kalerkantho


বই আলোচনা

মাসুক হেলালের ‘মুখ ও মুখোশ’ প্রকাশিত

টোকন ঠাকুর

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মাসুক হেলালের ‘মুখ ও মুখোশ’ প্রকাশিত

গত শতকের আশির দশক এমনকি নব্বইয়ের দশকের প্রথমার্ধ পর্যন্ত ‘দৈনিক বাংলা’ হাউস থেকে প্রকাশিত ‘আনন্দ বিচিত্রা’ই ছিল দেশের প্রধানতম বিনোদন ম্যাগাজিন। আমরা পড়তাম ঢাকার বাইরে বসে। ‘আনন্দ বিচিত্রা’ ছিল আর্ট কলেজ থেকে পাস করা এবং ১৯৭১ সালের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাৎ চৌধুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘বিচিত্রা’র সহযোগী পাক্ষিক প্রকাশনা। শাবানা, ববিতা, সুচরিতা, রাইসুল ইসলাম আসাদ, সুবর্ণা মুস্তাফা, হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলন, আফজাল হোসেন...মূলত টেলিভিশন-সিনেমার লোকদের সৃজনকর্ম-জীবনকাহিনী-গসিপিং ছবিসহ ছাপা হতো ‘আনন্দ বিচিত্রা’র পাতায়। আমাদের বালকবেলার পুরোটা জুড়েই তো উন্মাতাল আশির দশক, জেনারেল এরশাদবিরোধী আন্দোলন, গান, গল্প-কবিতা-আবৃত্তি-পথনাটক-মঞ্চনাটক, ছবি আঁকা, দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার-চিকা...আর এর মধ্যেও রাজ্জাক-কবরী, আল মনসুর, হাশেম খান, রফিকুন নবী, কাইয়ুম চৌধুরী, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আজাদ, সেলিম আল দীন, আবুল হাসান, নির্মলেন্দু গুণ, ফরহাদ মজহার, আহমদ ছফা, এস এম সুলতান, বিড়ি-সিগারেট, শ্মশানঘাটে রাত্রিবেলায় এক-দুইটা পুরিয়া এবং মফস্বলে বসেও ঢাকার দিকে নজর রাখছিলাম। অনেক কিছুর মতো চম্পা-শম্পা রেজার দিকেও বা বলা যায় বিনোদন ম্যাগাজিন বলতে ‘আনন্দ বিচিত্রা’র দিকেও যে নজর রাখছিলাম, সেই কারণেই, সেই মিড-এইটটিজ মানে আমাদের ইঁচড়েপাকা বালকবেলা থেকেই আমরা, আমরা মানে এই আমি বা আমার বন্ধুরা, তাঁকে চিনি। তাঁকে বলতে সেই আর্টিস্টকে। আর্টিস্টের নাম মাসুক হেলাল। তখনকার তরুণ তারকাদের পোর্ট্রেইট আঁকতেন মাসুক হেলাল। হয়তো আঁকলেন তরুণ অভিনেতা হুমায়ুন ফরীদির ‘বর্তমান’ (এই ‘বর্তমান’ বলতে আশির দশক) বয়সী মুখ এবং হুমায়ুন ফরীদির যখন ষাট-পঁয়ষট্টি বছর বয়স হবে, তখনকার কল্পিত বৃদ্ধ ফরীদির মুখ। মাসুক হেলালের আঁকানো একই তারকার তরুণ ও কল্পিত বৃদ্ধ মুখ বা পোর্ট্রেইট পাশাপাশি ছাপা হতো ‘আনন্দ বিচিত্রা’র পাতায়। সেই সঙ্গে শিল্পীর লেখা কিছু একটা থাকত সেখানে, ছোট্ট গদ্য। আমরা পড়ে ভারি মজা পেতাম। তখন তো আর ব্যক্তিগত মাসুক হেলালকে চিনতাম না, মাসুক হেলালও একজন তারকা শিল্পী। তারপর সেই ‘আনন্দ বিচিত্রা’র যুগ পার হয়ে গেল। মিডনাইনটিজে তো পাক্ষিকটা ‘দৈনিক বাংলা’ ও ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’র সঙ্গে বন্ধই হয়ে গেল। কিন্তু মাসুক হেলালের আঁকাআঁকি তো আর বন্ধ হওয়ার নয়, বইয়ের প্রচ্ছদ করে যাচ্ছেন তিনি শতসহস্র, সিনেমায় শিল্প নির্দেশনা দিয়েছেন।

পরবর্তী সময়ে শেখ রেহানা সম্পাদিত ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’তেও তিনি কাজ করেছেন সাংবাদিক বেবী মওদুদের সঙ্গে। কিন্তু মাসুক হেলাল ঠিক তাঁর ‘আনন্দ বিচিত্রা’র সৃষ্টিশীল ভঙ্গিটা যেন ফিরে পাচ্ছিলেন না। বাংলা দৈনিক ‘প্রথম আলো’তে এখন কাজ করছেন মাসুক হেলাল। আবার দেখছি তিনি ঘুরে দাঁড়াচ্ছেন, বাঁক নিচ্ছেন। কাগজটিতে সুন্দর সুন্দর অলংকরণের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সময়ে দেশের প্রত্যন্তের কোনো সাধারণ মানুষের মুখ এঁকেছেন, সেই মানুষটার সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করেছেন, সেই গল্প লিখে তার আঁকা মুখটা প্রথম আলোতে ছাপা হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। এ রকম মুখের আঁকা প্রতিকৃতি ও গল্প প্রকাশিত হয়েছে তাঁর অসংখ্য। ড্রইং বেইজড সেই অসংখ্য পোর্ট্রেইটের গল্পগুলো বাছাই করে প্রকাশিত হয়েছে ‘বাছাই, মুখ ও মুখোশ’, ‘আঁকা ও লেখা মাসুক হেলাল’। ড্রইং দিয়েই যে কিভাবে একটি মুখের ভাষা ধরা যায়, তা দক্ষ হাতে এঁকেছেন শিল্পী মাসুক হেলাল। খুবই সুদৃশ্যমানের, ভালো কাগজ-ছাপা-বাঁধাই হয়েছে ‘মুখ ও মুখোশ’ গ্রন্থটির। প্রচ্ছদ করেছেন শিল্পী আফজাল হোসেন। বইটার একটা চমত্কার ভূমিকা লিখেছেন শিল্পী রফিকুন নবী। ফ্ল্যাপের ছোট্ট লেখাটি লিখেছেন শিল্পী ধ্রুব এষ। মাসুক হেলালও শিল্পীর বংশধর।

‘মুখ ও মুখোশ’ আঁকা-লেখা গ্রন্থের কনটেন্টও খুব মজার। যেমন, ‘রমিজ রওশনের নাটুকে জীবন’, ‘সুরত আলীর চপ-বেগুনি’, ‘পথের মানুষ রেবেকা’, ‘রাশেদ রানার প্রেম’, ‘মসলা পেটেন মমতাজ নূরী’...এই রকমের একেকটা জীবন্ত গল্প। এতে উঠে এসেছে একদম সহজ-সরল মানুষের জীবনের ছাপচিত্র। নিঃসন্দেহে মাসুক হেলালের এই বাছাই ‘মুখ ও মুখোশ’ ব্যয়বহুল গ্রন্থটি প্রকাশ করে পারিজাত প্রকাশনী একটি ভালো প্রকাশনা উপহার দিল আমাদের। যেকোনো গ্রন্থপ্রেমিকই উৎসাহী হবেন বইটি হাতে পেতে, পড়তে, দেখতে। ভালো পোর্ট্রেইট আঁকতে চাওয়া তরুণ আঁকিয়েদের জন্যও বইটি সংগ্রহযোগ্য বলে বিবেচিত হবে দেখামাত্রই।

বাছাই ‘মুখ ও মুখোশ’-এর মূল্য ৫০০ টাকা। আর্ট-গ্লোসি পেপারে ছাপা হওয়া ‘মুখ ও মুখোশ’ গ্রন্থের জনক শিল্পী মাসুক হেলালকে ধন্যবাদ, এমন সুন্দর একটি কাজ পাঠকের সামনে উপস্থাপন করার জন্য। ধন্যবাদ পারিজাত প্রকাশনীকে।


মন্তব্য