kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অন্ধকার সম্পর্কিত এসব

মণিকা চক্রবর্তী

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



অন্ধকার সম্পর্কিত এসব

অঙ্কন : মানব

বাড়ি বিক্রয়ের সিদ্ধান্তটা কি তাকে শেষ পর্যন্ত নিতেই হবে? একটা গভীর অস্থিরতা তার বিবেকবোধকে গ্রাস করে। স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো, কুয়াশাঘেরা স্মৃতি তাকে ঘিরে ধরে।

কয়েকটা বুদবুদ ভেসে আসে। মিলিয়ে যায়। কত বছর? ঠিক কত বছর বাদে বাড়ির পথে! বাবার মৃত্যুর পর মায়ের কাছে সে কিছুদিন বাড়িতে ছিল। তখনো সে বিয়ে করেনি। মা মারা যাওয়ার পর যে সে বার পরিবারের সবাই মিলে এসেছিল, তা বেশ মনে পড়ছে। তা-ও বছরবিশেক তো হবেই! তখন মিতুলের বয়স কত! ছয় পেরিয়েছিল কি! মিতুল কেমন করে যেন সবার অগোচরে বাড়ির পেছনের পুকুরটায় পিছলে পড়ে গিয়েছিল। আর সে দিনই অনেক অশান্তি আর তার স্ত্রী উর্মিলার উচ্চস্বরে কান্নাকাটির পর অমল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, এই অসুস্থ প্রতিবন্ধী বাচ্চা নিয়ে আর বাড়িতে আসবে না। তারপর সত্যি সত্যিই আর আসা হয়নি। আর মা-ও তখন নেই। কার টানে আসবে! শেষ পর্যন্ত দুর্গাপূজা আর কালীপূজাতেও বাড়িতে আসা বন্ধ হলো। বাড়ি দেখাশোনার জন্য ছিল একজন মাসতুতো ভাই। মাসছয়েক আগে হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক হয়ে ভাইটি মরে গেল। বাড়িতে বউটি এখন একেবারেই একা। ভাইটার বুদ্ধিশুদ্ধি কম থাকায় তার বউ মল্লিকাই সব আগলে রাখত। মা বেঁচে থাকতেই মল্লিকাকে মাসতুতো দাদা বিনয়ের সঙ্গে বিয়ে দেয়। মল্লিকা শেষ পর্যন্ত এই বাড়িতেই থাকবে, মল্লিকাকে বউদি বলে ডাকতে হবে, এটা অমল কল্পনাও করেনি। অমলের বাড়িতে আসা কমে যাওয়ার পর মাকে দেখাশোনার জন্য বিনয় আর বউদি মল্লিকা ছাড়া আর কেউ ছিল না। মল্লিকাদের বাড়ি অমলদের গ্রাম পেরিয়ে দুটি ছোট গ্রামের পর। ছোটবেলায় অমলের এক পিসতুতো বোনের সঙ্গে সে অমলদের বাড়িতে বেশ কয়েকবার এসেছিল। মাঝেমধ্যে অমলদের নিরালা বাড়িতে কিছুদিন থেকেও যেত। মা খুব আদর করেই তাকে রাখত। বিকেলবেলায় বারান্দায় বসে লম্বা চুল বেঁধে দিত। গ্রাম ছেড়ে শহরে পড়তে আসার আগে মল্লিকার প্রতি একটা স্পষ্ট আকর্ষণ টের পেত অমল। মল্লিকা একবার পুকুরে সাঁতার কাটতে গেলে ওর ভাসন্ত উরু দেখে কৈশোরে মল্লিকাকে অপরূপা মনে হয়েছিল অমলের। মল্লিকাকে ঘিরে সেই শারীরিক ব্যঞ্জনাটা সে বড় হতে হতে অনেক নিঃসঙ্গ মুহূর্তে অনেকবার টের পেয়েছে। তার প্রথম জীবনের নারী, যে স্বপ্নে হানা দিত, তা ছিল মল্লিকারই অবয়ব। বিনয়দা বেঁচে থাকতেও মল্লিকাই মাঝেমধ্যে গাছের আম, কলা, তাল, খেজুরের রস যত্ন করে বাঁধাছাধা করে বাড়ির আশপাশের কোনো লোক দিয়ে ঢাকায় পাঠানোর চেষ্টা করত। আর সত্যি বলতে কি, মল্লিকার দিক থেকে সব সময়ই এক অদ্ভুত মায়াবী আলোছায়াময় স্নেহ টের পেত সে। তার চোখের লাবণ্যময় ভাষায় কিছু কথা শব্দহীন হয়েও অমলের হূদয়ে ঠিক পৌঁছে যেত। এমনকি গতকালই যখন বাড়ি কেনার পক্ষের দু-চারজন লোক বাড়ি এসে তার সিদ্ধান্তের কথা জানতে চেয়েছিল, তখনো বউদি মল্লিকার গলার স্বরটি মোবাইলে একটা অন্য রকম অনুভব দিয়েছিল তাকে। ‘ঠাকুরপো, বাড়ি কি সত্যি সত্যিই বেচবেন? দুটি পার্টি কালও খবর নিছিল। ’ তারপর কিছুক্ষণ স্তব্ধতা। অমল টের পাচ্ছিল বউদির সেই স্তব্ধ, বোবা স্বরটি তার শরীর থেকে আত্মা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে কোনো এক তীব্র সংকেতে।

অমলের স্ত্রী উর্মিলার কোনো টানই ছিল না বাড়ির প্রতি। শুধু বাড়ির কেন! মায়ের সঙ্গে সে কোনো দিনই মিলিয়ে চলতে চায়নি। ছেলে হওয়ার পর প্রতিবন্ধী ছেলেটি ছাড়া সংসারের কোনো জিনিসের প্রতিই তার কোনো টান নেই। এমনকি নিজের যত্নটুকুও সে করে না। টাকাপয়সা, শাড়ি-গয়না কোথায় কী? কিছুরই খবর রাখে না। শুধু গাড়ির কিছু হলে আর সব সময়ের পরিচিত ড্রাইভারটি না এলে প্রচণ্ড রেগে যায় উর্মিলা। এই এক বাতিক। যা কিছু আনন্দের তার কাছে, তা হলো রেড ওয়াইন কালারের জিপ গাড়িটি। ছেলেকে নিয়ে খুব বেড়াতে ভালোবাসে। শিশু পার্কে, চন্দ্রিমা উদ্যানে, রমনায়, আশুলিয়ায়। গাড়িটি কেনার সময় অনেক টাকা খরচ হয়েছিল। এই নির্দিষ্ট রেড ওয়াইন রংটির জন্য আরো এক লাখ টাকা বেশি ঢালতে হয়েছিল অমলকে। উর্মিলা ওর কাঁচুমাচু অবস্থা দেখে হাসতে হাসতে বলেছিল, অফিস থেকে ফিরে প্রায় প্রতিরাতেই তুমি এই রঙের সিরাপে ডুবে থাকো। তাই আমিও এ রংটিই বেছে নিলাম। অমল উর্মিলার মুখের দিকে তাকিয়ে প্রতিবন্ধী ছেলের নড়বড়ে মেরুদণ্ড আর ফ্যাকাসে সাদা করুণ মুখটি ঠিক তখনই যেন আরেকবার ভয়াবহভাবে দেখতে পেল। ওদের জন্য এই গাড়ি! একটা বিকট পরিহাসের মতো লেগেছিল। তা ছাড়া হাতে অত নগদ টাকাও নেই। তবু গায়ে গা রেখে দুটি জীবের বেঁচে থাকার তীব্র আকুতির মধ্যে এই গাড়িটি যেন তীব্র গতিবেগ নিয়ে হাজির হয়েছিল। স্বপ্নহীন জীবনের একটা মারাত্মক ছোবল তার নিজের মেরুদণ্ডকে ঠুকরে ঠুকরে অনেকখানি শক্তিহীন করে দিয়েছে। তার পরও সে এই দুটি অসহায় প্রাণীর দিকে তাকিয়ে অফিস থেকে লোন নিয়েই গাড়িটা কিনেছিল। গাড়িটা কেনার পর ওরা মায়ে-ছেলে মিলে বেশ সুখেই আছে বলা যায়। ছেলেটা বেড়াতে ভালোবাসে। মেঘভরা আকাশ, উজ্জ্বল আলো, মাথা তুলে দাঁড়ানো বট-অশ্বত্থ, জলের তীব্র ঘূর্ণি—এ সব কিছুই সে দেখতে ভালোবাসে। এই কঠিন হূদয়হীন শহরে উদ্দেশ্যহীনভাবে রোদ-বৃষ্টি-ঝড়ে একা একাই ঘুরে বেড়ায় ওরা।

অমল সারা দিন অফিসে ব্যস্ত। একটা বহুজাতিক কম্পানিতে অনেক খাটুনির পর বেশ কয়েকটি প্রমোশন পেয়েছে সে। সেলারি ভালো। সারা দিন কাজে ডুবে থাকা আর রাতে বাসায় ফিরে সব অবসন্নতার অবসানের জন্য কয়েক পেগ ওয়াইনে ডুবে থাকা। এই তার জীবন। এটা নিয়ে কোনো ব্যক্তিগত গ্লানিবোধ তার মধ্যে নেই। আছে কি? কী-ই বা সে করতে পারে এই মরচেপড়া জীবনের মধ্যে! একটা দুঃস্বপ্নের জীবন! কিছুতেই কিছু আসে-যায় না আর। সব রকম নীতিবোধ কেমন হাস্যকর লাগে। মা মারা যাওয়ার পর আপন বলতে তো আর কেউ নেই। ছেলেটি জন্মানোর পর থেকেই উর্মিলা নির্বিকার-নির্লিপ্ত। অথচ একসময় শরীরের কী অসাধারণ উগ্র সৌন্দর্য ছিল উর্মিলার। অন্যদিকে চোখ দুটিতে শান্ত গভীরতা। উত্তাল ভালোবাসায় কখন কেটে গিয়েছিল বিয়ের পরের দুটি বছর। এখন মিতুলকে নিয়ে উর্মিলার এক দুঃস্বপ্নের জীবন। পাশাপাশি সমান্তরালে আছে অমলের এক মৌন হাহাকার। সারা দিন কাজের শেষে বাসায় ফিরতে গেলে অমলের প্রায়ই মনে হয় কী যেন একটা ছটফটানি তার এই মধ্যবয়সী শক্তসামর্থ্য পুরুষালি শরীরের মধ্যে আটকে পড়ে আছে। কুলুপকাঠি দিয়ে আটকানো এই হূদয়, অবসাদ, নিষ্ক্রিয়তা। এসব অবসাদ সে আধুনিক জীবনের নানা আনন্দময় উপকরণ দিয়ে ভরিয়ে তুলতেই পারে। চেষ্টা করলে কোনো মেয়ে বন্ধুর সঙ্গে চ্যাটিং, ফ্ল্যাটিং, বেড়ানো, এসবের মধ্য দিয়ে সে কিছুটা থামাতে পারে তার নিজের শরীরে জেগে থাকা জান্তব লড়াইটাকে। কিন্তু তাতেও তার ধারণা, নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটা রুদ্ধশ্বাস আড়ষ্টতা এসব ছোটখাটো মুক্তির আনন্দকেও নস্যাৎ করে দেবে। তার ধারণা, সংসারজীবনের প্রথমদিকে, উর্মিলার সঙ্গে জীবনের যে আনন্দ সে অনর্গল সরলতায় আর উচ্ছলতায় ভাগ করে নিয়েছিল, তার খানিকটাও যেন আর কোনো আনন্দের মধ্যে জমে ওঠে না, কখনো জমে উঠবে না। এমনই মনে হয় তার। পাশাপাশি একটি অপরাধবোধ! অপরাধবোধই! যেন তার নিজস্ব আনন্দ উর্মিলার কাছে অনেক দুঃখের। উর্মিলাকে বাদ দিয়ে জীবনের যে অজস্র ছুটন্ত আনন্দের সম্ভার চারদিকে, তার সব কটিতেই যেন মিশে থাকে প্রতিবন্ধী ছেলেকে নিয়ে উর্মিলার অতিকায় লড়াই করার যন্ত্রণার আর্তনাদ।

উর্মিলা অনেক সময় টেরই পায় না কখন অমল ঘরে ফেরে। টের পায় কি! টের পেয়েও কি নিথর হয়ে ঘুমের ভানে থাকে! কি জানি! ছেলেটার ঘুম কম, তাই প্রতিদিনই ঘুমের ওষুধ দিতে হয়। সন্ধ্যার একটু পর ছেলে ঘুমানোর পর উর্মিলাও আর খুব বেশি দেরি করে না। চারপাশে নানা রকম শব্দের মধ্যে অমলের কাছে নিজের ফ্ল্যাটটাকে মনে হয় ভৌতিক। ড্রইং রুমের এক কোণে ঢেকে রাখা সামান্য খাবার, টেবিলে একটা গ্লাস, ঠাণ্ডা জলের বোতল আর ফ্রিজ থেকে অমলের বের করে নেওয়া হুইস্কি বা ওয়াইন। টিভিটা মৃদু আওয়াজে চলতে থেকে ভৌতিক নড়াচড়ার পরিবেশটাকে আরো একটু বাড়িয়ে দেয়। কখনো অমলের তন্দ্রার মধ্যে নেমে আসে প্রিয় শৈশব। বুকের ওপর নেমে আসে পুরনো বাড়ির স্মৃতি। ভীষণ ভারী মনে হয় নিজের কাছে। খুব করুণ লাগে বাড়িটার ছবি। প্রতিবন্ধী বাচ্চাটার মতোই। যেন পরিচর্যা করার কেউ নেই।

সেই পুরনো বাড়িটা। বাপ-দাদার ভিটে। কোন প্রপিতামহ এখানে আবাস গড়েছিল, ঠাকুর মন্দিরে প্রথম দুর্গাপূজা করেছিল—কে জানে! শুধু মনে পড়ে, বেলা পড়ে এলে রোদজ্বলা আকাশের রঙের তীব্র ছটায় একটা গভীর নির্জনতা লুকিয়ে থাকত সেই বাড়িটায়। নিঝুম স্তব্ধতা ছিন্ন করে হঠাৎ করে আচমকা ডেকে উঠত বাড়ির বিশ্বস্ত কুকুরটি। তার অতি প্রিয় কুকুর লাভলু। একটা ছোট বোন হয়ে মারা যাওয়ার পর সে একাই ছিল এই বাড়ির একমাত্র শিশু। সেই ছোটবেলার একমাত্র সঙ্গী লাভলু। বয়স তখন আট কি ১০! পুকুরপাড়ের কাছে ছিল সবুজ মানকচুর ঝোপ। হঠাৎ স্তব্ধ সময়ে তার কচি পাঁজরে নিঃসঙ্গতা কখন আঁচড় কেটে যেত সে জানতে পারেনি। কিন্তু সেই নিঃসঙ্গ ছেলেটি মস্ত দুপুরবেলাগুলোয় লাথি মেরে, আঘাত করে, তছনছ করে দিত শান্ত কচুগাছের ঝোঁপ। তাই বুঝি বাড়িটা তাকে কখনো আপন করে নেয়নি। অথচ সেই বিশ্বস্ত কুকুরটি তাকে পাহারা দিয়ে রাখত সব সময়। আপন করে নিয়েছিল। আজ কতকাল পরে সে বাড়ি যাচ্ছে! যতই রাস্তা ফুরাচ্ছে তার মনে পড়ছে সেই কুকুরটারই কথা, বাড়ির কথা, ছেলেবেলার কথা। যেন মাঝখানের এই ঘুণেধরা সময়গুলোর কোনো অস্তিত্বই নেই। কুকুরটা যে তাকে খুব আপন করে নিয়েছিল, তা-ও যেন সে আজই এইমাত্র বাড়িতে যাওয়ার রাস্তায় গাড়িতে যেতে যেতে আবার নতুন করে জানতে পারল। কী অদ্ভুতভাবেই না কুকুরটির পুরো অবয়বটি সে দেখতে পাচ্ছে। মৃত্যুর আগে জ্ঞানী বৃদ্ধ মানুষের মতো বসে বসে ঝিমোত বাড়ির উঠানের মাঝখানে। সামনের দুই থাবার মধ্যে মাথাটি রেখে খুব নির্লিপ্তভাবে দেখে যেত সব কিছু। তবে কান দুটি সব সময় খাড়া করে রাখতই। টহলদার হিসেবে সে খুব সতর্ক থাকত সব সময়ই। কুকুরটা মরে যাওয়ার দু-এক মাস আগের একটা ছোটবেলার ঘটনা স্পষ্টভাবে অমলের মনের ওপর দুলে ওঠল। ভেতরবাড়ির দিকে যেতে বৈঠকখানার এক কোণে ঘন হয়ে ওঠা বাসকগাছের ঝাড় ছিল। তার পাশেই ছিল বেশ লম্বা একটা চাঁপাগাছ। কবে যে বোলতারা এসে সেই লম্বা গাছের ডালে বাসা করেছে কারো চোখে পড়েনি। দুপুর শেষ হওয়ার একটু পরে মাঠে খেলতে যাওয়ার আগে তার মনটা দপদপিয়ে কী যেন খুঁজছিল। আচারের বয়াম থেকে কিছুটা আচার আর আমসত্ত্বের মধ্যেই সাবাড় করে ফেলেছে সে। হাতে কাজ না থাকায় অলস হাত দুটিকে কাজে লাগানোর জন্য যেইমাত্র সে চাঁপাগাছটিকে ঝাঁকুনি দিতে গেল ঠিক তখুনি ঝিমিয়ে থাকা কুকুরটা এক দৌড়ে ঘেউ ঘেউ করতে করতে ওর পায়ের কাছে এসে আরো জোরে জোরে ঘেউ ঘেউ করে চেঁচাচ্ছিল। শব্দে চমকে গিয়ে দুপুরের আয়েশি ঘুম থেকে এক লাফে উঠে এসেছিল মা। তারপর কুকুরটার জ্বলজ্বলে চোখের দিকে তাকিয়ে বিপদের আশঙ্কাটা আঁচ করেছিল। মায়ের ত্রস্ত মুখের দিকে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করেছিল, কী দেখছ! কী! মা-ও ভয়ার্ত স্বরে বলেছিল, দেখ, মাথার ওপরে ওটা কী? চোখ পিট পিট করে তাকিয়ে আস্তে আস্তে পা টিপে টিপে সরে পড়েছিল সে। মা কুকুরটার মাথায় আস্তে হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘ভাগ্য ভালো যে লাভলুটা ঘেউ ঘেউ করে আমাকে ডেকেছিল। বোলতারা এখানে এত বড় বাসা করেছে! আমারও চোখে পড়েনি। যাক বাবা, আজ সর্বনাশ থেকে বাঁচা গেল। তোর কি দুপুরবেলাটা এভাবে ঘুরে ঘুরে কাটাতে হবে? শুয়ে শুয়ে ঠাকুরমার ঝুলিটা পড়তে পারিস না?’

সর্বনাশ থেকে শুধু যে সেদিনই লাভলু তাকে বাঁচিয়েছিল তা নয়। ১৯৭১ সালের যুদ্ধে যখন নিরুপায় হয়ে ওরা বাড়ি ছেড়ে আগরতলার শরণার্থী ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিল, সেই দীর্ঘ ৯ মাসের প্রতিটি দিনরাত বাড়িটা ঘুরে ঘুরে পাহারা দিয়েছিল লাভলু। ফেলে যাওয়া ঘরবাড়ি থেকে রাজাকারের লোকেরা টিনগুলো খুলে নিতে এলে লাভলু নাকি তাদের কাউকে কাউকে কামড়ে রক্তাক্ত করেছিল। বাড়ি ফেরার পর এ সবই শুনেছিল প্রতিবেশীদের কাছে। যে বিষয়টি ওদের সবাইকে অবাক ও বিস্মিত করেছিল তা হলো, ইন্ডিয়া থেকে ফেরার দিন লাভলু কিভাবে যেন টের পেয়েছিল। এটা কি কোনো মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার! অথবা অজানা কোনো শব্দতরঙ্গের মাধ্যমে সে জেনে গিয়েছিল! আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে বাড়ি থেকে অনেক দূরের সেই ফেরার রাস্তায় চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল অপেক্ষায়! বিষয়টা আজও তার কাছে অলৌকিক মনে হয়। সে যেন ‘গার্ড অব অনার’ দিয়ে সবার সামনে থেকে দায়িত্ব নিয়ে ওদের সবাইকে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছিল। অমলের স্পষ্ট মনে আছে, তার গায়ের সাদা রংটা ম্লান ছিল, রোগা হাড় জিরজিরে আর শরীরের এখানে-ওখানের লোমগুলো উঠে গিয়েছিল। বোধ হয় সেই লোম ওঠা জায়গাগুলোতে জখম খেয়েছিল সে যুদ্ধের সময়। কুকুরটাকে শেষ পর্যন্ত মরে যেতে বাধ্য করা হয়েছিল। একদল চোর চুরির মতলবে ওকে দিয়েছিল বিষ মাখানো খাবার।

আজ দীর্ঘদিন পর সে বাড়ি যাচ্ছে। নিজেকে মনে হচ্ছে ক্লান্ত, নিঃসঙ্গ, আউটসাইডার। একটা অনিশ্চয়তাবোধ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মনের ভেতর। গত মাসে মাসতুতো ভাইটি মারা যাওয়ার পর একা একা বাড়িটি আগলে রাখা আর সম্ভব নয় মধ্যবয়সী বিধবা বউদির পক্ষে। আশপাশের অনেকেই বাড়ি বিক্রি করে চলে গেছে। সে-ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাড়ি যাওয়ার পরই দুটি পার্টি টাকা নিয়ে আসবে বলেছে। অথচ এই বাড়ি বিক্রির সিদ্ধান্ত সে কিছুতেই মন থেকে মানতে পারছে না। এই বয়সে বউদিকেই বা সে রাখবে কোথায়! তার নিজের জীবনের যন্ত্রণা আর হাহাকারের মধ্যে বউদিকে সে ঢাকায় নিয়ে যেতে চায় না। ইতিমধ্যেই বউদির ভাইকে খবর দিয়েছে সে, যেন কিছু মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে বউদিকে যত্ন করে রাখে। গাড়িতে চড়ে চার ঘণ্টার পুরোটা পথ পাড়ি দিতে দিতে সে ভেবেছে, তার বেঁচে থাকা, জন্ম-মৃত্যু, কুকুর, কুকুরের অপমৃত্যু, বউদির প্রতি এক অদ্ভুত দুর্বলতা, আর তার থেঁতলানো বিকারগ্রস্ত জীবনের কথা। এত কিছুর পরও আকাশের নীল তার বুকের মধ্যে শান্তির ছায়া দেবে ভেবে, ছটফট করা মনটিকে শান্ত করার জন্য সে তার গাড়ির জানালা খুলে দিয়ে নীল আকাশটাকে একবার প্রাণভরে দেখার চেষ্টা করে। আকাশের মুখ থমথমে। কী মাস এখন? শ্রাবণ শেষ হলো! কি জানি! আজকাল বাংলা মাসগুলোও ঠিকঠাক মনে থাকে না। আকাশের বুকে লেপ্টে থাকা খোপ খোপ অন্ধকারগুলো দেখতে দেখতে কখন যেন বাড়ির খুব কাছেই এসে গেল তার গাড়ি। মালিপাড়া, সাহাপাড়া, পেয়ারাবাগান পেরিয়ে সাদা স্কুলঘরটি চোখে পড়ল। যেন ওখানে এখনো ব্ল্যাকবোর্ডের পেছন থেকে হাজিরা খাতা খুঁজছেন মধুসূদন পণ্ডিত। স্কুলঘরের পেছনে এখনো লতাকলমির মরা ডাল। বাড়ির ভেতরে ঢুকেই মনে হলো, কী এক গভীর রহস্যময়তায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে বাড়িটি। একেবারে সুনসান নীরবতা। চারপাশে শৈশবের স্মৃতি। বাবার কাচারিঘর। বাবার হাতেই লাগানো নিমগাছটি এখনো আগের মতোই।

দীর্ঘদিন পর কালো চিকন পাড়ের সাদা শাড়ি পরা শ্যামলা মল্লিকা বউদিকে দেখে কেমন ফ্যাকাসে মনে হলো। পুরু ঠোঁটে ব্যথাময় ক্লান্ত হাসি। যেন অনেক বছর ধরে অভিশপ্ত হয়ে পড়ে আছে একা এই বাড়িতে। একটা সন্তানও জন্মাল না বিনয় আর মল্লিকার। সন্তান ধারণ করেনি বলে এই মধ্যবয়সেও মল্লিকার শরীরে কোনো শিথিলতা নেই। ভাত বেড়ে দেওয়ার সময় বউদির হাতের আচারের বয়াম থেকেও যেন বের হয়ে আসছিল জমানো দীর্ঘশ্বাস। ভাত খেতে বসে জমাট কান্নাগুলো শেষ পর্যন্ত চুপচাপ আটকে দিতে পেরেছিল অমল। তবু একবার মনে হয়েছিল, এই সুনসান বাড়িতে জীবনের সব পচা-গলা অন্ধকারের ওপর লাথি মেরে শরীরের প্রচণ্ড উষ্ণতায় এখনই সে জাগিয়ে দিতে পারে নিজেকে আর ওই ফ্যাকাসে নারীটিকে। যে বাড়িটিতে আজও চাইলেই জাগিয়ে রাখা যায় প্রেমময় জ্যোত্স্না। সে কি পারে না তার শৃঙ্খলিত জীবনের অপরিসীম নিঃসঙ্গতা থেকে, ভাগ্যের নিষ্ঠুরতা থেকে বের হয়ে আসতে! কেন আজ নিজের বাড়িতেই নিজেকে অচেনা আর অবাঞ্ছিত মনে হচ্ছে! বেঁচে থাকা মানেই যন্ত্রণা, জ্বালা আর নিষ্ফলতা! আহা, চাইলেই যদি নিজের ভাগ্যটাকে বদলে দেওয়া যেত!

মাথার ওপর ভেঙেপড়া অসংখ্য ভাবনার টুকরো টুকরো অংশের ইট-পাটকেল খেতে খেতে সে বাড়ি বিক্রি করে বসে। বউদির নামে মোটা অঙ্কের কিছু টাকা পোস্ট অফিসে সঞ্চয়পত্র করে তাকে বাপের বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিয়ে অমল দায়িত্বগুলো তাড়াতাড়ি শেষ করে। তবু ঢাকায় ফিরতে দুই দিন দেরি হয়ে যায়। উর্মিলার উপর্যুপরি ফোনে সে তার ভঙ্গুর অস্তিত্বটা আরো বেশি করে টের পায়। পিতৃপুরুষের ভিটার প্রতি আর কোনো দায় অনুভব করে না। ফেরার পথে গাড়িটা খুব দ্রুত চলছে। না, এখন আর সে কিছু ভাবছে না। রাত হয়ে গেছে। যত তাড়াতাড়ি ঢাকায় পৌঁছানো যায়। উর্মিলা হয়তো একা একা প্রতিবন্ধী বাচ্চাটাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। সে আর ভাবতে চাচ্ছে না কিছুই। যা হওয়ার তা হয়েছে। তবু বিস্তীর্ণ অন্ধকারে বউদির করুণ মুখটা আবছাভাবে ভাসে। সে ঢুলুঢুলু চোখে বাড়ির পুকুরের জলের ভেতর নিজের ছায়া দেখে। ছায়ার ভেতর আলো, আলোর মধ্যে অনেক করুণ মুখ। মা-বাবা, মল্লিকা...। হঠাৎ গাড়িটা ব্রেক করল। কী হলো কাশেম?

স্যার, একটা কী যেন গাড়ির সামনে ধাক্কা লাগল।

অন্ধকার নির্জন রাস্তায় অমল তখনই গাড়ি থামিয়ে নামল। গাড়ির সামনের তীব্র আলোতে একটা থেঁতলানো কুকুর। একেবারেই থেঁতলে গেছে। অমল যেন দেখল, থেঁতলানো কুকুরটা পুরো অবয়ব নিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, শুঁকছে অমলের জুতার চারপাশের মাটিটা। কুকুরের শরীরটা যেন অমলের খুব পরিচিত। লোম ওঠা, সাদা আর বিবর্ণ। অমল বাইরের বোবা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে অতিদ্রুত যন্ত্রের মতো গাড়িতে উঠে বসে। সে ভাবে, অন্ধকারসম্পর্কিত এসব চেতনা মুছে দিয়ে সে কবে ঠিকঠাক যন্ত্র হয়ে উঠতে পারবে?


মন্তব্য