kalerkantho


অখণ্ড মানবসমাজ এবং স্বাধীনতা-উত্তর আমাদের লালনচর্চা

আজাদুর রহমান

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



অখণ্ড মানবসমাজ এবং স্বাধীনতা-উত্তর আমাদের লালনচর্চা

ফকির লালন জীবদ্দশায় খুব একটা প্রচার পাননি। ধর্মাধর্মের নানা ফেরে পড়ে অনেকটা গোপনেই চলেছে তাঁর সাধন-ভজন। তা ছাড়া প্রচলিত ধ্যান-জ্ঞানের বাইরে দাঁড়িয়ে অখণ্ড মানবসমাজের কথা যাদের নিয়ে তিনি বলতে চেয়েছিলেন, তারাও উঁচু দরের কেউ ছিল না। ফলে তাঁর জন্মবাস্তু, জাতপাত ইত্যাদি ভালো করে কিছুই জানা যায়নি। তাঁকে খুঁজতে তাই অগত্যা কেবল তাঁর গানের কাছেই যেতে হয়। একদিকে যেমন প্রচারবৈরী ছিলেন, অন্যদিকে এমন অজপাড়াগাঁয়ে তাঁর বসবাস এবং কার্যকারণ ছিল যে সমকালীন লোকসমাজ কোনো দিনই তাঁর মেধাময় দিকটি খুঁজে পায়নি। মোটাদাগে বলতে গেলে রবীন্দ্রনাথই প্রথম লালনগানকে প্রাজ্ঞসমাজে এনে উপস্থিত করান। রবীন্দ্রনাথের লালনপ্রিয়তা এবং বাউলিয়ানার কারণে শিক্ষিত সমাজ যতক্ষণে লালনকে সন্ধান করতে মনোযোগী হতে শুরু করল, ততক্ষণে আর তিনি বেঁচে নেই।

জীবনের নিগূঢ় ভাববোধকে সর্বজনগ্রাহ্য করে এ বাংলায় সম্ভবত তাঁর মতো করে আর কেউ বলতে পারেননি। কার্যত গাঁও-গ্রামের সহজ মানুষদের মুখ থেকে মুখে ছড়িয়ে পড়েছিল তাঁর গান। যিনি সর্বপ্রথম কলম ধরেছিলেন, তিনি বসন্ত কুমার পাল। কাঙাল হরিনাথের সম্পাদনায় তত্কালীন গ্রামবার্তায় লালনের যতটুকু জীবনী ছাপার অক্ষরে এসেছিল, ততটুকুই খাঁটি বলে ধরে নেওয়া হয়েছে। এরপর যে গবেষণা হয়নি তা নয়, হয়েছে। স্বাধীনতা-উত্তরকালে প্রখ্যাত বাউল গবেষক মুহম্মদ মনসুর উদ্দিন কিংবা ড. আহমদ শরীফসহ আরো অনেকেই বিস্তর গবেষণা করেছেন এবং এ বিষয়ে বই লিখেছেন। অধিকন্তু লালনকেন্দ্রিক বেশ কিছু চলচ্চিত্র এবং ডকুমেন্টারিও তৈরি হয়েছে। ফলাফলে ফকির লালন আমাদের কাছে অনেকখানি স্পষ্ট হয়েছে, তবে আমরা ঠিক পুরোপুরি আস্বস্ত হতে পারিনি। ব্যক্তি ফকির লালনের জীবনাচার এবং তাঁর প্রবর্তিত জীবনদর্শন এমনই বহুমাত্রিক আর রহস্যময় যে তিনি মূলত কী বলতে চেয়েছিলেন! তার চেয়ে বরং তিনি কে, হিন্দু না মুসলিম, জাতপরিচয় অথবা যোগ-মহাযোগ কিংবা সাধীকাযোগে একজন সাধু কী করে গোপনীয় কর্মকরণ করে থাকেন ইত্যাদি গূঢ়তত্ত্ব সামনে চলে এসেছে।

সে যা-ই হোক, গবেষকদের মত-দ্বিমত এবং সর্বসাধারণের ক্রমাগত অমীমাংসিত কৌতূহলের যথার্থ কারণ আছে বটে! যেমন—লালনের জন্ম আসলে কোথায় তা আজও স্থির করে বলা যাচ্ছে না। গবেষকদের বেশির ভাগ মনে করেন লালন কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার চাপড়া ইউনিয়নের অধীন ভাঁড়ারা গ্রামে জন্মেছিলেন। এ মতের সঙ্গে কেউ কেউ দ্বিমত পোষণ করেন এই বলে যে ছেউড়িয়া থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের ভাঁড়ারার ১৬-১৭ বছরের একটি যুবক নিখোঁজ হলো অথচ দীর্ঘ জীবদ্দশায় আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিতজন কেউ তাঁকে চিহ্নিত করতে পারল না!—তা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। ১৩৪৮ সালের আষাঢ় মাসে প্রকাশিত মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকার এক প্রবন্ধে লালনের জন্ম যশোর জেলার ফুলবাড়ী গ্রামের মুসলিম পরিবারে বলে উল্লেখ করা হয়। অন্যদিকে বিশিষ্ট লালনসুরি পাঞ্জুশাহর ছেলে খোন্দকার রফিউদ্দিন ‘ভাবসংগীত’ গ্রন্থে লালনের জন্ম-বৃত্তান্ত জানাতে গিয়ে বললেন, ‘ফকির লালনশাহর জন্মভূমি যে যশোর জেলার হরিণাকুণ্ডু থানার অধীন হরিশপুর গ্রামেই ছিল, এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। ’

তত্কালের হিন্দু-মুসলিম সমাজে লালন নামের আর কাউকে পাওয়া যায় না। অর্থাৎ লালনের আগে ‘লালন’ নামের প্রচলন ছিল না বলেই মনে হয়। ধারণা হয়, লালন হয়তো নিজেই চেয়েছিলেন তাঁর পরিচয় গোপন থাকুক। তা ছাড়া লালন নামটা এমন যে হিন্দু-মুসলমান কোনো কিছুতেই ফেলা যায় না। এমনকি তাঁর জন্ম আসলে কোথায়, সেটাও কেউ সঠিক করে বলতে পারেনি। জাত-জন্মের ব্যাপারে লালনের নিজের কথা সোজাসুজি—

সব লোকে কয় লালন কি জাত সংসারে

লালন কয় জাতের কিরূপ

দেখলাম না এই নজরে।

তিনি হিন্দু কি মুসলমান? এ নিয়ে বিবিধ মতামত পাওয়া যায়। কারো মতে তিনি কায়স্থ সন্তান, যার বাবা মাধব এবং মা পদ্মাবতী; পরে তিনি ধর্মান্তরিত হন। ওদিকে সিংহভাগ গবেষক মনে করেন, তিনি জন্মেছিলেন মুসলিম তন্তুবায় পরিবারে। বাবা দরিবুল্লাহ দেওয়ান, মা আমিনা খাতুন। কেউ কেউ আবার তাঁকে বিভিন্ন খাতে ব্যাখ্যা করে হিন্দু অথবা মুসলমান বানানোর অপচেষ্টাও করেছেন। অথচ তিনি জাতপরিচয় জানাচ্ছেন—

সবে বলে লালন ফকির হিন্দু কি যবন

লালন বলে আমার আমি

না জানি সন্ধান

বস্তুত তিনি আপনিতেই পরিচয় দিতে চাননি বরং জন্মবাস্তু জানতে গিয়ে আমরাই হন্যে হয়ে তাঁর কাছে বারবার ধরনা দিয়েছি। অথচ পদে পদে অভিন্ন গান গেয়েছেন তিনি—

সবে বলে লালন ফকির কোন জাতের ছেলে।

কারে বা কি বলি আমি

দিশে না মেলে

প্রথম লালনজীবনীকার বসন্ত কুমার পালও ‘মহাত্মা লালন’ নিবন্ধে একই কথা বলেছেন—‘সাঁইজি হিন্দু কি মুসলমান এ কথা আমিও স্থির বলিতে অক্ষম। ’ কিছু কিছু মুসলমান সাধক ফকির অবশ্য আরেক রকম যুক্তি তোলেন। তাঁদের মতে, আল্লাহর পথে নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন বলেই লালন তাঁর গানে নিজের পরিচয় দিতে গিয়ে ফকির লালন, অধম লালন, দরবেশ কিংবা সাঁই লালন ইত্যাদি উপাধি যোগ করেছিলেন। তবে হিন্দুসাধকরা ফকির পদের পাশাপাশি সাঁই, গোসাই ইত্যাদি পদেও তাঁকে ডেকে থাকেন।

আত্মপরিচয় বিলীন করে তথাকথিত ভেদমার্গের বাইরে গিয়ে নিজকে শুধুই মানুষ হিসেবে পরিচিত করানোর কারণ কী! এককথায় জাতের আগল ভেঙে দিয়ে একটা সহজ সমাজব্যবস্থার কথা ভেবেছিলেন তিনি।

তিনি বারবার মানুষকে ভজতে বলেছেন। মানুষের সঙ্গে গাঁথা আছে মানুষ। তাঁকে ভক্তি-ভালোবাসা না দিলে কোনো সাধনই সিদ্ধ হয় না।

সুতরাং ব্যক্তি লালন কিংবা তাঁর সাধনমার্গের বাইরে বিরাজমান মানবতাবোধকে তুলে ধরার সময় এসেছে। ছুত্মার্গ বিসর্জন দিয়ে মানুষ নামের কাতারে যত তাড়াতাড়ি আমরা দাঁঁড়াতে পারব ততই মঙ্গল। আমাদের বিবেকের খাঁচায় একা ফকির লালন কত আর করাঘাত করে বলবেন—মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি!


মন্তব্য