kalerkantho


মঞ্চনাটক : সোনাই মাধব

প্রেমতীর্থের নান্দনিক তর্পণ

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



প্রেমতীর্থের নান্দনিক তর্পণ

মৈমনসিংহ গীতিকা বাংলাদেশের এক অনর্ঘ কৃষ্টিভাণ্ডার। ড. দীনেশচন্দ্র সেন, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে এই গীতিকা অনুসন্ধান এবং বিষয়টি নিয়ে গবেষণা করেছেন, তিনি যথার্থই বলেছেন, ‘... এই সকল পল্লীগীতিকা পড়িলে পাঠক একটা অজানিত রাজ্যের হাওয়া পাইবেন ... সেই হাওয়া নির্মল ও স্বতঃস্ফূর্ত এবং যাহাকে স্পর্শ করে তাহাকে নতুন জীবন দান করে ... এগুলি প্রেমতীর্থের তর্পণ। ’ সত্যি বলতে কি, এই গীতিকা অবলম্বনে লোক নাট্যদলের পদাবলি যাত্রা ‘সোনাই মাধব’ সেই প্রথম অভিনয় থেকেই দর্শকদের এক ‘অজানিত রাজ্যের হাওয়ায়’ আন্দোলিত করতে সক্ষম হয়েছে এবং সে হাওয়া যে ‘নির্মল ও স্বতঃস্ফূর্ত’, সে অভিজ্ঞতাও এখনো সম্পূর্ণ অনুভূত হচ্ছে। ‘সোনাই মাধব’ চিত্তবিনোদক হয়েই দর্শকদের অন্তরে ‘প্রেমতীর্থের পবিত্র তর্পণের’ সংযোগ ঘটিয়েছে।

মৈমনসিংহ গীতিকায় ‘সোনাই মাধব’ শিরোনামে কোনো গীতিকা নেই। লোকনাট্যদল আসলে চন্দ্রাবতী প্রণীত ‘দেওয়ান ভাবনা’য় বিদ্ধৃত গল্পকে ওই গল্পের নায়ক-নায়িকার নামানুসারে ‘সোনাই মাধব’ পদাবলি যাত্রায় রূপান্তরিত করেছে। সম্পূর্ণ পালাটির পরিকল্পনা, সংগীত পরিচালনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন লিয়াকত আলী লাকী। এর সুর সংযোজন করেছেন যৌথভাবে দীনেন্দ্র চৌধুরী ও লিয়াকত আলী লাকী। উল্লেখ্য গত শতাব্দীর ‘নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকে নিরীক্ষাধর্মী এই পালাটি মঞ্চস্থ করা হয়—প্রদর্শিত হয় ৭৬টি রজনী। সেখানে মেয়েদের চরিত্রে ছেলেদের দিয়ে অভিনয় করানো হয়। ’

সেই সময়ে দেখা পালাটির বিষয়ে অনেকেই মত পোষণ করেন, বর্তমান অপেক্ষা ওই প্রদর্শনীই ভালো ছিল। আমার ব্যক্তিগত মতামত তা নয়, বর্তমান প্রদর্শনীও গুণগতভাবে সমমানের হয়েছে; অনেক ক্ষেত্রে আগের প্রদর্শনীকে ছাড়িয়েও গেছে। এ জাতীয় গীতিকাগুলোকে গবেষকরা রোমান্টিক বিয়োগান্তক বা রোমান্টিক ট্র্যাজেডি বলে বিবেচনা করে থাকেন। যেসব কুশীলব এই নান্দনিক বিষয়গুলো উপস্থাপনা করেছেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে যথার্থ ও যোগ্যতার সঙ্গেই করেছেন—বিশেষ করে পালার চরিত্রের সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষা করেই তাঁরা আবেগাকীর্ণ অভিনয় পরিবেশন করতে সক্ষম হয়েছেন। বিনোদনের দিকটি ছিল পালাটির উজ্জ্বলতম বৈশিষ্ট্য এবং সেই নব্বইয়ের দশকের প্রদর্শনী থেকে কোরিওগ্রাফি, আলোকসম্পাত ও পোশাক পরিকল্পনা বর্তমান প্রদর্শনীতে হয়েছে ভিন্নতর; অনেক ক্ষেত্রেই নতুন সংলাপ সংযোজন বিনোদনের নান্দনিক বিচারে উন্নততর এবং বিনোদনের মাত্রা নিঃসন্দেহে বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে দেওয়ান ভাবনার চরিত্রে লিয়াকত আলী লাকী ছিলেন অনবদ্য। তাঁর প্রতিটি প্রবেশ ও প্রস্থান ছিল দর্শকদের কাছে সবচেয়ে আকর্ষণীয়। যে দৃশ্য দর্শকদের আন্দোলিত করেছে সেটি হলো, দেওয়ান ভাবনার তিন সন্তানসম্ভবা স্ত্রীর সংগীত ও নৃত্য—এই দৃশ্যের শেষাংশে লাকীর যোগদান অনাবিল আনন্দের উৎস ছিল।

সোনাই মাধব পদাবলি যাত্রাটি যে বিশুদ্ধ পালা বা যাত্রারূপে পরিবেশিত হয়েছে তা নয়। যদিও গ্রন্থিক উপস্থাপনা ছিল মূল গীতিকা আশ্রয়েই। কিছু কিছু সংগীত সুর লোকঐতিহ্য থেকে যেমন অতিক্রান্ত হয়েছে, তেমনি স্থানবিশেষে কোরিওগ্রাফিতেও আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে।

লোক নাট্যদলের কুশীলবদের—মঞ্চে এবং মঞ্চের নেপথ্যে—সনির্বন্ধ ধন্যবাদ দর্শকদের এমন একটি সৌন্দর্য আবিষ্কারের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য, যা সত্য অর্থে প্রেমতীর্থেরই চিরন্তন তর্পণ।

আবদুস সেলিম


মন্তব্য