kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


কেন শিল্পী হলাম

জয়নুল আবেদিন আমার ছবি দেখে বলেছিলেন, তোমার ইন্টারভিউ হয়ে গেছে

হামিদুজ্জামান খান

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জয়নুল আবেদিন আমার ছবি দেখে বলেছিলেন, তোমার ইন্টারভিউ হয়ে গেছে

আমি ছবি আঁকা শুরু করি স্কুলে। যষ্ঠ বা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ি। আমি যখন খাতার মধ্যে লিখতাম, তখন একটু ড্রয়িং করে দিতাম। ড্রয়িং দেখে শিক্ষকরা আমাকে উৎসাহ দিতেন। স্কুলটা ছিল আমাদের গ্রামেই, বনগ্রাম হাই স্কুল। আমার শিক্ষকদের অনেকেই ছিলেন হিন্দু। তাঁদের কাছে ভারত থেকেও অনেক পত্রপত্রিকা আসত। মোটা মোটা ম্যাগাজিন। এগুলো আমাকে দেখাতেন। জলরং, ছবি...তাঁদের কাছেই শুনি এগুলো। একসময় স্কুলে একটি ছবি আঁকার প্রতিযোগিতার চিঠি এলো। আমাকে বলা হলো, তুমি তো ছবি আঁকো, তুমি এঁকে জমা দাও। ১৯৫৭ সাল হতে পারে সেটা। ছবি আঁকলাম, স্কুলে জমা দিলাম। যেখানে প্রতিযোগিতা হচ্ছিল, সেখানে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। কয়েক দিন পর এক শিক্ষক বললেন, তুমি একটা পুরস্কার পেয়েছ। এটা আনতে হবে আরেক থানা থেকে। তখন তো রাস্তাঘাট এমন ছিল না। আমার বাবাকে নিয়ে গিয়েছিলাম। তিনি খুব খুশি হলেন যে আমি পুরস্কার পেয়েছি। আমার মনে আছে, একটা ট্রফির মতো দিয়েছিল। এটা পেয়ে আমার একটু আঁকার ঝোঁকটা বাড়ল। আমি যে আঁকতাম, বাবা পছন্দ করতেন। যখন একটু ওপরের ক্লাসে উঠলাম, তখন দেখতাম যে আমাদের বাড়িতে কেউ না কেউ বসে আছে। বলত যে আমার দাদার ছবি আঁইকা দেও। এঁকে দিতাম। ঘরে নিয়ে ছবিটা বাঁধিয়ে রাখত। এভাবে শুরু হলো ছবি আঁকা।

আমাদের বাড়ির পাশে একজন বিখ্যাত শিল্পী ছিলেন। হেমেন্দ্র মজুমদার। তাঁকে চিনেছি কলকাতায় গিয়ে। কলকাতা মিউজিয়ামে তাঁর অনেক ছবি আছে। আমার আব্বার কাছে তাঁর গল্প শুনেছি। তিনি বলতেন, হেমেন্দ্র মজুমদার একটা পাগলা লোক ছিলেন। মানুষদের ধরে এনে বসিয়ে ছবি আঁকতেন।

ম্যাট্রিক পাস করলাম। আমি ভাবলাম চারুকলায় পড়ব। তখন আমি কিছু জানতাম না। আমি তো একেবারে মফস্বলে বড় হয়েছি। একেবারে গ্রাম। বাড়ি থেকে স্কুল দুই কিলোমিটার, হেঁটে যেতাম। কাঁচা রাস্তা। খালি পায়ে লুঙ্গি পরে স্কুলে যেতাম। আমাকে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি করে দেওয়া হলো ভৈরব কলেজে। কিন্তু কলেজ আমার ভালো লাগছিল না। একদিন বাড়ি চলে আসলাম। এর মধ্যে আমি খোঁজখবর নিয়েছি কোথায় আর্ট কলেজ আছে, কিভাবে ভর্তি হতে হয়? কোথায় যেতে হবে? ঢাকা তো কোনো দিন যাইনি। বাড়ি গিয়ে বললাম, আমি আর্ট কলেজে যাব। আমাদের একজন পোস্টমাস্টার ছিলেন। তিনি বললেন, জয়নুল আবেদিন ঢাকা আর্ট কলেজের প্রধান। আপনি ছেলেকে তাঁর কাছে নিয়ে যান। পোস্টমাস্টারের সঙ্গে আমার বাবার খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। তাঁর সঙ্গে কথা বলার পর বাবা আমাকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় এলেন।

আমাকে সরাসরি ঢাকা এনে আবেদিন স্যারের সঙ্গে দেখা করালেন। স্যারের বাড়িতে। আমি কিশোরগঞ্জের জেনে তিনি খুশি হলেন। কারণ তাঁর জন্মও কিশোরগঞ্জে। আমার সঙ্গে কিছু ছবি ছিল, সাহস করে দেখালাম। বললেন যে তোমার ইন্টারভিউ হয়ে গেছে। তুমি কালকে গিয়ে ভর্তি হয়ে যাও। তখন চারুকলায় ইন্টারভিউ দিয়ে ভর্তি হতে হতো। তিনি যখন বললেন ভর্তি হতে, পর দিন চারুকলায় গিয়ে বললাম, ভর্তিও হয়ে গেলাম। এর মধ্যেই কিন্তু চারুকলায় সেশন শুরু হয়ে গেছে, আমি লেট একটু। প্রায় দুই মাস ক্লাস হয়ে গেছে। গিয়ে দেখি ছেলেরা খুব স্মার্ট, আর আমি তো একেবারে গ্রাম থেকে গেছি। ক্লাস শুরু করলাম। প্রথমে মুস্তাফা মনোয়ার স্যার ছিলেন। তিনি বললেন বেশি বেশি স্কেচ করবে। তিনি দেখিয়ে দিলেন। আমার ভালো লাগত। সাংঘাতিকভাবে চেষ্টা করলাম। প্রথম বর্ষ শেষ করে দ্বিতীয় বর্ষে উঠলাম। ওই সময় ওয়াটার কালারের কাজ শুরু হলো। ভালো করে কাজ করলাম। যদিও আমি একেবারেই গ্রামের ছেলে, তবু দেখা গেল আমিই সবচেয়ে ভালো আঁকি। মনে আছে একবার সারা রাত স্টেশনে বসে স্কেচ করেছি। তারপর ক্লাসে এলাম। কিন্তু আমি হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। মনোয়ার স্যার এসে দেখলেন আমি ঘুমাচ্ছি। অন্য একজনকে বললেন, ওর স্কেচ খাতা বের করো। দেখলেন আমার খাতা পুরোটা ভর্তি স্কেচে। বললেন, ওকে ডেকো না, ও ঘুমাক, ও হয়তো রাতে জেগেছে। যখন ঘুম ভাঙল উঠে দেখি ক্লাসে কেউ নেই। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম। বলল, মনোয়ার স্যার ডাকতে নিষেধ করছেন। বলেছেন, দেখো, এই ছেলে একদিন কী করে। ওর সম্ভাবনা আছে। আমার আগ্রহ আরো বেড়ে গেল। আমি ভর্তি হয়েছিলাম পেইন্টিংয়ে। তখন স্থাপত্যটা চারুকলায় ছিল না। এই ডিপার্টমেন্ট শুরু হয় ১৯৬৩ সাল থেকে। পেইন্টিংয়ের সঙ্গেই স্থাপত্যটা করেছি। ১৯৬৭ সালে পাস করলাম। এরপর সারা জীবন শিল্পের সঙ্গেই থেকে গেলাম।

শ্রুতলিখন : চন্দন চৌধুরী


মন্তব্য