kalerkantho

25th march banner

কবির অকালপ্রয়াণ

হাসান আজিজুল হক

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কবির অকালপ্রয়াণ

ছবি : কাকলী প্রধান

রফিকের মতো অমায়িক, ভদ্র, সুমিষ্ট লোক আর দেখা যায় না। কবি রফিক আজাদ বাংলাদেশের অঙ্গুলিমেয় কবিদের মধ্যে অন্যতম এবং তিনি তাঁর সৃজন কর্মের ব্যাপক অবদান আমাদের সামনে রেখে গেলেন। তিনি আমাদের মাঝে স্মরণযোগ্য হয়ে আছেন, লোকের মুখে মুখে রয়ে গেছেন।

ভাত দে হারমজাদা, তা না হলে মানচিত্র খাবো,/চলে যাবো সুতোর ওপারে/—এটা অসম্ভব তারপর ‘চুনিয়া আমার আর্কেডিয়া’ সব সময়কার স্মরণযোগ্য কবিতা। কবিতার এটাই গুণ। কবিতার গোটাটাই আজকাল আর অনেকেই মুখস্থ রাখতে পারে না। কেননা সেভাবে কবিতা লেখা হয়নি। রবীন্দ্রনাথ মানুষ মুখস্থ করে, জীবনানন্দ কম মানুষই মুখস্থ করে, হয়তো তাঁর দু-একটা করে। যেমন বিষ্ণু দের কবিতা ‘চোরাবালি’ দু-একটা হয়তো মুখস্থ করে লোকে। কিংবা আধুনিক কবিতায় সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। কিন্তু রফিক আজাদ এতটা পঠিত এবং তার কবিতা এতটা সহজ ও সরল, যেটা মুখস্থ করার দরকার হয় না। পুরো কবিতাটা বুঝতে পারা যায় যে রফিক আজাদের ভাবনা, রফিক আজাদের চিন্তা, মানুষের জন্য তার ভালোবাসা, মানুষের জন্য তার কনসার্ন এগুলো খুব দাবি করে। তার আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিল খুব ভিন্ন রকম। সেই-ই আমার ঢাকার পুরনো বন্ধুদের একজন। যতদূর মনে পড়ছে ১৯৬৩ সালের দিকে আমার সঙ্গে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের কিছু চিঠিপত্র আদান-প্রদান হয়েছিল। সায়ীদ ‘সাম্প্রতিক ধারার গল্প’ বের করছেন। এবং ‘পূর্ব মেঘের বৃত্তায়ন’ বলে একটি গল্প লিখছিলাম পরে এটি ছোট উপন্যাসিকা হিসেবে ছাপা হয়েছিল। সায়ীদ বলতেন, বাংলা সাহিত্যে এ রকম গল্প আর লেখা হয়নি। এটাকে আমি নভেলা বলব, নাকি উপন্যাসিকা বলব, নাকি গল্প বলব জানি না। আমি ঢাকায় যাব। কিন্তু ঢাকায় থাকার মতো তখন নির্দিষ্ট কোনো জায়গা আমার ছিল না। গিয়েছিলাম ওদের দুজনের সঙ্গে দেখা করার জন্য। ওরা তখন ইস্কাটনের একটি বাড়িতে থাকত। তখন রফিক আজাদ ব্যাচেলর। ওখানে একটা গলির মধ্য দিয়ে পার হলাম। গিয়ে দেখি ওখানে একটা বেঁটে-খাটো শক্ত-সামন্ত মানুষ বসে আছে। আমিও সঙ্গে সঙ্গে ওখানে ঢুকে গেলাম। তখন সায়ীদের সঙ্গে দেখা হলো এবং সায়ীদ বললেন, ইনি কবি রফিক আজাদ। ওই যে পরিচয়, এরপর সেই সম্পর্ক গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়েছে। সম্পর্কটা নিবিড় থেকে নিবিড়তর হয়েছে। একটা সময় তারা বাংলা একাডেমির বইমেলাটা দিনাজপুরে করছিল। সেই বইমেলাটা আমি আর শামসুজ্জামান খান উদ্বোধন করেছিলাম। শামসুজ্জামান খানের সঙ্গে আমার অনেক গল্প আছে, লোকজনকে আমি বলি না। বহু জায়গায় পাশাপাশি রাত কাটানো সময় গিয়েছে। যা-ই হোক, আমরা ঢাকা থেকে যারা গিয়েছিলাম, তাদের থাকার জায়গা হয়েছিল দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী একটি মাটির ঘরে। মাটির ঘর শীতকালে গরমই হয়। ওই ঘরে আবুল হাসনাত, রফিক আজাদ আরো অনেকেই ছিল। কী তুমুল আড্ডাই না হলো! নাটক হতো, বোরহানউদ্দিন নামে একজন নাট্যকার ছিলেন। পিকনিক করা হলো ওখানে। এভাবে সারা দিন নানা রকম অনুষ্ঠান হচ্ছে; কিন্তু রাতে শোয়ার পর গল্প করতে আরম্ভ করলাম এবং শেষ হলো সকালে। সেই সময় আমি ও রফিক আজাদ খুবই ঘনিষ্ঠ হয়ে গিয়েছি। তারপর থেকে রফিক আজাদ আমাকে কখনো ওস্তাদ বলে, কখনো গুরু বলে। ও যখন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক ছিল, তখন একবার আমাকে বক্তৃতা দিতে ডেকেছিল। রাজশাহীতে যখন দু-একটা অনুষ্ঠান হয়। এখানে দু-একটা সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে। ও যখন বাংলা একাডেমিতে ছিল, তখন আমার লেখা জোর করে আদায় করেছে সে। আমি একবার বড় নাটকের অনুবাদ করেছিলাম। ভাস্কো নামে। পরে এটি ঢাকায় মঞ্চস্থও হয়েছিল। এটি প্রথম ছাপা হয় বাংলা একাডেমির ম্যাগাজিন ‘উত্তরাধিকার’-এ। ছাপে আমাদের রফিক আজাদ। ও যখন ‘রোববারে’ যায়, তখনো আমার লেখা ছেপেছে। কারণ, আমি তার অনুরোধ ফেলতে পারতাম না। যে করেই হোক তাকে আমার একটা লেখা দিতেই হতো। এ রকমই সম্পর্ক ছিল তার সঙ্গে আমার। আমি তো আর নিয়মিত ঢাকায় যেতাম না, তাই তার সঙ্গে আমার অত দেখাও হতো না। তার স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদ ঘটল, সেটাও আমি জানি। আবার দিলারা হাফিজের সঙ্গে তার বিয়ে হলো, সেটাও জানি। কবিতা তো সে লিখেই যাচ্ছে। লিখল ‘অসম্ভবের পায়ে’। এটা লিখে সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, এই নাম রাখা যাবে? আমি বলেছি কেন নয়! রাখা যাবে। রবীন্দ্রনাথের গান আছে ‘মেঘলা হাওয়ার বাদল দিনে’। ওখানে একটা লাইনে আছে ‘অসম্ভবের পায়ে’। তারপর তো একটি বইয়ের নামই সে রাখল ‘অসম্ভবের পায়ে’। তার লেখা ‘চলে যাবো সুতোর ওপারে’ আমাকে সে মুখে মুখে বলেছে অনেক আগে। এটি নিয়ে পরে কবিতা লিখবে তা মনে করিনি। গেল তাই, সেভাবেই সে চলে গেল। স্মৃতি ছাড়া কী আর বলব এখনকার কবিতায় সাধারণত দু-একজন ছাড়া! যদিও সবচেয়ে প্রোডিওসিং হচ্ছে কবিরা। একটা কথা আমাদের সময় প্রচলিত ছিল যে একটি হলের সামনে যদি লাঠি চালানো হয়, তবে সাত-আটজনের মাথায় গিয়ে ওই লাঠি পড়ে; তার মধ্যে অন্তত চারজন কবি হবে। আমি সে কথা বলব না। কবিতা আমি এখনো পড়ি। পড়তে পারি, সেই কবিতা পড়ি। কবিতা তো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়। তার তো একটা সমাজ-সংলগ্নতা থাকবে এবং একটি ঐতিহ্য-সংলগ্নতা থাকবে। যা-ই হোক, কবিতা নিয়ে আমি বিচার করতে বসিনি, কবিতা নিয়ে বিচার করতে চাই-ও না। এখনো আমি আল মাহমুদ পড়ি, সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা পড়ি, নির্মলেন্দু গুণের কবিতা বেশ স্বচ্ছ—পড়ি, মহাদেব সাহার কবিতা পড়ি, রফিক আজাদের কবিতা পড়তাম। আজকাল খুব কম লিখত। আবার হাবিবুল্লাহ সিরাজীর কবিতা পড়ি। তার মধ্যে রফিক আজাদের কবিতা এত স্বচ্ছ, এত দায়বদ্ধতা—আর ও রকম আর একজন আছে তার নাম মোহাম্মদ রফিক। রফিকের কবিতাকে আমি অত্যন্ত উচ্চ মূল্য দিয়ে থাকি। আর এই রফিক আজাদ! এই রফিক আজাদের কবিতা আমি সত্যি করে আজকাল আর তেমন দেখতাম না। যারা প্রতিভাবান মানুষ, তারা যেকোনো বয়সে চলে যান না কেন, তাকে অকালপ্রয়াণ বলতে হয়।   যদি রফিক আজাদ নব্বই বছর বয়সে চলে যেতেন, তাকে আমার অকালপ্রয়াণ বলতে কোনো আপত্তি হতো না। আমাদের আখতারুজ্জামান ইলিয়াস যেমন বলতেন, একজন সৃজনশীল মানুষের তিন শ বছর আয়ু হওয়া উচিত। কারণ সে তার ভূত-ভবিষ্যৎ দেখে তো। তার মতো করে কারো দেখা সম্ভব নয় বলেই একজন কবি হয়েছে, একজন লেখক হয়েছে। তারা এত অল্প আয়ুর হলে কেমন করে চলবে! সেদিক থেকে এটা একেবারে অকালপ্রয়াণ। এতে খুব কষ্ট পেয়েছি। শিগগিরই ঢাকা যাব। বাংলা একাডেমিতে যাব। সে তো তরুণ লেখক প্রকল্প চালাত। মানুষ হিসেবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সে একটু বেশি বিনয়ী। গ্রন্থকেন্দ্রে যখন সে এসেছিল, দায়িত্ব নিয়ে আমি খুব কড়া করে তাকে নানা রকম কথা বলেছিলাম। ওরা একটা বইমেলা করেছিল। আমি বলেছিলাম, এটা একটা বইমেলা হলো নাকি! তখন সে আমাকে বলল, ওস্তাদ, কিছু করার তো নাই। সে মৃত্যুর সঙ্গে প্রায় দেড় মাস পাঞ্জা লড়ল। আমি জানি এক অঙ্গ অবস হয়ে গেছে, তারপর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়ে জমাট বেঁধে গেছে। এ অপেক্ষা শুধু শুধু। এ কেবল সময়ের অপেক্ষা। আমার আরেক বন্ধু ঠিক এ রকমই পড়ে আছেন। তার নাম খন্দকার সিরাজুল হক। বাংলা একাডেমির পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রাবন্ধিক, গবেষক। হয়েছে কি—কোনো শূন্যতাই তো চিরকাল শূন্য থাকে না। বাতাস তো বয়ে চলে। গরম বাতাসের জায়গায় হয়তো ঠাণ্ডা বাতাস আসতে থাকে। তার চলে যাওয়া অপূরণীয় ক্ষতি সেটা আমি বলতে পারব না। এই ক্ষতিটা এ মুহূর্তে আমাকে খুবই কষ্ট দিচ্ছে। ক্ষতি যত, ক্ষত তত/ নিমিষে ত্রিনাঙ্কুর। এই ক্ষতি, ক্ষত নিমিষে ত্রিনাঙ্কুর নয়। আমি আর কী বলব। তার শান্তি কামনা করি।

অনুলিখন : শ্যামল চন্দ্র নাথ 


মন্তব্য