kalerkantho


রফিক আজাদের সঙ্গ

জাহিদ হায়দার   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রফিক আজাদের সঙ্গ

শীতকাল। সকাল ৭টা-সাড়ে ৭টা হবে। একটি কালো মোটরসাইকেল ‘গাড়লের মতো’ শব্দ করে এলো হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের (বর্তমানের রূপসী বাংলা হোটেল) সামনে। দাউদ বেশ চিত্কার করে বলল, ‘ওই যে রফিক আজাদ। ’ আমরা দুজন প্রায় দৌড়ে তাঁর কাছে চলে যাই। ওর চিত্কার শুনে সেখানে অপেক্ষমাণ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের কয়েকজন মানুষ, কারো কারো হাতে ছিল ক্যামেরা, মনে হলো সাংবাদিক, পরে শুনেছিলাম, দাউদ বলেছিল, ‘তাঁরা ছিলেন সাংবাদিক, গিয়েছিলেন টাঙ্গাইলে, কভার করতে বঙ্গবন্ধুর কাছে কাদের সিদ্দিকীর যুদ্ধাস্ত্র সমর্পণের সংবাদ’, আমাদের আর মোটরসাইকেলচালকের দিকে কৌতূহলে তাকায়।

রফিক আজাদের মাথায় ঝাঁকড়া চুল। মাথায় মাফলারের মতো কিছু একটা বাঁধা। গোঁফ মোটা। মুখে ধূলি ধূসরিত খোঁচা খোঁচা দাড়ি। জুলফি বটের ঝুরির বন্য তারুণ্যে নেমেছে চোয়ালের হাড় পর্যন্ত। হাড় মুখের খসখসে চামড়া ফুঁড়ে যেন রাগে বের হয়ে যাবে। চোখ দুটি বড় নয়। দৃষ্টি তীক্ষ। উজ্জ্বল দৃষ্টিতে স্বাধীনতার আনন্দ। নাক চ্যাপটা। রোদ-বৃষ্টি-শীতপীড়িত রং চামড়ার। পরে দেখেছি, গায়ের রং ছিল ফরসার ধাঁচে স্নিগ্ধ। গড়ন ছোটখাটো। শরীর পেটা। দেখতে সাধারণ বাঙালির মতো নন। নৃতাত্ত্বিকরা প্রথম দেখায় বলতে পারেন, গারো বা চাকমাগোষ্ঠীর মানুষ। তাঁর পায়ে ছিল জঙ্গল শু। পরনের জামা, প্যান্ট আর জ্যাকেটের কাপড় মোটা। বসনের আদি রং সম্ভবত একদা ছিল খয়েরি। সবই যুদ্ধ করা। মুক্তিযুদ্ধের কয়েক মাস ওসব কাপড় পরে রাত-দিন জঙ্গলে, জনপদে, নদীতে কাঁধে, কখনো হাতে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার আর বাংলাদেশের রাজাকার, আল-বদর বাহিনীর বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করেছেন। ওই দেখা হওয়ার অনেক পরে, যখন আমাদের পরিচয় ভালোমাত্রায় চেনাজানার দিকে যাচ্ছে, তিনি আমাকে বলেছিলেন, ‘জঙ্গল শু পাওয়া গিয়েছিল বিএসএফ থেকে। ’

কাদেরিয়া বাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক আজাদ মোটরসাইকেল থেকে নামলেন না। কেন নামবেন? স্টার্ট বন্ধ করেননি। কত জরুরি তাড়া তাড়াচ্ছে তাঁকে। সাইকেলের গোঁয়ার মোটরটা সশব্দে জানান দিচ্ছে, ‘থামলে কেন, যাবে না?’

সেদিন তারিখ ছিল ২৪ জানুয়ারি, ১৯৭২। বঙ্গবন্ধুর কাছে ‘বাঘা সিদ্দিকী’ অস্ত্রকে নত করবেন। তখন বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মানুষের কাছে এক নতুন স্বাধীন দেশ। দাউদ আর আমি হোটেল ইন্টারকনের সামনে সকাল ৭টার আগে থেকেই, এক আনন্দ-উত্তেজনায় উজ্জ্বল হয়ে অপেক্ষা করছিলাম রফিক আজাদের জন্য। তরুণ কবি দাউদকে নিয়ে ‘রফিক ভাই’ যাবেন টাঙ্গাইলে। আর আমরা পরের দিন খবরের কাগজে দেখব, হাতে অস্ত্র নিয়ে কাদের সিদ্দিকী, আমাদের বীর, এক হাঁটু কাঠের মঞ্চের শক্ত পিঠে বিজয়ের দৃঢ়তায় ঠেকিয়ে আর অন্য হাঁটু অর্ধেক ভেঙে, মেরুদণ্ড আক্ষরিক অর্থেই সোজা করে, বঙ্গবন্ধুর হাতে তুলে দিচ্ছেন যুদ্ধ করা সঙ্গিন, তার ছবি। এই দৃশ্যের অনেক পরে আমরা, সচিত্র সন্ধানী থেকে প্রকাশিত, কাইয়ুম চৌধুরীর আঁকা প্রচ্ছদে পাব রফিক আজাদের ভিন্ন মেজাজের কবিতার বই ‘সশস্ত্র সুন্দর’। প্রচ্ছদটা মনে রাখার মতো। অস্ত্রের মাথায় ফুল।

আগের রাতেই দাউদ আমাকে বলেছিল, তার সঙ্গে কাল সকালে আমি যাব কি না। ‘কেন যাব, কোথায় যাব?’ আমার প্রশ্নের উত্তর ছিল, ‘না গেলে না যাবি, গেলে দেখতে পাবি একজন মুক্তিযোদ্ধা আর কবিকে, তোর সঙ্গে পরিচয় করায়ে দেব। ’ আমি মুক্তিযোদ্ধা কবির নাম জানতে চাই। দাউদ নাম বলে আর শর্ত দেয়, সকালে বাসা থেকে বের হতে হবে গোপনে, যাওয়ার কথা যেন কেউ না জানে। আমি শর্ত মেনে নিই।

দাউদ বলল, ‘আমার ছোট ভাই জাহিদ, কবিতা লেখার চেষ্টা করছে। ’ মোটরসাইকেলের ঘষঘষ আওয়াজের মধ্যে রফিক আজাদকে সালাম দিই। তিনি স্মিত হেসে, ঝাঁকড়া চুল দুলিয়ে, মুখে নয়, মাথা একবার ওপর-নিচে করে সালামের জবাব দিলেন। আমার মুখের ওপর তাঁর চোখ ছিল স্থির। তাতে কোনো স্বভাবকবির ভাবালু চোখের চাহনি ছিল না। আমাকে কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। পৃথিবীতে অনেক কবি আছে, মুক্তিযোদ্ধা কবি খুব বেশি নেই।

যেন আগে থেকেই সব পরিকল্পনা করা ছিল। মোটরসাইকেলের পেছনে বসার জন্য দাউদ দ্রুত পা তুলতে তুলতে বলে, ‘বাসায় বলবি আমি টাঙ্গাইল যাচ্ছি, রাতে যদি না আসি, কালকে আসব। ’

সাইলেন্সারের চিল চেঁচানো শব্দ। দুজনকে পিঠে নিয়ে, একরাশ ধোঁয়া উগড়ে, মোটরসাইকেল উড়ে চলে যায়। আমি হঠাৎ একা হয়ে যাই। রফিক আজাদ আর আমার ভাইকে নিষ্ঠুর মনে হয়।

সত্যি বলছি, সেদিন মুক্তিযোদ্ধা রফিক আজাদ আমার কিশোর-উত্তীর্ণ মন ও চোখে দূর আকাশ থেকে রৌদ্রালোক ছিটিয়ে দেন, সামনের সব কিছু উজ্জ্বল দেখি; কিন্তু কবি রফিক আজাদকে আমার ভালো লাগেনি। কবি কেন এমন পোশাক পরবে? কবিরা তো পায়জামা-পাঞ্জাবি পরেন। এমন প্রশ্ন আসার কারণ মনে হয় রবীন্দ্রনাথের বসন। পরে মনে হয়েছে, রবীন্দ্রনাথও যুদ্ধে গেলে রফিক আজাদের মতোই পোশাক পরতেন। আলখাল্লা পরার আরাম নেওয়ার সময় পেতেন না। পরে রফিক ভাই বলেছেন, ‘কবি কেন পায়জামা-পাঞ্জাবি পরবে, কবির পোশাক হতে হবে জিন্স আর টি-শার্ট। ’ যদিও তাঁকে বুড়ো বয়সে কখনো কখনো পাঞ্জাবি আর ট্রাউজারে দেখেছি। আমার মনে পড়ে না, ওঁকে কখনো টাই পরতে দেখেছি। পোশাকি হতে পছন্দ করতেন না। চিন্তাচেতনায় সর্বদা ছিলেন আধুনিক।

আমাদের রফিক আজাদকে তাঁর আত্মঘাতী আনন্দ উপভোগের পরিপ্রেক্ষিত থেকে বিচার করলে, বলতে হবে তিনি ছিলেন অন্য রকম সুন্দর মানুষ। আর কবি হিসেবে আমাদের ভাষার এক বিশেষ কবি।

২.

১৯৭৩ সাল। মাস জুলাই বা আগস্ট হবে। বাংলা একাডেমির ‘উত্তরাধিকার’ পত্রিকায় আমি কবিতা দিয়েছি। আমার অগ্রজ রশীদ ভাইকে রফিক আজাদ বলেছেন, আমি যেন তাঁর সঙ্গে দেখা করি। বর্ধমান হাউসের দোতলার এক বড় ঘরে তখন বসতেন সেলিনা হোসেন, রফিক আজাদ ও আমার অগ্রজ। দুপুরের কিছু আগে ওঁদের ঘরে গেলাম। চলছে তুমুল আড্ডা আর কাজ। অন্য আগুন্তুকরা আমার অচেনা। রফিক আজাদ আমাকে দেখে বললেন, ‘চেয়ার ফাঁকা নেই। ’ দুই মিনিটও আমি দাঁড়াইনি। তিনি তাঁর আসন থেকে উঠে এসে বললেন, ‘এসো। ’ তাঁর হাতে ছিল আমার কবিতা। আমাকে নিয়ে এলেন ঘরের বাইরে। বললেন, ‘এই যে তোমার কবিতা। যেখানে দাগ দিয়েছি, একমাত্রা কম পড়েছে, আমি কয়টি যথাশব্দ বলছি, তোমার যেটা পছন্দ হয় ব্যবহার করতে পারো, যদি মনে করো অন্য কোনো শব্দও ব্যবহার করতে পারো, কবিতাটি আমার ভালো লেগেছে। ’ কবিতাটি সংশোধন করে ওঁর হাতে পরদিন দিয়ে এলাম। তিনি পড়লেন। হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে, এক কাপ চা হয়ে যাক। ’

বর্ধমান হাউসের কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে হলো, রফিক আজাদ আমার মতো এক তরুণকে কী শ্রদ্ধা করলেন। তিনি গতকাল ঘরে বসেই তো কাজটি করতে পারতেন? করেননি। কারণ কবি হতে চাওয়া একজন তরুণ তাঁর ঘরে বসা অচেনা মানুষদের সামনে লজ্জা পেতে পারে, তাই তরুণকে আড়ালে নিয়ে আর্য-আচরণে শিক্ষকতা করেছেন।

৩.

১৯৮০ সাল। আমরা কয় বন্ধু ‘বিপক্ষে’ নামের সাহিত্য পত্রিকা বের করার পরিকল্পনা করছি। একটি আড্ডা হওয়া দরকার। রফিক ভাইকে আড্ডায় আনতে হবে। পত্রিকার জন্য তাঁর কিছু পরামর্শ ও অভিজ্ঞতা নিতে হবে। একসময় ‘স্বাক্ষর’ বের করেছেন তিনি।

ফেব্রুয়ারির কোনো এক মধ্যরাতে আমরা বসলাম। মালিবাগের এক ছোটো ঘরের ভেতর স্বল্প আলোর নিচে, কবি রফিক আজাদ, আবেদীন কাদের, আবু সাঈদ জুবেরী, আহমদ বশীর, মকবুল হোসেন ফারুকী পিউ (প্রয়াত), মানিক চৌধুরী আর আমি বসে, সময়কে আমাদের দাস বানিয়ে যাপন করছি প্রভুর বিলাস। অনেক হালকা প্রসঙ্গ আমাদের প্রায় জড়ানো জিহ্বায় কখনো হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে জরুরি বিষয়, আবার কখনো কথা চলছে বাংলাদেশের কবিতার বাকল, কাণ্ড, শেকড়, পাতা আর শাখা-প্রশাখার অবস্থা ও মান নিয়ে। রফিক ভাইয়ের হাতে সিগারেট জ্বলছে, আমাদের হাতেও। হঠাৎ বললেন : সুধীন দত্তের ‘যযাতি’ পড়ব। ‘উত্তীর্ণ পঞ্চাশ, বনবাস প্রাচ্য প্রাজ্ঞদের মতে/অতঃপর অনির্বাণীয়; এবং বিজ্ঞানবলে/পশ্চিম যদিও আয়ুর সীমা বাড়িয়েছে/ ইদানীং, তবু সেখানেই মৃত্যুভয় যৌবনের/প্রভু, বার্ধক্যের আত্মপ্রতারক। ...’ সহনীয় আবৃত্তিকারদের মতো সুন্দর কণ্ঠস্বর ছিল না রফিক আজাদের। না থাকুক। তাঁর উচ্চারণ স্পষ্ট, তবে কিছুটা নাসিকা প্রভাবিত। কিন্তু সেই রাতে তাঁর কণ্ঠে ওই দীর্ঘ কবিতার কোনো কোনো অংশের আবৃত্তি যখন শেষ হলো, ‘পরিকীর্ণ পানশালা’ তখন শুদ্ধতা ও নীরবে বারবার বলছিল : ভেলা আমি ভাসিয়েছিলুম একদা তাদেরই মত/আজ এটুকুই আমার পরিচয়। ’ যে আবৃত্তি আমরা তাঁর কণ্ঠে শুনেছিলাম, সেই রাতের সামগ্রিক পরিবেশের কারণেই হয়তো তা ছিল তুলনারহিত। আমার মনে হয়, কবিতা পড়তে হয় ওই রকম পরিবেশ নির্মাণ করেই। রফিক ভাই বললেন, ‘একসময় পুরো যযাতি আমার মুখস্থ ছিল। ক্লাসিক মানসের কবিদের বোঝার জন্য যে পঠনপাঠন দরকার, তা তোমাদের জেনারেশনের নেই। ’ কথাগুলো বলেই এক উচ্চমার্গীয় হাসিতে ছোট ঘরের আয়তন-সীমা ভেঙে দিলেন। আমরা, তরুণ লেখক ও কবি হওয়ার বাসনায় তাঁকে ঘিরে বসা, বলি, ‘আরো কিছু বলুন। ’ নিচের ঠোঁটের দুই পাশে নামানো যত্নশীল গোঁফ ঈষৎ কাঁপিয়ে ‘যযাতি’ থেকে আরো কয় লাইন বললেন : অবহেলা চরমে নিশ্চিত জেনেই, বেরিয়েছিল তারা। ... আমি বিংশ শতাব্দীর/সমান বয়সী; মজ্জমান বঙ্গোপসাগরে; বীর/নই, তবু জন্মাবধি যুদ্ধে যুদ্ধে, বিপ্লবে বিপ্লবে/বিনষ্টির চক্রবৃদ্ধি দেখে, মনুষ্যধর্মের স্তবে/নিরুত্তর, অভিব্যক্তিবাদে অবিশ্বাসী, প্রগতিতে/যত না পশ্চাত্পদ, ততোধিক বিমুখ অতীতে। ’ হঠাৎ থেমে ‘ওই মিয়ারা সুধীন দত্ত পড়বা। যযাতি অক্ষরবৃত্তে লেখা, খেয়াল কইর প্রথম স্তবকে অন্তমিল নেই, দ্বিতীয় স্তবকে আছে, আবার তৃতীয়তে দু-এক জায়গায় আছে, এইভাবে লেখা। ’ একটি কবিতা পড়ার সময় অনেক দিক খেয়াল রাখতে হয়, সেই রাতে তিনি আমাদের অনেক ব্যাখ্যা করে বুঝিয়েছিলন। একসময় আমি বলি, ‘হ্যাঁ, ‘অর্কেস্ট্রা’ কবিতাতেও সুধীন দত্ত বিভিন্ন ছন্দ ব্যবহার করেছেন, তার কারণ হচ্ছে, একাধিক বাদক দলের সম্মিলনে সৃষ্ট সুরমূর্ছনা। ’ রফিক ভাই বললেন, ‘ঠিকই ধরেছ, সুধীন দত্ত অর্কেস্ট্রার কন্ডাক্টর। ’ তারপর প্রায় জড়ানো কণ্ঠে অর্কেস্ট্রা থেকে দুই পঙিক্ত দু-তিনবার আওড়ালেন : মৃত্যু কেবল মৃত্যুই ধ্রুব সখা/যাতনা, শুধুই যাতনা সূচির সাথী। ’

ভোর হয়ে আসছিল। বেশ কিছু শূন্য পাত্র ঘরে রেখে আমরা প্রশান্ত রাস্তায় আসি। বশীর বলে, ‘রফিক ভাই আমরা কিন্তু আপনার চোর কবিতার চোর নই। ’ ‘না, না আমরা সবাই শব্দচোর’ বলেই শেষরাতের আর ফাঁকা রাস্তার নৈঃশব্দ কাঁপিয়ে কবি রফিক আজাদ হাসেন।


মন্তব্য