kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সুকান্তের চিঠি

মুহাম্মদ ফরিদ হাসান

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সুকান্তের চিঠি

অঙ্কন : দেওয়ান আতিকুর রহমান

সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা সাহিত্যে প্রতিভাধর ও প্রতিশ্রুতিশীল একজন তরুণ কবির নাম। এত অল্প বয়সে বিপুল শক্তিধর সৃষ্টির নজির বিশ্বসাহিত্যে থাকলেও বাংলা সাহিত্যে একজনই।

পৃথিবী বদলানোর স্বপ্ন তাঁর রক্তে-রন্ধ্রে, চেষ্টায় ও সাধনায় ছিল। অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি সুকান্তের দাবি ও তাঁর রচিত কবিতা এসে এক রাস্তায় মিশে গেছে। অনেকে তাঁকে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে চিহ্নিত করে থাকেন। তবে এ কথার সঙ্গে এও সত্য, তাঁর বিদ্রোহ নজরুলের মতো বজ্রকঠিন নয়, তাঁর বিদ্রোহ ভিন্ন এক ব্যঞ্জনা নিয়ে হাজির হয়েছে কবিতায়। ভিন্ন ধরনের এই ব্যঞ্জনা সুকান্তের নিজের সৃষ্টি, যা তাঁকে কবি সুকান্ত হিসেবে স্বাতন্ত্র্য করে তুলেছিল।

আমরা ইতিপূর্বেও দেখেছি, অনেক প্রাজ্ঞজনই বলেছেন, কবি যা-ই লিখেন তা-ই অমৃত হয়। কবির চিঠিও তাই চিঠির চেয়ে বেশি কিছুর অর্থ বহন করে। আমরা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল অথবা জীবনানন্দ দাশকে পাই অথবা শামসুর রাহমান ও আবুল হাসানকে পাই, যাঁরা নিয়মিত চিঠি লিখতেন কখনো বন্ধুর কাছে, প্রেমিকার কাছে, কখনো জীবনের প্রয়োজনে চিঠি লেখা। সেই অনেকের সঙ্গে একই দলে চিরসবুজ সুকান্ত ভট্টাচার্যকেও পাই। তিনি বন্ধু, পিতা ও স্বজনদের কাছে প্রায় অর্ধশত  চিঠি লিখেছেন। তবে সুকান্ত বেশির ভাগ চিঠিই লিখতেন সময়ের প্রয়োজনে, একই সঙ্গে শখের বশে। তিনি তাঁর বন্ধু অরুণাচল বসুকে প্রচুর চিঠি লিখেছেন। তবে এসব চিঠি পড়ে বোঝা যায় যে সমাজমনস্কতা ও পরিবর্তন চিন্তনের পাশাপাশি সুকান্ত বিপুল আনন্দ নিয়ে চিঠি লিখতেন। আবার দুই বন্ধুর চিঠির মধ্যে চলত বাক্য নির্মাণের খেলা।   সুকান্তের প্রথম দিককার চিঠিগুলো ‘অর্থহীন অথচ বেশ ভারী শব্দ বানানোর খেলা’ হলেও পরবর্তী চিঠিগুলোতে তাঁর দর্শন, বোধ, উপলব্ধি ও প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। চিঠিগুলো কবির মনোজগতের বিভিন্ন অলিন্দে প্রবেশ করিয়ে দেয় এ যুগের পাঠককে। কবির চিঠিগুলো কেমন ছিল, তার পাঠ নেওয়া যেতে পারে। সুকান্ত ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২৪ পৌষ কলকাতা থেকে অরুণকে লিখেছেন : ‘কলকাতাকে আমি ভালবেসেছিলাম, একটা রহস্যময় নারীর মতো, ভালবেসেছিলাম প্রিয়ার মতো, মায়ের মতো। তার গর্ভে জন্মানোর পর আমার জীবন এতগুলি বছর কেটে গেছে তারই উষ্ণ-নিবিড় বুকের সান্নিধ্যে; তার স্পর্শে আমি জেগেছি, তার স্পর্শে অমি ঘুমিয়ে পড়েছি। বাইরের পৃথিবীকে আমি জানি না, চিনি না, আমার পৃথিবী আমার কলকাতার মধ্যেই সস্পূর্ণ। একদিন হয়তো এ পৃথিবীতে থাকব না, কিন্তু এই মুহূর্ত পর্যন্ত আমি যে কলকাতায় বসে কলকাতাকে উপভোগ করছি! সত্যি অরুণ, বড় ভাল লেগেছিল পৃথিবীর স্নেহ, আমার ছোট্ট পৃথিবীর করুণা। বাঁচতে ইচ্ছা করে, কিন্তু নিশ্চিত জানি কলকাতার মৃত্যুর সঙ্গেই আমিও নিশ্চিহ্ন হব। ’ এই উদ্ধৃতিটুকুর মধ্যে প্রাগুক্ত দুটি বিষয়ই অনুধাবন করা যায়। প্রথমত, সুকান্তের শব্দ বানানোর খেলা ও ভাব প্রকাশের কবিত্ব। দ্বিতীয়ত, তাঁর চিন্তা ও কমিউনিস্ট কর্মীর অনুধাবন। এখানে সুকান্তের চিঠির বিষয়ে শুভাশিস ব্যানার্জির কথাটিও উল্লেখ্য, ‘কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী, কিশোর সংগঠন কিশোর বাহিনীর সংগঠক সুকান্তের কবিতা আর জীবন একাকার। মৃদুস্বরে, ধ্যানের ভঙ্গিমায় যে কবিতা লিখিত হয় তাও যেমন শিল; তেমনি উচকিত ভাষায় অস্তিত্ব নিংড়ে যে ভাষা ওঠে তাও শিল। ’ কবিতার মতো একই সঙ্গে সুকান্তের চিঠির ভাষাও ‘শিল’। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী হিসেবে তিনি যা বিশ্বাস করতেন তা যেমন কবিতায় উঠে এসেছে, তেমনি সেই বিশ্বাস স্বাভাবিকভাবেই স্থান পেয়েছে চিঠিগুলোতে।

সুকান্তের বিশেষ একটি চিঠির কথা উল্লেখ করতে চাই। সুকান্তের পিতা নিবারণ ভট্টাচার্য সংসারধর্ম ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়েছিলেন। এ খবর পেয়ে মর্মাহত সুকান্ত তাঁর পিতাকে চিঠি লিখেন। বাবাকে লেখা সেই চিঠিটি ছিল কটাক্ষ আর বাণে-বিদ্রূপে ভরা। সুকান্ত লিখেছেন : ‘পরমারাধ্য বাবাজী, আপনার আকস্মিক অধঃপতনে আমি বড়ই মর্মাহত হইলাম। ইতোমধ্যে শ্রবণ করিয়াছিলাম আপনি সন্ন্যাস অবলম্বন করিয়াছেন,...এমতাবস্থায় ইহাই অনুমিত হইতেছে যে কাহারও সুমন্ত্রণায় আপনি এই পথবর্তী হইয়াছেন। ...এ ক্ষেত্রে আমার নিবেদন এই যে, অচিরে এই সৎসঙ্গ পরিত্যাগপূর্বক আপনার এই অস্বাভাবিকতা বর্জন করিয়া স্বীয় কর্তব্যকরণে প্রবৃত্ত হউন। আপনার পিতাঠাকুরের নির্দেশমত আপনার কলিকাতায় আসিয়া থাকাই আমার অভিপ্রায়। এ স্থানেও সৎসঙ্গের অনটন হইবে না, উপরন্তু আমার মতো অসতের সহিত দুই-চারিটা কথোপকথনের সুবিধাও মিলিবে। ’ এ চিঠিখানি আমাদের আরেকজন কবির চিঠির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। নজরুল তাঁর মামাশ্বশুর আলী আকবর খানকে এমন একটি চিঠি লিখেছিলেন।

সুকান্ত তরুণ হলেও তাঁর রসবোধ ছিল অফুরান। রসবোধে তিনি যেন সৈয়দ মুজতবা আলী। এক চিঠির শুরুতেই লিখেছেন : ‘দারোয়ানজীকে ধন্যবাদ-ধন্যবাদ পোস্ট অফিসের কর্তৃপক্ষ আর পিওনকে। ’ আবার অরুণকে সম্বোধন করেছেন ‘পরম হাস্যাস্পদ অরুণ’ বলে। বন্ধুর চিঠির জবাব না পেয়ে প্রতি-উত্তরে লিখেছেন : ‘সবুরে মেওয়াফল-দাতাসু, অরুণ, তোর কাছ থেকে চিঠির প্রত্যাশা করা আমার উচিত হয়নি, সে জন্যে ক্ষমা চাইছি। বিশেষত তোর যখন রয়েছে অজস্র অবসর—সেই সময়টা নিছক বাজে খরচ করতে বলা কি আমার উচিত?’ সুকান্ত চিঠিতে কোন কোন বই পড়েছেন, কোথায় কোথায় গিয়েছেন, কার সঙ্গে দেখা হয়েছে—সেসব কথাও বিস্তর বলেছেন। ১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট জন্মানো এই কবি ১৯৪৭ সালের ১৩ মে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের পাশাপাশি চিঠিগুলোও বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ।


মন্তব্য