kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ জানুয়ারি ২০১৭ । ১১ মাঘ ১৪২৩। ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮।


রফিক আজাদের অপ্রকাশিত সাক্ষাত্কার

কবি রফিক আজাদ বাংলা কবিতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। ১৯৪১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইলের গুলী গ্রামের জন্মগ্রহণ করেন। মারা যান ১২ মার্চ ২০১৬ সালে ৭৫ বছর বয়সে। তিনি একাধারে কবি, মুক্তিযোদ্ধা ও সম্পাদক ছিলেন। তাঁর ‘অসম্ভবের পায়ে’, ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’, ‘সীমাবদ্ধ জলে সীমিত সবুজে’, ‘প্রিয় শাড়িগুলো’ ও প্রেমের কবিতাসমগ্র বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ৬ জুন ২০১৩ তাঁর এই সাক্ষাত্কারটি গ্রহণ করেন কবি শ্যামল চন্দ্র নাথ

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রফিক আজাদের অপ্রকাশিত সাক্ষাত্কার

শ্যামল চন্দ্র নাথ : আপনি একটি বিখ্যাত কবিতা লিখেছিলেন। ‘ভাত দে হারামজাদা/তা না হলে মানচিত্র খাবো।

’ ১৯৭৪ সালে। মুক্তিযুদ্ধেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। এই কবিতা লেখার পর বঙ্গবন্ধু আপনাকে স্বয়ং ডেকেওছিলেন। এই বিষয়ে আমি জানতে চাই।

রফিক আজাদ : এই বিষয় নিয়ে আমি আর কথা বলতে চাই না। এটা নিয়ে অনেক সমস্যার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।

শ্যামল : ‘অসম্ভবের পায়ে’ কাব্যগ্রন্থের ‘চোর’ কবিতায় আপনি চোর চিত্রকর, চোরকে দার্শনিক, ধ্যানী এবং শিল্পের জ্যেষ্ঠ সহোদর অভিধায় শনাক্ত করেছেন। এ নিয়ে আপনার অভিব্যক্তি জানতে চাই।

রফিক আজাদ : আসলে শিল্পী, দার্শনিক, ধ্যানী, জ্ঞানী এঁদের ধ্যানের প্রকৃষ্ট সময় হলো রাত। প্রধানত এটাই। এবং চোরেরও (হেসে উঠলেন) কর্মক্ষেত্র হলো রাত। কাজেই উভয়ে রাতেই সাধক। কাজেই সেই অর্থেই রাতে যেমন চোরের, তেমনি ধ্যানীর।

শ্যামল : ‘যদি ভালোবাসা পাই আবার শুধরে নেবো জীবনের ভুলগুলি। ’ আপনার একটি বিখ্যাত প্রেমের কবিতা। এখানে চাওয়া-পাওয়া ও না-পাওয়ার বিষয় ধ্বনিত হয়েছে। আমি জানতে চাই, প্রথম কখন প্রেমে পড়েন?

রফিক আজাদ : সেই তো কৈশোরে।   সে কি আজকের ঘটনা। সেই স্কুলে পড়াকালে।

শ্যামল :  আপনার কবিতা একই সঙ্গে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সমাজ, অলংকার ও ছন্দমাত্রার ঐতিহ্যের এক ভিন্ন আবেদন সৃষ্টি করেছে। এ ক্ষেত্রে আপনার লেখনী কাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে কিংবা অনুপ্রেরণা পেয়েছেন?

রফিক আজাদ : আমি অনুপ্রেরণা পেয়েছি প্রধানত সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কাছ থেকে। তাঁর কবিতার আঁটসাঁট গঠন এবং খুব শব্দ হিসাবি, মানে খুব হিসাব করে শব্দের প্রয়োগ করতেন। তারপর তাঁর ছন্দ ছিল একেবারে মুঠোর মধ্যে। সব কিছু মিলে আমার আদর্শ কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। বাংলা ভাষায়। আর বিদেশি ভাষায় টি এস ইলিয়ট। আমি মনে করি, তাঁরা দুজনই খুব কাছাকাছি। তাঁরা দুজন পরস্পর এবং তাঁদের মধ্যে বলিষ্ঠ উচ্চারণ ছিল। এবং এই দুজন আমার আদর্শের কবি।

শ্যামল : ত্রিশের দশকের কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের কথা বলেছেন। কিন্তু ত্রিশের দশকে তো আরো কবি এসেছেন যেমন—জীবনানন্দ দাশ, বুদ্ধদেব বসু।

রফিক আজাদ : হ্যাঁ, ঠিক বলেছ শ্যামল। জীবনানন্দ দাশ আমার প্রিয় পাঠ্য। কিন্তু আমি তাঁকে অনুসরণ করি না। তারপর বুদ্ধদেব বসু আমার খুব প্রিয় পাঠ্য কবি।

শ্যামল : চল্লিশের দশকের কবিদের নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

রফিক আজাদ : সমর সেন আমার প্রিয়। তিনি গদ্য কবিতা লিখেছেন। গদ্য কবিতা বলতে যা বোঝায়, আমাদের ভাষায় তা হলো সমর সেনের কবিতা। এবং খুবই সাকসেসফুল কবিতা। খুবই দুঃখজনক যে তিনি দীর্ঘদিন তাঁর কাব্যজীবন চালালেন না। লিখলে আরো ভালো হতো। আমরা আরো সম্পদ পেতাম।

শ্যামল : ১৯৭৩ সালে প্রথম আপনার কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এবং তখনকার সময়ের বইমেলার সঙ্গে এখনকার বইমেলার বিষয়টির তফাত কোথায়?

রফিক আজাদ : আমার কাব্য প্রকাশিত হয়েছে অনেক দেরিতেই। মোটামুটি ষাটের দশকেই আমাদের বই বেরোনোর কথা ছিল। কিন্তু বের হয়নি। তখনকার বইমেলার এতটা গুরুত্ব ছিল না এখনকার বইমেলার মতো। বইমেলা শুরুই হয়েছিল চিত্তরঞ্জন সাহার উদ্যোগে। প্রথম তিনি চট বিছিয়ে বইমেলা করেছিলেন। কাজেই বইমেলার ইতিহাস খুব দীর্ঘ নয়।

শ্যামল : ষাটের দশকে লেখালেখি শুরু করে আপনি বাংলা কবিতায় এক নতুন সুর, নতুন চেতনা এবং এক নতুন আবেগময়তা সৃষ্টি করেন। এ ক্ষেত্রে কোন বিষয়টিকে আপনি প্রাধান্য দিয়েছেন?

রফিক আজাদ : আমাদের ভাষার যে সৃষ্টি। রবীন্দ্র প্রভাব মুক্তির সময়ে কিংবা আমাদের সময়কালে বিষয়টি খুব জোরদার ছিল। সেটা, তারপর আমাদের সময়কালের একটা সুবিধা ছিল কি, একটু ভিন্ন ভাষা চর্চা শুরু হয়। আমি মনে করি, আমাদের ভাষা খুবই তরতাজা। আমাদের সমস্যাগুলো ভাবা যায় একটু যেমন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট। আমরা তো ষাটের দশকে খুব সংকটময় সময় পার করেছি। ওই সময়ে শিক্ষা আন্দোলন, তারপর ছয় দফা, তারপর গণ-আন্দোলন, স্বাধীনতার উথালপাথাল সময় এবং বৈরী একটি পাকিস্তানি সরকার। কাজেই লেখালেখিতে একটু প্রতীকী ভাষা ব্যবহার করতে হয়েছে। অনেক দিক থেকেই কবিতায় একটা আলাদা স্বর উচ্চারিত হয়েছে। খালি আমার নয়। অনেকের কবিতার মধ্যেই এটি উঠে এসেছে। মোহাম্মদ রফিক এক রকম লিখতেন, আসাদ চৌধুরী আরেক রকম লিখতেন।

শ্যামল : ষাটের দশকে আপনি, আসাদ চোধুরী ও আবদুল মান্নান সৈয়দ মিলে ‘সাক্ষর’ নামে একটি পাক্ষিক পত্রিকা বের করতেন। ওই সময়ের স্মৃতিচারণা যদি করতেন।

রফিক আজাদ : হ্যাঁ, আমরা ওই সময়ে ‘সাক্ষর’ বলে একটি পত্রিকা বের করতাম। আমরা সবাই মিলে—মানে ষাটের দশকে যাঁদের উত্থান, তাঁরা মিলে লিখতাম। খুব বেশি সংকলন বের হয়নি। সংকলন এলে—তো এটার বৈশিষ্ট্য ছিল, এতে দুজন-দুজন  আলাদা আলাদা সম্পাদক থাকত। এতে একক কোনো সম্পাদক ছিল না। প্রথম সংখ্যার সম্পাদক ছিলাম আমি ও সিকদার আমিনুল হক, দ্বিতীয় সংখ্যায় সম্পাদক ছিল প্রশান্ত ঘোষ আর কে একজন ছিল যেন এখন মনে নেই। মানে এ রকম।

শ্যামল : পাবলো নেরুদা আপনার প্রিয় কবি। ১৯৭৪ সালে এই গণমানুষের কবি মারা যান। নেরুদার কবিতা আপনি অনুবাদও করেছেন। আপনি কেন নেরুদার কবিতা অনুবাদে আগ্রহী হলেন?

রফিক আজাদ : সেটা স্বাভাবিকভাবেই আমি করেছি। নেরুদা বলতে নয় শুধু, নিজে অনুবাদ করব তা নয়, যদিও আমার পাঠ অনেক সীমিত। তার পরেও বলব, ইংরেজি ভাষার উল্লেখযোগ্য কবিতা ও সংস্কৃত ভাষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ভাষার কবিতা আমি পড়েছি। তবে নেরুদার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে নেরুদার জীবন, তাঁর লেখা ও তাঁর আত্মজীবনী অনেক আকর্ষণ করেছে আমাকে। আমাদের দু-একজন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ছিল। নানা কারণে তাঁর প্রতি আমার আকর্ষণ। আর কবিতার তো কথাই নাই। তাঁর কবিতা আমার খুব প্রিয়। অনুবাদের ব্যাপার কিছুটা এক ধরনের বাইরের তাগিদেও করেছি। নেরুদার ওপর একটা বই বেরুবে তার জন্য আমার কিছু প্রিয় মানুষ চেয়েছিল যে নেরুদার কবিতা আমি অনুবাদ করি। তারা কবিতাগুলো সাপ্লাই দিয়েছিল এবং আমি অনুবাদ করি। এ ছাড়া আরো কিছু কবিতা নিয়ে আমার একটি অনুবাদের বইও আছে। ‘অপর অরণ্য’ নামে। এ ছাড়া সংস্কৃত ভাষার বেশ প্রাচীন কিছু কবির প্রায় দেড়-দুই হাজার বছর আগের কিছু কবিতা অনুবাদ করেছি। কারণ সেগুলো আমার বেশ ভালো লেগেছিল। তার মানে এই নয় যে আমি শুধু নেরুদার কবিতাই অনুবাদ করেছি। অনেক সময় এমন হয় যে অনুবাদ করার জন্য ঝোঁক চাপে। তখন এমনই হয়, এখন যেমন কিছুই লিখছি না। মাঝেমধ্যে এমন সময়ও যায়।

শ্যামল : মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কোনো স্মৃতির কথা বলবেন কি?

রফিক আজাদ : ওগুলো আছে, অনেক স্মৃতিই—একেবারে এক ইঞ্চি বা এক বিঘতের জন্য বেঁচে এসেছি। মাথার ওপর দিয়ে গুলি চলে গেছে। এ রকম সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছি। তো নদীর এপার-ওপার ছোট্ট নদী বলা যায় না, খালের মতোই। তখন তো একটু পানি ছিল, আমি এই পারে, বর্ষার সময় ওরা যেটা করত, মানে পাকিস্তানি বাহিনী সন্ধ্যার পরে আর থাকত না, ওরা ব্যাক করে যেত। অবিরাম গোলাগুলি চলার পর হঠাৎ থেমে গেল। প্রায় আধা ঘণ্টার মতো নিশ্চুপ ছিল তারা। আমরা খালের ওপর থেকে নিচে নেমে এলাম।

শ্যামল : একটু পেছনে ফিরে আসছি। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায় জীবনের সবচেয়ে স্মৃতিবহ ঘটনা কোনটি?

রফিক আজাদ : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় স্মৃতিবহ ঘটনা হলো মুনীর চৌধুরীর লেকচার। আজীবন তা ভোলা যাবে না। তা ছিল বিস্ময়কর। তাঁর মানে তিনি যে ক্লাস নিতেন, তিনি যে ক্লাস নিতে নিতে বারান্দায় যেতেন, বিশ্বাস করো, আমাদের সবার চোখ ও মনোযোগ ওই বারান্দা পর্যন্ত থাকত এবং ফিরে আসতেন, আমাদের চোখও তা অনুসরণ করত। যেমন পণ্ডিত ছিলেন, তেমন প্রাজ্ঞও ছিলেন। কঠিন বিষয়কেও তিনি খুব সহজ করে বোঝাতেন। তিনি আমাদের ভাষাতত্ত্ব পড়াতেন।

শ্যামল : রফিক ভাই, আমি ভাষাতত্ত্ব থেকে কাব্যতত্ত্বে চলে আসছি। আপনি বাংলা একাডেমির তরুণ লেখক প্রকল্পের প্রশিক্ষক হিসেবে প্রায় তিন বছর কাজ করেছিলেন। কাব্যতত্ত্ব পড়াতে গিয়ে এতে আপনার অভিজ্ঞতার কথা বলুন।

রফিক আজাদ : হা  হা (কবি হেসে উঠলেন), না, বন্ধ কেন হয়েছে তা আমি বলতে পারছি না। এটা চালু রাখা খুব জরুরি ছিল বলে আমি মনে করি। এখনো আমি বোধ করি যে ক্লাস করে কবিতা বোঝা যায় না; কিন্তু টেকনিক্যালি দিকটা আয়ত্তে আসে। যেমন—ছন্দপ্রকরণ, ভাষা ব্যবহারের কৌশল—অনেক কাজে লাগে। তার পরও কবিতা তো হাতেনাতে শেখানো যায় না। যে নিজে কবি হবে তাঁকে কিছুটা সহযোগিতা করা যায় আর কি। এই কোর্সটা চালু রাখা উচিত ছিল। এখন আবার চালু হয়েছে। আমি মনে করি, এটি বাংলা একাডেমির খুবই ভালো একটা প্রকল্প। এটা চালু রাখাটা খুব জরুরি।

শ্যামল : বাংলা একাডেমির কথা যেহেতু হচ্ছিল, বাংলা একাডেমি থেকেই প্রশ্ন করছি। আপনি বাংলা একাডেমিতে কর্মরত ছিলেন ১৯৭২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত। তখন আপনি বাংলা একাডেমির সাহিত্য ম্যাগাজিন ‘উত্তরাধিকার’-এ কাজ করেন। তখন আপনার সঙ্গে কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলনের সম্পর্কের সূত্রপাত। তাঁর প্রথম উপন্যাস আপনি ছেপেছিলেন। ওই প্রসঙ্গে যদি কিছু বলতেন।

রফিক আজাদ : বলতেছি (হেসে হেসে), ওটা আমাকে গল্প আকারেই দিয়েছিল। ওটার নাম ছিল ‘যাজ্জবজীবন’। পরে আমি দেখলাম যে তার গল্পের ভেতরে যে বিস্তৃতি আছে, ভেতরে তা দিয়ে একটা সুযোগ আছে একটা মাঝারি আকারের উপন্যাস হওয়ার। তারপর আমি ওরে বলেছি, তুমি লেখা চালিয়ে যাও। কোনো অসুবিধা নাই। আমি নিয়মিত ছাপতে শুরু করলাম। ধারাবাহিকভাবে ছাপার ফলে এটি একটি ভালো উপন্যাস হয়েছে।


মন্তব্য