kalerkantho

রহস্যজট

পলাশের যুক্তি

আশিকুর রহমান

২৪ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পলাশের যুক্তি

আশফাক মিস্ত্রিকে দেখে থামাল কিশোর পলাশ। বয়স বারো হলে কী হবে, গ্রামে তার দাপট অনেক।

‘কই যাও আশফাক চাচা!’

‘দেশের অবস্থা বালা না। মিলিটারি আইব হুনতাছি।’

‘তো পলাইতেছ ক্যান? দেশের অবস্থা বালা করন লাগব না?’

‘আরে, কাহিল হয়া গেছি রে বাপ। পেটে দানাপানি দিতে হইব।’

‘গেছিলা কই?’

‘পুবের বিন্দিনদীর বিরিজের কাম চলতেছে। নদীতে ভরা জোয়ার। তুই পড়লে শ্যাষ।’

‘আমি সাঁতার পারি! হুহ!’

পলাশরা থাকে বিরিন্তাপুর গ্রামে। গ্রামের পশ্চিমে থাকা বিন্দিনদী সারাক্ষণই বাতাসের তালে তালে বয়ে চলেছে উত্তর থেকে দক্ষিণে। দুদিকেই শহর সমান দূর। এর মাঝে দক্ষিণে কয়েক মাইল দূরেই নদী ঘেঁষে চৈন্তাপুর। দুই প্রান্তের আরো কিছু গ্রাম ঘেঁষে বেঁকে গেছে নদীটা।

বিরিন্তাপুরের মতো এ পারের গ্রামগুলো যেন এক সুতোয় বাঁধা। মাঝে মাঝে আঁকাবাঁকা পথ আর খাল। বেশির ভাগই ধানি জমি আর সবজিক্ষেত। পুবের দিকে একটা মেইন রোডের মতো আছে। দু-একটা বাস মাঝেমধ্যে চলে।

পলাশ রেডিওর খবরে শুনেছে, সারা দেশে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে নাকি পাকিস্তানি সৈন্যরা। তাদের গ্রামে এখনো আসেনি। পরদিন সকালে শোরগোল শুনে ছুটে বেরিয়ে গেল পলাশ। চলে গেল স্কুলমাঠে। দেখল, চালের আড়তদার মতিনকে ঘিরে গোল হয়ে আছে অনেকে। মতিন গিয়েছিল দক্ষিণের মফস্বল শহর চৈন্তাপুরে। সেখানে নাকি মিলিটারি ঘাঁটি গেড়েছে।

‘ওরা আইজকা বিরিন্তাপুর দিয়া অপারেশন শুরু করব। গোলাবারুদ লইয়া আসতেছে। তোমরা সবাই যা কিছু আছে সব লইয়া আমার লগে পুবের মেইন রোড ধইরা হাঁটা দেও। যত তাড়াতাড়ি যাইবা তত তাড়াতাড়ি বাঁচতে পারবা। রোড ছাইড়া যাইবা না। তাইলে মরবা।

‘ওই মিয়া, আন্দাজে কতা কও ক্যালা?’

চেঁচিয়ে উঠল পলাশ। ভিড় ঘুরে দাঁড়ালো পলাশের দিকে।

‘ছেড়া, তুই বেশি পকর পকর করস! আমি কইতাছি...।’

‘তুমি কইতাছস চৈন্তাপুর দিয়া আসব। কিন্তুক বিরিজের কাম এখনো শেষ হয় নাই।’

‘পুঁচকা দেহি কাউয়ার ছাওয়ের মতো চিক্কুর দেয়। মিলিটারি কি বাসে কইরা আসব রে! ওগো কাছে গানবোট আছে। ওরা আইব রাইতের আন্ধারে।’

গুঞ্জন উঠল। আশপাশের কোনো নদীতে কেউ কোনো দিন ইঞ্জিন নৌকা চলতে দেখেনি। গানবোট কী বস্তু সেটাও জানে না। এর মধ্যে একজন বলল, ‘ইঞ্জিন থাকলে তো শব্দ পামু। আওনের খবর পাইলে দূর থেইকা খন্তা-কুড়াল লইয়া রেডি থাকুম। আমগো কাছে তীর মারার লোকও আছে। ওরা তীর মারব। কী রে পলাশ, তুই পারবি না?’ নিজেকে প্রমাণ করতেই যেন ভোঁ করে একটা গুলতি ছুড়ল পলাশ। সোজা গিয়ে লাগল স্কুলের ঘণ্টায়। সে শব্দ থামতেই মতিন মিয়া আবার হাত উঠাল।

‘ভাইসব, ভুল আমার। তোমাগোরে বেশি সাবধান করতে চাইছিলাম। তোমরা তো বিশ্বাস করলা না। সইত্যটা কই তাইলে। আমার লগে দক্ষিণের এক রাজাকার কমান্ডারের বাতচিত হইছে। তারা ভাবে, এই বিরিন্তাপুরে মুক্তিগো ঘাঁটি আছে। ওরা আইব রাইতের বেলায়। চোরের মতো। ইঞ্জিননৌকা বা গানবোটে চইড়া আসব না। আসব পালতোলা নৌকায়।’

এবার নীরবতা। ভয় পেয়েছে সবাই। এমনিতে আজ অমাবস্যার ভরা কাটাল। রাতের আঁধারে কোন ফাঁকে এসে গুলিটুলি মেরে বসে।

‘ভোঁ!... ধপাস!’

হতবিহ্বল গ্রামবাসী দেখল, পলাশের গুলতি থেকে ছুটে আসা একটা মার্বেল সোজা আঘাত করল মতিনের কপালে। জ্ঞান হারিয়ে বস্তার মতো পড়ে গেল লোকটা।

‘হালা মিথ্যুক! রাজাকার! হগ্গলরে মারনের বুদ্ধি। শোনো গ্রামবাসী... পাকিস্তানি মিলিটারি চৈন্তাপুর না, পুবের মেইন রোড দিয়া আসতেছে। সবাই রাইতের আগেই নৌকায় কইরা মাঝনদীতে গিয়া ঘাপটি মাইরা বইসা থাকো। তারপর দেখো কী কাণ্ড ঘটে।’

এরপর গ্রামবাসী পলাশের বাকি যুক্তি শুনল। পড়ে গেল হৈচৈ। কেউ তৈরি হলো পালাতে। কেউ ঠিক করল, মোটা গাছগুলোর আগায় ইট, পাথর আর কেরোসিন ভেজানো মশাল নিয়ে বসে থাকবে। পলাশ ঠিক করল, সে-ও থাকবে তাদের দলে, গুলতি হাতে।

এবার বলো, পলাশ কী যুক্তি দেখিয়েছে?

 

গত রহস্যজটের উত্তর

উত্তর : মোকারম বলেছেন, তিনি ভারী একটা ন্যাকড়া দিয়ে ইমরোজের বমি পরিষ্কার করেছেন। যদি সত্যিই তা করে থাকতেন, তবে সেটা শুকনো থাকত না, ভেজা থাকত।

মন্তব্য