অতিপ্রাকৃতিক গল্প অনুবাদে কেরামতি-334506 | দশদিক | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১২ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৪ জিলহজ ১৪৩৭


বই আলোচনা

অতিপ্রাকৃতিক গল্প অনুবাদে কেরামতি

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



অতিপ্রাকৃতিক গল্প অনুবাদে কেরামতি

বর্তমানে বাংলা সাহিত্যের একটা জনপ্রিয় ধারা সায়েন্স ফিকশন। সেবা প্রকাশনী প্রকাশিত এ ধরনের বই পড়ে একটা প্রজন্ম গড়ে উঠেছে। এখন আরেকটি প্রজন্ম গড়ে উঠছে। তাদের কাছে এ ধরনের বই মানে অবশ্যপাঠ্য। সাংবাদিক মুনীর রানার ভাষান্তরে এ রকম একটি বই ‘প্রজেক্ট মাস্টোডন’। এই বইয়ের গল্পগুলো অতিপ্রাকৃতিক।

টাইম মেশিনের প্রকল্প। তিনজন হঠাৎ উধাও। কোনো খোঁজ নেই। শেষ পর্যন্ত কর্তারা প্রকল্প স্থগিত করে দেয়। ওদিকে তিনজন ৫০ হাজার বছর আগের সময়ে চলে গেছে। সেখানে এক জঙ্গলে তাদের আস্তানা। তারা বুনো হাঁস ও তিতির পাখির মাংস আগুনে ঝলসিয়ে খায়। চারপাশে ইয়া বড় বড় ঘোড়া ও অদ্ভুত সব প্রাণী ঘুরে বেড়ায়। এদিকে যন্ত্রটা বিকল। ২০০ দিন তিন বন্ধু খাটাখাটনি করে মেশিনটির জন্য কিছু একটা করেছে। দুজন গেছে হরিণ শিকারে। বাকিজন টাইম মেশিন নিয়ে হাওয়া। চিঠি লিখে রেখে গেছে, ‘আমি শিগগিরই ফিরে এসে তোমাদের নিয়ে যাব।’ সেই বন্ধু বর্তমানে ফিরে প্রকল্পটা পুনরায় চালু করেছে। টাইম মেশিনের ত্রুটিটা সারিয়ে দুই বন্ধুকে ফিরিয়ে আনতে হবে। হাজার হাজার বিজ্ঞানী মিলে ‘প্রজেক্ট মাস্টোডনে’ কাজ করছিল। এদিকে দুই বন্ধু অপেক্ষায়।

এ হচ্ছে ‘প্রজেক্ট মাস্টোডন’ সায়েন্স ফিকশন সংকলনের নাম গল্প। একে ছোটখাটো উপন্যাসই বলা যায়। এর মূল গল্পকার সিডি সিমাক।

মনে করুন, ভিনগ্রহের বাসিন্দারা ছদ্মবেশে পৃথিবীতে এসে মানুষ শিকার করে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ-ই টের পাচ্ছে না। এ রকম দুজন ভিনগ্রহী ‘আলদেবারান’ ও ‘দেনেব’ ঢাকার একটি ক্যাফেতে বসে বিয়ার খাচ্ছে আর এসব গল্প করছে। ২০৫০ সালের ঢাকার সম্ভাব্য রূপ নিয়ে এই গল্প ‘আগন্তুক’। ডালাস ম্যাকর্ড রেনল্ডসের লেখা ‘আয়াম এ স্ট্রেঞ্জার হেয়ার মাইসেলফ’ গল্পের অনুবাদ এটি।

‘অবাক বইপাঠ’ গল্পে সাহিত্যে শব্দের প্রয়োগকে যেভাবে রসালো করে উপস্থাপন করা হয়েছে, তা পড়তে পড়তে পেটে খিল ধরে যায়। যেমন ‘রবিনের কাজ-কারবার দেখলে সবার চোখ কপালে উঠে যায়।’—এই বাক্য আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর পরে কেউ পড়ে বুঝল, সত্যি চোখ কপালে উঠেছে। এ রকম ‘চুল খাড়া হয়ে যায়’, ‘চোখ বুড়ো লোকটাকে অনুসরণ করতে লাগল’, ‘মাথা ঘুরে গেল’, ‘মাথা বনবন করে ঘুরছে’ ও ‘আনন্দে আটখানা হয়ে লাফাতে লাগল’। শব্দের আক্ষরিক অর্থ পড়ে এক কিশোরের সেকি কৌতূহল! শেষে তার আবিষ্কার, ‘এ বইটা যে সময়ের, তখন মানুষ যন্ত্রযুগের চেয়েও এগিয়ে ছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’ এটি ফিলিপ কে ডিকের ‘দি আইজ হ্যাভ ইটে’র অনুবাদ।

কারওয়ান বাজারে একটি রেস্টুরেন্টে বসে দুই লোকের দুপুরে খাওয়ার গল্প ‘ওই মহামানব আসে’। এদের একজন নিজেকে মহামানব দাবি করে। শেষের বাক্যে জানা যায়, আরেকজন অন্ধ। মহামানবও সেটা বুঝতে পারেনি।

‘ডিম ডিমাডিম ডিম’ গল্পটি ক্রিস অটেম্যান নেভিলের লেখা ‘টু মেনি এগসে’র অনুবাদ। একটা নতুন ফ্রিজ। সেখানে আপনা-আপনি ডিম আসে। সেই ডিম নিয়ে শিশির-রোমেল দম্পতির আনন্দ ও বিড়ম্বনা এতে ফুটে উঠেছে।

এই রকম আটটি ফিকশন নিয়ে বই ‘প্রজেক্ট মাস্টোডন’। লেখক ভূমিকায় উল্লেখ করেছেন, এসব লেখা অনেক আগে তৈরি ছিল। এমনকি এক যুগ আগে দুটি গল্প ‘প্রথম আলো’য় ছাপা। কিন্তু এত দিনে বড় ছেলের আবদার রাখতে গিয়ে বই প্রকাশ করেছেন। ভূমিকায় লিখেছেন, ‘হুবহু লাইন বাই লাইন ধরে অনুবাদ না করে ভালো লাগা গল্পের প্রেরণাটুকু নিয়ে গল্পের কাঠামোটা যথাসম্ভব ঠিক রেখে নিজের মতো করে লিখতেই আমার ভালো লাগে। তাতে বেশ স্বাধীনতা, স্বাচ্ছন্দ্য এসব অনুভব করা যায়।’ এই স্বাচ্ছন্দ্য যে কতটা নিপুণ তা না পড়লে বোঝা যাবে না। নামগল্পটি ব্যতীত বাকিগুলো পড়ে ঘুণাক্ষরেও বোঝা যায় না, এগুলো অনুবাদ। মনে হয়, এ দেশেরই কোনো লেখক বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী লিখেছেন। এখানেই অনুবাদকের কৃতিত্ব। যদিও সমালোচকরা মূলানুগ অনুবাদকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। কিন্তু মূলানুগ না হয়েও বাকি গল্পগুলো সুখপাঠ্য ও হূদয়গ্রাহী হয়েছে।

►হানযালা হান

মন্তব্য