kalerkantho


পাথর প্রাণে আলোর ঝলকানি

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পাথর প্রাণে আলোর ঝলকানি

হামিদুজ্জামানের শিল্পকর্মজুড়ে রয়েছে বোধের আপেক্ষিকতা। কখনো মনে হয় তাঁর কাজের প্রেরণা আধ্যাত্মবাদ, কখনো মনে হয় প্যালিওলিথিক যুগের রমণীর নিদর্শনের কাছাকাছি—অর্থাৎ নিরবধিকাল আর বিষয়কে অতিক্রম করে যায় তাঁর শিল্পকর্ম। তবে শিল্পের সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন পাঠকমাত্রই তাঁর কাজের ভেতর দিয়ে ঢুকে পড়তে পারেন প্রকৃতির ভূখণ্ডে। প্রকৃতি থেকে আহরিত সৌন্দর্যে বোধের মৃদু শব্দতরঙ্গ পৌঁছে যায় কানে, চৈতন্য সাড়া জাগায়। কেননা তাঁর কাজে ব্যবহূত ফর্মের অবয়বগুলো প্রকৃতি থেকে আহরিত।

পাথর আর ব্রোঞ্জে গড়া ভাস্কর্যগুলোর শরীরজুড়ে অজস্র বিন্দু আর রেখার আঁচড়ের মিথস্ক্রিয়া। ভাস্কর্যের বহিরাঙ্গে নানা আঁচড় আর রেখার সিম্ফনি একধরনের ইন্দ্রজাল তৈরি করে। শিল্পী বলেন, আমি পাথরকে আকৃতি দেওয়ার চেষ্টা করি। পাথরের মধ্যে লাইনগুলো ধরার চেষ্টা করি। জ্যামিতিক ফর্মটাও গুরুত্বপূর্ণ। ছোট কাজেরও মনুমেন্টাল অ্যাফেক্ট থাকে। স্বাভাবিক বাঁধাধরা কোনো জ্যামিতিক গঠন নেই কাজটির মধ্যে। তবে পাথরের এই ভাস্কর্যের গা বেয়ে অসংখ্য রেখা কল্পনা করা যায়, যা কোনো দর্শকের চোখ টেনে নিয়ে যাবে মূল আকৃতির দিকে। গভীরভাবে লক্ষ করলে সেখানেই খুঁজে পাওয়া যাবে এক মানব মুখাবয়ব।

তাঁর পেইন্টিং আর ড্রয়িংয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য একই মন্তব্য। স্টোনস-২ শিরোনামে গ্যালারি কায়ায় প্রদর্শিত ভাস্কর্য ও চিত্রকর্মগুলো দেখলে শিল্পের পাঠকের ভেতরে যা জমা হয়, তা হলো বোধের অনিঃশেষ অনির্বচনীয়তা।

সেই কবে রোঁদ্যার হাতেই ভাস্কর্যশিল্পে আধুনিককালে বিস্ময়কর পরিবর্তন এলো। মানুষের শরীরকে সুস্পষ্ট বাস্তবতাবিবর্জিত করে এমন একটি আকৃতি দেওয়া হলো, যাতে রইল না শরীরী শাসন বলে কিছু। এই ধারা আরো এগিয়ে নিলেন ম্যুর।

ম্যুর যেসব আকৃতি নির্মাণ করলেন, তাতে উপাদানের নিজস্ব এবং প্রকাশক্ষমতার ওপর গুরুত্ব বাড়ল। আকৃতিতে স্বাভাবিক দেহ বিবৃতির পোষকতা না করে ইঙ্গিতময়তা লক্ষ করলেন। তাঁর তৈরি আকৃতিগুলো অ্যানাটোমিক্যাল ছিল না; কিন্তু চারিত্রিক পরস্ফুিটনে বায়োলজিক্যাল রইল। এসব বিমূর্ত ফর্ম নির্মাণের ধারা অনুসরণ করে ক্রমাগত সামনের পথে হেঁটে চলেছেন শিল্পী হামিদুজ্জামান। রাজধানীর গ্যালারি কায়ায় চলছে এই শিল্পীর একক শিল্পকর্মের প্রদর্শনী।

স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে হামিদুজ্জামান খান আধুনিক ভাস্কর্যচর্চাকে বিকশিত করার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য। ফলে হামিদুজ্জামান ব্যাপক আলোচিত ও ভাস্কর হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। পারদর্শিতা দেখিয়েছেন ক্যানভাস ও কাগজে জলরং, অ্যাক্রিলিক মিশ্রণসহ নানা মাধ্যমে। তিনি বহুমাত্রিক ধারায় সিদ্ধহস্ত—এই সত্য প্রতিভাত হয়ে ওঠে।

প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলো দেখে মনে হয়, কালোর প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব রয়েছে এই শিল্পীর। অধিকাংশ কাজে কালো ফর্মের পেছনে বিচ্ছুরিত হয় আলোর স্নিগ্ধতা; অথবা কালো ভূমির ওপর সাদা মার্বেল পাথরের ঝলকানি। স্টোনস-২ শিরোনামের প্রদর্শনীতে পাথর আর ধাতব বস্তুতে সেই শৈল্পিক রূপের স্ফুরণ ঘটিয়েছেন তিনি। সাদা, কালো, সবুজ মার্বেল পাথর তাঁর শিল্প রচনার প্রধান উপাদান। এসব পাথর কেটে-কুটে শৈল্পিক রূপ দেন তিনি। সেসব কাজে জ্যামিতিক ফর্মের অস্তিত্ব স্পষ্ট।

শিল্পকর্মগুলোতে রয়েছে এক প্রকার কৌশলগত নির্মিতি, যা বিশেষ বিশেষ স্থানগত স্থাপনার মধ্য দিয়ে অর্থবহ হয়। শারীরিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পারস্পরিক অনুপাত অস্বীকার করে। তবে সতত সঞ্চরমাণ সত্তা হিসেবে তা জনজীবনের কর্মচঞ্চলতার সঙ্গে একাকার।

শিল্পীর শিল্পকর্ম নিয়ে সমস্ত ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু মানুষ। মানুষ সম্পর্কে তিনি কী ভাবছেন, সেই ভাবনাকেই তিনি তাঁরা গঠন বা নির্মাণরীতির মধ্যে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেন। এ ভাবনা রূপ পায় নির্মাণকৌশলের সংহতির ওপর—যা রেখার, বস্তুপুঞ্জের এবং নির্মিত গঠনের উপরিস্থলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এর মধ্য দিয়ে অবয়বের গঠনগত যে চিহ্নিতকরণ প্রক্রিয়া রয়েছে, শিল্পীর কাছে তার মূল্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু শিল্পী একে অতিক্রম করেন এবং একটি বিশিষ্টার্থক গঠননৈপুণ্যে নতুন এক রূপের জন্ম দেন।

তাঁর কাজে যে শিল্পগত অবয়ব গড়ে ওঠে, তা দৃশ্যমান মানুষের অবিকল প্রতিকৃতি নয়। কিন্তু তিনি যা দেখেছেন, তা একটি নতুন ধরনের সংযোজিত বা সংস্থাপিত সমগ্রতা। যাকে মডেল করে শিল্পী ভাস্কর্য নির্মাণ করেন, সে মডেলটির যথাযথ আকৃতি নয়; কিন্তু যে আকৃতি নতুন করে উদ্ভাবিত হয়, একটি বিশ্বাস এবং আদর্শের মূর্ততায় তা চূড়ান্ত বিচারে কেবল শিল্পই। এই প্রক্রিয়াটি তাঁকে প্রকৃতই মহৎ শিল্পীর আসনে প্রতিষ্ঠিত করে।

ঁ খান মিজান


মন্তব্য