kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মৃত্যু নেই বিপ্লবী সোমেন চন্দের

আহমদ রফিক   

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মৃত্যু নেই  বিপ্লবী সোমেন চন্দের

অঙ্কন : মানব

শহর ঢাকা ব্রিটিশ শাসনামলে রাজধানীর মর্যাদা পায়নি সত্য; কিন্তু নানা অভিধায় এর খ্যাতি খুব একটা কম ছিল না। মহররমের মিছিল ও জন্মাষ্টমীর মিছিল-খ্যাত ঢাকার অন্য এক পরিচিতি ছিল মসজিদের শহর।

তা ছাড়া ‘খাজা-কুট্টি-শাখা’ তিনে মিলে ঢাকা—এমন পরিচিতিও একেবারে ফেলনা বলা চলে না। তবে মহল্লা-বিভক্ত শহর ঢাকার পাঠাগার পরিচিতিও এর এক উজ্জ্বল দিক। আরএসপিআইয়ের ‘অভ্যগ্র গ্রন্থাগার’ অন্তত একটি বিশেষ নমুনা। কাঠের সুদর্শন সে ঘরটি, আহা, পুড়ে ছাই হয়ে গেল ব্রিটিশ তথ্যকেন্দ্র হওয়ার কারণে তরুণদের সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতার ক্রোধের আগুনে। তবে আমার বিবেচনায় শহর ঢাকার তুলনামূলক বিশেষ খ্যাতি দলীয় রাজনীতির সংগঠিত তত্পরতায়।

 

দুই

শহীদ সোমেন চন্দকে নিয়ে কিছু লেখার প্রসঙ্গে ঢাকা সম্পর্কে উল্লিখিত ছোট্ট গৌরচন্দ্রিকা অবান্তর মনে হলেও আগাগোড়া প্রাসঙ্গিক এ প্রেক্ষাপট। ত্রিশের দশকের শেষ দিক থেকে চল্লিশের দশকে পৌঁছে শহর ঢাকায় মুসলিম লীগ ছাড়াও চারটি রাজনৈতিক সংগঠন প্রবল প্রতাপে পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় সক্রিয় ছিল, তাতে বিদ্বেষ বা বিরূপতাও কম ছিল না। যেমন জাতীয় কংগ্রেস, ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপিআই এবং কমিউনিস্ট পার্টি। শেষোক্ত সংগঠনটি ছিল পূর্বোক্ত তিনটির একাট্টা বা বিচ্ছিন্ন বিরোধিতার টার্গেট।

ইতিহাসের পাতা উল্টাতে গেলে দেখা যায়, ত্রিশের দশকের শেষ বছর দুইসহ চল্লিশের দশকের বেশির ভাগ সময় বিশ্বযুদ্ধ, রাজনীতির পরস্পরবিরোধিতা, সামাজিক অস্থিরতা নিয়ে টালমাটাল। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাম্প্রদায়িক সংঘাত, রাজনৈতিক সংঘাত, প্রগতি বনাম রক্ষণশীলতার দ্বন্দ্ব, সেই সঙ্গে সাহিত্য-সংস্কৃতি-রাজনীতিতে শাসক সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতাসহ সমাজবাদী মতাদর্শের প্রাধান্য। চল্লিশের দশক তাই কারো কারো মতে বিচিত্র আদর্শিক সংঘাত সত্ত্বেও প্রগতি সাহিত্য-সংস্কৃতির দামাল দশক। সে সময় সর্বভারতীয় ও বঙ্গীয় প্রেক্ষাপটে প্রগতি সাহিত্য-সংস্কৃতি ও গণনাট্যের এক উজ্জ্বল শক্তিমান অধ্যায় রচিত হয়েছিল, ঢাকার সোমেন চন্দ সে উজ্জ্বলতার তরুণ প্রতিভূ, যত ছোট হোক না কেন সে বৃত্ত।

 

তিন

সোমেন চন্দের জন্ম ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের ২৪ মে একটি নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে। তাঁর শৈশব থেকে বাকি জীবন (মাত্র ২২ বছরের) কেটেছে অভাব-অনটনে শহর ঢাকায়। তারুণ্য আদর্শবাদে আকৃষ্ট হওয়ার সময়। সোমেন চন্দের বেলায়ও তাই। তা ছাড়া ঘর-বাইরের সহায়ক পরিবেশ তাঁকে রাজনীতিতে টেনে আনে। সে রাজনীতি সমাজবদলের, কমিউনিস্ট আন্দোলনের, সর্বোপরি আর্থসামাজিক শোষণ ও বৈষম্য হ্রাসের বিরুদ্ধে সংগ্রামের।

সময়টা ছিল সোমেন চন্দের জন্য বহুমাত্রিক শ্রমের। রাজনীতি, সাহিত্য, সাংগঠনিক কাজ, বই পড়া—সব কিছু মিলে। তাঁর আন্তরিকতা, নিখাদ আদর্শবাদ ও শ্রমনিষ্ঠার কারণে কমিউনিস্ট নেতাদের দৃষ্টি পড়ে এই তরুণ কর্মীর ওপর। ইতিমধ্যে বিশ্বযুদ্ধাবস্থার কারণে কমিউনিস্ট নেতা প্রায় সবাই কারাগারে। সে পরিপ্রেক্ষিতে রেলওয়ে ওয়ার্কার্স ইউনিয়নের সব দায়িত্ব পড়ে সোমেন চন্দের কাঁধে। বহুসংখ্যক মেহনতি মানুষ, সংগ্রামী মানুষের সংস্পর্শে আসেন সোমেন। অভিজ্ঞতা বাড়ে, যা তাঁর গল্প সৃষ্টির পক্ষে সহায়ক হয়ে ওঠে। রণেশ দাশগুপ্তের মতে, ‘এখানেই লেখক হিসেবে তাঁর শিক্ষানবিশির উত্তরণ রূপদক্ষতায়। ’

একই বছরে প্রগতি লেখক সংঘের বৈঠকে পঠিত রচনাগুলো নিয়ে ‘ক্রান্তি’ শীর্ষক একটি সাহিত্য সংকলন প্রকাশিত হয়। সংকলন প্রকাশের ক্ষেত্রেও সোমেন চন্দের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা উল্লেখ করেছেন রণেশ দাশগুপ্ত তাঁর লেখায়। সোমেন চন্দের ‘বনস্পতি’ গল্পটি এই সংখ্যা ‘ক্রান্তি’তেই প্রকাশিত হয়। রণেশ দাশগুপ্ত আরো লিখেছেন যে ক্রান্তির শ-খানেক কপি নিয়ে সোমেন কলকাতায় গিয়ে প্রগতি লেখক-লেখিকাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং তাঁর ‘ইঁদুর’ গল্পটি ‘পরিচয়’ পত্রিকায় দিয়ে আসেন। তাঁর শোকাবহ মৃত্যুর কিছুদিন পরই গল্পটি ‘পরিচয়’-এ ছাপা হয়।

 

চার

তাঁর স্বল্পস্থায়ী জীবনে প্রধানত ১৯৩৭ থেকে ১৯৪২ সময় পরিসরে রাজনীতি ও সাহিত্য হাত ধরাধরি করে চলেছে। সাহিত্য বলতে শুধু গল্প লেখা বা অন্য সাহিত্যকর্মই নয়, সাহিত্য-সংস্কৃতির সাংগঠনিক দিকেও ছিল তাঁর যথেষ্ট অবদান। তবু বলব, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিশেষ করে ঢাকা রেলওয়ে ওয়ার্কার্স ইউনিয়নে কমিউনিস্ট পার্টি প্রভাবিত ইউনিট গঠনে কিংবা প্রগতি লেখক সংঘ ও সোভিয়েত সুহূদ সমিতির গোড়াপত্তনে সোমেন চন্দের ছিল শ্রমনিষ্ঠ অসাধারণ ভূমিকা। এসব কারণে কমিউনিস্ট কর্মী সোমেন বিরোধী রাজনৈতিক দলের চোখে হয়ে ওঠেন বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বী, এককথায় শত্রু ও হত্যার টার্গেট। সোমেন হত্যার নির্মমতা এমনটাই প্রমাণ করে।

সোমেন নিজেও ‘মার্ক্সবাদী সমাজবিজ্ঞান এবং বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ রচনাসমূহ পাঠের মাধ্যমে একজন সুশিক্ষিত মার্ক্সবাদী হয়ে উঠতে’ অবিশ্বাস্য মাত্রায় সময় ও শ্রম ব্যয় করেছেন। তাঁর সাহিত্যচর্চা যদি হয়ে থাকে সহজাত নান্দনিক তাগিদে, তাতে ছিল আদর্শিক প্রভাব। আর সেই আদর্শ ও সমাজবদলের প্রেরণায় তাঁর প্রগতিশীল রাজনীতি, এ ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতির বিষয়টি উল্লেখযোগ্য। সম্ভবত রাজনৈতিক অভিভাবকপ্রতিম সতীশ পাকড়াশির আদর্শিক কথাগুলো তাঁর মনে গভীর দাগ কেটে স্থায়িত্ব পেয়ে থাকবে।

শ্রমিক আন্দোলনের পাশাপাশি ঢাকা জেলা প্রগতি লেখক সংঘের ‘গোড়া পত্তনেও সোমেন চন্দের ছিল অগ্রণী ভূমিকা’, এ মন্তব্য রণেশ দাশগুপ্তের। কিরণ শংকর সেনগুপ্তের ভাষ্যে একপর্যায়ে সোমেন এই সংগঠনের সম্পাদক, মতান্তরে সহসম্পাদক। আসলে এই তরুণ বয়সেই সোমেন চন্দ কমিউনিস্ট আদর্শের বাস্তবায়নে মনপ্রাণ সমর্পণ করেছিলেন। তাই একাধিক ধারায় তাঁর কার্যক্রমের বিস্তৃতি।

স্বভাবতই পূর্বোক্ত দায়িত্ব পালনে থেমে থাকেননি সোমেন চন্দ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রান্ত হওয়ার (২২ জুন, ১৯৪১) পর ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি এ যুদ্ধকে জনযুদ্ধ ঘোষণা করে নীতিগতভাবে সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে অবস্থান নেয়। কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে চলে যুদ্ধবিরোধী তত্পরতা। গঠিত হয় ‘সোভিয়েত সুহূদ সমিতি’।

বলতে গেলে এই ‘সোভিয়েত সুহূদ সমিতির’ কর্মকাণ্ডে মন-প্রাণ দিয়ে জড়িত হওয়াও বোধ হয় সোমেনের বিপদ ডেকে আনে, সেই সঙ্গে রেল ইউনিয়নে তাঁর জনপ্রিয়তা। কারণ প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলগুলো ছিল ‘জনযুদ্ধ’নীতির ঘোর বিরোধী। যা-ই হোক, ১৯৪২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় স্থাপিত ‘সোভিয়েত সুহূদ সমিতি’ শহর ঢাকায় সোভিয়েত ইউনিয়নের পক্ষে একটি চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর উদ্বোধন করেন। যথারীতি এ আয়োজনেরও একনিষ্ঠ নেপথ্য কর্মী সোমেন চন্দ। এর পরই সেই ভয়ংকর দিন ৮ মার্চ (১৯৪২)।

ঢাকার সুতাকল শ্রমিকদের সমর্থনে আয়োজন ফ্যাসিস্টবিরোধী সম্মেলনের। প্রধান উদ্যোক্তা সোভিয়েত সুহূদ সমিতি। এতে যোগ দেন শ্রমিকনেতা শামসুল হুদা, রেল ইউনিয়ন নেতা জ্যোতি বসু, বঙ্কিম মুখার্জি, সুরেন গোস্বামী, স্নেহাংশু আচার্য, সাধন গুপ্ত প্রমুখ স্বনামখ্যাত রাজনৈতিক নেতা ও বুদ্ধিজীবী। সম্মেলনের সভাপতি নির্বাচিত হন বঙ্কিম মুখার্জি। সম্মেলন সফল করতে সোমেন চন্দ মনে হয় তাঁর সমগ্র সত্তা উজাড় করে দিয়েছিলেন। তাই ঢাকার রেল শ্রমিকদের এ উদ্দেশ্যে সংগঠিত করে একটি মিছিল নিয়ে সম্মেলনের সভামঞ্চের দিকে যাত্রা করেন সোমেন চন্দ। মিছিলের নেতৃত্বে সোমেন, হাতে তাঁর লাল পতাকা। ইতিমধ্যে বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনের একদল জঙ্গি যুবক মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সম্মেলনস্থলে হামলা চালায়; কিন্তু স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রতিরোধে তারা পিছু হটে। ব্যর্থ আক্রোশে ফেরার পথে ওরা হঠাৎ করেই সোমেনের নেতৃত্বে অগ্রসরমাণ মিছিলে হামলা চালায়। তাদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল সোমেন। বাধা দেওয়ার আগেই তারা নৃশংসভাবে খুন করে সোমেন চন্দকে।

 

পাঁচ

সহকর্মীদের মতে, ‘সোমেনের আত্মদান বৃথা যায়নি। ’ নিষ্ঠুর এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে শিক্ষিত মহলে প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়, বিশেষ করে প্রগতিশীল শিবিরে। কলকাতায় ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হলে প্রতিবাদী স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। অবিশ্বাস্য যে এ সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রবীণ জাতীয়তাবাদী নেতা রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন কলকাতার স্বনামখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী। তাঁদের কণ্ঠে প্রতিবাদ ও ধিক্কার। ফ্যাসিবাদী অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে নতুন করে প্রস্তাব করা হয় ফ্যাসিবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পীসংঘ গঠনের।

স্মরণযোগ্য যে বিভিন্ন সময়ে বিশ্বে ফ্যাসিস্ট বা অনুরূপ রাজনৈতিক অপশক্তির হাতে আদর্শবাদী মানুষের শহীদ হওয়ার সংখ্যা নেহাত কম নয়। যে স্পেনীয় গৃহযুদ্ধে ফ্যাসিবাদবিরোধী সংগ্রামে উদ্দীপ্ত ছিলেন সোমেন চন্দ, সেই গণতন্ত্রী স্পেনকে রক্ষা করতে ‘আন্তর্জাতিক ব্রিগেডে’ যোগ দিয়ে শহীদ হন র‌্যালফ ফক্স, ক্রিস্টোফার রডওয়েল, জন কনফোর্ড, জুলিয়ান বেল প্রমুখ প্রতিভাবান লেখক ও বুদ্ধিজীবী। খুন হন মহৎ স্পেনীয় কবি গার্সিয়া লোরকা, চল্লিশের দশকে প্রান্তিক বঙ্গে শহীদ সোমেন চন্দ চরিত্র-ধর্মে তাঁদেরই একজন। নারায়ণ চৌধুরী ঠিকই বলেছেন : ‘সোমেন চন্দ বাংলার বিপ্লবী তারুণ্যের কাছে এক উজ্জ্বলতম নাম। ’


মন্তব্য