতের তর্জনী নির্দেশ করেন। বাজারের মাঝভাগে একটি বড়সড় জলের কূপ। এখান থেকে অন্যান্য বাসাবাড়ির ছোট ছোট কূপে জল যেত! ময়লা বা ব্যবহূত জল চলে যেত নর্দমায়। অভিজাতদের ঘরগুলো একটু আলাদা। স্নানের জন্য আলাদা ঘর তো আছেই, কোনো কোনো দালানে ছিল পাতাল চুলার ব্যবস্থা, যেন শীতের দিনে গরম জলে স্নান করা যায়। অনেক ঘরেই বারান্দা ছিল। কোনো কোনো বাড়ির দোতলার ভগ্নাবশেষ আজও রয়ে গেছে।

‘হেয়ার ইজ দ্য গ্রেট গ্র্যানারি অব দ্য সিটি। স্যার মর্টিমের হুইলার আইডেন্টিফায়েড ইট...’

অধ্যাপক ভরদ্বাজ এবার দেখাচ্ছেন একটি বিশাল কাঠের তৈরি শস্যাগার। শস্য শুকানোর জন্য বাতাস নিয়ন্ত্রণের বিশেষ ব্যবস্থা ছিল এই গোলাঘরে। গ্রাম থেকে ফসল এনে এখানেই সরাসরি ফেলা হতো শুকানোর জন্য।

‘দিস সিটি ওয়াজ ডেস্ট্রয়েড সেভেন টাইমস, অলসো রিবিল্ট ফর সেভেন সাকসেসিভ টাইমস!’ অধ্যাপক ভরদ্বাজ বলে চলেন। বহিঃস্থ আক্রমণকারীদের হামলা ছাড়া আরো ছিল সিন্ধু নদের তীব্র বন্যা। এর আগে করাচি শহরের জাদুঘরে মামা-মামি আর মামাতো দুই ভাইয়ের সঙ্গে ইফতেখার দেখেছে মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া নানা উপবিষ্ট বা দাঁড়ানো মানুষের ভাস্কর্য, তামা আর পাথরের হাতিয়ার, সিলমোহর, সোনার গয়না আর শিশুদের খেলনা। মহেঞ্জোদারো থেকে পাওয়া এক পঞ্চদশী নর্তকির ভাস্কর্য কী অপরূপ! সারা দেহে আর কিছুই নেই, শুধু দুই হাতভর্তি চুড়ি ছাড়া। কিংবা ধরো এক পুরোহিত রাজার ভাস্কর্য। পরনে সিন্ধি পোশাক আজরুক। মোচ নেই, তবে মুখে হালকা দাড়ি এক রাজা। চারপাশে পশু পরিবেষ্টিত, যোগাসনে বসা দেবতা পশুপতি কি সাড়ে পাঁচ হাজার বছরের এক পুরনো তামার মালা। চার ফুট লম্বা মালা কে পরত? এই নগরীর কোন নর্তকি, কোন অমাত্যের স্ত্রী বা কে?  

‘স্যার, লেকিন ইয়ে সব তোড় কিয়া কিঁউ? সব কিউ টুটে গ্যয়া?’

মেহবুব প্রশ্ন করে উর্দুতে। এমনি সময় কখনো কখনো উর্দুতে কথা বললেও মোহাজিরদের সঙ্গে কথা বলার সময় মেজর ইশহাক হোক কী অধ্যাপক ভরদ্বাজ কুমার...তারা ইংরেজিতেই উত্তর করবে। করবেই করবে।

‘দ্য ইন্দাস ভ্যালি সিভিলাইজেশন ওয়েন্ট ইনটু ডিক্লাইন বাই দ্য ইয়ার সেভেন্টিন...’

আচ্ছা, ১৭০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেই তবে সিন্ধু নদের সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছিল? কেন ঘাঘঘর নদীর স্রোত শুকিয়ে গেল? বড় কোনো ভূমিকম্প হয়েছিল? ইন্দো-আর্যরা তো সরস্বতী আর গঙ্গা নদীর মাঝে ১৫০০ অব্দে তাদের বৈদিক সভ্যতা গড়ে তুলেছিল?

আজ এই মহেঞ্জোদারোতে ভ্রমণের আগে সিন্ধু সভ্যতার ইতিহাস পড়াতে গিয়ে অধ্যাপক ভরদ্বাজ পড়িয়েছেন কিভাবে ৫০০-৩০০ অব্দে সিন্ধু নদের পশ্চিমে পারস্য-গ্রিক-কুশান সভ্যতা গড়ে উঠেছিল। আলেক্সান্দার দ্য গ্রেট পাঞ্জাব ও সিন্ধুর ভেতর দিয়ে মার্চ করে গেছিলেন সপ্তম-দশম শতাব্দী নাগাদ। সপ্তম শতাব্দীর পর তো ইসলাম এলো। রাজা দাহির সেনের পরাজয়ের পর হাব্বারি, সুমরা, সাম্মা বা আর্ঘুম গোত্রের সিন্ধিরা একে একে সবাইকে ইসলাম গ্রহণ করতে হলো। করাচি না এলে কখনো বুঝি জানত ইফতেখার যে ভুট্টো পদবিটি সিন্ধুর রাজপুত হিন্দুদেরও আছে? বাচো, ভুট্টো, ভাট্টি, ভানব্রো, মহেন্দ্র, বুরিরো, লাখা, সাহেতা, লোহানাস, মহানো, দাহার, ইন্ধার, চাচার, ধারেজা, রাঠোর, দাখান কি লাংঘা। রাজা দাহিরের পরাজয় ভাষ্য পড়াতে পড়াতে ক্লাসে কি খানিকটা উদাস হয়ে যান অধ্যাপক ভরদ্বাজ?

 

৩.

‘বোল্ আরিয়ো ধাত্রী বোল্

   রাজসিংহাসন ডামাডোল...

মুলকে হামান হাসতি উঠায়া

  বোলকে হামান কৃষি উঠায়া

   হাসনগর কি কিষান কি পয়গম হ্যায়!’

...মহেঞ্জোদারো ঘুরে দুপুরের পর বাসে ফেরার অবসাদ দূর করতেই বোধ করি মেজর ইসহাক গান ধরেছেন। সঙ্গে ছেলেরা কয়েকজন তাল তুলছে। তবু এ গান কি তোলা ঠিক হচ্ছে? ক্লাসের সবাই তো আর কিছু মার্ক্সিস্ট নয়! কিছুদিন আগে নর্থ-ওয়েস্ট প্রভিন্সের হাসনগর এলাকায় প্রায় ১০০০০ একর কৃষিজমি স্থানীয় জোতদাররা পুরোটাই অধিগ্রহণের চেষ্টা করলে পাঞ্জাব, বেলুচিস্তান, সিন্ধু বা নর্থ-ওয়েস্ট প্রভিন্সের যত সোশ্যালিস্ট-কমিউনিস্ট দল তারা সবাই বিশাল বড় আন্দোলন করেছিল। এ দেশে বছরখানেক থাকার সুবাদে আর সেজ মামা নিজে ন্যাপের সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে এপারের মার্ক্সিস্টদের সঙ্গে বেশ তাড়াতাড়ি পরিচয় হয়েছে ইফতেখারের। ইতিমধ্যে সে ঘুরেছে তার পশুতু বন্ধু কামালের বাড়ি, যেখানে অতিথিকে দেবতার মতো সম্মান করা হয়। তবে বাড়ির মেয়েরা সচরাচর বাইরের ছেলেদের মুখ দেখায় না। ঘুরেছে সে হোলির দিনে সিন্ধি বন্ধু রোহিত কুমারদের বাড়িতে। হোলির দিনে মন্দিরে মন্দিরে রঙের থালা হাতে সে ঘুরতে দেখেছে সিন্ধুর কমে আসতে থাকা হিন্দু পরিবারগুলোর মেয়েদের। ইফতেখার আরো গেছে লানডির পাহাড়ে, যেখানে শ্রমিকদের ওপর পুলিশের ঝটিতি আক্রমণের সময় পাহাড়ের তিন দিক থেকে পুলিশের দিকে পাথর ছুড়ে মারার সময় ইফতেখারও তাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। এবার বাসে আরেকটি গান উঠছে তালে তালে :

‘তোড় রাহা হ্যায় জিঞ্জির এশিয়া

    তোড় রাহা হ্যায় জিঞ্জির...

নয়ি জিন্দিগি নিগার রেহি হ্যায়

    ওধার মাও কা চীন।

হিন্দুস্তান সে মালেদেশেতা

    লাগি হুই হে আগ,

সাম্রাজ কো ছেদ রহি হ্যায়

  ভিয়েতনাম মে সাম্রাজ কি

    গুজলে লাগে চেরাগ!’ 

এশিয়ার জিঞ্জির টুটবে ভালো কথা, বাঙালির জিঞ্জিরের কী হবে? দেশ থেকে বেশ কিছুদিন চিঠি আসে না। চিঠি এলে মায়ের সেই একই কথা : ‘মন দিয়া পড়াশোনা করিয়ো। ঘরের খাইয়া বনের মোষ তাড়াইবার আপাতত কোনো প্রয়োজন নাই। মাউরাদের সঙ্গে কভু কোনো বিবাদে যাইবে না। ’

...মহেঞ্জোদারো পার হয়ে লারকানা। তারপর বাস করাচি পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধ্যা ছয়টা। একে একে সব ছাত্র বিদায় নিলে এমনকি অধ্যাপক ভরদ্বাজ কুমার আর তাঁর ছেলে রোহিত কুমার পর্যন্ত বিদায় নিলে মেজর ইসহাক তাঁকে থামতে বলেন, ‘ওয়েট আ মিনিট!’

‘ইয়েস স্যার?’

‘কাম উইথ মি!’

সামনের একটা রেস্টুরেন্টে বসে চারদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে সকালের সেই ইংরেজি কাগজটা ইফতেখারের দিকে বাড়িয়ে দেন তিনি, ‘দিখো!’

Jinnah’s dream of unity dissolves in blood

by Kenneth Clarke (who returned from Karachi yesterday)

The Telegraph, March 27-1971 : Civil war in Dacca seems to spell the final, bloody end to the dream of unity between the two peoples of Pakistan, separated by 1,000 hostile miles of India and tenuously linked by a solitary thread, religion.

That was the dream of Mohammed Jinnah, ‘Founder of Pakistan.’

‘আমাদের দেশের কাগজগুলো খবর সব চেপে গেলেও পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম কি আর চুপ থাকবে? তোমাদের দেশে ম্যাসাকার হয়েছে ইফতেখার!’

‘ম্যাসাকার?’ চায়ের কাপ সামনে রেখে উদ্ভ্রান্তের মতো সামনে বক্তার দিকে তাকায় ইফতেখার।

‘ইয়েস, জেনোসাইড! দিস কান্ট্রি ওয়াজ বাউন্ড টু বি ব্রোকেন...’

‘কবে ম্যাসাকার হলো?’

‘ওভার ওয়ান মিলিয়ন পিপল কিলড ইন ঢাকা অন টোয়েন্টি-ফিফথ মার্চ!’

‘না, আম্মা, আম্মাগো!’

কান্নার একটা ধমক ছিটকে আসে ইফতেখারের গলা থেকে। মা তো ঢাকায় থাকে না, থাকে সেই পার্বতীপুরে! তবু যা কিছু ঢাকা, যা কিছু বাংলার তাই যেন মা!

‘হোয়াই আর ইউ ক্রায়িং?’ ফিসফিসিয়ে বলেন ইসহাক, ‘আই ওয়াজ আ আর্মি পার্সন। বাট আই হেট প্রেজেন্ট পাক আর্মিস রোল। ’ ইফতেখারের দুই কাঁধে মৃদু চাপড় দিয়ে গলা একদম খাদে নামিয়ে বলতে থাকেন, ‘রাদার ইউ শুড বি প্রাউড!  ইউ কাম ফ্রম দ্য ব্রেইভ বেংগলি রেস। মোশরেকি বাংগাল কি যুদ্ধে জেহাদি কি আজাদিকো সুরুখ সালাম। বিদ্রোহী বাঙালির মুক্তিসংগ্রামকে লাল সালাম!’


মন্তব্য