kalerkantho

26th march banner

রেখায় রঙে জীবনালেখ্য

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রেখায় রঙে জীবনালেখ্য

Drawing is the honesty of the art. There is no possibility of cheating. It is either good or bad
@Salvador Dali

জন্মের পর শিশুর প্রথম সৃজনপ্রয়াসের মাধ্যম রেখা। শিল্প শিক্ষার নবিশিকালে শিক্ষার্থীদের নীরিক্ষার বিষয়ও রেখানির্ভর চিত্রকর্ম বা ড্রয়িং। তবু খ্যাতিমান শিল্পীরা বারবার নিজেকে সমর্পণ করেন এ রীতির কাছে। আমাদের শিল্পাচার্য আজীবন রেখাঙ্কনে জীবনের নানা বোধ আর স্বভাবকে ধরতে চেয়েছিলেন। একই পথে হেঁটেছেন কামরুল হাসান, আবদুর রাজ্জাক, আবদুল বাসেত, মুহম্মদ কিবরিয়া, আমিনুল ইসলাম, মুর্তজা বশীর প্রায় সব বরেণ্য শিল্পী।

এসব বরেণ্য শিল্পীদের সবাই একই কুশলতাকে বিচিত্র ভঙ্গিতে প্রকাশ করেছেন। তাঁদের কাজে রেখায় কিংবা রঙের প্রলেপনগুলো প্রকাশ পেয়েছে অপূর্ব দক্ষতায়। মূলত এগুলো রঙের অর্থবহতা ও এর মধ্যে আবেগের প্রতিষ্ঠাকে রূপ দেওয়ার প্রয়াস। শিল্পী রণজিতের কাজেও নানা মাধ্যমের ভিড়ে বরাবরই লক্ষণীয় ড্রয়িংয়ের প্রাধান্য। কেবল রেখা দিয়েই তাঁর শিল্পসত্তার নানা রূপ নানাভাবে উদ্ভাসিত। রেখার সঙ্গে রঙের কুশলী-বিন্যাস দেখে তাঁকে অন্য শিল্পী থেকে পৃথক করে চেনা যায়। সম্প্রতি রাজধানীর শিল্পাঙ্গনে শেষ হয়েছে এই শিল্পীর একক চিত্র প্রদর্শনী।

‘অব অ্যা পোয়েটিক ভিশন অব লাইফ’ শিরোনামের ওই প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত ছবিতে প্রকাশ পায় শিল্পীর সৃজনশীলতায় বৈচিত্র্যময় ও মনোগ্রাহী রূপান্বেষ প্রক্রিয়া। সেসব ছবি উচ্ছলতা অর্জন করেছে বিষয়ের গুণে ও রং-রেখার কুশলী ব্যবহারে। কাগজে চারকোল, কালি-কলম আর পেনসিলের পেলব রেখায় আঁকা চিত্রকর্মে এক একটি মানসি ফিগার যেন একেকটি জীবনালেখ্য। সেখানে রয়েছে প্রথাকে ভাঙার সাহস। যার শিল্পগত মান প্রশংসনীয়।

ড্রয়িংকে সাধারণত আমরা গণ্য হতে দেখি রেখায় নানাবিধ ক্রিয়াকর্ম হিসেবে। সদৃশকরণকে নিশ্চয় করার অভিনিবেশ নিয়ে বস্তু প্রাণী বা মানুষের শরীরী কাঠামোকে স্পষ্ট করতে, একটিকে অন্য ফর্ম থেকে আলাদা করতে রেখায় আশ্রয় খোঁজেন শিল্পীরা। এমন ছবিতে পরিসর বা স্পেসের বিশ্লেষণ থাকে গৌণ। রণজিতের কাজে আমরা দেখি রং-রেখা আর স্পেসের সমন্বিত ব্যবহার। আপন চিত্রকর্মে তিনি মেলে ধরেন ভাবনাতাড়িত বিষয়-আশয়কে। পেন্সিল কিংবা কালি কলমের আঁচড়ে যাপিত জীবন ও পারিপার্শ্বিকতাকে উপজীব্য করে ছবি আঁকেন তিনি।

রেখার বিচিত্র লীলায় একটি ফর্মে বহু আকৃতির ভঙ্গি নির্মাণ করেন এই শিল্পী। তাঁর কাজে বিশুদ্ধ পরিপ্রেক্ষিতের ব্যবহার নেই। চিত্রপটের সর্বাংশজুড়ে আকৃতির সংস্থাপনে তাঁর চিত্রকল্প বিষয় নিরপেক্ষ বিমূর্ত নয়; কিন্তু দেশজ ভাব লাবণ্যের উজ্জ্বল প্রকাশে প্রাণবন্ত। এসব কৌশল প্রক্রিয়ায় মানসলোকের গভীরতা ও জীবনগত অর্থ সংযোজিত।

শিল্পীর কাজে রেখার হিসেবি ব্যবহারই যে কেবল একটি চিত্রকে সার্থক করে তোলে, সে ধারণার নিদর্শন স্পষ্ট। কালি-কলমে-পেনসিলে বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে আঁকা কেবল রেখাচিত্র বা ড্রয়িংও বর্ণনা হিসেবে বা রং প্রকাশে সার্থক হয়ে উঠেছে। চিত্রের যাবতীয় ফর্ম ও উপাদানের সঙ্গে রেখার সুসামঞ্জস্য বিধানের প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তাঁর চিত্রের সার্থকতা ও রেখার গুণাগুণের বিষয় বিবেচিত হতে পারে।  

এবারের প্রদর্শনীতে রণজিৎ তাঁর বেশ কয়েকটি ছবি সাদা-কালো ও বর্ণময় রঙিন গাল্পিক বিবরণে তুলে ধরেছেন। চিত্রমালার অধিকাংশ চরিত্র নারীর। সেখানে রয়েছে নারীকেন্দ্রিক নানা ভঙ্গিমা। কাগজের ওপর স্রেফ পেনসিলের সাবলীল পেলব টান—তাতেই উঠে আসে নারীর কোমল রূপ। আবার পেনসিল কিংবা চারকোলের বিন্যাসেও ধূসর-কালোয় মানসলোকের রূপাভা।   

রণজিতের বেশির ভাগ কাজে বলিষ্ঠ ও ইঙ্গিতময় আঁচড়ে মানুষের  জীবনাচরণের চিহ্ন। অঙ্কনরীতি বাস্তবধর্মী হলেও তাঁর আঁকা মুখাবয়বের ছবি অস্পষ্ট। রৈখিক ক্ষেত্রের পরিসরে ও বাইরে জলরং-এ সাদা-কালো ও লাল-কমলা কালো-হলুদের ছোপ। চরিত্রের পরনের কাপড়ের সূক্ষ্ম বয়ন, ছাপার নিপুণতাও অনুপস্থিত। তবু একেকটি মুখাবয়ব যেন একেকটি গল্পের পটভূমি তুলে ধরে। সেসব পটভূমি পাঠকের কাছে যেমন বড় হয়ে দেখা দেয় তেমনি অন্যভাবে দেখলে পটভূমিকে আড়াল করে দর্শকের সামনে হাজির হয় নান্দনিক রূপে।

তাঁর কাজে প্রসাধনরতা নারী, শিশু কিংবা গৃহপালিত পশুছানা কোলে নারী, সেলাইকর্মে নারী। ভিড়ের মধ্যে নারী-পুরুষের চলাচল—এ রকম বিবিধ জীবন-ভঙ্গিমা শিল্পীর বলিষ্ঠ অঙ্কনশৈলীতে বিম্বিত। অনেক পুরুষ চরিত্রও বিদ্যমান ছবির মিছিলে কেউ ঢোলক বাদ্যরত, তাদের কেউ বা হুঁকোতে ধূমপানরত। সব মিলিয়ে রেখার সিম্ফনি আর রঙের বিন্যাসে মানুষ আর প্রকৃতির জীবনাালেখ্যে উদ্ভাসিত রণজিতের চিত্রমালা।

             খান মিজান


মন্তব্য