kalerkantho

26th march banner

রফিক আজাদের প্রেম

হাবীবুল্লাহ সিরাজী

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রফিক আজাদের কবিতার এই ‘বিশ্বাস-স্থাপনযোগ্য’ পরিসরে প্রেমের যে বানান তিনি লিপিবদ্ধ করেছেন তার দিকে মনোযোগী হওয়া আবশ্যক। শরীরী প্রেম কিংবা স্বর্গীয় প্রেম, সংজ্ঞার তারতম্যে প্রভেদ যতটুকু—কল্পনার সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণে বোধকরি পার্থক্য ততটা নয়। প্রেম, নারী কী নিসর্গে—তা আত্মমগ্নতারই উষ্ণ ফসল। ঘটনা, ব্যক্তি-সম্পর্কের সচল যানবাহনে যখন পরিভ্রমণ শুরু করে, তখন শুদ্ধ অনুভবের হৃদয়ঘটিত কর্মকৌলীন্যের বিকাশ অবশ্যম্ভাবী। আর পার্থিব কী অপার্থিব সব সংঘটন রূপ পায় আন্দোলনে এবং এ পরিপ্রেক্ষিতে ব্যর্থতা বা সার্থকতা ঘটনা-ঘটনেরই দাস। রফিক আজাদের প্রেম জাগতিক অনুভূতির সঙ্গে ইন্দ্রিয়-অগ্রাহ্য পদার্থে মুজ্জমান। ফলে : শব্দ-প্রেম, নিসর্গ-প্রেম যৌথভাবে ছন্দের উঠোন পেরিয়ে কবিতার ঘরে প্রবেশ করে। কেবল আবরণে যেটুকু হেরফের। প্রেম কবিকে কি মহৎ করে? প্রেম কি দাহ্যবস্তু, যাতে কবি অঙ্গারে পরিণত হন কিংবা ‘পোড়া সোনায়’ রূপান্তরিত হন? প্রেমিক কি প্রেমিকার বুকের তলায় লুকানো থাকে? হাজারো প্রশ্ন হতে পারে, হাজারো ব্যাখ্যা হতে পারে, হতে পারে অবগাহনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া। তবে নিশ্চিত যে কথা—প্রেমে জীবনের বীজ থাকে, যে বীজ জীবনকে গৌরবান্বিত করে, আনন্দময় করে, কর্মযোগী করে। বক্তব্যের এই কূলে—রফিক আজাদের প্রেমিক মনের দৃশ্যমান রূপ কী, তা উপলব্ধির চেষ্টা করা যাক। যেমন, ‘নারী : কবির অভিধান’ শীর্ষক কবিতায় কবির অন্তিমপ্রবণতা থাকে সুন্দরের দিকে এবং এই সুন্দরই কেবল জগৎ-সংসারকে নিয়ন্ত্রণের মৌলিক ক্ষমতা রাখে।

            ‘সুন্দরের দিকে রয় আমার প্রধান প্রবণতা;

            তোমার শরীর হয় কবিতার পবিত্র পুরাণ,

            গরীবের কানাকড়ি, বিধবার শেষ শাদা শাড়ি। ’

সৌন্দর্যের ক্ষেত্র-বিচারে শরীরী প্রসঙ্গ উপস্থিত। কিন্তু সে শরীর ‘কবিতার পবিত্র পুরাণের’ মতোই পুণ্যতায় উজ্জ্বল। তাহলে শরীরী প্রেমের বিদ্রূপ ও কটাক্ষ তো অন্তরঙ্গ আলোর গম্বুজে ম্রিয়মাণ হয়ে গেল। আবার ‘প্রেমের পথে পথে কাঁটা বিছানো’—এমন মহাজন-বাক্যও বায়ুবহ জীবজগতে প্রচলিত ও পরীক্ষিত। মহাভারতের লোপামুদ্রা কী লপিতা, মন্দপাল বা পরীক্ষিত এ বিষয়ে যথার্থ সাক্ষ্য প্রদানে পারঙ্গমতা দেখাবে। কিন্তু কবি রফিক আজাদ কী বলেন দেখা যাক :

১.         ‘অশ্রুজলে ধুয়ে দিই

            ফুটপাত,

            তোমার জীবন হয়

            আকস্মাৎ

            বিয়ের কাতান। ’

২.         ‘ভুল চাবি হাতে ঠায়

            দাঁড়িয়ে রয়েছে এক অন্ধ

            নারী

            পারদের মতো ভারি

            আর বন্ধ

            ডবশাল দরজায়। ’

৩.        ‘একটি নারীর জন্যে ব্যর্থ হবে সমস্ত জীবন?’

৪.         ‘বিষ-পিঁপড়ের মতো তোমার কথারা

            আমার শরীরে উঠে আসে। ’

৫.         ‘যদি ভালোবাসা পাই     শিল্প-দীর্ঘ পথে

            ব’য়ে যাবো কাঁথাগুলি। ’

৬.         ‘মার্সিডিস বেঞ্জ থেকে, মানবিক, এমন তাকালো

            এক পলকের অবহেলা এমন শরীরময়,

            এতোটা বাষ্ময়

            নীরব দৃষ্টির ভাষা এতোটা মুখর, ...’

৭.         ‘রোমে কি এখন তুমি খুব সুখে আছো?। ’

৮.        ‘সুন্দর শাম্পানে চ’ড়ে মাধবী এসেই বলে,—‘যাই’। ’

‘মার্সিডিস বেঞ্জ’ প্রেমের অন্বেষায় আলোকিত উপাদান হয়ে ঝরে পড়ে। রফিক আজাদ এবং মার্সিডিস বেঞ্জের আরোহিনী সুন্দর শাম্পানে চড়ে মনোজগতের কিনারায় এসে ভেড়েন। কবির ব্যর্থতা, হৃদয় নিঃসৃত শব্দপুঞ্জ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলতে বাধ্য করে। কবি চরিত্রের এই যমজ উপকূল (অস্তিত্ব ও নৈরাশ্য) তাঁকে দিয়েছে শিল্পীর মহিমা। ‘বেদনার এ পদপ্রান্তে’ কবির ভাষায় আছে অন্তর্দৃষ্টির বিলম্বিত জ্যোতি।

এ প্রসঙ্গেই ভিন্নভাবে অন্য একটি রূপের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। আর তা হচ্ছে ‘গণিকা ও গৃহবধূ’ ‘আর্দ্র খেলাধুলা’ শিরোনামের কবিতা নিয়ে সুস্থ বৈষয়িক বিবেচনার ক্ষেত্রে গৃহবধূর অবস্থান যেমন স্বাভাবিক, তেমনি শিল্পের চরিত্র হিসেবে গণিকার উপস্থিতিও সামঞ্জস্যহীন নয়। রফিক আজাদের বক্তব্য অনুসারে জীবন ও যৌবনের এই দুই নারী যেন যমজ ভগ্নি। শিল্পীর মনোভঙ্গি ও গৃহীর দৃষ্টিভঙ্গির যুগল মিলন ঘটে দুই নারীর সঙ্গমস্থলে।

            ‘...—দুই নারী, দুই সত্য;

            সরলতা : গৃহবধূ; আর শিল্প : চতুর গণিকা। ’

যদিচ ‘আর্দ্র খেলাধুলার’ পরিবেশ কিঞ্চিত লঘু, তথাপি অনুভবের এই বৈচিত্র্য প্রেমেরই দোসর অন্য এক কাণ্ড। সবচেয়ে ক্লেদাক্ত, ক্লান্তিকর কাজই সবচেয়ে পরিতৃপ্তির কাজ। অতএব, এহেন পার্শ্বচরিত্রের আনাগোনাও প্রণিধানযোগ্য।

            ‘নারীর শরীর ঘিরে

            প্রবাহিত হ’য়ে

            হু হু শব্দে ব’য়ে যাওয়া

            উত্তপ্ত বাতাস

            সমস্ত শরীরময়

            অসামান্য শিহরণ আনে। ’


মন্তব্য