kalerkantho

সোমবার। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ । ১০ মাঘ ১৪২৩। ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৮।


একাত্তরের বাংলাদেশ বিদেশি বুদ্ধিজীবীর বিবেক

আন্দালিব রাশদী

অন্যান্য   

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



একাত্তরের বাংলাদেশ বিদেশি বুদ্ধিজীবীর বিবেক

১৯১৭ সালে প্রথম মহাযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা প্রত্যক্ষ করে র‌্যানডল্ফ বোর্ন ‘দ্য ওয়ার অ্যান্ড দ্য ইন্টেলেকচুয়ালস’-এ লেখেন : আমাদের বুদ্ধিজীবীরা যদি প্রশাসনের নেতৃত্ব দিতে পারতেন তাহলে স্পষ্টতই নিরপেক্ষভাবে কার্যকর করে শান্তি অর্জনের পথ খুঁজে বের করতেন। তাঁরা তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জাতিকে যুদ্ধে লিপ্ত করতেন না

সংকটের সময় বুদ্ধিজীবীর মাথা কচ্ছপের মাথার মতো শক্ত খোলসের ভেতর ঢুকে যায়।

সরকারের অনুগ্রহভাজন বুদ্ধিজীবী সব আমলেই সরকারের সাফাই গান। গাইতে না পারলে পালিয়ে বেড়ান, নিশ্চুপ থাকেন। একাত্তর সেই সাক্ষ্য দেয়।

১৯১৭ সালে প্রথম মহাযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীর ভূমিকা প্রত্যক্ষ করে র‌্যানডল্ফ বোর্ন ‘দ্য ওয়ার অ্যান্ড দ্য ইন্টেলেকচুয়ালস’-এ লেখেন : আমাদের বুদ্ধিজীবীরা যদি প্রশাসনের নেতৃত্ব দিতে পারতেন তাহলে স্পষ্টতই নিরপেক্ষভাবে কার্যকর করে শান্তি অর্জনের পথ খুঁজে বের করতেন। তাঁরা তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে জাতিকে যুদ্ধে লিপ্ত করতেন না। ...

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক বিবেক জেগে উঠেছিল। তারই কিছুটা ভাগ পায় একাত্তরের বাংলাদেশ।

মানুষের বর্বরতার চরম রূপ যুদ্ধ। যুদ্ধে বুদ্ধিজীবীর নির্লিপ্ত থাকা ও নিপীড়কের পক্ষাবলম্বনের উদাহরণের ঘাটতি নেই। এ ভাগে পড়েছেন টিএস এলিয়ট, এজরা পাউন্ড, নুট হামসুন, ডাব্লিউ বি ইয়েটস, পল ক্লদেল, চার্লস মর্গান, এইচ জি ওয়েলশ এবং আরো অনেকে।

স্পেনিশ ভাষার প্রতিবাদীদের শীর্ষে থাকেন ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, পাবলো নেরুদা, মিগুয়েল হার্নান্দেজ, র‌্যাফায়েল আলবের্ডি।

একাত্তরের বাংলাদেশ সৌভাগ্যবশত বিদেশি বুদ্ধিজীবীদের একাংশকে আকৃষ্ট করতে পেরেছে।   তারই কয়েকটি উদাহরণ :

১৯৬৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল বিজয়ী আলফ্রেড কাস্টলার বুদ্ধিজীবী হিসেবেও ইউরোপে পরিচিত। তিনি জার্মান ভাষায় কবিতা লিখতেন। ৮ অক্টোবর ১৯৭১ তিনি প্যারিসে লে ফিগারো পত্রিকায় বাংলাদেশের শরণার্থীদের নিয়ে লেখেন : পৃথিবীর জন্য হিরোশিমা ছিল ভয়াবহ একটি আঘাত। মুহূর্তের মধ্যে শত-সহস্র মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেল। এই আঘাত আমাদের বিবেক জাগাল, আমাদের সচেতন করে জানিয়ে দিল, আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করি, যেখানে মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ আবিষ্কারগুলো জীবন রক্ষার সাফল্য দেখার আগেই মানুষের মৃত্যু নিশ্চিত করতে ব্যবহার করা হয়েছে। অথচ আমাদের শিক্ষা ছিল, আমাদের বিপরীত দিকে যাদের অবস্থান, তারা আমাদের শত্রু হলেও আমাদের মতোই মানুষ।

যে সময় হিরোশিমার ঘটনা ঘটেছে, সে সময় এ ধরনের ট্র্যাজেডির ব্যাপকতা অস্বাভাবিক কিছু ছিল না। হিরোশিমা ট্র্যাজেডির যারা শিকার, তাদের মধ্যে তারাই ভাগ্যবান, যারা মৃত্যুবরণের বিষয়টি বুঝেই উঠতে পারেনি। ভিয়েতনামের নাপাম বোমার আগুনের নিচে ড্রেসডেনের শত-সহস্র মানুষ যে অবর্ণনীয় যন্ত্রণা ভোগ করেছে, সেই ট্র্যাজেডি ছিল আরো বেশি ভয়ংকর। সপ্তাহের পর সপ্তাহ লাখ লাখ নারী-পুরুষ-শিশু নািস হত্যাযজ্ঞের সময় যেভাবে মৃত্যুর প্রহর গুনেছে, তা কি আরো ভয়াবহ ছিল না?

একই মাসের আরেকটি ট্র্যাজেডি এই মুহূর্তে আমাদের চোখের সামনে ঘটে যাচ্ছে, অথচ আমরা সবাই নির্বিকার। পত্রিকায় প্রকাশিত এক অনুচ্ছেদ সংবাদ যা অনেকেরই দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে তা আমাদের খবর দিচ্ছে পাকিস্তানি শরণার্থীদের জন্য যে তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে তা অতি সামান্য এবং এরই মধ্যে তা ফুরিয়ে গেছে। খাবার ও রসদ সরবরাহ থেমে গেছে এটা নিশ্চিত। এখন থেকে কয়েক দিনের মধ্যে হাজার হাজার শিশুর মৃত্যু ঘটবে। এখনই যদি ব্যাপক খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে আগামী কয়েক মাসে তিন থেকে পাঁচ লাখ কিংবা তারও বেশিসংখ্যক শিশু মৃত্যুবরণ করবে।

এটা কী করে সম্ভব যে এই ট্র্যাজেডি আমাদের চোখে পড়বে না। আমরা সম্পূর্ণ নির্বিকার থাকব, আমরা এই শিশুদের যন্ত্রণা কিছুমাত্র অনুভব করব না। আমরা এই শিশুদের মায়েদের হতাশার মুখোমুখি বিবেকহীন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকব?

মানবতা যদি নির্বিকারভাবে এই ট্র্যাজেডির কেবল সাক্ষী হয়েই থাকে, তাহলে নিজ থেকে এর ধ্বংসের সময় কি এখনো আসেনি?

কাস্টলারের গবেষণার ক্ষেত্র অপটিক্যাল স্পেকট্রোস্কোপি, বিশেষ করে এটমিক ফ্লুরোসেন্স।   পারমাণবিক আলো কল্যাণে না লাগিয়ে তা যে হত্যাযজ্ঞে ব্যবহার করা হয়েছে, তিনি জোর দিয়ে তাই বলেছেন। চোখের আলোয় যেমনই দেখেছেন, অন্তরের আলোয় দেখেছেন মানুষের মর্মমূলের যাতনা, সংকটেও মানুষের নৈর্ব্যক্তিক নিস্পৃহতার নিন্দা করেছেন, সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়েছেন আলফ্রেড কাস্টলার।

১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের সভাপতিত্বে বিভিন্ন পেশার বুদ্ধিজীবীদের একটি সভার আয়োজন করে গান্ধী পিস ফাউন্ডেশন। এতে অংশ নেন বায়ার্ড জাস্টিন, মাইকেল হ্যারিংটন, পাভেল জেভারমোভিক, ওয়ালিদ ইব্রাহিম, ফরিদ সিয়ালা, পিউ হার্দাদ। সভা তিনটি বিষয়ের ওপর হয়। প্রথমত, পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে বাংলাদেশ থেকে হঠাতে আন্তর্জাতিক ব্রিগেড গঠন করা; দ্বিতীয়ত, সাফল্যের সঙ্গে লড়াই করার জন্য বাংলাদেশকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান; তৃতীয়ত, বাংলাদেশ পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য হিউম্যান রাইটস কমিশনের বিশেষ অধিবেশন আহ্বান করা।

বিশিষ্ট ফরাসি বুদ্ধিজীবী আঁদ্রে মালরো যে বাঙালি গেরিলা যোদ্ধাদের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছেন, সে জন্য তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করা হয়।

ইন্দোনেশিয়ার কূটনীতিক ও লেখক আবু হানিফা লিখেছেন, “যদিও সে দেশের সংবিধানে ইসলামকে গুরুত্ব দিয়ে পাকিস্তানকে ‘ইসলামিক স্টেট’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে, নিজ দেশের মানুষের প্রতি তাদের যে আচরণ ও মনোভাব, তাতে ইসলামের লেশমাত্র ছোঁয়া নেই। ফলে এই নেতারা আমাদের এমন একটা ধারণা দেন যেন, ইসলামকে তাঁরা কেবলমাত্র অলংকারের মতো ধারণ করে আছেন। ”

তিনি আরো লিখেছেন, ‘রাজনীতি সম্পর্কে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের অজ্ঞতা পশ্চিম পাকিস্তানের জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে তাঁর ষড়যন্ত্র ও পাঞ্জাবি জেনারেলদের নির্যাতন ও নিপীড়ন পূর্ব পাকিস্তানকে একটি রক্তাক্ত ভূখণ্ডে পরিণত করেছে। ’

সুইস রেডিওতে ক্লদ জস বললেন, ‘আমরা যদি এই এক কোটি মানুষের সম্ভাব্য মৃত্যুকে মেনে নিতে পারি, তাহলে গ্যাস চেম্বারে নিহত এক কোটি মানুষের মৃত্যুকেও মেনে নিতে পারব। ’ এই এক কোটি মানুষ হচ্ছে শরণার্থী শিবিরের ভাগ্য বিড়ম্বিত এক কোটি মানুষ।

ফরাসি দার্শনিক আঁদ্রে মালরো পূর্ব পাকিস্তানের গেরিলাদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে লড়াইও করতে চেয়েছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে চিঠি লিখেছেন, ‘যখন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাবাহিনী অর্থাৎ আপনার সেনাবাহিনী ভিয়েতনামের নগ্নপদ যোদ্ধাদের পরাস্ত করতে ব্যর্থ হলো, আপনি কেমন করে বিশ্বাস করেন স্বাধীনতার জন্য উদ্বেল একটি দেশকে এক হাজার ২০০ মাইল দূর থেকে ইসলামাবাদ এসে পুনরুদ্ধার করতে পারবে?

যখন পৃথিবীর নিয়তি অনিশ্চিত, বঙ্গোপসাগরে রণতরী পাঠানো কোনো নীতি হতে পারে না। হতে পারে কেবলই অতীতের ধ্বংসস্তূপ। একাত্তরের উন্মাতাল বাংলাদেশে এসে শরণার্থী শিবির থেকে ব্যথিত অ্যালেন গিঞ্জবার্গ লেখেন, ‘সেপ্টেম্বর অন যশোহর রোড’ নামের স্মরণীয় কবিতা। শিল্পী জোয়ান বেজ লিখলেন এবং গাইলেন, বাংলাদেশ, বাংলাদেশ/হোয়েন দ্য সান সিঙ্কস ইন দ্য ওয়েস্ট/ডাই এ মিলিয়ন পিপল অব বাংলাদেশ।

১৯৭১ সালে ভারতের বুদ্ধিজীবীদের বৃহদাংশ বাংলাদেশের লড়াইকে সমর্থন জানিয়েছেন। এগিয়ে এসেছেন সংগীতশিল্পী ভুপেন হাজারিকা, অভিনেত্রী নার্গিস। সমর্থন জুগিয়েছেন এডওয়ার্ড ম্যাসন, হোর্হে লুইস বোর্হেস এবং আরো অনেকে।


মন্তব্য